বুধবার, ১৬ নভেম্বর, ২০২২

বিরসা মুন্ডা

 VOICE of 85

 বিরসা মুণ্ডার জন্ম গ্রাম উলিহাতু জেলা রাঁচী ১৫ই নভেম্বর ১৮৭৫। পিতার নাম সুগণা মুণ্ডা মাতার নাম কর্মী হাতু। কাজের খোঁজে বীরসার পিতা কুরুম্বদা বীরবাকির কাছে যেতে হয়। সেখানে শ্রমিকের কাজ করে অন্যের জমিতে।


বীরসার ছোটবেলা সাধারণ আদিবাসী ছেলে মেয়েদের যেভাবে কাটে তারও সেই ভাবে আনন্দে কেটেছে ধূলাবালি গাছপালার সাথে। তবে বীরসা খুব সুন্দর বাঁশি বাজাতে পারত।


পরিবারের জন্য বীরসাকে তার মামাবাড়ী আয়ুভাতে থাকতে হয়েছিল। এখানে বীরসা দু বছর কাটিয়ে ছিল। এখানে সালগার এক স্কুলে সে পড়ত। যে স্কুল চালাত জয়পাল নাগ। তারপরে বীরসা একজন খ্রীষ্টান মিশনারির সান্নিধ্যে আসে এবং খ্রীষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে। তখন থেকে তার পড়াশুনার প্রতি অত্যধিক মনোসংযোগ এসে যায়। বীরসা যে ভেড়া ও ছাগলদের চরাত তাদের প্রতি নজর না দেওয়ার জন্য বীরসাকে প্রহার করে মালিকেরা। তখন সে তার দাদার কাছে কুন্দ্রী বড়ােলীতে চলে যায়। এখানেই সেই নিম্ন প্রাথমিকে পড়াশুনা করে জার্মান মিশনারীদের কাছে। তারপরে সে চাইবাসাতে ও একটি জার্মান মিশনারী স্কুলে পড়াশুনা করে। বীরসার জীবনের ছোট বেলাটাই কেটেছে বিহারের ছোটনাগপুরের গ্রাম ও জঙ্গলে।


চাইবাসাতে বীরসা ১৮৮৬ সাল পর্যন্ত কাটিয়েছিল। এই সময় সর্দারদের সঙ্গে মিশনারী এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হওয়ার কারণে তার পিতা তাকে মিশনারী স্কুল থেকে তুলে নেয়। এর একটা বড়ো কারণ ব্রিটিশ সরকার আদিবাসীদের কাছ থেকে জঙ্গলের অধিকার কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত করে। সিংভূম, পালামৌ, মানভূম সর্বর ব্রিটিশরা তাদের অধিকার কব্জা করতে উঠে পড়ে লাগে। ১৮৮২ সালে ভারতীয় জঙ্গল আইন চালু হয়, তারই ফলশ্রুতি এইসব।


ঠিকাদার এবং জাগিরদাররা বহুদিন ধরে এইসব অঞ্চল দখল করে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। ১৮৫৬ সালে এই জাগিরদারদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৬০০।

এর ফলে এখানকার মূলনিবাসী মানুষেরা প্রায় তাদের জমিজমা হারিয়ে ফেলেছিল। 


নিজেদের জমিতেই তারা মজদুর হিসাবে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছিল। তাদের জমি এই জমিদারের ঠিকাদার আর মহাজনদের কবজায় চলে গিয়েছিল। তাদের অশিক্ষার কারণে ব্রিটিশ কোর্টে তাদের লড়াই করার ক্ষমতা ছিল না। শত শত বছরের দখলে রাখা জমি ব্রিটিশদের দালাল জমিদার আর মহাজনদের কবজায় চলে গিয়েছিল। বীরসা ছোটনাগপুর অঞ্চলের সমস্ত আদিবাসীদের এক ছাতার তলায় নিয়ে আসল।


১৮৯৪ সালে খরা আর মহামারীতে আদিবাসীদের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে পড়ে। বিরসা সমস্ত আদিবাসীদের একজোট করে ব্রিটিশ সরকারের কাছে আবেদন জানায় জঙ্গলের উপরে যে ট্যাক্স চাপানো হয়েছে, তা যেন মকুব করা হয়।


১৮৯৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাদের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখা এবং সবাই একত্রীভূত করে ব্রিটিশের বিরোধিতার জন্য বীরসার দু'বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়। তার জন্য জমিদার এবং মহাজনদের ষড়যন্ত্র ছিল।


১৮৯৭ সালে বীরসা আগষ্ট মাসে চারশো আদিবাসীদের নিয়ে তীর ধনুক নিয়ে খুন্তী পুলিশ স্টেশন আক্রমন করে।


১৮৯৮ তালাগা নদীর পাশে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে বীরসা যুদ্ধে অবতীর্ণ


হয়। প্রথমিকভাবে ব্রিটিশদের পরাজিত করে।


পরবর্তীকালে ব্রিটিশ তাবেদারদের কৌশলে আদিবাসীদের অনেক লোককে গ্রেপ্তার হতে হয়। তাদের উপর চলে অকথ্য নিপীড়ন। ১৯০০ সালের ফেব্রুয়ারী তিন তারিখে চক্রধরপুরের জঙ্গলে বীরসাকে গ্রেপ্তার করে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী।


এই জেলে মাত্র ২৫ বছর বয়সে এক অসিম সাহসী আদিবাসী যুবক বীরসা মুণ্ডার মৃত্যু হয়। ব্রিটিশরা ঘোষণা করে কলেরায় বীরসা মুণ্ডার মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু কলেরা হয়েছে বীরসা মুণ্ডার এমন কোন খবর ছিল না।


২৫ বছর বয়সের এক যুবা যে এমন ঐতিহাসিক লড়াই দিতে পারে আবা পর্যন্ত ভারতবর্ষের ইতিহাসে এমন উদাহরণ পাওয়া মুস্কিল। হাজার হাজার আদিবাসীদের যেভাবে অনুপ্রাণিত করে দুর্ধর্ষ ব্রিটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে এবং জমিদার মহাজনদের বিরুদ্ধে এতো দুর্দমনীয় লড়াই এক স্বল্পশিক্ষিত আদিবাসী ২৫ বছরের যুবকের তা অবিস্মরণীয়। তার এই লড়াই চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে আগামীদিনের মানবতাবাদের লড়াইয়ের ইতিহাসে।

বর্তমান এই বীর পুরুষ বীরসা মুন্ডাকে আমরা মুলনিবাসি আদিবাসীরা ভগবান বানিয়ে ফেলেছি, বিশেষ করে উত্তর ভারতে দিল্লির প্রতিবেশী জেলার মুল নিবাসীরা এর পূজা করেন ।