সোমবার, ৭ অক্টোবর, ২০১৯

যে মতুয়ারা, ‘জন্মগত জাতিকথা কয় না’ সেই মতুয়া- জনক হরি-গুরুচাঁদের গলায়, ‘ব্রাহ্মণ’ – জাতের জুতোর মালা কেন পরাই?



 

 









যে মতুয়ারা, ‘জন্মগত জাতিকথা কয় না’ সেই মতুয়া- জনক হরি-গুরুচাঁদের গলায়, ‘ব্রাহ্মণ’ – জাতের জুতোর মালা কেন পরাই?
       লেখক – স্বপন কুমার বিশ্বাস
(বই- হরি-গুরুচাঁদ  বাঙলার চণ্ডাল ও ভারতবর্ষের অভ্যুত্থান পৃষ্ঠা ক্রমাঙ্ক ৬০ থেকে ৬৫)

---- একদল নমঃশূদ্র নিজেদের ব্রাহ্মণ বলে পরিচিত করানোর চেষ্টা করে। তাতেই তারা আনন্দ পায়। কেন? একি কেবল হীনমন্যতা প্রসূত পলায়ন মনবৃত্তি না ঐতিহাসিক তত্ত্ব ভিত্তিক সত্য? হরিচাঁদ বেদ, ব্রাহ্মণ মানেননি। সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলন ও বৈপ্লবিক আধ্যাত্মিক আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি জাতিভেদ ব্যবস্থার বিলোপ করার সাধনা করেছেন। সেক্ষেত্রে তাঁকে কিংবা তাঁর পরিবার বা বংশকে এবং সর্বশেষে, সমগ্র চণ্ডাল তথা নমঃশূদ্র জাতিকে ব্রাহ্মণ হিসাবে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা যে কত বড় অপপ্রচেষ্টা তা নির্ণয় করাও কঠিন।

   চণ্ডাল জাতির কিছু সম্পন্ন মানুষ সামাজিক মর্যাদা অর্জনের জন্য চেষ্টা চালান। এর জন্য তৎকালে তাদের সামনে দুটি মাত্র পথ খোলা ছিল, প্রথমতঃ ধর্মান্তরিত মুসলমান হওয়া দ্বিতীয়তঃ হিন্দুদের মাঝে হিন্দু ব্রাহ্মণ সমাজপতিদের দ্বারা গ্রহণযোগ্য স্তরে স্থান লাভ করা। তৎকালে প্রায়  এক কোটি চণ্ডাল জাতির সদস্য মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করে মানুষ হিসাবে সামাজিক স্বীকৃতি আদায় করে নেয়। একদল যারা চৈতন্য মহাপ্রভুর অত্যাচারে এবং অন্যবিধ প্রচারের প্রভাবে মুসলমান খ্রীষ্টান হতে পারেনি, তারা হিন্দুদের  পঙ্‌তিতে আশ্রয় গ্রহণের চেষ্টা চালায়। এক দল ব্রাহ্মণ সমাজপতিও এমনি  শূদ্র-স্বেচ্ছাদাস বানাবার এক সুযোগ খুঁজছিলো।
    সামান্য শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠান প্রাপ্ত সদস্যরাই দলিত বহুজন সমাজকে স্ব-স্বার্থে ধোঁকা দিয়েছে,  বিপন্ন করেছে চিরকাল। তারা নানান ভাবে প্রমাণ করতে চেষ্টা করেছে চণ্ডালেরা ব্রাহ্মণ, কিম্বা চণ্ডালেরা চণ্ডাল নয় তারা নমঃশূদ্র এবং নমঃশূদ্ররা ব্রাহ্মণ। এই পথে তারা ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুদের কাছে ঘেঁসার চেষ্টা করেছে।
    হরিচাঁদ জন্মের প্রায় শত বৎসর পরে তারক গোঁসাই লেখা হরিলীলামৃত প্রকাশিত হয়। গ্রন্থমধ্যে বর্ণিত হয়েছে যে, জীবনীর পাণ্ডুলিপি দেখে ঠাকুর হরিচাঁদ নিষেধ করেছিলেন জীবনী লিখতে। যাইহোক ইতিমধ্যে আমরা লক্ষ্য করেছি চণ্ডালদের মধ্যে হিন্দু হবার একটা আগ্রহ দেখা দিয়েছিল। যদিও হরিচাঁদের ধর্ম ও দর্শনতত্ত্ব, ধর্মাচার ও পদ্ধতি সবই হিন্দুধর্ম তথা ব্রাহ্মণ্যধর্ম থেকে বিভিন্ন তথাপি পরবর্তী কালের শিষ্যরা তাঁকে এবং তাঁর ধর্মকে হিন্দুভুত করার ত্রুটি   রাখেন নি। এবং আত্মমর্যাদা রক্ষা করার জন্য অন্যায় ও হীন মনোভাব গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ হরিচাঁদকে ব্রাহ্মণ বংশোদ্ভুত বলে পরিচয় দেবার ব্যবস্থা করে। বলা হয়, তার পূর্বজ পুরুষ, উত্তর বিহারের মিথিলা অঞ্চলের একজন ব্রাহ্মণ সাধু পুরুষ ছিলেন। তিনি পূর্ববঙ্গে এসে নমঃশূদ্র কন্যার পাণী গ্রহণ করেছিলেন। তারপর থেকে বংশটি নমঃশূদ্র বলে পরিচিত হয়।
     এমনকি মহাকবি মহানন্দ হালদার মীড সাহেবের মুখে উচ্চারণ করিয়েছেনঃ-  
“আমি বলি এই জাতি নিশ্চয় ব্রাহ্মণ।
হীন হয়ে আছে শুধু হিংসার কারণ।।
আদি কালে এরা সবে ছিল যে ব্রাহ্মণ
ক্ষুদ্র কিম্বা শূদ্র এরা হবে না কখন।।”
    এমন মতবাদ জাতিতত্ত্বের হিসাব নিকাশে মেলে না। কারণ, প্রথমতঃ জাতকের জাত পিতার জাত হিসাবেই নির্ধারিত হয়। কন্যার জাত থেকে হয় না। দ্বিতীয়তঃ যে অতীত কালে হরিচাঁদের পূর্বপুরুষ নমঃশূদ্র কন্যা বিবাহ করেন বলে বলা হয়েছে, সেইকালে চণ্ডালী মাতার গর্ভের সন্তান নমঃশূদ্র বলে পরিচিত হয়েছিল, এমন কথা শাস্ত্র সম্মত নয়। নমঃশূদ্র তখন ছিলই না।
    এই সব দাবী-দাওয়ার কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। কোন শাস্ত্র বা লিখিত প্রমাণ নেই। দাবীগুলি যে অলীক ও কৃত্রিম সে কথা নানান ভাবে বোঝা যায়। বঙ্গ দেশে তৎকালেই এক কোটি  সংখ্যার বেশি চণ্ডাল ছিল। প্রায় নব্বই লক্ষ চণ্ডাল মুসলমান হয়ে যায়। সংখ্যা তত্ত্বের দিক থেকে অনায়াসেই বলা যায়, এত সংখ্যক ব্রাহ্মণ পূর্বভারত তথা বঙ্গদেশে তৎকালে থাকতেই পারেনা। ভারতবর্ষে ব্রাহ্মণের সংখ্যা কখনও ৩% - ৩.৫% শতাংশের বেশি হয়নি। কিন্তু বঙ্গদেশে চণ্ডালের  সংখ্যা মোট জন সংখ্যার প্রায় ৯% শতাংশে ছিল। এর সঙ্গে আসল ব্রাহ্মণের সংখ্যা যুক্ত হলে দাঁড়ায় প্রায় ১৪% শতাংশ। সপ্তশতী (শূদ্রব্রাহ্মণ) কিম্বা আদি সুরের আনিত পঞ্চ ব্রাহ্মণ যাই হোক না কেন; ব্রাহ্মণ হীন, বেদবাহ্য বঙ্গদেশে মাত্র কয়েকশ বছরে ব্রাহ্মণের সংখ্যাবৃদ্ধির হার যদি আর্যাবর্তের আর ব্রহ্মবর্তের মাত্র ৩% - ৪% শতাংশ ব্রাহ্মণের সঙ্গে তুলনা করা যায় তবে নিশ্চিতই, অবিশ্বাস্য মনে হবে। উত্তর প্রদেশের তথা আর্যাবর্তের ব্রাহ্মণ সংখ্যা ৪% শতাংশের বেশি নয় আজও। বঙ্গে কি করে সেকালেই দেড় দুই কোটি ব্রাহ্মণ হবে?
    এই ধরণের ভাবনা হিসাবে মেলেনা। নমঃশূদ্ররা যদি চণ্ডাল না হত, তারা সকলে যদি ব্রাহ্মণ হত তবে সর্বমোট ব্রাহ্মণের সংখ্যা কত হত? এই কালে, যুগী ও বৈদ্যজাতের লোকেরাও নিজেদের ব্রাহ্মণ বলে দাবী করে আন্দোলন চালিয়েছিল। ভারতবর্ষের সব কটি প্রদেশে ব্রাহ্মণের শতকরা সংখ্যার সঙ্গে বঙ্গের ব্রাহ্মণের শতকরা সংখ্যার কি মিল থাকে? যে দেশে অষ্টম-সপ্তম শতাব্দীর পূর্বে ব্রাহ্মণ ছিল না সেই পাণ্ডব বর্জিত দেশে এত বিপুল সংখ্যক (চন্ডাল + ব্রাহ্মণ + যুগী + বৈদ্য + ধর্মান্তরিত চণ্ডাল + মুসলমান) ব্রাহ্মণ উৎপন্নের হিসাব কোন ম্যালথাস সাহেব দিতে পারবেনা। চণ্ডালের ব্রাহ্মণত্ব ঐতিহাসিক ও গাণিতিক দিক থেকে অবাস্তব।
   এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, জাতভুক্তি করণের মাধ্য দিয়ে হিন্দুকরণের বা ব্রাহ্মণের দাস হিসাবে পরিণত করার কাজের স্রোত এত প্রবল হয়েছিল যে এই একই সময়ে বঙ্গের কায়স্ত, মাহিষ্য, রাজবংশী, পোঁদ-পৌন্ড্র, হাড়ি ইত্যাদি জাতের লোকেরা নিজেদের ক্ষত্রিয় হিসাবে দাবী করতে থাকে। সরকারী নথিতে ক্ষত্রিয় পরিচয় লিপিবদ্ধ করানোর জন্য শাস্ত্রের অকাট্য যুক্তি প্রমান দেখায়। এভাবে দেখা যায় বেদবাহ্য বঙ্গের প্রায় ৩০% ব্রাহ্মণ এবং ৬০% ক্ষত্রিয় জাতের বা বর্ণের মানুষ।
    আর্যসংস্কার তথা মনোবৃত্তি বলে, যা কিছু প্রবল এবং ভাল গুণ সম্পন্ন তাই ব্রাহ্মণজাত, আর্য  বিষয়। আর যা কিছু মন্দ, দুর্বল, কদাকার কিম্বা ভারতীয় তা অন-আর্য। পক্ষান্তরে বলা যায়, যা  কিছু ভারতীয় অন্‌আর্য এবং অব্রাহ্মণ্য তাই মন্দ, নিন্দনীয় ও অস্থায়ী। তার মধ্যে উজ্জ্বল ও প্রশংশনীয় কিছ থাকতে নেই। বঙ্গের প্রবল, সংখ্যাবহুল বিকাশশীল চণ্ডালদের মুক্তিসূর্যের মহিমময় জ্যোতির্লোক হরি-গুরুচাঁদকে তাই আত্মস্মাৎ করে নিতে হবে ব্রাহ্মণ বলে? চণ্ডাল জাতির শৌর্য এবং মানবিক সাধন-সিদ্ধির প্রতি এ এক অন্যায় ব্যঙ্গ এবং বিদ্রুপ মাত্র। ব্রাহ্মণ হওয়া কোন গৌরবের নয়। ব্রাহ্মণজাত ভারতবর্ষের প্রগতি- বিকাশ এবং উত্থানের জন্য কোন অবদানই –ত রাখেনি। ভারতীয় সভ্যতা সংস্কৃতিতে ব্রাহ্মণদের কোন অবদান যদি থাকে তবে তা দাসপ্রথার স্থায়ীত্ব দান, দাসদের সংখ্যা বৃদ্ধি। “ছোট ছোট এই সব (ভারতীয়) গোষ্ঠী ছিল, জাতিভেদ ও কৃতদাসত্ব দ্বারা কলুষিত। অবস্থার প্রভুরূপে মানুষকে উন্নত না করে তাকে (ব্রাহ্মণেরা) করেছে বাহিরের অবস্থার পদানত। স্বয়ং-বিকশিত একটি সমাজ ব্যবস্থাকে তারা পরিণত করেছে অপরিবর্তমান প্রাকৃতিক নিয়তি রূপে। এবং এইভাবে আমদানি করেছে প্রকৃতির এমন পূজা, যা  পশু করে তোলে লোককে। প্রকৃতির প্রভু যে মানুষ তাকে হনুমানদেব রূপী বানর এবং শবলাদেবী রূপী গরুর অর্চনায় ভুলুন্ঠিত করে অধঃপতনের প্রমাণ দিয়েছে” Indian Castes, those decisive impediments to Indian progress and Indian power’ জাত ভেদ ব্যবস্থা ভারতীয় শক্তি ও প্রগতির চূড়ান্ত প্রতিবন্ধকতা। সুতরাং ব্রাহ্মণ হবার পিছনে কোন গৌরব থাকতে পারে না। শোষক-দলক-ঘৃণক যারা, তাদের বিরুদ্ধে সদা দণ্ডায়মান ছিলেন গুরুচাঁদ।
     বাংলায় তথা পূর্ব ভারতে ব্রাহ্মণ ছিল না একেবারেই। ‘শপ্তশতি ব্রাহ্মণের কাহিনি যারা জানে তারা এটাও জানেন, যে গল্পটি অনঐতিহাসিক কাহিনি। যদি ঐতিহাসিকও হয়, কৃত্রিমভাবে,   উদ্দেশ্য মূলকভাবে বানান গল্প নাও হয়, তাহলেও ঐ সাতশত ব্রাহ্মণ কিন্তু কাহিনি অনুসারেই সাজানো ব্রাহ্মণ। গলায় উপবিতের মতন সুতো পরিয়ে গরুর পিঠে চড়িয়ে তাদের পাঠিয়ে ছিলেন রাজা আদিশূর। আদিশূরের ঐতিহাসিক স্থানকাল নির্ণয় করা যায় না। তাহলে বলতে হয় এই  সাতশত শূদ্রব্রাহ্মণ আর স্ত্রীহীন কনৌজ থেকে আগত ব্রাহ্মণই যৌগিক শব্দের ‘নম’ এবং ‘শূদ্র’ বঙ্গ দেশে ব্রাহ্মণের সংখ্যা বৃদ্ধি করে ছিল। সুতরাং সাধু সাবধান। আমাদের স্মরণে রাখা দরকার যে বেদবাহ্য দেশের বামুন, রাজা রামমোহন রায় বেদের বঙ্গানুবাদ করেছিলেন বলে কাশীর বামুনেরা তাঁকে অধিকার ভঙ্গের জন্য গালি দিয়েছিল। এ হেন অবস্থায়, বৈদ্য, যুগী আর বিপুল সংখ্যক নমঃশূদ্ররা যদি, পূর্বোক্ত নকল জারজ ব্রাহ্মণদের সঙ্গে সঙ্গে ব্রাহ্মণের খাতায় নাম লেখায় তবে ইতিহাস ভূগোলের সাথে গণিতেরও গণ্ডগোল শুরু হবে।
     তারা প্রশ্ন তোলেনি, নমঃশূদ্ররা যদি ব্রাহ্মণ তবে ‘ব্রাহ্মণ’ এই বিশেষ্য লিখবে না কেন? নমঃশূদ্র লিখবে কেন? নমঃশূদ্ররা যদি ব্রাহ্মণ, তবে বিহারের মৈথিলী ব্রাহ্মণ পুত্র পুর্ববঙ্গের নমঃশূদ্র মেয়ে বিয়ে করে, হরিচাঁদের সপ্তম ঊর্দ্ধপুরুষ ব্রাহ্মণত্ব হারায় কেন?
     চণ্ডালেরা তথা নমঃশূদ্ররা যদি ব্রাহ্মণই হবে তবে ব্রাহ্মণের (দশ দিনে শ্রাদ্ধ ছাড়া) অপরাপর বিদ্যাশিক্ষায় অধিকারাদি নেই কেন? শ্রাদ্ধ ব্যবস্থাও তো অবৈদিক। চণ্ডাল তথা নমঃশূদ্রদের জাতিগত চারিত্রিক লক্ষণ মোটেই ব্রাহ্মণাক্রান্ত নয়। ব্রাহ্মণের ন্যায় এরা পরান্ন ভোগী, পরশ্রমশোষক, তঞ্চক, শঠ এবং বিবেকহীন নিষ্ঠুর নয়। এরা কঠোর শ্রমশীল উৎপাদক, স্বনির্ভর, সৎ এবং অত্যন্ত সাহসী জাতি। এরা হৃদয়বাণ ও ধর্মপরায়ণ। রিজলের মত----- এরা সর্বকর্ম পরঙ্গম। নৌচালনা, মৎস শিকার, যুদ্ধবিদ্যা, কৃষিবাণিজ্য, বাস্তুবিদ্যা এবং চিকিৎসা (চাঁদসী) বিদ্যায় দক্ষ। ব্রাহ্মণেরা এসবের কিছুই পারে না। জলে এবং ডাঙ্গায় এরা সমান পারদর্শী। এস্ফিভিয়াস অর্থাৎ উভয়চর বলে উচ্চপ্রশংশীত হয়েছে চণ্ডাল জাতি, ইংরেজ বিদ্বান ও গবেষকগণ কতৃক।   
     এই সব অতিমহৎ ও সুদূর্লভ গুণ সম্পন্ন চণ্ডাল তথা নমঃশূদ্রদের অপগুণের তথা সর্বপ্রকার  অমানবিক এবং পৈশাচিক কাজকর্মের গুণধর যে ব্রাহ্মণ তাদের দলভুক্ত করাটা চণ্ডালের কপালে অস্পৃশ্যতার কলঙ্ক লেপনের থেকেও বড় গ্লানিদায়ক। চণ্ডালকে ব্রাহ্মণ আখ্যা দিলে প্রকৃতপক্ষে  চণ্ডালকে চুড়ান্ত অপমান করা হয়। ব্রাহ্মণ জাত তো অপরাধ জগতের অবতার। সেন্সাস কমিশনার মিঃ এল. এস. এস. ও ‘মেলী, ভারতবর্ষ, অপরাধ প্রবণ, সম্প্রদায় ও জাতিগুলির তুলনা মূলক বিচার করে লিখেছিলেনঃ “The number of Muslim and Hindu convicts in Bengal is almost exactly proportionate to their strength in the population…… The largest number of Hindu criminals are Kayasthas and Brahmins.” ব্রাহ্মণদের বহুবিবাহ, কুলীন প্রথা, বাল্যবিবাহ, বিধবা অত্যাচার, মন্দির বেশ্যা ব্যবসা, সতীদাহের নারী হত্যা, ছোটজাত বলে মানুষের প্রতি অমানবিক ঘৃণা ইত্যাদি হাজারো ক্রাইমদোষে কলঙ্কিত। কলঙ্কের ঐতিহ্যময় ব্রাহ্মণ হতে যাবেন কেন হরি-গুরুচাঁদ!!  
    হরিচাঁদ ঠাকুর যাদের পারিবারিক, উপাধী ‘দাস’ কিম্বা ‘বিশ্বাস’ ছিল, ভক্তদের দ্বারা ব্রাহ্মণ বলে কীর্তিত। বলা হয়েছে তার পূর্বতন পিতৃপুরুষ শ্রীরামদাস বিশুদ্ধ এবং পূণ্যবাদ মৈথিলী ব্রাহ্মণ   সন্তান ছিলেন। তার পুত্র এবং গুরুচাঁদ ঠাকুরের সপ্তম ঊর্দ্ধপুরুষ চন্দ্রমোহন নমঃশূদ্র কন্যা বিবাহ করেন, একারণেই এবং সেই থেকে বংশটি নমঃশূদ্র জাত হিসাবে পরিগণিত হয়।  

     প্রকৃত পক্ষে এই সব কথা অতীত ইতিহাস ভিত্তি হীন। কোন প্রাচীন লিখিত প্রমাণ তথ্যের ভিত্তিতে  এ সব কথা তারক গোঁসাই লেখেন নি। যে কালে হরিচাঁদের পিতৃপুরুষের দ্বারা নমঃশূদ্রের কন্যার পাণিগ্রহণের কথা বলা হয়েছে সে কালে নমঃশূদ্র কোথায়? জাতিমালার কোন গ্রন্থেই নমঃশূদ্র নেই। এদের নাম ছিল চন্ডাল। নমঃশূদ্র শব্দের আবির্ভাব মোটামুটি ১৮৮০ দশক থেকে। স্বং গুরুচাঁদ কিছু চেষ্টা করেছিলেন চণ্ডাল নামের পরিবর্তে নমঃশূদ্র নাম দিতে। সুতরাং অতপ্রাচীন কালে নমঃশূদ্র কন্যা বিবাহের কাহিনি কাল্পনিক বলেই বলতে হয়।  
    আরো দেখা যায়, বর্ণান্তরে বিবাহের ফলে, নিয়মানুসারে পিতার বর্ণ বা জাতের নামে পরিচিত হয় সন্তান। যেমন, ব্রাহ্মন যদি নমঃশূদ্র কন্যা বিবাহ করে, বর্তমান সমাজে আমরা দেখি সন্তানের পরিচয় ব্রাহ্মণই হয়। নমঃশূদ্র যদি কায়স্ত কন্যা বিয়ে করে তাদের সন্তান নমঃশূদ্র এবং তপশীল ভুক্তই হয়। কায়স্ত হিসাবে পরিচিত হয় না। হরিচাঁদের ব্রাহ্মণ প্রপিতামহ নমঃশূদ্র কন্যা বিবাহ করার পরেও বংশধরেরা তো ব্রাহ্মণ হিসাবেই অন্ততঃ পতিত ব্রাহ্মণ হিসাবে গৃহীত হবে। অস্পৃশ্য  নমঃশূদ্র কেন হয়ে গেল? জাত তো জনকের সূত্রে আগত। মাতৃসূত্রে নয়।
     আবার শাস্ত্রে দেখা যায় ভিন্ন রকম। মনু বলেছেন শূদ্র পিতা এবং ব্রাহ্মণ মাতার উত্তর পুরুষ চণ্ডাল নামে খ্যাত হয়। অর্থাৎ ব্রাহ্মণ হয় না কখনই। দুজনের কারো জাতের নাম পায় না। নতুন এক সঙ্কর বর্ণের সৃষ্টি হয়। তাহলে হরিচাঁদ ঠাকুরের প্রপিতামহের বেলায় এই অদ্ভূৎ, কৃত্রিম এবং পতনপদ অবস্থা ঘটল কেন? পিতা ব্রাহ্মণ,  মাতা নমঃশূদ্র। সঙ্কর বর্ণ কিছু নতুন নাম পাবেতো? পিতৃ সূত্রে পাবে তো? শূদ্রের থেকেও নিম্নতম স্থান তথা অস্পৃশ্যত্ব কি করে পায়? হিসাব, কোনভাবে না মেলায় একমাত্র এবং পরিষ্কার কারণ এই যে এই পরিচয় পত্রটি একেবারেই বানানো এবং কৃত্রিম। চণ্ডালরা মাতৃসূত্রে আর্য; আর নমঃশূদ্রতো প্রিতৃসূত্রে আর্য!     
     হরিচাঁদ ঠাকুরের ব্রাহ্মণ উৎস কোনভাবেই তাদের কিম্বা তাঁর স্বজাতির মর্যাদা বাড়ায় না।  বরং ভাবিকালের আদালতে ব্রাহ্মণজাতের দ্বারা কৃত সব মানবতা বিরুদ্ধ অপকর্ম এবং অপসংস্কৃতি অনুষ্ঠানের সব দায় তাদের ঘাড়েও বর্তাবে। অন্য পরে কা কথা স্বয়ং হরি-গুরুচাঁদ বলেছেন,
“দলিত গলিত যত পতিত মানব।
ব্রাহ্মণের কুটচক্রে মৃতপ্রায় সব।।”
মানব জাতিকে দলিত- গলিত পশ্বাধাম করে রেখেছে যে জাত গোষ্ঠী, সেই কুচক্রি ব্রাহ্মণ  নরগোষ্ঠী-সদস্য হতে যাবে কোন দুঃখে, ধন উৎপাদক, সৎ ও উদার প্রাণের কৃষক সম্প্রদায়।  হরি-গুরুচাঁদ দলিত বহুজন, আর্ত সমাজের উদ্ধার কর্তা, তাদের জীবন ও সমাজের কালোত্তীর্ণ ধ্রুবতারা, তিনি কি করে ব্রাহ্মণ হবেন? ব্রাহ্মণ তো দলিত বহুজন মানুষের নৈস্বর্গিক দুষমন। ঘৃণক তারা মানবের। উপনিবিষ্ট, বিদেশী। শূদ্র শম্বুকের উত্থানে ব্রাহ্মণ শিশুর অকাল মরণ ঘটে আর শূদ্র  শম্বুকের শিরচ্ছেদ হলে, তাঁর মরণ কাঠির যাদুস্পর্শে দূরবর্তী মৃত ব্রাহ্মণ কুমার পুনঃপ্রাণ লাভ করে। দলিত বহুজন মানুষের প্রাণের ঠাকুর হরি-গুরুচাঁদ কি করে ব্রাহ্মণ হবে। মিথ্যা কথা! সব ঝুট হ্যায়! হতেই পারে না।
     যে মতুয়ারা, ‘জন্মগত জাতিকথা কয় না’ সেই মতুয়া- জনক হরি-গুরুচাঁদের গলায়, ‘ব্রাহ্মণ’ – জাতের জুতোর মালা কেন পরাই?

রবিবার, ৬ অক্টোবর, ২০১৯

বাঙালির বিদ‍্যাসাগর বাবা শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর

আমাদের বিদ্যাসাগর
 গুরুচাঁদ ঠাকুর
 সুধীর রঞ্জন হালদার

বাঙালিদের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কথা কে না জানেনবিদ্যাসাগর যদিও একটি সংস্কৃত শিক্ষার উপাধি এবং একাধিক ব্যক্তিই এই উপাধি লাভ করেছেনতথাপি বিদ্যাসাগর বললেই সবাই ঈশ্বরচন্দ্রকেই বোঝেন। শুধু যে বিদ্যার সাগর তাইই নয়দয়ার সাগরকরুণার সাগর ইত্যাদি বিশেষণেও তাঁকে বিভূষিত করা হয়। তাঁর দয়াকরুণামাতৃভক্তি সম্বন্ধে যে কত গল্প তৈরি হয়েছে তারও ইয়ত্তা নেই। বিভিন্ন স্কুল-কলেজের দেয়ালে তাঁর নামে প্রশস্তিমূলক ছড়া-কবিতাও হামেশা দেখতে পাই। এদেশে  সর্বজনীন শিক্ষাবিস্তারের কথা বলতেও একবাক্যে সবাই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কথা বলেন। বই-পুস্তকে তাঁর সমাজ সংস্কারের অসামান্য অবদানের কথা পড়িপ্রাতঃস্মরণীয় মনীষী হিসাবে তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি
কিন্তু ভারতবর্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্রঅবহেলিতপতিতঅস্পৃশ্য জনগণ যাঁরা এই দেশের বৃহত্তম সংখ্যক মূলনিবাসীতাঁদের জন্য তিনি কী করেছেনএ প্রশ্ন কি আমরা এই অবহেলিত মূলনিবাসীরা কোনোদিন করেছিএই দয়ার সাগরকরুণার সাগর বিদ্যাসাগর তাঁদের শিক্ষার জন্য কী করেছেন তার অনুসন্ধান কি আমরা কখনও করেছিযদি সেই অনুসন্ধান করি তা হলেই জানতে পারব যেতথাকথিত অস্পৃশ্য মূলনিবাসী মানুষদের জন্য তিনি কিছুই করেননি তো বটেইউপরন্তু তাঁরা যাতে শিক্ষার ধারে কাছেও ঘেঁষতে না পারেনতার ব্যবস্হাই তিনি করে গিয়েছেন। ইতিহাসের পাতা থেকে দু-একটি উদাহরণ দিলেই এর সত্যতা জানা যাবে। 
১৮৫৯ সালে তৎকালীন বৃটিশ সরকার যে শিক্ষানীতি ঘোষণা করে তার উদ্দেশ্য ছিল মাতৃভাষার মাধ্যমে নিচু জাতের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া। এই সময়ে বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্ণর ছিলেন স্যার জন পিটার গ্রান্ট।  ওই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর শিক্ষানীতি সম্পর্কে তাঁর মতামত জানিয়ে পিটার গ্রান্টকে যে চিঠি লেখেন তার অংশ বিশেষের বাংলা অনুবাদ এখানে তুলে দিচ্ছি
‘‘এদেশে এবং ইংল্যাণ্ডে এমন একটা অলীক ধারণার সৃষ্টি করা হয়েছে যেন উচ্চবর্ণীয়দের শিক্ষার ব্যপক সাফল্য অর্জন করা গেছেএখন নিম্নবর্ণের লোকেদের শিক্ষার প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। কিন্তু বিষয়টা যদি অনুসন্ধান করা হয় তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা দেবে। তাই আমার বিনীত অনুরোধশিক্ষা বিস্তারের একমাত্র উৎকৃষ্ট পন্হা হিসাবে সরকার সমাজের উচ্চবর্ণের মধ্যে শিক্ষা সীমিত রাখুন। উঁচু জাতের মধ্যে ব্যাপক শিক্ষার বিস্তার ঘটালেই শিক্ষা নীতি সফল হবে” (Education Department proceedings, October 1960 (No.53)25 quoted by R.K.Biswas in article ‘A Nation of slow Learners’ in the Telegraph, Calcutta, December 23, 1993.)
আগে ‘‘কায়স্হ জাতির কলকাতার সংস্কৃত কলেজে পড়বার অধিকার ছিল না কারণ তারা শূদ্র। অব্রাহ্মণদের সংস্কৃত কলেজে পঠন পাঠনের অধিকারের প্রশ্ন ওঠে ১৮৫১ সালে। এডুকেশন কাউন্সিলের সচিব এ সম্পর্কে উক্ত কলেজের অধ্যক্ষ ঈশ্বরচন্দ্রের মতামত চেয়ে পাঠান। ১৮৫১ সালের ১৮ই মার্চ এডুকেশন কাউন্সিলের সচিব Captain F.F.C. Hayes কে তিনি এক দীর্ঘ পত্র লিখেছিলেন। সেই পত্রের বক্তব্য সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে দিচ্ছি
‘‘শাস্ত্রমতে শূদ্রের কর্তব্য হল ব্রাহ্মণক্ষত্রিয় এবং বৈশ্য এই তিন উৎকৃষ্ট বর্ণের সেবা করা। মনুর কালের বিধান।  কায়স্হরা শূদ্র। তবু এ নিয়ম তাদের ক্ষেত্রে পুরোপুরি কঠোর ভাবে প্রযোজ্য নয়। গোঁড়া ব্রাহ্মণগণ আজকাল তাদের শাস্ত্রশিক্ষা ও দীক্ষা দিচ্ছে। সংস্কৃত সাহিত্য পাঠ শূদ্রদের নিষিদ্ধ নয়তারা কেবল পবিত্র ধর্মগ্রন্হ পড়তে পারবে না। বর্তমানের প্রচলিত নিয়মানুসারে বৈদ্যজাতি সংস্কৃত কলেজে পড়ার অধিকারী। রঘুনন্দন স্মৃতি মতে বৈদ্যরাও শূদ্রকায়স্হদের তুল্য। বৈদ্য জাতির মতো কায়স্হদেরও সংস্কৃত কলেজে পড়তে দিতে আমার আপত্তি নেই। তবে কায়স্হ ছাড়া অন্য নিম্নবর্ণের লোকেদের এই কলেজে ভর্তিতে আমার আপত্তি আছে। কারণ জাতের সিঁড়িতে তারা অনেক নীচেয় এবং সম্ভ্রান্ত নয়। তাদের ভর্তি করলে এই মহাবিদ্যালয়ের মান ও মর্যাদাক্ষুণ্ন হবে বলেই আমি আশঙ্কা করি। পরিশেষে জানানো দরকার যে কায়স্হদের এই কলেজে ভর্তির প্রস্তাবে এখানকার পণ্ডিতরা ঘোর খাপ্পাএটা তাদের আদৌ মনঃপুত নয়” (বিনয় ঘোষঃ  বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজওরিয়েন্ট লং ম্যানকলকাতা ১৯৭৩পৃষ্ঠা ৫৪২-৫৪৪শিপ্রা বিশ্বাস কর্তৃক উদ্ধৃতঅণ্বেষণ ২য় পর্ব অদল বদলআগষ্ট১৯৯৪)
এর চার বছর পরে যখন সুবর্ণ বণিকদের সংস্কৃত কলেজে পড়ার প্রশ্ন ওঠে তখন শিক্ষা অধিকর্তা গর্ডন ইয়ং-কে বিদ্যাসাগর যে চিঠিটি পাঠান তার সারসংক্ষেপ হল
 ‘‘১৮৫১ সাল পর্যন্ত ব্রাহ্মণ এবং বৈদ্য জাতিকে এই কলেজে ভর্তি করা হত। তারপর শূদ্র জাতের মধ্যে সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত জাতি কায়স্হদের এখানে পড়বার সুযোগ দেওয়া হয়। পরে ১৮৫৪ সালে কলেজের দ্বার সম্ভ্রান্ত সমস্ত জাতির জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। কিন্তু আমি দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যেআবেদনকারী সুবর্ণবণিকদের সংস্কৃত কলেজে ভর্তি করা যাবে না। এটা সত্যি কথা এই জাতির অনেকে কলকাতায় খ্যাতিমান এবং জনপ্রিয়। তা হলে কী হবেজাতের সিঁড়িতে তারা অতি নীচুতে। ছোটজাতের লোকদের সংস্কৃত কলেজে প্রবেশাধিকার এখানকার পণ্ডিতদের মর্মপীড়া এবং অখ্যাতির কারণ হবে। কলেজের জনপ্রিয়তা ভীষণ ভাবে হ্রাস পাবে। যত উদারতা ও সহানুভূতি সম্ভবপূর্বেই দেখিয়েছিএর পরে আর নয়। কলেজের দ্বার আবেদন প্রার্থীদের জন্যে খুলে দিতে আমি রাজী নই। পারলে আমি খুশী হতাম” (বিনয় ঘোষঃ বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজশিপ্রা বিশ্বাস কর্তৃক উদ্ধৃতঅণ্বেষণ ২য় পর্বঅদল বদলআগষ্ট১৯৯৪)
সুতরাং এ কথা নিঃসংশয়ে বলা যায় যেঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর অস্পৃশ্য মূলনিবাসীদের শিক্ষার জন্য কিছুই করেননি তো বটেই উপরন্তু সরকারের সেই প্রচেষ্টাকেও তিনি বানচাল করে দিয়েছেন। তিনি শিক্ষার দ্বার সকলের জন্য খুলে দিয়ে গেছেন বলে যা প্রচার করা হয় তা সর্বৈব মিথ্যা। তিনি যা কিছু করেছেন- তা যে মুষ্টিমেয় কিছু উচ্চবর্ণীয়দের জন্য করেছেনএ কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না
ক্ষান্তরে মতুয়া’ ধর্মের স্রষ্টা হরিচাঁদ ঠাকুরের নির্দেশে তাঁর পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুর এইসব সংখ্যাগরিষ্ঠ মূলনিবাসী মানুষদের জন্য মনুর বিধানকে অগ্রাহ্য করে কৃষিব্যাবসা এবং শিক্ষার ব্যবস্হা করতে জীবনপাত করেছেন।  গুরুচাঁদের নির্দেশ ছিল গ্রামে গ্রামে বিভিন্ন কমিটি বানিয়ে প্রতিদিন প্রতি পরিবারে এক মুঠো করে চাল সঞ্চয় করে শিক্ষার আন্দোলনে কাজে লাগাতে হবে। গ্রামে বিবাহশ্রাদ্ধ ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে যা খরচ হবে তার তিন শতাংশ এই তহবিলে চাঁদা দেওয়ার নিয়ম চালু করা হয়। ২০ বছরের কম কোনও নমঃশূদ্র পাত্র এবং ১০ বছরের কম কোনও পাত্রীকে বিবাহ দেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়
ঈশ্বরচন্দ্র উচ্চবর্ণীয়দের শিক্ষা বিস্তারের জন্যই বা কটা স্কুল তৈরি করেছিলেনমোট ৩৬টি বিদ্যালয় স্হাপন করার খবর জানা যায়। অথচ উচ্চশিক্ষায় বঞ্চিত গুরুচাঁদ এই অবহেলিত সমাজের মানুষের জন্য সারা বাংলায় শিক্ষা-আন্দোলনের মাধ্যমে আঠারোশো-এরও বেশি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যার ধারে কাছেও যেতে পারেননি। গুরুচাঁদ ঠাকুরই নমঃশূদ্রদের মধ্যে শিক্ষার একটা জোয়ার এনেছিলেন। তাঁর জন্য আমরা পেয়েছি আমাদের সমাজে যোগেন্দ্র নাথ মণ্ডলকেমুকুন্দ মল্লিককে এবং আরও আরও বহু মনীষীদের। বর্তমানে আমাদের সমাজে যে লক্ষ ক্ষ মানুষ শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়েছেনচাকরিব্যবসায়শিল্প ইত্যাদি গড়ে সমাজে যে একটি বিশিষ্ট স্হান দখল করেছেনতার আলোক বর্তিকা জ্বালিয়েছিলেন এই মহান পুরুষ গুরুচাঁদ ঠাকুর বিদ্যাসাগরীয় ধারায় যা কোনও দিন সম্ভবপর হত না। তাহলে আমাদের কাছে কে প্রাতঃস্মরণীয় মহাপুরুষকে আমাদের কাছে বিদ্যাসাগরনিশ্চয়ই ঈশ্বরচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় নয়। কাকে আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবনিশ্চয়ই বর্ণবিদ্বেষী পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে নয় আমাদের এই অল্প লেখাপড়া জানাদয়ার সাগর মহান পুরুষ গুরুচাঁদ ঠাকুরই আমাদের বিদ্যাসাগর। সকলের আগে আমাদের তাঁকেই শ্রদ্ধা জানানো উচিত নয় কি?

পতিত পাবন শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর

হরিচাঁদ ঠাকুর
সুধীর রঞ্জন হালদার
পূর্ববঙ্গের ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার সফলাডাঙা গ্রামে ১৮১২ খ্রিস্টাব্দের ১১ মার্চ বুধবার (বাংলা ১২১৮ সালে) মহামানব হরিচাঁদ ঠাকুর নমঃজাতির এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন
হরিচাঁদ ঠাকুরের পিতার নাম যশোমন্ত ঠাকুর ও মাতার নাম অন্নপূর্ণা। হরিচাঁদ ঠাকুরের বাল্যকালের নাম ছিল হরিদাস।  তাঁরা পাঁচ ভাই ছিলেন। তাঁদের নাম ছিল যথাক্রমে- ১) কৃষ্ণদাস২) হরিদাস৩) বৈষ্ণবদাস৪) গৌরীদাস এবং ৫) স্বরূপদাস।  হরিচাঁদ ঠাকুরের জীবনলীলা বিষয়ক শ্রীশ্রীহরিলীলামৃত নামে একখানি গ্রন্থ লেখেন কবি তারকচন্দ্র সরকার। সেই গ্রন্থ থেকে হরিচাঁদ ঠাকুর সম্পর্কে আমরা অনেক কিছু জানতে পারি
হরিচাঁদ ঠাকুরের পিতা পরম বৈষ্ণব অর্থাৎ কৃষ্ণভক্ত ছিলেন। কেউ কেউ তাঁকে যশোমন্ত বৈরাগী বলেও ডাকতেন। তাঁদের পদবি বিশ্বাস হলেও কয়েক পরুষ আগে নিত্য সাধুসেবাঠাকুরপূজাবৈষ্ণবধর্মের আচার পালন করার জন্য তাঁরা সকলের কাছ থেকে ঠাকুর উপাধি পেয়েছিলেন।  তারপর থেকে যশোমন্ত ও তাঁর পুত্রদের ঠাকুর বলে সবাই জানতেন। সেই জন্য তাঁদের ঠাকুর পদবি হয়
বাল্যকালে হরিচাঁদ খুবই দুরন্ত ছিলেন। বাল্যসঙ্গী ছিল ব্রজনাটুবিশ্বনাথ প্রমুখের সঙ্গে তিনি গোরু চরাতে যেতেন। বৈষ্ণবদের তিনি সহ্য করতে পারতেন না। বাড়িতে বৈষ্ণবেরা এলে পিতা যশোমন্ত ঠাকুর তাদের চরণামৃত পান ও পদধূলি নিতে বললে তিনি তা অমান্য করতেন। অনেক সময় তাঁদের বাড়িতে বৈষ্ণবেরা এলে তাদের ঝোলা পর্যন্ত লুকিয়ে জলে ফেলে দিতেন
হরিচাঁদ ঠাকুরের স্ত্রীর নাম ছিল শান্তিবালাযাকে আমরা শান্তিমাতা বলি। তাঁর পিত্রালয় ছিল ফরিদপুর জেলার (বর্তমান বাংলাদেশে) জিকাবাড়ি গ্রামে। তাঁর পিতার নাম ছিল লোচন প্রামাণিক
হরিচাঁদ ঠাকুরেরা জমিদার সূর্যমণি মজুমদারের জমিদারিতে বাস করতেন। জমিদার সূর্যমণি মজুমদার মিথ্যা মামলায় ডিক্রি জারি করে ঠাকুরদের বাড়ি নিজের নামে নিয়ে নিয়েছিলেন। বাধ্য হয়ে তাঁরা সফলাডাঙা ত্যাগ করে সেই জেলারই রামদিয়ায় সেন বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখান থেকে পরে পার্শ্ববর্তী গ্রাম ওড়াকান্দিতে শ্রীভজরাম চৌধুরীর বাড়িতে আশ্রয় নেন
হরিচাঁদ ঠাকুর প্রথাগত বিদ্যাশিক্ষার কোনো সুযোগ পাননি। তখনকার দিনে নমঃজাতিকে চণ্ডাল বলা হত। চণ্ডালজাতি অস্পৃশ্য বলে তাঁদের বিদ্যাশিক্ষার অধিকার ছিল না। তাই তিনি বিদ্যালয়ে যেতে পারেননি। যে জন্য তিনি লেখাপড়া শিখতে পারেননি। লেখাপড়া না জানলেও তিনি ছিলেন প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও অত্যন্ত মেধাসম্পন্ন জ্ঞানীব্যক্তি। ছেলেবেলাতেই তাঁর বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বন্ধুদের কাছে প্রকট হয়ে ওঠে। বন্ধু এবং সাথীরা সকলে তাই তাঁকে ঘিরে থাকতেন। সকলের সব সমস্যার মীমাংসা করে দিতেন তিনি। প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়েও প্রখর বুদ্ধিমত্তার জোরে বিজ্ঞান ও যুক্তিনির্ভর বৌদ্ধিকদর্শন উপলব্ধি করেছিলেন তিনি। কর্মজীবনে তাঁর এই জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার দ্বারা শোষিত বঞ্চিত জনগোষ্ঠী অর্থাৎ পতিত মানুষদের মুক্তিদূত হিসাবে তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন
তখনকার দিনে এখনকার মতো চিকিৎসা ব্যবস্থার বিশেষ কোনো সুযোগ ছিল নাএত উন্নতিও ছিল না। গ্রামাঞ্চলের অবস্থা ছিল খুবই করুণ। গ্রামাঞ্চলে কোনো ডাক্তারই ছিল নাবিশেষ করে পতিত জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত গ্রামগুলিতে। ওঝাদের ঝাড়ফুঁককবচ-তাবিজ ধারণ আর ঈশ্বরের উপর নির্ভরই ছিল তাদের একমাত্র চিকিৎসা। এই অবস্থায় হরিচাঁদ ঠাকুর নিজস্ব বুদ্ধিমত্তার বলে গ্রাম্য মানুষদের প্রাকৃতিক চিকিৎসার চিকিৎসকের ভূমিকা গ্রহণ করেন। রোগমুক্তির জন্য তিনি বিভিন্ন রোগে বিভিন্ন রকমের ব্যবস্থা দিতেনসেইসঙ্গে রোগীর মনোবল বৃদ্ধির জন্য রোগীর বাড়িতেরোগীকে সঙ্গে নিয়েই হরিবোল নামের কীর্তন করতেন
এই চিকিৎসা এবং নামকীর্তনের ফলে রোগীর মানসিক শক্তিবৃদ্ধির কারণে অধিকাংশ রোগেরই উপসম হত। এর ফলে গ্রাম্য মানুষদের কাছে তিনি উদ্ধারকর্তার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যান।  তখনকার বৈদিক ধর্মে প্রভাবান্বিত গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছে তিনি তথাকথিত ঈশ্বরের অবতার রূপে পরিগণিত হন
হরিচাঁদ ঠাকুর পিছিয়ে পড়া সমাজের মানুষের জন্য সকল রকম সামাজিক কাজেও অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন। কৃষকদের প্রতি নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের প্রতিবাদে কৃষকদের নিয়ে তিনি গোপালগঞ্জ মহকুমার জোনাসুর নীলকুঠি অভিযানের নেতৃত্ব দেন। সংসার প্রতিপালনের জন্য তিনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত হন। এক সময় তিনি তেলের ব্যবসা করেন। বিভিন্ন মুদিদ্রব্য নিয়ে এক সময়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিক্রি করেও বেড়িয়েছেন। ব্যবসাবৃত্তির প্রসার ও বিজ্ঞান সম্মত উন্নততর পদ্ধতিতে অনাবাদী জমি চাষ করে চাষের উন্নতি ঘটিয়েছিলেন। এই সমস্ত কাজ করে তিনি সকল পিছিয়ে পড়া মানুষদেরকে সংসার প্রতিপালন ও উন্নততর জীবন গড়ার ক্ষেত্রে সঠিক পথের দিশা দেখিয়েছেন
অলীক কল্পনাঅসাম্য ও মিথ্যা ভেদভাব সৃষ্টিকারী বৈদিকধর্ম তথা হিন্দুধর্মের অমানবিক নীতি-নিয়মের বিরুদ্ধেযুক্তিবাদকে প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে ধর্ম এবং অলীক কল্পনায় ভরা ধর্মগ্রন্থের বিরুদ্ধে- বেদপুরাণমনুসংহিতা প্রভৃতি গ্রন্থগুলির স্বার্থান্বেষী বিধানের বিরুদ্ধে ছিল হরিচাঁদ ঠাকুরের আসল সংগ্রাম। ওইসব মিথ্যা শাস্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে তিনি বললেনকুকুরের উচ্ছিষ্ট প্রসাদ পেলেও খাই। বেদবিধি শৌচাচার নাহি মানি তাই।। অবশেষে তিনি বেদবিধি বহির্ভূত একটি নতুন ধর্মের সূচনা করেনতার নাম হল মতুয়াধর্ম
হরিচাঁদ ঠাকুর তাঁর সঙ্গীসাথিদের নিয়ে যেভাবে হরিবোল’ ধ্বনিতে ধর্মীয় অনুষ্ঠান করতেনবৈদিকতাকে বর্জন করে যে সমস্ত আচার অনুষ্ঠানে মত্ত হতেন তাই দেখে তাঁর বিরোধীরাবিশেষ করে ব্রাহ্মণ-কায়স্থরা ব্যঙ্গ করে তাঁদের মত্তমউত্যামতুয়া নামে অভিহিত করত। হরিচাঁদ ঠাকুরও সেই মতুয়া নামটি মেনে নিয়েছিলেন। তিনি নিজেই বলেছেন- ভিন্ন সম্প্রদায় মোরা মতুয়া আখ্যান এখন যাঁরা হরিচাঁদ ঠাকুরের অবৈদিক আদর্শ পালন করে চলেন তিনি বা তাঁরাই মতুয়া
এই ধর্ম প্রতিষ্ঠার আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে কুসংস্কারাচ্ছন্ন শিক্ষাহীন ধর্মহীন পতিত নমঃজাতিসহ অন্যান্য অধঃপতিত জাতিদেরকে একটি ধর্মের বন্ধনে আবদ্ধ করাউন্নততর গার্হস্থ্য জীবনে পূর্ণ শান্তিলাভের উপায় নির্ধারণ করা এবং সামাজিক অসাম্যের বিলোপ সাধন করে বিশ্ব-সৌভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করা
মতুয়াধর্ম কর্ম এবং ন্যায়-নৈতিকতার ধর্মযে কর্ম নির্দোষবিজ্ঞান সম্মত এবং সাধুজন দ্বারা প্রশংসিত। যা আসলে সত্যিকারের মানবতাবাদী ধর্ম হিসাবে পরিচিত। এই ধর্মের মূল বৈশিষ্ট্য হলো কর্মভিত্তিক সত্যসাম্যপ্রেম ও পবিত্রতার নিদর্শন
হরিচাঁদ ঠাকুর মতুয়াধর্ম পালনের জন্য কতকগুলি প্রধান নির্দেশ দিয়েছেনসেগুলি হলো-
১) সদা সত্য কথা বলা,
২) পরস্ত্রীকে মাতৃজ্ঞান করা,
৩) পিতামাতাকে ভক্তি করা,
৪) জগৎকে প্রেমদান করা অর্থাৎ সকল জীবকে ভালোবাসা,
৫) জাতিভেদ না করা,
৬) কারও ধর্মনিন্দা না করা,
৭) বাহ্য অঙ্গ সাধুসাজ ত্যাগ করা,
৮) শ্রীহরিমন্দির প্রতিষ্ঠা করা,
৯) ষড়রিপু  থেকে সাবধান থাকা,
১০) হাতে কাম মুখে নাম করা,
১১) দৈনিক প্রার্থনা করা ও
১২) ঈশ্বরে আত্মদান করা
এ ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে তিনি তাঁর ভক্তদের আরও বহু উপদেশ দিয়েছেন
মতুয়াধর্মে পিতামাতাই হলেন প্রধান ঈশ্বর। তাঁরাই সৃষ্টিকর্তা। সন্তানকে লালন পালন করে তাঁরাই মানুষ করে তোলেন। সন্তানেরও প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হল পিতামাতার সেবা করাতাঁদের দুঃখকষ্টঅভাব-অভিযোগের আশু সমাধান করা
মতুয়াধর্মে ঈশ্বরের সংজ্ঞা সম্পূর্ণ আলাদা।  যে যারে উদ্ধার করে সে তার ঈশ্বর  উদ্ধার অর্থাৎ অধঃপতিত অবস্থা থেকে উন্নততর জীবনে উত্তরণ ঘটানো। আর সেই ঈশ্বরের আদর্শপালন করাই তাঁর কাছে আত্মদান। এখানে শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরই পতিত জাতির উদ্ধারকর্তাতাঁর আদর্শ অনুসরণ করাই তাঁকে আত্মদান
মতুয়াধর্মে কাল্পনিক কোনো দেবদেবীর কোনো স্থান নেই কিংবা তাদের পূজা করবারও কোনো বিধান নেই। কিন্তু দুঃখের বিষয়অনেক মতুয়াধর্মী লোকের ঘরে বিভিন্ন পূজার প্রচলন দেখা যায়।  হরিচাঁদ ঠাকুরের প্রতিকৃতির পাশে নানা দেবদেবীর প্রতিকৃতি রেখে পূজা-অর্চনা করতে দেখা যায়।  এটা কোনোমতেই ঠিক নয়। মতুয়াধর্মে কাল্পনিক দেবদেবীর পূজা নিষিদ্ধ। এ সম্পর্কে হরিচাঁদ ঠাকুরের পুত্র আর এক মহামানব গুরুচাঁদ ঠাকুর বলেছেন- মতুয়ার পক্ষে কোন পূজা পর্ব নাই কিন্তু সাধারণ মতুয়ারা ব্রাহ্মণদের প্ররোচনায় অভ্যাসবশে এসব করে চলেছেন
মতুয়াধর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হচ্ছে সত্যপ্রেমপবিত্রতাসাম্যমৈত্রী ও সততাসকলের প্রতি ভালোবাসাকাউকে ছোটো বা নীচ না ভাবাসকলের জন্য সমান স্বাধীনতাসমান অধিকারকাল্পনিক কোনো ঈশ্বরের সন্ধান না করে মানুষ তথা জীবসেবার মাধ্যমেই আনন্দপ্রাপ্তি অনুভব করা ইত্যাদি
মতুয়াধর্ম অনেকটাই ভারতের প্রাচীন সনাতনধর্ম ও বৌদ্ধধর্মকে অনুসরণ করে। তবে তার থেকেও একে আরও সহজ সরল গৃহধর্মীযুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানসম্মত করা হয়েছে। প্রাচীন সনাতন ধর্মের সঙ্গে মতুয়াধর্মের বহুলাংশে সামঞ্জস্য রয়েছে। সাম্য ও ন্যায়-নৈতিকতাকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা আদি সনাতন ধর্মে কোনো বর্ণভেদ ছিল নাজন্মগত কারণে কেউ উচ্চ-নীচ ছিল না। সমাজে সকল বিষয়ে সকলের ছিল সমানাধিকার। মতুয়াধর্মও এই সকলকে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এজন্য এই ধর্মকে সূক্ষ্ম সনাতনধর্ম নামে অভিহিত করা হয়
হরিচাঁদ ঠাকুর তাঁর প্রবর্তিত সহজ-সরল ধর্ম মতুয়াধর্ম প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে এই জাতির উন্নতিকল্পে যে সকলের মধ্যে শিক্ষাপ্রসারের প্রয়োজন এই উপদেশই দিতেন। অবশ্য শিক্ষাদানের জন্য তিনি তাঁর স্বল্পকালীন জীবদ্দশায় তখনকার পরিবেশ পরিস্থিতির মধ্যে বিশেষ কিছু করে যেতে পারেননি। কিন্তু তাঁর এই অপূর্ণ কাজ পূর্ণ করার জন্য পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুরকে নির্দেশ দিয়ে যান
প্রকৃতপক্ষে ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারতবর্ষে মতুয়াধর্ম প্রবর্তন- বেদব্রাহ্মণযাগযজ্ঞ বিরোধী এক ধর্মান্দোলন বা ধর্মবিপ্লব ছাড়া আর কিছুই নয়। জাতপাতধর্মবর্ণসম্প্রদায় ইত্যাদি বিভেদপন্থীদের বিরুদ্ধে হরিচাঁদ ঠাকুর কর্তৃক এ এক যুদ্ধ ঘোষণা। মতুয়ারা প্রত্যেকই সেই যুদ্ধের এক-একজন সৈনিকযে যুদ্ধে নারী ও পুরুষেরা সমান মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত
মতুয়াধর্মের ত্রিকোণ লাল বর্ণের পতাকার তিনদিকে সাদা প্রান্তরেখা। লাল অর্থাৎ বিপ্লব বা অগ্রগতির জন্য লাগাতার সংগ্রাম এবং সাদা অর্থাৎ শান্তির প্রতীক। প্রকৃতপক্ষে সকলের সঙ্গে সম-অধিকারে সহাবস্থানের নীতিতে শান্তির জন্য বিপ্লব। সমাজের অস্পৃশ্যতাঅসাম্যকুসংস্কারঅমানবিকতা ও মানবীয় ভেদাভেদ দূর করে সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য বিপ্লব। যুদ্ধজয়ের প্রতীক যেমন মতুয়ার হাতের নিশান,  তেমন সেই যুদ্ধজয়ের ঘোষণা তথা উন্মাদনাকে আরও আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে উদ্বুদ্ধ করতে ধ্বনিত হয় জয়ডঙ্কাকাঁসর ও শিঙার ধ্বনি
সমস্ত মানুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠাই মতুয়াধর্মের মূল উদ্দেশ্য। নারী ও পরুষের মধ্যে সমাজে যে বৈষম্য বিদ্যমান তাঁর বিরুদ্ধেও হরিচাঁদ তাঁর মত জানিয়েছেন। নারী নরকের দ্বারএর বিরুদ্ধে তিনি বলেন- নারীকে অবজ্ঞা করে আদর্শ গার্হস্থ্যধর্ম প্রতিষ্ঠা করা যায় না।  নারী গৃহের কেন্দ্রস্থল।  নারীকে বাদ দিয়ে সংসারের কল্পনা করা যায় না।  নারীকে সঙ্গে নিয়ে ধর্মপথে অগ্রসর হতে হয়  এইজন্যই তিনি নারীশিক্ষানারীর মর্যাদা দান ও অধিকার রক্ষার জন্য সবাইকে নির্দেশ দেন
হরিচাঁদ ঠাকুর মাত্র ছেষট্টি বছর জীবিত ছিলেন। ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দের ১৩ মার্চ (বাংলা ১২৮৪) ভোরবেলা তিনি প্রয়াত হন। তাঁর জন্মদিনের মতো সেই দিনটিও ছিল বুধবার। প্রয়াণের পূর্বে তিনি তাঁর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার ভার তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র মহামানব গুরুচাঁদ ঠাকুরের উপর সঁপে দিয়ে যান। গুরুচাঁদ ঠাকুর পূর্ণ নিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর পিতার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন

(হরিচাঁদ ঠাকুর ও মতুয়াধর্ম বই থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে)