বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২০

হাত ধোয়া ইতিহাস।


আসলে রক্তাক্ত জার্নি বা ইতিহাস।

এখন যে কথা বলা হচ্ছে প্রায়
বিভিন্ন চ্যানেলে ঘন ঘন হাত ধুন সাবান দিয়ে
কারণ হাতের মধ্যে দিয়ে ভাইরাস প্রবেশ করে।
এখন যে কথা বলা হচ্ছে প্রায়
বিভিন্ন চ্যানেলে ঘন ঘন হাত ধুন সাবান দিয়ে
কারণ হাতের মধ্যে দিয়ে ভাইরাস প্রবেশ করে।
আগে মানুষ হাত ধুত বা মুছত মাটি দিয়ে
আর কেউ নদীর জলে। কারণ সাবান খুব অল্প মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিল দামের কারণে।
আমরা যে সাবান ব্যবহার করি তা আবিষ্কৃত
হয়েছিল ১৮২৩  সালে।
তার মানে প্রায় আড়াই বছর পরে
মানুষ হাত স্যানিটাইজ করা শিখলো।

 কিন্তু স্যানিটেশন এর কথা  বা সাবান দিয়ে

হাত ধোয়ার কথা যে বিজ্ঞানি প্রথম বলেছিলেন ভাইরাস থেকে বাঁচতে তাঁকে মেন্টাল এসাইলামে পাঠিয়ে গার্ডে রা  পিটিয়ে নৃশংস ভাবে হত্যা করেছিল।অবশ্য ফ্লোরেন্স নাইট এঙ্গেল ও
ওই একি কথা বলেছিলেন ।একই সময় মানে ১৮৫৩ সাল। উনি ছিলেন প্রথম শিক্ষিত নার্স।ক্রী মিয়ার যুদ্ধের সময়ে  সৈন্যদের চিকিৎসার সময়ে
সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার কথা বলেছেন।
কিন্তু কেন এই পদ্ধতির কথা বললেন
তা প্রমাণ করতে পারেন নি।
১৮ শতকে  জীবাণু ছড়ানোর বিষয়টি জানা ছিল না। হাত ধোয়ার প্রচলনটা ছিল কদাচিৎ। টয়লেট থেকে এসে, এমনকি ক্লিনিক্যাল প্রসিডিওর কিংবা অপারেশনের আগে ডাক্তাররা ও হাত ধুতেন না। ডাক্তাররা মর্গ থেকে এসে যখন রোগী দেখতেন তখন মৃতদেহ থেকে ভয়ংকর পার্টিকল জীবিত রোগীদের মধ্যে সংক্রমিত হত এবং তাদের মৃত্যু ঘটত। হাঙ্গেরিয়ান চিকিৎসক 'ইগনাজ স্যামেল ওয়াইজ' প্রথম এ বিষয়ে নজর দেন। জন্ম
১৮১৮।

১৮৪৭ সালে স্যামেলওয়াইজ পুরুষ গাইনি ডাক্তারদের নির্দেশ দেন প্রসূতি বিভাগে সুস্থ মায়েদের পরীক্ষা করবার আগে হাত ধুতে হবে এবং তাদের ইনস্ট্রুমেন্ট-গুলি ক্লোরিনেটেড লাইম দিয়ে ধুতে হবে। এর ফল হল অবিশ্বাস্য। ওই বছর একজন রোগীরও মৃত্যু হল না। তখন মৃত্যুর হার ছিলো ১৬ পার্সেন্ট।
উনার নির্দেশে  পরীক্ষা চলার পর মৃত্যুর হার দাঁড়ালো
১ পার্সেন্ট। অভাবনীয় সাফল্য। 

স্যামেলওয়াইজ এরপর হাত ধোয়ার উপকারিতা নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন।
কিন্তু তাঁর সহকারীরা তাঁর বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করলেন, কারণ তাদের মনে হল ডা. স্যামেল- ওয়াইজ তত্ত্ব বলতে চায় তারাই, অর্থাৎ চিকিৎসকরাই রোগীর মৃত্যুর জন্য দায়ী।
প্রথম রুগীরা বলতে শুরু করলেন ডাক্তার রায় দায়ী।
ভিয়েনা হাসপাতালে মৃত্যুহার কমলেও, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও হাত ধোয়ার তত্ত্ব প্রত্যাখ্যান করল।
উদ্বিগ্ন স্যামেলওয়াইজ ভিয়েনায় ১৮৬১ সালে নিজের কাজ প্রকাশ করলেন, কিন্তু কোনও লাভ হল না। সায়েন্টিফিক সোসাইটির লোকজন তখনও বিশ্বাস করত রোগ বালাই হয় খারাপ আত্মার মাধ্যমে।

স্যামেলওয়াইজ মরিয়া হয়ে সকল গাইনি ডাক্তারদের চিঠি লিখতে শুরু করেছিলেন,
যেন তারা হাত ধুয়ে, ইনস্ট্রুমেন্টস ধুয়ে কাজ করেন।
এতে জীবন বাঁচবে। তখন সব ডাক্তাররা তাঁকে পাগল আখ্যা দেন। আস্তে আস্তে তিনিও ডিপ্রেশনে চলে যান। সবাই তাকে পাগল মনে করছিল।
১৮৬৫ সালে নার্ভাস ব্রেকডাউনের পর স্যামেলওয়াইজকে পাঠানো হলো
মেন্টাল অ্যাসাইলামে’। কেউ বললো তাঁর ‘নিউরো সিফিলিস’ হয়েছে,কেউ বলল, বদ আত্মা ভর করেছে। মাত্র ১৪ দিন পর, মেন্টাল এসাইলামের গার্ডরা তাঁকে প্রচন্ড পেটাল। পেটানোর ফলে তাঁর হাতে-শরীরে ক্ষত থেকে ডান হাতে বিষক্রিয়া শুরু হয়। রক্তের বিষক্রিয়ায় মাত্র ৪৭ বছর বয়সে ১৩ আগস্ট,১৮৬৫ সালে মারা যান এই যুগান্ত সৃষ্টিকারী চিকিৎসক। ইগনাজ স্যামেলওয়াইজের কাজ লুই পাস্তুরের জীবাণু তত্ত্বের অন্যতম ভিত্তি। তার কাজ ও ব্যাখ্যা লুই পাস্তুরকে প্রচুর সাহায্য করেছিল।
অথচ তাঁর শেষ কৃত্যানুষ্ঠানে কোন ডাক্তার এলেন না। এমনকি তাঁর মৃত্যুর খবর ‘হাংগেরিয়ান মেডিক্যাল সোসাইটি’ প্রকাশ ও করেনি তাদের পেপারে।

জীবাণু তত্ত্ব, অর্থাৎ রোগের উৎপত্তি জীবাণু থেকে হতে পারে আবিষ্কারের অনেক বছর পর তাঁর স্বীকৃতি মেলে ২০ শতকে। হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে তাঁর স্মৃতিস্তম্ভ আজ ও বিরাজমান।

শুধু তাই নয়
ইগনাজ স্যামেলওয়াইজের  স্ত্রী বিশ্বাস করতে শুরু করলেন যে তাঁর স্বামীও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। সব চেয়ে বেশি আঘাত পেয়েছেন
যখন তাঁর বস জন klein ভিয়েনা থেকে চিঠিতে বললেন
তোমার কাজ আমাদের কথা শোনা , প্রজার মতো
নতুন কিছু বলা নয়। obey your teachers
তোমায় কে অনুমতি দিয়েছেন
এই সব বলার । তোমার মানসিক সমস্যা আছে । তাঁকে  ভিয়েনায় চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয় ।
এবং জোর করে বুদা পেস্টে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
 এবং কোনো হাসপাতাল তাকে যেন চাকরি না দেন তার ব্যবস্থা ও করলেন।তিনি কাজ করতে না পেরে মানসিক অবসাদে ভুগতে শুরু করলেন।  পাগল বলে ফতোয়া জারি করা হলো
একদম একা কেউ পাশে নেই।ইগনাজ স্যামেলওয়াইজ  রাস্তায় লিফলেট বিলি করে বলতে শুরু করেছিলেন শেষের দিকে
যে ডাক্তার রাই খুনী। কারণ তাঁরা  হাত sanitize না করে রোগীদের কাছে গিয়ে রোগ ছড়াচ্ছেন। ডাক্তাদের দায়িত্যজ্ঞান হীনতার জন্যই এত মায়ের মৃত্যু হচ্ছে।ডান হাতে গাংরিন হয়ে গিয়েছিল। 
প্রচার করা হলো উনি গাংরিন এর কারণে মারা গেছেন ।  আসলে খুন হলেন।
ওই সময়ে তাঁর বন্ধু বান্ধব
আত্মীয় সবাই  এমন কি তাঁর তাঁর  স্ত্রী ও তাঁর বিরুদ্ধে ছিলেন।তিনি জানতেও পারলেন না যে কত বড় কাজ
করে গেলেন।
আজ ভিয়েনা এবং বুদা পেস্টে তাঁকে নিয়ে স্মরণ সভা হয়। তাঁর বাড়িটাই এখন একটা  ঐতিহাসিক মিউজিয়াম ।
 আজ ও ভিয়েনা ও 
বুদা পেস্টের  সব ডাক্তার রা
তাকে নিয়ে গর্ব অনুভব করেন।
তিনি মারা যান অর্থাৎ খুন হন
৪৭ বছর বয়সে।মাত্র ২৯ বছর বয়সে তিনি ডাক্তার হিসেবে
যোগ দেন

ভিয়েনা হাসপাতালে। ১৯৬৪ সাল থেকে
তাঁর বাড়িটাই এখন টুরিস্ট স্পট।প্রতি বছর
5 লক্ষ মানুষ  আসে মানে টুরিস্ট তাঁর মূর্তি ও বাড়ীটা দেখতে।
করোনা প্রসঙ্গে এই গল্প আজও
প্রাসঙ্গিক,এবং হাত ধোয়া   ইতিহাসের এক অদ্ভুত পুনরাবৃত্তি।
সূত্রঃ https://www.bbc.com/bengali/news-49859801

চিকিৎসা ভুল থেকে ঠিক এক।



অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টির হারিয়ে-যাওয়া দাদা

আচ্ছা, এমন যদি হয় যে রোগীকে অপারেশন টেবিলে তোলা হল, অজ্ঞান করা হল, চামড়া কাটা হল, কিন্তু তারপরে আসল অপারেশন না করে কাটা চামড়া জুড়ে দেওয়া হল? রোগীকে বলাও হল না তাঁর অপারেশন হয়নি? আজকালকার দিন হলে নিঘঘাত খবরের কাগজে “ডাক্তার না কশাই” বলে বিশাল হেডিং হত। লোকঠকানোর জন্য কনজিউমার কোর্টে ধরে নিয়ে যেত, টেলিভিশনের পর্দায় দেখাত, ডাক্তারবাবুর মুখ আমসি, বুম হাতে গগন ফাটাচ্ছেন অ্যাঙ্করের দল।

নাঃ, গোড়া থেকে বলি। ‘ইন্টারন্যাল ম্যামারি আর্টারি’-র নাম শুনেছেন? না শুনে থাকলেও ক্ষতি নেই। হার্টের রোগের কথা শুনেছেন তো? হার্টের যে রোগে বুকে চিনচিনে ব্যথা হয়, আর ইসিজি করে দেখা যায় হার্ট তথা হৃদযন্ত্র অক্সিজেনের অভাবে ভুগছে, সেটার কথা বলছি। আজকাল এসেছে অ্যাঞ্জিওগ্রাফি। অ্যাঞ্জিওগ্রাফি করলে দেখা যায় হৃদযন্ত্রকে রক্ত সরবরাহ করার ধমনীগুলো সরু হয়ে গেছে, যথেষ্ট পরিমাণে রক্ত পাঠাতে পারছে না। যদি কোনো সময়ে হৃদযন্ত্রে রক্ত সরবরাহ এতোটাই কমে যায় যে তার একটা অংশ অক্সিজেন না পেয়ে ‘মারা যায়’, তখন বুকে খুব ব্যথা হয়। ডাক্তারবাবু গম্ভীর মুখে বলেন, ‘হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, প্রাণ নিয়ে টানাটানি’। 

১৯৩৯ সালে হার্ট অ্যাটাক আটকানোর জন্য একটা অপারেশন করা শুরু হল। ইন্টারন্যাল ম্যামারি আর্টারি বলে একটা ধমনী বেঁধে দিয়ে তার মধ্যে রক্ত চলাচল বন্ধ করে দেওয়া। এতে তেমন ক্ষতি নেই—ঠিক যেমন গল ব্লাডার আমাদের কাজের জিনিস হলেও তাকে কেটে বাদ দিলে বিশেষ ক্ষতি নেই। ডাক্তারেরা ধারণা করলেন, ইন্টারন্যাল ম্যামারি ধমনী বন্ধ করে দিলে তার রক্তের অনেকটা হৃদ-ধমনীর মধ্যে দিয়ে বইবে, হৃদযন্ত্রে যাবে। একটি নদীর দুই শাখানদীর একটি বাঁধ দিয়ে আটকে দিলে অন্য শাখাটিতে যেমন জল বেশি পরিমাণে বয়ে যায়, অনেকটা সেরকম। 

অপারেশন চালু হল। বহু মানুষ জানালেন তাঁরা অপারেশনের ফলে ভাল আছেন। তাঁদের ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেও দেখা গেল যে তাঁদের আগের মতো সহজে বুকে ব্যথা হচ্ছে না। সবাই খুশি। কিন্তু পাশ্চাত্য মেডিসিন ততদিনে নানা ভুলপথের অলিগলিতে ঠোক্কর খেয়ে শিখেছে, আপাতদৃষ্টিতে কাজ করে যা কিছু, তার সব কিছু সত্যিকারের কাজ নাও করতে পারে।  তাই একটা পরীক্ষা করা হল।  (১)

কয়েকজন হৃদরোগীকে বেছে নেওয়া হল। 
তাঁদের জানানো হল, তাঁদের ইন্টারন্যাল ম্যামারি আর্টারি লাইগেশন হবে, কিন্তু এই অপারেশন কতটা কাজের তা নিয়ে সন্দেহ আছে। 
পরীক্ষাটার মূল দায়িত্বে যারা ছিলেন, তাঁরা রোগীদের ‘র‍্যান্ডম’-ভাবে দু’দলে ভাগ করে ফেললেন। (২)
এবার অপারেশন টেবিলে রোগীকে তোলার পর সার্জেনের সামনে একটা বন্ধ খাম খুলে ধরা হল। তাতে লেখা রোগীর ‘সত্যি অপারেশন’ হবে নাকি ‘মিথ্যে অপারেশন’ হবে।  
একদল রোগীর ওপর ‘সত্যি অপারেশন’ হল—তাঁদের বুক কেটে ইন্টারন্যাল ম্যামারি ধমনী বেঁধে দেওয়া হল। 
অন্যদলের রোগীর ওপর ‘মিথ্যে অপারেশন’ হল, অর্থাৎ তাঁদের বুকের ওপর কাটাকুটি ও সেলাই করা হল ঠিকই, কিন্তু ইন্টারন্যাল ম্যামারি ধমনীকে স্পর্শ করা হল না। 
রোগীরা জানতেও পারলেন না তাঁদের ‘মিথ্যে অপারেশন’ হয়েছে; তাঁদের খাওয়া-দাওয়া-ব্যায়াম-বিশ্রাম ইত্যাদি সংক্রান্ত উপদেশ, অ্যানাস্থেসিয়া, অপারেশন, হাসপাতালে যত্ন-আত্তি এসবেতে ‘সত্যি অপারেশন’ রোগীদের সঙ্গে কোনো ফারাক রাখা হল না।
আর রোগীর যত্ন নিচ্ছিলেন ও তাঁদের উন্নতি-অবনতি মাপছিলেন যেসব ডাক্তার, তাঁরা জানতেন না কোন রোগীর সত্যি অপারেশন আর কোন রোগীর মিথ্যে অপারেশন হয়েছে। 
অর্থাৎ রোগী যেমন তাঁর চিকিৎসা বিষয়ে অন্ধ রইলেন, ডাক্তারও তাঁর অধীনস্থ রোগীর চিকিৎসা বিষয়ে অন্ধ রইলেন। (৩) 

অপারেশনের পরে রোগীদের বেশ কিছুদিন ধরে দেখা হল, প্রশ্ন করে জানা হল তাঁরা কেমন আছেন, নানা পরীক্ষা করে তাঁদের হৃদযন্ত্রের অবস্থা জানার চেষ্টা করা হল। দেখা গেল, ‘সত্যি অপারেশন’ করা হোক আর ‘মিথ্যে অপারেশন’ দুদলের রোগীর উন্নতি মোটের ওপর সমান। তার মানে অপারেশনের ফলে যা লাভ হয়েছে বলে ভাবা গেছিল সবই ভুয়ো। ১৯৩৯ সালে অপারেশন শুরু হয়েছিল, কুড়ি বছর পরে বলা হল যা করা হয়েছিল তা সব ভুল।  

মুজতবা আলি মশাই বলেছিলেন না, সর্দিজ্বর চিকিৎসা করলে সারতে সময় লাগে সাত-সাতদিন, আর চিকিৎসা করলে মাত্র একসপ্তাহ! কিন্তু এই ইন্টারন্যাল ম্যামারি আর্টারি লাইগেশন অপারেশনটা ঠিক সে গোত্রে পড়ে না। অপারেশনের ফলে রোগীর খানিক উন্নতি হতই। সেটা হত তাঁরা হার্টের রোগের জন্য খাদ্য ও ব্যায়াম সংক্রান্ত পরামর্শ ভালভাবে মানতেন বলে—অপারেশন করাটা রোগটাকে আলাদা গুরুত্ব দিত।  তাছাড়া ছিল ‘প্লাসিবো এফেক্ট’ বা রোগীতোষ ক্রিয়া। 

প্লাসিবো এফেক্ট নিয়ে বলা যাবে অন্য কোনো সময়। 

পাদটিকা 

১।প্রকৃতপক্ষে একটি নয়, দুটি প্রায় একই রকম পরীক্ষা হয়েছিল। প্রথমটি ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটন স্কুল অফ মেডিসিন, ইউএসএ—তার ফলাফল জার্নালে প্রকাশিত হয় ১৯৫৯ সালে (তথ্যসূত্র ১ দেখুন)। দ্বিতীয়টি ইউনিভার্সিটি অফ কানসাস মেডিক্যাল সেন্টার, ইউএসএ, এটির ফল প্রকাশ হয় ১৯৬০ সালে (তথ্যসূত্র ২ দেখুন)। 
 
২। ‘র‍্যান্ডম’-ভাবে কথাটার এমনিতে বাংলা হল ‘এলোমেলোভাবে’, কিন্তু পরিসংখ্যানশাস্ত্রে ‘র‍্যান্ডম’-ভাবে কথাটার একটা বিশেষ পারিভাষিক অর্থ আছে। ‘র‍্যান্ডম’-ভাবে একদল রোগীকে দুটো আলাদা দলে ভাগ করার মানে হল, কোনও একজন বিশেষ রোগীর দু’দলের কোনো একটিতে যাবার সম্ভাবনা সমান। এতে সুবিধা হচ্ছে যে পরীক্ষকদের কোনও দলের ওপর যদি পক্ষপাত থাকেও, দুই দলে রোগীরা এমনভাবে ভাগ হয়ে যাবেন যে একদলে অপেক্ষাকৃত খারাপ রোগী আর অন্য দলে তুলনায় ভাল রোগী—সে রকম হবার সম্ভাবনা খুব কম। ‘র‍্যান্ডম’-ভাবে ভাগ করার ফলে দু’দলের সদস্যরা ছিলেন মোটামুটি একই বয়সী, এবং তাঁদের রোগ ছিল একই রকমের তীব্র।

৩। একেই বলে ‘দুই অন্ধ’ পদ্ধতি। পুরো পরীক্ষার নাম দাঁড়াল, ‘ডাবল ব্লাইন্ড র‍্যান্ডমাইজড প্লাসিবো কন্ট্রোলড ট্রায়াল’; সংক্ষেপে একে এখন র‍্যান্ডমাইজড কন্ট্রোলড ট্রায়াল বা আরসিটি বলে। 


চিত্র পরিচিতি (কেবলমাত্র অব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য) 
১। অ্যানজাইনা বা হৃদরোগের বুকে ব্যথা
২। সত্যি অপারেশন আর মিথ্যে অপারেশন করে কার্যকারিতা যাচাই করার একটি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ  

কৃতজ্ঞতা স্বীকার
ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি 

তথ্যসূত্র

1. Cobb, L. A., Thomas, G. I., Dillard, D. H., Merendino, K. A., & Bruce, R. A. (1959). An Evaluation of Internal-Mammary-Artery Ligation by a Double-Blind Technic. New England Journal of Medicine, 260(22), 1115–1118. (https://scihub.wikicn.top/https://doi.org/10.1056/nejm195905282602204, accessed on 25 June 2020) 

2. Dimond, E. G., Kittle, C. F., & Crockett, J. E. (1960). Comparison of internal mammary artery ligation and sham operation for angina pectoris. The American Journal of Cardiology, 5(4), 483–486. 
(https://scihub.wikicn.top/https://doi.org/10.1016/0002-9149(60)90105-3, accessed on 25 June 2020) 

3. Snake Oil Science: The Truth about Complementary and Alternative Medicine. R. Barker Bausell. Oxford University Press; 2009 

চিকিৎসা ভূল থেকে ঠিক।


ম্যাচো ম্যানস সিগারেট, স্যার হিল ও স্যার ডল

ওয়েন ম্যাকলারেন, ৫২ বছর। মৃত্যুর কারণ ফুসফুসের ক্যানসার।
এরিক লসন, ৭২ বছর। মৃত্যুর কারণ ফুসফুসের ক্রনিক রোগ।
ডেভিড ম্যাকলীন, ৭৩ বছর। মৃত্যুর কারণ ফুসফুসের ক্রনিক রোগ ও ফুসফুসের ক্যানসার।

একটি আমেরিকান সিগারেট কোম্পানি ১৯২৪ সালে মহিলাদের জন্য একটি সিগারেট ব্র্যান্ড বাজারে ছাড়ে। সেটি বিশেষ চলছিল না। ত্রিশ বছর পরে বিজ্ঞাপনের আমূল পরিবর্তনের ধাক্কায় ঐ সিগারেটটিই হল পরম পুরুষালী, মাচো ম্যানের হাতে উঠল সেই পৌরুষপূর্ণ ভোগ্য। ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৭—দুবছরের মধ্যে ঐ ব্র্যান্ডের সিগারেটের বিক্রি বেড়ে হল চারগুণ—৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার।

সিগারেটের নতুন বিজ্ঞাপনে স্মোকারদের ম্যাচো ম্যান ইমেজ তৈরি হল। এল নতুন নতুন মুখ। যথা ডেভিড ম্যাকলীন, এরিক লসন, ওয়েন ম্যাকলারেন। দ্য কাউবয় হিরো’জ। এই তিনটে নাম লেখার প্রথমেই দিয়েছি, আর এদের মধ্যে দুজনের ছবি দিয়েছি নীচে।

সিগারেটের হিরো। সিগারেটের শিকারও। আজ আমরা জানি যে রোগে এরা মারা যান সেই রোগগুলো সবই সিগারেট খেয়ে হয়। কিন্তু বৈজ্ঞানিক সত্য আদালত-মান্য হতে গেলে অনেকগুলো ধাপ পেরিয়ে আসতে হয়। তাই ডেভিড ম্যাকলীন ফুসফুসের ক্যান্সারে মারা যাবার পরে তাঁর বিধবা স্ত্রী সিগারেট কোম্পানির বিরুদ্ধে ক্যালিফোর্নিয়ার আদালতে মামলা করেন, কিন্তু হেরে যান। সিগারেট থেকে ঐ রোগ হয়েছে, বা বিজ্ঞাপনে সিগারেট ফুঁকতে বাধ্য হবার জন্য রোগ—এসব মানেনি ক্যালিফোর্নিয়া কোর্ট।

১৯৯০ তে ফুসফুসে ক্যানসার ধরা পড়ার পরে ওয়েন ম্যাকলারেন ধূমপান বিরোধী প্রচারে নামলেন—নীচের ছবিতে দেখবেন একই ফ্রেমে পাশাপাশি রয়েছেন সিগারেটের বিজ্ঞাপনে উজ্জ্বল ম্যাকলারেন আর বিছানায় মৃত্যুর কাছাকাছি ম্যাকলারে্ন—অ্যান্টি-স্মোকিং প্রচারের জন্য তোলা ছবি। আর প্রথম ছবিটি এরিক লসনের।
শেষ পর্যন্ত সিগারেট কোম্পানিকে কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছিল। কেন দিতে হল তাই নিয়েই আজকের গল্প।
------------------------------------


স্যার অস্টিন ব্র্যাডফোর্ড হিল এবং স্যার রিচার্ড ডল। রিচার্ড ডল গণিতবিদ হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু কেম্ব্রিজের এন্ট্রান্স পরীক্ষায় আটকে যান, ভর্তি হন ডাক্তারি পড়তে। মেধাবী চিকিৎসাবিজ্ঞান গবেষক। আর ব্র্যাডফোর্ড হিল হতে চেয়েছিলেন ডাক্তার, কিন্তু ছোটবেলায় টিবিরোগের কারণে ভগ্নস্বাস্থ্য, ডাক্তারির চাপ সইবে না, তাই হয়েছিলেন গণিতবিদ। ১৯৪০ সাল নাগাদ গণিতবিদ হয়েও হিল ডাক্তারি নিয়ে অনেক গবেষণা করেন। টিবি-তে ওষুধের ভূমিকা, আর্সেনিক নিয়ে কাজ করলে ক্যানসার হয় কিনা—এইসব গবেষণা। এরকম সময়ে হিল সাহেবের নজর পড়ল ফুসফুসের ক্যান্সার রোগটার ওপরে। রোগটা তার আগের দুই দশকে ছয়গুণ বেড়ে গেছে! কিন্তু কেন বেড়েছে কেউ জানে না।

হিল বললেন ডল সাহেবকে, আরে, দেশের হল কী? ফুসফুসের ক্যান্সার হঠাৎ এত বাড়ল কেন? দুজনে মিলে মাথা ঘামিয়ে বের করলেন মোটরগাড়ির দূষণের সঙ্গে বা ধূমপানের সঙ্গে এর একটা সম্পর্ক থাকতে পারে। কিন্তু সম্পর্ক থাকতে পারে বললেই তো হবে না, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ কোথায়? এর জন্য তো ওষুধের কার্যকারিতা প্রমাণের মতো কোনো রান্ডমাইজড কন্ট্রোলড ট্রায়াল বা আরসিটি করা যাবে না। (পাদটিকা ১)

হিল সাহেবের প্রথমে মনে হয়েছিল, মোটরগাড়ির দূষণের সঙ্গে ফুসফুসের ক্যান্সারের সম্পর্ক বেশি ঘনিষ্ঠ। কিন্তু মোটরগাড়ির দূষণ দ্বারা কে কতটা আক্রান্ত হচ্ছেন সেটা কীভাবে মাপা যাবে? কে ধূমপায়ী আর কে ধূমপায়ী নন, সেটা চিনতে কিন্তু কোনো অসুবিধা নেই। তাই ধূমপানের সঙ্গে ফুসফুসে ক্যান্সারের সম্পর্ক আছে কিনা সেটা দেখাটাই তাঁরা প্রথম কর্তব্য স্থির করলেন।

ধূমপানের সঙ্গে ফুসফুসে ক্যান্সারের সম্পর্ক ধরার কাজে যে সমীক্ষা করতে হবে তার জন্য চাই বড় দুটো গ্রুপ—যাদের একদল ধূমপান করে, আরেকদল ধূমপান করে না। দুই দলে অনেক মানুষ চাই, যাদের জীবনযাত্রা অন্য সব বিষয়ে একই রকম, তফাৎ কেবল এই ধূমপানের ব্যাপারটায়। তাদের কয়েক বছর ধরে নিয়মিত নজরদারিতে রাখতে হবে, সমস্ত শারীরিক সমস্যার খবর লিপিবদ্ধ করে বিশ্লেষণ করতে হবে। যদি দেখা যায় ধূমপান করা মানুষদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যান্সারের হার সত্যিই বেশি, তাহলে বুঝতে হবে ধূমপান সম্ভবত দায়ী। এইধরনের সমীক্ষা হল কয়েক বছর ধরে চলা এক রাজসূয় যজ্ঞবিশেষ—এর টেকনিকাল নাম প্রস্পেকটিভ কোহর্ট স্টাডি। আমাদের দেশ হলে এমন সমীক্ষা আদৌ করা সম্ভব হত কিনা সন্দেহ, কারণ আমাদের দেশে এখনও মেডিকেল নথী কেন্দ্রীয়ভাবে ঠিকমতো রাখার ব্যবস্থা তেমন নেই।

এমন নথী ওদেশে, মানে বৃটেনেও বিরল। কিন্তু হিল অনেক ভেবচিন্তে দেখলেন, বৃটেনের ডাক্তাররাই তো রয়েছেন। ১৯৫১ সালে বৃটেনে ত্রিশ হাজার ডাক্তারকে নিয়ে পঞ্চাশ বছর ধরে সমীক্ষা চালানোর ছক কষে ফেললেন তাঁরা। ডাক্তারদের দুটো দলে ভাগ করলেন—একদল ধূমপান করেন, আরেকদল করেন না। ডাক্তার ধূমপায়ীরা ঝুঁকি থাকতেও পারে সেটা জেনে স্মোক করেন, চট করে তা ছাড়বেন না। আর যাঁরা ধূমপায়ী নন তাঁদের মাঝবয়সে ধূমপান শুরু করার সম্ভাবনা কম। ডাক্তারদের একবার এই সমীক্ষাতে রাজি করাতে পারলে তাঁরা নিজেদের ইচ্ছাতেই শেষ পর্যন্ত থাকবেন, কারণ ফুসফুস ক্যান্সার বাড়ার কারণ জানা তাঁদের পেশার জন্য দরকার। এছাড়াও বৃটিশ ডাক্তারদের মধ্যে রোজগার, জীবনযাত্রা ইত্যাদির খানিকটা সাম্য আছে—এরকম হতে পারে না যে যাঁরা ধূমপান করেন তাঁরা বেশি কৃমি বা অপুষ্টিতে ভোগেন। অর্থাৎ এঁদের মধ্যে ধূমপান ও ক্যান্সারের যোগসূত্র থাকলে তা অন্য কোনো অজ্ঞাত তৃতীয় বিষয়ের জন্য হবার কথা নয়। (তথ্যসূত্র ১)

পঞ্চাশ বছর ধরে সমীক্ষা চলবে এমন কথা ছিল। তার মানে সমীক্ষার ফল প্রকাশ হবার কথা ছিল ২০০০ সাল নাগাদ। কিন্তু প্রথম বছরেই ফলাফল এতোই উল্লেখযোগ্য যে বৃটিশ মেডিক্যাল জার্নালে প্রাথমিক রিপোর্ট ছাপা হল। তিন বছরের মধ্যেই সমীক্ষায় খুব নির্দিষ্ট ফলাফল আসতে শুরু করল। ত্রিশ হাজার ডাক্তারের মধ্যে ৩৭ জন তিন বছরে ফুসফুসের ক্যান্সারে মারা যান, আর তাঁদের প্রত্যেকেই ধূমপায়ী। শুধু তাই নয়, ধূমপান হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা অনেক বাড়িয়ে দেয় এটাও প্রমাণিত হয়ে গেল। (প্রাথমিক রিপোর্ট -- তথ্যসূত্র ২)

সিগারেট ইন্ডাস্ট্রি নানা রকম পদ্ধতির ফাঁকফোকর খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। হাজার হোক, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যবসা। বৃটিশ ডাক্তাররা নিজেরা এই সমীক্ষার গিনিপিগ ছিলেন। তাঁরা একেবারে প্রথম থেকেই সমীক্ষার পদ্ধতি সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন। তাই সিগারেট ইন্ডাস্ট্রি যখন আইনি কচাকচি করছে তখন বৃটিশ চিকিৎসকেরা সিগারেটের বিরুদ্ধে বলতে শুরু করলেন।

এর মধ্যে ১৯৫৪ সালে একলক্ষ নব্বই হাজার আমেরিকান নাগরিকদের নিয়ে আরেকটি সমীক্ষার ফল প্রকাশিত হল, তাঁর ফলাফল বৃটিশ ডক্টরস’ সার্ভে-র অনুরূপ (পাদটীকা ২)। কীভাবে ধূমপান থেকে ক্যান্সার হতে পারে তার সম্ভাব্য উত্তরও দ্রুত মিলতে শুরু করল। পরীক্ষাগারে তামাকের ধোঁয়া থেকে পাওয়া আলকাতরার মতো জিনিসটি ইঁদুরের চামড়ায় লাগালে সেখানে ক্যান্সার হতে দেখা গেল। আবার হার্ট অ্যাটাক, ক্যান্সার, ফুসফুসের অন্যান্য রোগ মিলিয়ে মোট মৃত্যুর হার হিসেব করে দেখা গেল, আমেরিকা-ইউরোপের ৩৯ বছর থেকে ৬৯ বছর বয়সী মানুষদের মধ্যে অধুমপায়ীদের মৃত্যুহার বেশ কম। মোটামুটি শতকরা ১৫ জন অধূমপায়ী মানুষ এই বয়সে মারা যান, অথচ শতকরা ৪৩ জন ধূমপায়ী এই বয়সে মারা যান। অর্থাৎ শতকরা ২৮ জনের মৃত্যুর পেছনে ধূমপানের অবদান থাকার যথেষ্ট সম্ভাবনা।

ব্র্যাডফোর্ড হিল এবং রিচার্ড ডল চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রথম প্রস্পেকটিভ কোহর্ট স্টাডি করলেন, এমন নয়। এর আগেও এরকম সমীক্ষা হয়েছিল। কিন্তু এ ধরনের সমীক্ষার মধ্যে এটি সবথেকে নাড়া দেবার মতো ঘটনা। খুব দ্রুত পাশ্চাত্যের নানা দেশে ধূমপান ও তামাক বিরোধী আইনগুলো এল।

দুঃখের বিষয় এর ফলে সিগারেট কোম্পানিগুলো আরও বেশি করে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমাদের মতো দেশগুলোর ওপর, যেখানে আইন প্রণয়ন হল দেরীতে, আর আইনের প্রয়োগ হল আরও আলগাভাবে—আমাদের দেশ এখন তামাক-জনিত ক্যান্সারে বিশ্বে শীর্ষের দিকে।
সেটা নিয়ে কথা হবে পরের কোনো সময়।


পাদটিকা
(১) ওষুধ কাজ করে কিনা সেটা জানার জন্য রোগীদের দুটো দলে ভাগ করে, তাদের একদলের ওপর ওষুধ প্রয়োগ করে আর অন্যদলের ওপর ওষুধের মতো কিন্তু আসলে অকেজো জিনিস দিয়ে, কিছুদিন পরে তুলনা করা যায়। যদি ওষুধ পাওয়া রোগীরা অকেজো জিনিস পাওয়া রোগীদের চাইতে গড়ে বেশি উপকৃত হয় তাহলে বুঝতে হবে ওষুধটা ঐ রোগে কাজের। নইলে বুঝতে হবে ঐ রোগের জন্য ওটা ওষুধ নামের যোগ্য নয়। একে বলে রান্ডমাইজড কন্ট্রোলড ট্রায়াল—সংক্ষেপে আরসিটি।
(২) স্যার হিল ও স্যার ডল-এর সমীক্ষাটি ‘বৃটিশ ডক্টরস’ সার্ভে’ বলে আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রে বিখ্যাত। জার্নাল অফ আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন-র ইতিহাসে এই সমীক্ষাটি একটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলে স্বীকৃত।

চিত্র পরিচিতি (কেবলমাত্র অব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য)
১। এরিক লসন— কাউবয় হিরো।
২। ওয়েন ম্যাকলারেন—সিগারেটের বিজ্ঞাপনে আর বিছানায় মৃত্যুর কাছাকাছি। ধূমপান বিরোধী প্রচারে তোলা ছবি।
৩। স্যার ব্র্যাডফোর্ড হিল এবং স্যার রিচার্ড ডল।


তথ্যসূত্র
1. Trick or Treatment: Alternative Medicine on Trial. Simon Singh & Edzard Ernst. Corgi Books, 2009.
2. Smoking and Carcinoma of the Lung. Richard Doll and A. Bradford Hill. Bristish Medical Journal. 1950 Sep 30; 2(4682): 739–748. https://www.bmj.com/content/2/4682/739 accessed on 28 June 2020
3. India Against Cancer পোর্টাল http://cancerindia.org.in/tobacco-related-cancer/  accessed on 28 June 2020.

ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় সংক্ষিপ্ত

আসুন আজ ডক্টর বিধান চন্দ্র রায়ের জন্ম দিবসে তাঁর প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করি এবং আপামর বাঙালি ও বাংলার সকল স্তরের মানুষের পক্ষে জানাই শতকোটি প্রনাম । 
বাংলার নবরূপকার বলতেই যে মানুষটির নাম ঠোঁটের ডগায় চলে আসে তিনি আর কেউ নয় , তিনি  মহান চিকিৎসক, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক  বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও  বাংলার মানুষের কাছের মানুষ, প্রানের মানুষ ও মনের মানুষ ডক্টর বিধান চন্দ্র রায় মহাশয় । 
বিধান চন্দ্র রায় বাংলার সনামধন্য রাজা প্রতাপাদিত্যের বংশধর । যিনি সম্রাট আকবরের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন । বাংলার গৌরবময় ইতিহাসে তাঁর নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য । সেই বংশের একজন অংশীদার হলেও বিধান চন্দ্রের পিতা প্রকাশ চন্দ্র এর ভাগ্য কোন বিষয় সম্মতি জোটে নি । পারিবারিক কলহ বিবাদ মামলা মোকদ্দমায় লিপ্ত হয়ে পড়ে  রায় পরিবার এর উত্তরসূরিগন । প্রকাশ চন্দ্র কে নিজের ভিটে ছেড়ে বহরমপুরে চলে আসতে হয়।
তিনি সারা জীবন ধরে লড়াই করে জীবন সংগ্রামে নিজেকে সর্বদা ব্যস্ত রাখেন পরিবারের জন্য । তাঁর এই জীবন সংগ্রামের সাথী হিসাবে তিনি পাশে পেয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী অঘোরকামিনী দেবী কে । বিধান চন্দ্র রায় তাঁদের কনিষ্ঠ পুত্র । তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১লা জুলাই ১৮৮২ সালে। দুই কন্যা ও তিন পুত্রের জননী অঘোরকামিনী দেবী কে খুব কষ্টের মধ্যে দিন কাটাতে হয়েছিল ।  বিধান চন্দ্রের জীবনে তাঁর পিতা মাতার চিন্তাধারার বিশেষ প্রভাব পড়েছিল । বিধান চন্দ্র খুব ছোট বেলা থেকেই যে শিক্ষা পেয়েছিলেন তাঁর পিতা মাতার কাছ থেকে তা ভবিষ্যতে তাঁর জীবনে আশীর্বাদ এ পরিনত হয় । 
একদিকে মানব দরদী চিকিৎসক অন্য দিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী (১৯৪৮-১৯৬২)। তাঁর কর্মজীবন খুবই বর্ণময় । স্বাধীন ভারতের একজন প্রথম সারির নেতা । শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয় তাঁর প্রভাব প্রসারিত ছিল দিল্লি পর্যন্ত । ভারতবর্ষের রাজ্য ও কেন্দ্র দুই স্থানেই ছিল তাঁর সমান কদর । তিনি পন্ডিত নেহেরুজীর ঘনিষ্ট বন্ধু হিসাবেও রাজনৈতিক মহলে পরিচিত ছিলেন । ১৯৪৮ সালে রাজ্যভার গ্রহণ করার পর থেকে তাঁকে সম্মুখীন হতে  হয়েছিল সমস্যা বহুল জটিল রাজনীতির । প্রথম সমস্যা - ইস্ট পাকিস্থানের বাঙালিদের পুনর্বাসন নিয়ে । এই সমস্যা খুবই ভয়াবহ রূপ ধারণ করে । তিনি কোনমতে সেই সমস্যা থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন । উদ্বাস্তু পুনর্বাসন সমস্যার কিন্তু পুরোপুরি সমাধান হয়নি । কেন্দ্র ও রাজ্যের বোঝাপড়ার মধ্যে দিয়ে সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া হয় । বিধান চন্দ্রের চেষ্টায় কোন ত্রুটি ছিল না । অনেকটা অসহায় অবস্থায় তাকে অনেক সমালোচনা মেনে নিতে হয় দলের স্বার্থে । সেই সময় তাঁর পাশে ছিলেন প্রফুল চন্দ্র সেন ।  তিনি মুখ্যমন্ত্রীর পদে বসে সারাটা জীবন বাংলার উন্নতির কথা ভেবেছিলেন । খাদ্য সমস্যা, পরিবহন সমস্যা, শিল্পায়ন, চিকিৎসা ব্যবস্থা, শিক্ষা, খেলাধুলার জগৎ সব কিছু নিয়ে ভেবেছিলেন । তিনি যে বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন তার স্বার্থক রূপদানে সর্বদা সচেষ্ঠ ছিলেন । দুর্গাপুর শিল্প নগরী, কল্যাণী টাউন শীপ,  সল্টলেক , হরিনঘাটা ফার্ম, ওরিয়েন্টাল গ্যাস কোম্পানি, ভূতল রেলওয়ে, দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে, আকাওয়া গঞ্জেস (গঙ্গা জল পরিশোধন প্রকল্প) প্রভৃতি নানা দিকে ছিল তাঁর নজর । ১৯৫০ সালে ভূতল রেলওয়ে এর জন্য ফ্রান্স থেকে একদল ইঞ্জিনিয়ার কলকাতা আসেন । কিন্তু সেই সময় পরিবহন সমস্যা এতটাই খারাপ অবস্থায় ছিল যে তিনি সেই পরিমান অর্থ ভূতল রেলওয়ের জন্য বরাদ্দ করতে সক্ষম হন নি । নতুন শিল্প গঠনের ক্ষেত্রে বাঙালি যুবকদের তিনি সব সময় উৎসাহিত করতেন । চিকিৎসা জগতে তিনি গরিব মানুষের ভগবান ছিলেন । তিনি ব্যস্ততার মধ্যেও সময় বের করে ছুটে যেতেন তাঁর রোগীদের চিকিৎসার জন্য । অনেক উদাহরণ আছে তাঁর উদারতার । তিনি সিনেমা জগৎ কেও সমান ভাবে উৎসাহিত করেছেন এবং তার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন । সত্যজিৎ রায় যখন 'পথের পাঁচালি' করতে গিয়ে অর্থের অভাবে কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলেন তখন সরকারি ভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন । এই পথের পাঁচালি এনে দেয় বাংলার ঘরে অনেক খ্যাতি ও যশ । 
প্রথম বিধানসভা নিবার্চন হয় ১৯৫৭ সালে । বিধান চন্দ্র রায় পুনরায় নিবাচিত হন এবং দ্বিতীয়বার মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসেন । এর পূর্বে ১৯৫৬ সালে তাঁর উদ্যোগ্যে বিধান সভায় খসড়া পঞ্চায়েত আইন পেশ করা হয় । ১৯৫৭ সালের নিবাচনের পর এই আইন নানা বাধা অসুবিধার কারনে স্বার্থক রূপ পায় নি । তাঁর মন্ত্রিসভায় সিদ্ধার্থ শংকর রায় আইন মন্ত্রী হিসেবে কিছু দিন ছিলেন । অন্যান্য দের সাথে মতানৈক্যের কারনে তিনি অল্প দিন পরেও ইস্তফা দেন । 
১৯৬১ সালে রাষ্ট্রপতি ডক্টর সার্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনান তাঁকে ভারত রত্ন সম্মানে সন্মানিত করেন । ১৯৬২ সালের নির্বাচনে তিনি পুনরায় নির্বাচিত হন। তৃতীয়বার মুখ্যমন্ত্রীর আসন গ্রহণ করেন । সেই সময়  তিনি শারীরিক ভাবে দুর্বল ছিলেন । ৩০ জুন ১৯৬২ তে তিনি ভীষণ ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন । পরের দিন তার জন্মদিন । বহু মানুষ আগের দিন থেকেই কলকাতায় আসতে শুরু করেন তাঁকে জন্ম দিনের শুভেচ্ছা জানাতে । এত অসুস্থতার মধ্যেও তিনি তাঁর কাছে আগত মানুষের ভালবাসার কথা চিন্তা করে তাঁর বাড়ির দরজায় একটি বার্তা লিখে নিজে সই করেন । সেটি তাঁর বাড়ির দরজায় আটকে দিতে বলেন । তাঁর সেই বার্তা :-
" According to the advice of the doctors it is not possible for me to receive personally your congratulations and good wishes on my birth day. I reciprocrate the same, and requests my friends to accept my heartful thanks and I pray for their well being..."
                               Bidhan Chandra Roy
এই মানুষটিকে জানতে হলে অবশ্যই পড়তে হবে Dr. B.C.Roy by K.P. Thomas . এই বই টির ফরওয়ার্ডিং এ জহরলাল নেহেরু লেখেন --
".....I am glad that Shri K.P.Thomas has written a biography of Dr. B.C.Roy, and I hope that many will profit by it..."

K.P.Thomas এর অনেকটাই বাংলা অনুবাদ বলা যেতে পারে আরও একটি বই  " কর্মযোগী বিধানচন্দ্র" লেখক নন্দলাল ভট্টাচার্য ।
এ ছাড়াও অনেক বই আছে যেমন DR. BIDHAN CHANDRA ROY by Dr. Nitish Sengupta
আমার হাতে আরও একটি বই আসে যেটি খুবই মূল্যবান । বিধান চন্দ্র রায়ের সাথে তাঁর সহকারী হিসাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন Shri S.M. Bose তাঁর 'Two Decades With Dr. Roy And His Successors' বইটিতে ।
সকল পাঠক বন্ধুদের কাছে নিবেদন যদি ডক্টর বিধান চন্দ্র রায় কে জানতে চান ওপরের উল্লিখিত বই গুলো অবশই পড়বেন ।
তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে যদি আমার লেখার মধ্যে কোন ভুলত্রুটি থাকে আমাকে মার্জনা করবেন ।

বিনীত
 
তারক মিত্র।