বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২১

ডাঃ মীডের সন্দেহ ভঞ্জন ও জাতির হাত ধরাঃ

 ডাঃ মীডের সন্দেহ ভঞ্জন ও জাতির হাত ধরাঃ


ডাঃ সি, এস, মীড ১৯০৬ সালে ওড়াকান্দী আসার পর প্রায়শই গুরুচাঁদ ঠাকুরের সাথে নানা বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করতেন । উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত বিজ্ঞানের পূজারী মীড সাহেব প্রতিদিন অবাক হতেন গুরুচাঁদ ঠাকুরের প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, ধৈর্য্য, শৌর্য দেখে ! তিনি চেষ্টা করতেন গুরুচাঁদ ঠাকুরকে বুঝবার, পরিমাপ করার । জ্ঞান-যুক্তি দিয়ে যাচাই করে নিতে চাইতেন সবকিছু । কিন্তু হায় ! যত বুঝতে চাইতেন ততই যেন তিনি ঠাকুর গুরুচাঁদের অসীম জ্ঞান ভান্ডারে নিজেকে হারিয়ে ফেলতেন । মনের ভিতর ঘুরপাক খেত হাজারো প্রশ্ন ----কে ইনি ! কিভাবে এঁনাকে ধরা যায় ! কোন্‌ গুণে এত এত ভক্ত’রা ---- ‘ইনি জগতের সেরা’ বলে গণ্য করে ! মীড সাহেবের মনের ভাব বুঝে ‘অন্তর্যামী’ গুরুচাঁদ ধীরে ধীরে জবাব দিতেন সব কথার ।


একদিন ‘রাজর্ষি’ গুরুচাঁদ মীড সাহেবকে বলছেন, ‘আচ্ছা মীড, বিজ্ঞানের বলে তোমরা অত্যাশ্চর্য তো কত কিছুই কর; শুনেছি ‘দূরবীন’ নামক এক যন্ত্রের সাহায্যে অনেক দূরের জিনিস দেখতে পাও আবার বীনা তারে অনেক অনেক দূরের মানুষের সাথে কথা বলো । মৃতদেহে জীবন দান দিতে কিন্তু তোমরা পার না ! আমরা জানি, এই ‘দেহ-ভান্ড’ সর্ব্ব শক্তির আধার । তাকে জাগাতে পারলে কিন্তু সব জানা যায় ! অতঃপর গুরুচাঁদ ঠাকুর মীড সাহেবকে নিচলপুরের ‘দুই কন্যা’র কাহিনী শোনান । মীড সাহেব বলেন, ‘এসব ধর্মের উপকথা মাত্র’; বাস্তবে কদাচিৎ এমন ঘটে না’ । মীড সাহেবের সন্দেহভাজন করতে গুরুচাঁদ ঠাকুর তখন তাঁর পিতা ‘পতিত পাবন’ দয়াল হরিচাঁদের ভক্ত যুধিষ্ঠিরকে কিভাবে বাঘের হাত থেকে উদ্ধার করেছিলেন তা ব্যক্ত করেন । তাতেও মীড সাহেব সন্দেহ যায় না । তিনি বলেন ‘আমরা ইংরেজ জাতি যা কিছু স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করি তাই বিশ্বাস করি এবং অনুমান করে কিছু বিশ্বাস করা ফাঁকির সমতুল্য বলে গণ্য করি’ ।


মীড সাহেবের মনের আঁধার ঘোচাতে, ঠাকুর গুরুচাঁদ তখন মিষ্টি হেসে বললেন-----শোন মীড, কার্তিক নামে একজন ভক্ত এক দুধের ভান্ড নিয়ে এখানে আসছে । ঠিক দু’দিন পরে এমন সময়ে সে এখানে এসে পৌঁছাবে । জাতিতে সে নমঃশূদ্র, বয়েস ৪০, গৌরাঙ্গ বরণ এবং হাতে তাঁর একখানি ছাতা রয়েছে । ইতিপূর্বে সে কখনই ওড়াকান্দী আসে নি । দু’দিন পর এখানে এসে স্বচক্ষে তাঁকে দেখে যেও । ‘দূরদর্শী’ গুরুচাঁদ তাঁর মনের ভাবধারা বুঝিয়ে দিতে কিন্তু ভোলেননি মীড সাহেবকে, তিনি বললেন-----


“আমার স্বভাব নহে সব বলা ।

বড়ই বিপদে ভরে এই পথে চলা ।।”            (শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত, পৃঃ ১৯৯)


অর্থাৎ, গুরুচাঁদ ঠাকুর এইসব কথা বলা পছন্দ করতেন না । শুধু্মাত্র মীড সাহেবের সন্দেহ ভঞ্জনের কারণেই বলেছেন । কতখানি দূরদর্শিতা ও বাস্তবোচিত ধারণার অধিকারী হলে এমন কথা বলা যায়  । তিনি চাইতেন, মানুষ আত্মশক্তি জাগরণের মধ্যে দিয়েই আত্মবলে বলীয়ান হোক । কোন ভ্রান্ত ধারণার বশীভূত হয়ে মানুষ যেন ভুল পথে চালিত না হয় ! বিস্ময়ে অভিভূত ডাঃ মীড বাড়ী ফিরে এসে সব বৃত্তান্ত জানালেন তাঁর জীবন সঙ্গিনী মিসেস্‌ মীড’কে । মিসেস্‌ মীড স্ববিস্ময়ে বলে ওঠেন, ‘যদি একথা সত্যি হয়, তবে গুরুচাঁদ ঠাকুর’কে আমার ‘ধর্মপিতা’ বলে স্বীকার করে নেব । যথাসময়ে আসে সেই কাঙ্খিত দিন । ‘দূরদর্শী গুরুচাঁদের প্রতিটি বাক্য অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয় । শেষ হয়, ডাঃ মীডের পরীক্ষা । অতঃপর মীড জানান, তাঁর মা দিব্য-দেহধারী এক পুরুষের স্বপ্নাদেশে তাঁকে বঙ্গদেশে আসার আদেশ আগেই দিয়েছিলেন । বলেছিলেন----‘এক মহান পুরুষের সাথে তোর সাক্ষাত হবে । এতদিনে আমার আশা পূর্ণ হল’ । এরপর ডাঃ মীড অঙ্গীকারবদ্ধ হন সমাজের অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষের জন্য গুরুচাঁদ ঠাকুরের নির্দেশানুযায়ী কাজ করে যাবেন । মীড সাহেব বলেন -----


 

“তোমার জাতিকে আমি ধরিলাম হাতে ।

সর্ব্ব উপকার পাবে এরা আমা’ হ’তে ।।’’ (শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত, পৃঃ ২০২)


তারপর গুরুচাঁদ ঠাকুরের সহযোগিতা ও তত্ত্বাবধানে দীর্ঘ ১৫ বৎসর যাবৎ ডাঃ সি এস মীড যে কত’শত কাজ করে গেছেন তা ভাবলে অবাক হতে হয় । যতদিন চন্দ্র সূর্য থাকবে, মতুয়াকাশে ডাঃ মীডের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে । তিনি ওড়াকান্দীর মাটিতে মতুয়াদর্শ দ্বারা এতটাই প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন যে সুদূর অস্ট্রেলিয়া ফিরে গিয়ে নিজ বাড়ীর নাম রেখেছিলেন ‘ওড়াকান্দী’ । 


 জয় গুরুচাঁদ । জয় মীড সাহেব ।

কোন মন্তব্য নেই: