রবিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১

পতিতপাবন গুরুচাঁদ ঠাকুরের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পালন ও নেতাজির বক্তব্য :

 পতিতপাবন গুরুচাঁদ ঠাকুরের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পালন ও নেতাজির বক্তব্য :


1937 সালের 13 মার্চ পতিতপাবন গুরুচাঁদ ঠাকুর ইহলোক ত্যাগ করেন কিন্তু সেবছর কোন শোকসভা পালন করা হয়নি তাই 1938 সালের 13 ই মার্চ কলকাতা অ্যালবার্ট হলে তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা হয়। উক্ত সভায় সভাপতিত্ব করেন কংগ্রেস লেজিসলেটিভ পার্টির চিফ হুইপ শ্রী যোগেশ চন্দ্র গুপ্ত (বিখ্যাত আইনজীবী)। প্রধান অতিথির চেয়ার অলংকৃত করেন কংগ্রেস সভাপতি শ্রী সুভাষ চন্দ্র বসু যাকে বিশ্ববাসী নেতাজি বলে চেনেন। তাছাড়া উক্ত মঞ্চে যেসব প্রধান নেতারা বসে ছিলেন তারা হলেন সর্বশ্রী বিরাট চন্দ্র মন্ডল,(এম. এল. এ)  রসিকলাল বিশ্বাস, (এম. এল. এ) বঙ্কিম মুখার্জি, (এম. এল. এ) নিহারেন্দু দত্ত মজুমদার, (এম. এল. এ) ডাক্তার গঙ্গা চরণ সরকার, (এম. এল. এ) বেগম সাকিনা (কর্পোরেশন কাউন্সিলর), সন্তোষ ঘোষ (কর্পোরেশন নেতা) প্রমুখ। এদের পেছনে যারা দাঁড়িয়েছিল তারা হলেন সর্বশ্রী যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল (এম.এল.এ), প্রমথরঞ্জন ঠাকুর (এম.এল.এ) ও যজ্ঞেশ্বর মন্ডল (এমএল.এ)। উক্ত সভায় যারা বক্তব্য রাখেন তারা হলেন,-সর্বশ্রী সন্তোষ ঘোষ, বঙ্কিম মুখার্জি, নিহারেন্দু দত্ত মজুমদার, বেগম সাকিনা (উর্দু ভাষায়), নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং যোগেশ চন্দ্র গুপ্ত। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু খুব নিচু গলায় কিন্তু স্পষ্ট উচ্চারণে বলেছিলেন - ঠাকুর গুরুচাঁদ ও তার পিতা ঠাকুর হরিচাঁদ সর্বজন শ্রদ্ধেয় এমন মানুষ যে তাদের শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রতিদিনই আমরা দিন শুরু করতে পারি। এদেরই বলে প্রাতঃস্মরণীয়। মিটিং ডেকে  আয়োজন করে একদিন তাদের স্মরণ করে বাকি 364 দিন  তাদের ভুলে থাকার মত মানুষ তারা নন। গুরু স্থানীয়দের দুই ভাগে ভাগ করা যায় -একদল নিত্যকর্মের স্মরণীয় আর একদল জীবন কর্মে স্মরণীয়। কিন্তু এই দুই ভাগের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, যিশু, মহম্মদ, রামানুজ এরা আমাদের জীবনের নীতি শেখান -যেমন, যত মত তত পথ, বীর বাণী, অহিংসা, শরীয়ত ইত্যাদি। আর এক ভাগে যারা তারা আমাদের নিত্যকর্ম মনে করিয়ে দেন -চৈতন্য, নিত্যানন্দ, হরিচাঁদ- গুরুচাঁদ,বুদ্ধদেব, মহাবীর।  এরা আমাদের শিক্ষা দেন -হরির্নামৈব কেবলম্,হাতে কাম মুখে নাম, মহানির্বাণ, অহিংসা করুণা ইত্যাদি।


আমরা ভারতীয়রা, অবতারে বিশ্বাস করি। পাশ্চাত্য দর্শনে সেই অবতার রুপি মানুষকেই বলা হচ্ছে "সুপারম্যান"। গুরুচাঁদ ঠাকুর ছিলেন একজন অবতার, "সুপারম্যান"। তিনি বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে নবজীবন সঞ্চার করেছেন। তিনি তফশিলভুক্ত জনগণকে উন্নত করেছিলেন যাতে তারা রাজনীতিতে ও সমাজে বর্ণহিন্দুদের সমতুল্য হয়ে উঠতে পারে।


বর্ণহিন্দু ও তপশিলি ভুক্ত হিন্দুরা মিলেই  অখন্ড হিন্দু সমাজ তৈরি হয়েছে। তাদের মধ্যে বস্তুত কোন পার্থক্য নেই। ভারতীয়দের  ক্রীতদাসে পরিণত করা হয়। ভারতীয়রা একটা পরাধীন,অনগ্রসর, অত্যাচারিত, আক্রান্ত এবং পরাজিত জাতি। আপনারা সিডিউল কাস্টদের অনগ্রসর জাতি বলবেন না,কারণ আমাদের পুরো জাতিটাই অনগ্রসর, ডিপ্রেসড। ব্রাহ্মণ ও কায়স্থরাও কোন ব্যতিক্রম নয়। স্বাধীনতা পেলে এইসব প্রভেদ পার্থক্য লুপ্ত হয়ে যাবে।


নমঃশূদ্র দের একটি অংশ, মন্ত্রী মুকুন্দ বিহারী মল্লিক ও তার ভাইদের দলবল উক্ত সভায় অনুপস্থিত ছিলেন। তারা খুলনায় 14 ই মার্চ সভা করেন। উক্ত সভায় তখনকার অর্থমন্ত্রী শ্রী  নলিনী রঞ্জন সরকার মহাশয় উপস্থিত হয়েছিলেন।


সূত্র : বরিশালের যোগেন মন্ডল 

লেখক :দেবেশ রায়।

শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১

মিথ্যা_লেখার_ক্ষমতা_দেখুন

 " #মিথ্যা_লেখার_ক্ষমতা_দেখুন-"


 মিথ্যা লিখে ব্রাহ্মণগণ মহাপুরুষ, কালিদাসকে বিশ্ববিখ্যাত কবি বানিয়েছিলেন।

 মিথ্যা লিখে ব্রাহ্মণরা অন্ধ (অন্ধ) #সুরদাসকেও একজন #মহান_কবি বানিয়েছিল।

 মিথ্যা লিখে ব্রাহ্মণরা #বিষ্ণুগুপ্ত_মৌর্যকে_চাণক্য বানিয়েছিল।

 মিথ্যা লিখে ব্রাহ্মণরা #বুদ্ধের পঞ্চতন্ত্র, বিষ্ণু শর্মার পঞ্চতন্ত্র বানিয়েছে।

 মিথ্যা লিখে ব্রাহ্মণরা ব্রাহ্মণকে #বীরবল_সম্রাট আকবরের চেয়ে বড় করে তুলেছিল।

 মিথ্যা লিখে ব্রাহ্মণরা #মহাদরপোক_সাভারকার #বীর_সাভারকর বানিয়েছিলেন।

 মিথ্যা লিখে ব্রাহ্মণরা ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র এবং বর্ণের চেয়ে ব্রাহ্মণদেরকে আরও জ্ঞানী ও উপাস্য করে তুলেছিল।

 মিথ্যা লিখে ব্রাহ্মণরা নিজেদেরকে ঈশ্বরের চেয়ে বড় ব্রাহ্মণ বানিয়েছে।

 মিথ্যা লিখে ব্রাহ্মণরা তাদের প্রতিপক্ষ, তাদের শুভাকাঙ্খী বানিয়েছে।

 মিথ্যা লিখে ব্রাহ্মণরা এমনকি কাল্পনিক #গল্প_সত্য বানিয়েছে।


 এখন আপনি আমাকে বলুন - যখন মিথ্যা লিখে একজন ব্রাহ্মণ কোটি কোটি মানুষকে তার দাস করতে পারে!  ....তাতে কি?  আমরা কি সত্য লিখে এই দাসত্ব থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষকে মুক্ত করতে পারি না?


 তলোয়ার ইতিহাস বদলায় না, ভূগোল বদলায়!


 আপনি যদি ইতিহাস পরিবর্তন করতে চান, #কলম_ব্যবহার করুন!


 তিনি #বিখ্যাতভাবে_কাল্পনিক জিনিসও তৈরি করেছিলেন।

 এবং আপনি বিখ্যাত এমনকি বাস্তব জিনিস করতে সক্ষম নন!

 এটি প্রতিটি স্তরে আমাদের #ব্যর্থতার_কারণ।

 যদি আপনি  লিখতে  না পারেন, তবে আপনি অন্যদের কাছে পৌঁছানোর জন্য যারা লিখছেন তাদের কথাগুলি #শেয়ার করে করতে পারেন!


 যখন আমরা বুদ্ধ, রবিদাস, কবিরদাস, ঘাসিদাস, ছত্রপতি শাহুজি, পেরিয়ার, জ্যোতিবা ফুলে, গাডগে, আম্বেদকর, ফাতিমা শেখ, তন্ত্য ভিল, বিরসা মুন্ডা, ঝালকারি বাই, উদাদেবী, কাংশী রাম, লল্লাই সিং যাদব, সম্রাট অশোক, ফুলন দেবীকে ডাকতাম। এটি সম্পর্কে লিখতে শুরু করে, তবেই মানুষ তাদের জানতে পারে।


 সুতরাং আপনি যদি সত্য না লিখেন, আপনি এই মিথ্যা এর দাসত্ব থেকে মানুষকে মুক্ত করতে পারবেন না!

 যাদের পূর্বপুরুষরা আপনার পূর্বপুরুষদের আহিরা, তেলকাত, ভরওয়া, চামড়া, পাসিয়া, ডোমভা, পালভা, গডওয়া, ননিয়া, বাল্মিকিয়া, কোহরা, কৈরি, ধোবিয়া, খাতিকা, প্যাটেলওয়া, মলহওয়া বলে ডাকতেন এবং আজও তাদের ডাকেন। আপনারা অন্ধভাবে বিশ্বাস করেন তাদের সাপের মত বাচ্চা ?  হে আমাদের ওবিসি এসসি এসটি বহুজন সমাজের নিরীহ ভাইয়েরা!  সেই দুধও  পান করে  তোমার এবং  তোমাকেও  কামড়ায়।  একই লোকেরা আপনার  অধিকার  ছিনিয়ে নেয় এবং আপনার  বিরোধিতা একই মানুষ।  তারা আপনাকে মুসলমানদের #ভয়, প্রতারণার মাধ্যমে আপনার অধিকার এবং ক্ষমতা দেখিয়ে নিয়ে যায়, তারপর আপনি *আপনার হাত ঘষতে থাকেন ।

 যদি আপনি  এই সাপ থেকে আপনার অধিকার পাওয়ার আশা করেন তাহলে ভালো!  আপনার চেয়ে আর বড় মূর্খ আর কে হতে পারে?

  এখন আপনি এটি একটি দীর্ঘ সময়ের জন্য করছেন, শীঘ্রই সতর্ক হন।


তথ্যটি পেয়েছি 'We The People' একটি ভার্চুয়াল মিটিং এর আলোচনায়। 


অনুবাদ : ব্যোমকেশ বিশ্বাস  


 জয় ভীম, নাম বুদ্ধ

"ভারতের সত্য ইতিহাস"

 "ভারতের সত্য ইতিহাস"

মূল রচনা : প্রোফেসর ডঃ রামনাথ পূর্ব কূলপতি

বাংলা অনুবাদ : ব্যোমকেশ বিশ্বাস


"#মূলনিবাসী সভ্যতা সিন্ধু #সভ্যতা"


খ্রী.পূ. ১৫০০ বা এর এক হাজার বছর পূর্ব পর্যন্ত পুরো ভারতীয় ভূ-খন্ডে রোম সভ্যতার থেকেও অনেক উন্নত সভ্যতা ছিলো। খনন কার্যের ফলে জানা যায় এখানে দিল্লী এবং চন্ডীগড় এর মতো উন্নত নগর ছিলো। এ সভ্যতা হস্তকলা এবং শ্রম পর কেন্দ্রিভূত ছিলো। বর্ণ-ব্যাবস্থা, জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতার নাম-নিশান ছিলো না। বর্ণনা পাওয়া যায় এই সময়ে রত্নের সিক্কা এবং সোনার বর্তনের প্রোচলন ছিলো। রাজা পরম ধার্মিক, সত্যবাদী, তপস্বী এবং দানী ছিলেন। নদী, জলে পরিপূর্ণ এবং দেশ ধন-ধান্য এবং রত্নে ভরা ছিলো। চারি দিকে অমন-চেন, সুখ-শান্তি ছিলো। এর কিছো উদাহরন আমরা "অভিজ্ঞান শকুন্তলম" নাটক এবং বিভিন্ন গবেষনায় পাওয়া যায়।


#ভিক্ষুক_শাসক


কিন্তু এই ভিক্ষুকরা এই সমস্ত সুযোগ-সুবিধা নিজেদের শক্তি তৈরিতে ব্যয় করেছিল, কারণ তাদের শকুন-দৃষ্টি এখানে শহুরে সভ্যতাকে ধারণ করতে নিয়োজিত ছিল।  এজন্য তিনি নিজেকে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য নামে তিনটি বর্ণে বিভক্ত করেন।  অন্যদের লুণ্ঠন করা এবং তাদের মাতৃভূমি দখল করা ছিল শ্রমের একটি বিভাজন।  চোর এবং ডাকাতও একই রকম ব্যবস্থা করে। 

 

#ভিক্ষুকদের_ধ্বংসের_লীলা


 সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংস করতে এবং এটি দখল করার জন্য, তিনি ইন্দ্রকে সেনাপ্রধান হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন বড় শহর ও দুর্গ ধ্বংস করতে।  অগ্নি নামক দেবতা সেনাপ্রধান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।  অগ্নি নামের দেবতা রাতের বেলা ছলনা করে শহরগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিতেন, এই ছিলেন ফায়ার ব্রিগেডের প্রধান।  বরুণ বিশাল বাঁধ ও খাল ভেঙে মাঠ ও শহর ডুবে দিতেন। কালী দুগ্গার মতো সুন্দরী নারীরা রাজাদের ফাঁদে ফেলে বিষ দিতেন।  ঋগ্বেদে সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংসের একটি চিত্রপূর্ণ বর্ণনা পায়।  এরকম শত শত মন্ত্র আছে যাতে বলা হয়েছে - হে ইন্দ্র!  আপনি অসংখ্য পাথরের তৈরি দুর্গ এবং অসুরদের শহর ধ্বংস করেছেন।  পাথরে নির্মিত অনেক দুর্গ ও শহর চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল।  বহু কৃষ্ণাঙ্গ নারী, শিশু এবং সৈন্য হত্যা করেছে।  হে আগুন!  আপনি অনেক শহর পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছেন, যার কারণে কালো পুরুষ ও মহিলারা মারা গেছেন এবং খাবার এবং জিনিসপত্র রেখে পালিয়ে গেছেন।  এই যুদ্ধ পাঁচ-ছয়শ বছর ধরে চলতে থাকে এবং মধ্য এশিয়া থেকে আয়ুনদের ঝাঁক আসতে থাকে।


#মনুসহিংসতার_নৃত্যনাট্য  


যেখানে দিল্লি চণ্ডীগড়ের মতো শত শত শহর বসতি স্থাপন করেছিল।  সোনার শহর 'লঙ্কা' পোড়ানো, দেবসুর যুদ্ধ ধ্বংস, রামলীলা ও দশেরায় রাবণ পোড়ানো, হিরানা কাশ্যপ, শাম্বুক, বালি, গান্ধী হত্যা, একলব্যের বুড়ো আঙুল, সুপনখার নাক ও কান কেটে ফেলা এবং হত্যা তদকা, দলিত এবং মুসলমানদের গণহত্যা, সেনাবাহিনী দ্বারা অকাল তখত ধ্বংস, খ্রিস্টান গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া, গুজরাটের গণহত্যা এবং বাবরি মারজিদ ধ্বংস, এই সবই মনুবদীর ডিএনএ।  এর একটি অংশ হয়ে গেছে।  'বিশ্ব হিন্দু পরিষদ' এবং 'বজরং দল' -এর কর্মীরা খোলাখুলি বলে যে, আমাদের দেব -দেবীরা যখন সব মারাত্মক অস্ত্র পরছেন, তারা কি এই অস্ত্রগুলি ফুল ফোটানোর জন্য রাখেন?  


#বৈদিক_হিংসা,#হিংসা_নয়


 আর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর, বৈদিক বলিদান হিংসা এবং যৌন মিলনের প্রকাশ্য প্রদর্শন হতে শুরু করে।  ভাই-বোন, বাবা-মেয়ে ইত্যাদির কোন কিছুই যত্ন নেওয়া হয়নি।  ব্রহ্মা তার মেয়ে সরস্বতীকে তার স্ত্রী বানিয়েছিলেন।  যেখানেই তাকান, শত শত প্রাণী বৈদিক সহিংসতায় জবাই হতে শুরু করে।  'বৈদিক সহিংসতা হিংসা না ভবতী' এর অধীনে কৃষকদের কাছ থেকে গরু, ষাঁড়, দুধ এবং খাদ্যশস্য ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল।  চার পাশে হাড় ও চামড়ার স্তূপ থাকবে, যার পুরো শহর দুর্গন্ধ হতে শুরু করেছে।  কৃষকদের চাষের জন্য ষাঁড় এবং খাবারের জন্য দুধ স্বপ্ন দেখতে শুরু করে।  বৈদিক মাংস ভক্ষণে 35 ধরনের পশুর মাংস খাওয়া হয়েছিল, যার বর্ণনা মনুস্মৃতিতে এসেছে।

বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১

ইতিহাস পর্যালোচনায় নিম্নবর্গীয় জাতি বা উপজাতি

ইতিহাস পর্যালোচনায় নিম্নবর্গীয় জাতি এবং উপ জাতিগোষ্ঠী কে বা কাহারা? এদের উদ্ধার কর্তা হিসেবে কোন ভগবান এসেছে? কেন এসেছে?

🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹


★ইতিহাস পর্যালোচনায় নিম্নবর্গীয় জাতি বা উপজাতি  গোষ্ঠীঃ-

বর্তমান বাংলাদেশ, ভারত সহ সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন তপশিলি জাতি এবং উপজাতি গোষ্ঠীরা বাস্তবিক অর্থে আজ-ও পর্যন্ত বিশ্বের কোনো ধর্মে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে নাই বা কাগজে কলমে মতুয়া মতাদর্শগত "সূক্ষ্ম সনাতন ধর্ম" বা "মতুয়া ধর্ম" ভিন্ন ধর্মীয় অধিকার পায় নাই। এদেরকে কতিত উচ্চবর্ণীয়রা বা ব্রাহ্মণ্যবাদীরা  নিম্নবর্গীয় তথা তপশিলি বা অন্ত্যজ (চন্ডাল সহ) জাতি এবং উপজাতি হিসেবে পরিগনিত করে আসছে। কিন্তু এই সকল ধর্মহীন তথাকথিত নিম্নবর্গীয় জাতিগোষ্ঠী মূল ইতিহাস না ঘেটে বা না বুঝে হুজুকেই বর্ণবৈষম্যভেদী, ছুৎমার্গ সহ উঁচু-নিচু জাত-পাত যুক্ত কুসংস্কারাচ্ছন্ন ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুধর্ম গ্রহণ করে চলছে বা হিন্দুধর্মে নাম লেখাতে চলেছে (মূল সনাতন ধর্মকে ছেড়ে) এবং ব্রাহ্মণ্যবাদীদের কুটচক্রে পরে ভয়ংকর  ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়াচ্ছে। আর সেখানে কথিত উচ্চবর্ণীয় লোকেরা অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে নবাগত ব্রাহ্মণ্যবাদ সৃষ্টি করে তথাকথিত নিম্নবর্গীয় অন্ত্যজ জাতিগোষ্ঠী বংশধরদের উপর শোষণ চালাবে যদি না এই সকল জাতি বা উপজাতি গোষ্ঠী সু-শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে মূল ইতিহাস জেনে এখনো সোচ্চার না হয়। নিম্নে ধর্মহীন সেই সকল নিম্নবর্গীয় জাতি এবং উপজাতি গোষ্ঠীর নাম তুলে ধরা হলো ---

১) নমঃশূদ্র ২) পৌণ্ড্রক্ষত্রিয় ৩) রাজপুত ৪) ঘাটোয়াল 

৫) তাঁতী ৬) শাখারী ৭) কর্মকার ৮) স্বর্ণকার ৯) কাঁশারী

১০) কুমোর  ১১) সদগোপ ১২) গোয়ালা ১৩) মালাকার

১৪) নাপিত ১৫) বারুই ১৬) বার্ণওয়ার  ১৭)তিলি ও তেলি ১৮) সদগোপ ১৯) গন্ধবনিক  ২০) সূত্রধর ২১) সুবর্ণবনিক  ২২) সাহা ২৩) কপালি ২৪)পাটিয়াল ২৫) পাটনি ২৬) চাষী কৈবর্ত ২৭) জালিয়া কৈবর্ত ২৮) ময়রা 

২৯) হালুই ৩০) কুণ্ডু ৩১) আগুরী ৩২) দলুই ৩৩) কুর্মি ৩৪) খেয়াতিলাম ৩৫) পরাশর দাস ৩৬) গরার  ৩৭) ধোপা ৩৮) স্যাকরা ৩৯) বৈষ্ণব ৪০) ডোম ৪১) যোগী ৪২) গাড়ওয়ারা ৪৩) চর্মকার ৪৪) কর্মকার ৪৫) সূত্রধর

৪৬) ভূইমালি ৪৭) কোচ ৪৮) রাজবংশী ৪৯) শূড়ী ৫০) খাটবা ৫১) বেলদার ৫২) কাচার ৫৩) কোইরি ৫৪) হানসি ৫৫) চুনরি ৫৬) মাটিয়াল ৫৭) তিয়র ৫৮) জালিয়া ৫৯) ঝাল ৬০) মল্ল ৬১) মাঝি ৬২) পাতুর ৬৩) বৈতি ৬৪) বাগদি ৬৫) দুলিয়া ৬৬) মুরিয়ারি ৬৭) লহেরি বা নুরি ৬৮) রাওয়ানী কাহার ৬৯) মাল-সাপুড়ে ৭০) রবি দাস ৭১) ঋষিদাস ৭২) বাঁশফোর ৭৩) বাল্মিকী ৭৪) হেলা ৭৫) হাড়ি ৭৬) মেথর ৭৭) লালবেগী ৭৮) বেদিয়া ৭৯) শিকারী ৮০) বাথুয়া ৮১) তেলেগু ৮২) তামিল ৮৩) নাগরচি ৮৪) বাহলিয়া ৮৫) বাউরি ৮৬) বিন্দ ৮৭) চাঁই ৮৮) দুসাদ ৮৯) পাসি ৯০) পান ৯১) পাহান ৯২) কাউরা ৯৩) মন্ডাই ৯৪) বুনো ৯৫) গারো ৯৬) শুড় ৯৭) ভুমিজ ৯৮) ভূইমালি ৯৯) নট ১০০) জেলে ১০১) শবর

এছাড়াও আরো কিছু জনজাতি আছে যার নাম আমার অজানা।


★ তপশিলি বা অন্ত্যজ জাতি (চন্ডাল সহ) এবং উপজাতি গোষ্ঠীর উদ্ধারকর্তা হিসেবে যে ভগবান এসেছে, যার জন্য এসেছেঃ--


উপরোল্লিখিত তপশিলি বা অন্ত্যজ জাতি এবং উপ জাতিগোষ্ঠীর জন্য এই বিশ্বে শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরের পূর্বে প্রকৃতপক্ষে কোনো ভগবান বা মুক্তিদাতা আসছে বলে ইতিহাসের পাতায় সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয় না। এই নিম্নবর্গীয় তপশিলি বা অন্ত্যজ জাতি এবং উপজাতির ধর্মীয় ও মৌলিক অধিকার সহ সকল প্রকার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য একমাত্র শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর এই ধরাধামে আবির্ভূত হয়েছিলেন।


এবার পূর্নব্রহ্ম পূর্ণানন্দ শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরের আসার কারন সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক----

                •তৎকালীন ভারতবর্ষ তথা বাংলার সমাজ ব্যবস্থায় ব্রাহ্মণ্যবাদীদের অত্যাচারে নিন্মবর্গের মানুষ যখন মানুষের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত, মন্দিরে গিয়ে ভগবানের আরাধনা থেকে বঞ্চিত, যেখানে নিন্মবর্গের মানুষের সংস্পর্শে মন্দির অপবিত্র হয়ে যেত ঠিক তখনই ঠাকুরের অবতীর্ণ হওয়ার প্রয়োজন দেখা দিল। তাইতো---দুনিয়ায় যারা উৎপীড়িত, যারা বঞ্চিত, যারা শোষিত, যারা লাঞ্ছিত, যারা উপেক্ষিত, যারা নির্যাতিত, যারা নিপীড়িত, যারা নিষ্পেষিত, যারা অবহেলিত, জীবনভর যারা শুধু দিলেই পেলেনা কিছুই, মানুষ যাদের চোঁখের জলের হিসেব নিলেনা; তাদের বেদনা তাদের করুন কান্নায় দ্যুলোক থেকে ভ্যূলোকে নেমে এনেছিল পতিতের পরিত্রাতা তথা তপশিলি বা অন্ত্যজ জাতি বা উপজাতি গোষ্ঠীর মুক্তিদাতা পূর্ণব্রহ্ম শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর।

     ঠাকুর এসেছিলেন ---

              "অন্ধজনে দিতে আলো, অমানীকে মান,

                ওড়াকান্দী আবির্ভূত হল ভগবান ।

                হরিচাঁদ যেই আলো প্রথম জ্বালিল,

                 গুরুচাঁদ শতগুনে বর্ধিত করিল।।"

পূর্ণব্রহ্ম শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর ও তৎপূত্র শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুরের আগমনে ব্রাহ্মণ্যবাদের ধ্বংসের দামামা বেজে উঠল। শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর এসে পতিতের মুক্তির জন্য প্রবর্তন করলেন মতুয়া মতবাদ, যেটা ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে এক মহা বিপ্লব। পতিত জাতির উদ্ধারের জন্য পূর্ণশক্তি ধারন করে পূর্ণব্রহ্ম শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর এই পৃথিবীতে এসে ব্রাহ্মণ বা ব্রাহ্মণ্যবাদীদের সৃষ্ট সকল জাতপাতের জাতাকল থেকে নিম্নবর্গের মানুষের মুক্তির জন্য এবং তিনি বিশ্বের সকল মানব জাতিকে একত্রে মিলিত করার উদ্দেশ্যে বললেন--

            "নরাকারে ধরাপরে যতজন আছে।

          একজাতি বলে মান্য পাবে মোর কাছে।।"

তাইতো সূক্ষ্ম সনাতন ধর্ম বা মানবতাবাদী মতুয়া ধর্মের মূলনীতি হিসেবে শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর বলেছেন --

           "জীবে দয়া নামে রুচি মানুষেতে নিষ্ঠা 

             ইহা ছাড়া আর যত সব ক্রিয়া ভ্রষ্টা।।"

এখানে শুধু গন্ডিবদ্ধ সম্প্রদায় ভূক্ত জাতিগোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করা হয়নি। এখানে বিশ্বের সকল জীবের প্রতি সমজ্ঞানে দয়া, যার যার ইষ্ট দেবতার নাম বা হরিনামের প্রতি রুচি রাখা এবং বিশ্বের সকল মানুষ একে অপরের প্রতি সহযোগিতা, সহমর্মিতা পোষণ পূর্বক ভালবাসা, মানুষের প্রতি নিষ্ঠা রাখা ও প্রেমের কথা বলা হয়েছে।

                          জয় হরিবোল

বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২১

ডাঃ মীডের সন্দেহ ভঞ্জন ও জাতির হাত ধরাঃ

 ডাঃ মীডের সন্দেহ ভঞ্জন ও জাতির হাত ধরাঃ


ডাঃ সি, এস, মীড ১৯০৬ সালে ওড়াকান্দী আসার পর প্রায়শই গুরুচাঁদ ঠাকুরের সাথে নানা বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করতেন । উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত বিজ্ঞানের পূজারী মীড সাহেব প্রতিদিন অবাক হতেন গুরুচাঁদ ঠাকুরের প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, ধৈর্য্য, শৌর্য দেখে ! তিনি চেষ্টা করতেন গুরুচাঁদ ঠাকুরকে বুঝবার, পরিমাপ করার । জ্ঞান-যুক্তি দিয়ে যাচাই করে নিতে চাইতেন সবকিছু । কিন্তু হায় ! যত বুঝতে চাইতেন ততই যেন তিনি ঠাকুর গুরুচাঁদের অসীম জ্ঞান ভান্ডারে নিজেকে হারিয়ে ফেলতেন । মনের ভিতর ঘুরপাক খেত হাজারো প্রশ্ন ----কে ইনি ! কিভাবে এঁনাকে ধরা যায় ! কোন্‌ গুণে এত এত ভক্ত’রা ---- ‘ইনি জগতের সেরা’ বলে গণ্য করে ! মীড সাহেবের মনের ভাব বুঝে ‘অন্তর্যামী’ গুরুচাঁদ ধীরে ধীরে জবাব দিতেন সব কথার ।


একদিন ‘রাজর্ষি’ গুরুচাঁদ মীড সাহেবকে বলছেন, ‘আচ্ছা মীড, বিজ্ঞানের বলে তোমরা অত্যাশ্চর্য তো কত কিছুই কর; শুনেছি ‘দূরবীন’ নামক এক যন্ত্রের সাহায্যে অনেক দূরের জিনিস দেখতে পাও আবার বীনা তারে অনেক অনেক দূরের মানুষের সাথে কথা বলো । মৃতদেহে জীবন দান দিতে কিন্তু তোমরা পার না ! আমরা জানি, এই ‘দেহ-ভান্ড’ সর্ব্ব শক্তির আধার । তাকে জাগাতে পারলে কিন্তু সব জানা যায় ! অতঃপর গুরুচাঁদ ঠাকুর মীড সাহেবকে নিচলপুরের ‘দুই কন্যা’র কাহিনী শোনান । মীড সাহেব বলেন, ‘এসব ধর্মের উপকথা মাত্র’; বাস্তবে কদাচিৎ এমন ঘটে না’ । মীড সাহেবের সন্দেহভাজন করতে গুরুচাঁদ ঠাকুর তখন তাঁর পিতা ‘পতিত পাবন’ দয়াল হরিচাঁদের ভক্ত যুধিষ্ঠিরকে কিভাবে বাঘের হাত থেকে উদ্ধার করেছিলেন তা ব্যক্ত করেন । তাতেও মীড সাহেব সন্দেহ যায় না । তিনি বলেন ‘আমরা ইংরেজ জাতি যা কিছু স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করি তাই বিশ্বাস করি এবং অনুমান করে কিছু বিশ্বাস করা ফাঁকির সমতুল্য বলে গণ্য করি’ ।


মীড সাহেবের মনের আঁধার ঘোচাতে, ঠাকুর গুরুচাঁদ তখন মিষ্টি হেসে বললেন-----শোন মীড, কার্তিক নামে একজন ভক্ত এক দুধের ভান্ড নিয়ে এখানে আসছে । ঠিক দু’দিন পরে এমন সময়ে সে এখানে এসে পৌঁছাবে । জাতিতে সে নমঃশূদ্র, বয়েস ৪০, গৌরাঙ্গ বরণ এবং হাতে তাঁর একখানি ছাতা রয়েছে । ইতিপূর্বে সে কখনই ওড়াকান্দী আসে নি । দু’দিন পর এখানে এসে স্বচক্ষে তাঁকে দেখে যেও । ‘দূরদর্শী’ গুরুচাঁদ তাঁর মনের ভাবধারা বুঝিয়ে দিতে কিন্তু ভোলেননি মীড সাহেবকে, তিনি বললেন-----


“আমার স্বভাব নহে সব বলা ।

বড়ই বিপদে ভরে এই পথে চলা ।।”            (শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত, পৃঃ ১৯৯)


অর্থাৎ, গুরুচাঁদ ঠাকুর এইসব কথা বলা পছন্দ করতেন না । শুধু্মাত্র মীড সাহেবের সন্দেহ ভঞ্জনের কারণেই বলেছেন । কতখানি দূরদর্শিতা ও বাস্তবোচিত ধারণার অধিকারী হলে এমন কথা বলা যায়  । তিনি চাইতেন, মানুষ আত্মশক্তি জাগরণের মধ্যে দিয়েই আত্মবলে বলীয়ান হোক । কোন ভ্রান্ত ধারণার বশীভূত হয়ে মানুষ যেন ভুল পথে চালিত না হয় ! বিস্ময়ে অভিভূত ডাঃ মীড বাড়ী ফিরে এসে সব বৃত্তান্ত জানালেন তাঁর জীবন সঙ্গিনী মিসেস্‌ মীড’কে । মিসেস্‌ মীড স্ববিস্ময়ে বলে ওঠেন, ‘যদি একথা সত্যি হয়, তবে গুরুচাঁদ ঠাকুর’কে আমার ‘ধর্মপিতা’ বলে স্বীকার করে নেব । যথাসময়ে আসে সেই কাঙ্খিত দিন । ‘দূরদর্শী গুরুচাঁদের প্রতিটি বাক্য অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয় । শেষ হয়, ডাঃ মীডের পরীক্ষা । অতঃপর মীড জানান, তাঁর মা দিব্য-দেহধারী এক পুরুষের স্বপ্নাদেশে তাঁকে বঙ্গদেশে আসার আদেশ আগেই দিয়েছিলেন । বলেছিলেন----‘এক মহান পুরুষের সাথে তোর সাক্ষাত হবে । এতদিনে আমার আশা পূর্ণ হল’ । এরপর ডাঃ মীড অঙ্গীকারবদ্ধ হন সমাজের অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষের জন্য গুরুচাঁদ ঠাকুরের নির্দেশানুযায়ী কাজ করে যাবেন । মীড সাহেব বলেন -----


 

“তোমার জাতিকে আমি ধরিলাম হাতে ।

সর্ব্ব উপকার পাবে এরা আমা’ হ’তে ।।’’ (শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত, পৃঃ ২০২)


তারপর গুরুচাঁদ ঠাকুরের সহযোগিতা ও তত্ত্বাবধানে দীর্ঘ ১৫ বৎসর যাবৎ ডাঃ সি এস মীড যে কত’শত কাজ করে গেছেন তা ভাবলে অবাক হতে হয় । যতদিন চন্দ্র সূর্য থাকবে, মতুয়াকাশে ডাঃ মীডের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে । তিনি ওড়াকান্দীর মাটিতে মতুয়াদর্শ দ্বারা এতটাই প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন যে সুদূর অস্ট্রেলিয়া ফিরে গিয়ে নিজ বাড়ীর নাম রেখেছিলেন ‘ওড়াকান্দী’ । 


 জয় গুরুচাঁদ । জয় মীড সাহেব ।

শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১

সতীদাহ পালন ও প্রথা

 🔴প্রসঙ্গঃ যেভাবে সতীদাহ পালিত হতঃ


সতীদাহ মূলত উচ্চ বর্ণের হিন্দু পরিবারগুলোতেই করা হত। হাজার হাজার বছর ধরে অগণিত ভারতীয় হিন্দু নারী জীবিত অবস্থায় চিতার লেলিহান আগুনে প্রবেশ করেছেন- কখনও স্বেচ্ছায়, কখনও বা জোর করে। স্বেচ্ছায় হলেও মানবতার বিচারে এই প্রথার পৃষ্ঠপোষকতা ভারতীয় সভ্যতার একটি অন্যতম কলঙ্ক-বিন্দু। কিন্তু কীভাবে পালিত হত এই বর্বর প্রথা? এই ব্যাপারে গোরাচাঁদ মিত্রের লেখা 'সতীদাহ' বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তারই কিছু অংশ নীচে তুলে ধরলাম-


🔸স্বামীর মৃতদেহ চিতায় শায়িত । নাপিত এসে বিধবা নারীর নখ কেটে দিয়ে গেলেন । শােক স্তব্ধা স্ত্রী হাতের শাখা ভেঙে চললেন স্নানে - শুচিশুদ্ধ হবার জন্য । স্নানের পর চিতারোহণের সাজ । আত্মীয়রা এগিয়ে এসে পরিয়ে দিলেন লাল চেলী , হাতে বেঁধে দিলেন রাঙা সুতাে দিয়ে আলতা , গােটা কপাল জুড়ে লেপে দিলেন টকটকে লাল সিঁদুর – নিপুণ করে আঁচড়ানাে চুলে থরে থরে চিরুনির বাহার । গােটা দেহে মূল্যবান অলংকারের সমারােহ । স্বামীহারা স্ত্রী দু-ফোঁটা চোখের জল ফেলতেও বিস্তৃত হয়েছেন তিনি যেন সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের হাতের পুতুল । কুশ হাতে নিয়ে পুবমুখী বসে অাচমন করলেন নারী । হাতে নিলেন তিল , জল ও কুশনির্মিত ত্ৰিপত্র । উপস্থিত ব্রাহ্মণগণ উচ্চারণ করলে – 'ওঁ তৎসৎ' । ধ্বনিত হল বিধবার নিম্ন কন্ঠে -"নমঃ , আজ অমুক মাসে , অমুক পক্ষে , অমুক তিথিতে , অমুক গােত্র ঐ অমুক দেবী বশিষ্ঠেব পত্নী অরুন্ধতীর সমমর্যাদায় স্বর্গে যাওয়ার জন্য , মানুষের শরীরে যত লোম আছে তত বছর অর্থাৎ তিনকোটি বছর স্বামীর সঙ্গে স্বর্গসুখ উপভােগের আশায় , মাতৃকুল , পিতৃকুল ও পতিকুল — তিন কুলকেই পবিত্র করার অভিপ্রায়ে , চতুর্দশ ইন্দ্রের রাজত্বকাল পর্যন্ত স্বর্গসুখ ভোগের কামনায় এবং যদি স্বামী ব্রহ্মহত্যাকারী , কৃতঘ্ন ও মিত্রদ্রোহী হন , তাহলে তাকে পবিত্র করার জন্য , আমি স্বামীর জলন্ত চিতায় অধিরোহণ করছি ' । ‘ হে অষ্টলােকপালগণ , হে সূর্য , চন্দ্র , বায়ু , হে অগ্নি , আকাশ , ভূমি , জল , হে অন্তর্যামিন আত্মাপুরুষ , হে যম , দিন , রাত্রি , সন্ধ্যা , হে ধর্ম , আপনারা সকলে সাক্ষী থাকুন , আমি প্রজ্বলিত চিতায় আরােহণ করে স্বামীর অনুগামিনী হচ্ছি ।" 


এরপর খই , খণ্ড ও কড়ি আঁচলে বেঁধে সতীনারীর চিতাপ্রদক্ষিণের পালা - বার বার সাতবার । ব্রাহ্মণ পুরােহিত কণ্ঠে প্রয়ােজনীয় মন্ত্রাদি বিবৃত হবার পর বিধবা স্ত্রী স্বামীর পাশে চিতাশয্যা গ্রহণ করলেন । আত্মীয়স্বজনেরা মহোল্লাসে গাছের ছালের দড়ি দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে চিতার সঙ্গে বাঁধলেন তাকে । পুত্র বা নিকট কোন আত্মীয় এগিয়ে এলেন চিতায় অগ্নিসংযােগের জন্য । উপস্থিত দর্শকবৃন্দের পৈশাচিক উল্লাস ও ঢাক - ঢােল , কাসরের প্রচণ্ড আর্তনাদে চতুর্দিক স্তম্ভিত । দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলাে চিতা । তাও যেন অাশ মেটে না পুণ্যার্থীদের ! ঝুপঝাপ করে শর ও পাকাটির আঁটি ফেলতে লাগলেন সবাই চিতার আগুনে । অগ্নিসংযোগের পর পাছে সতীনারীর আরও কিছুদিন পৃথিবীর আলাে - বাতাস ভােগের শখ হয় তাই চিতার পাশেই মােটা মােটা বাশ নিয়ে 'ধর্মসংস্থাপনাকারীরা' অপেক্ষমান । বিধবা স্ত্রী বাঁচবার সামান্যতম চেষ্টা করলেই বাঁশের উপর্যুপরি আঘাতে তার ভবলীলা সাঙ্গ করা হত। কোন নারী দৈবক্রমে চিতা থেকে পালিয়ে গেলে ক্ষুধার্ত নেকড়ের মত তার পিছু নিতেন অনুষ্ঠান কর্তা ও তার সাঙ্গোপাঙ্গোরা , পলায়মানা নারীকে লজ্জাকরভাবে বাহুবলে পরাস্ত করে আবার চিতায় চাপানাে হত — না হলে যে বংশের মুখে চুনকালি পড়বে ! সম্মিলিত প্রতিরােধের কাছে ফুৎকারে নিভে যেত সতীনারীর বাঁচার আশা । ধীরে ধীরে এক সময় নিভে যেত চিতার আগুন । কিন্তু তা বলে পুরােহিতের বিশ্রাম নেই । তিনি তখন শকুনির মত ঘেটে চলেছেন চিতার ছাই - ভস্ম - সতীর গায়ের বল মূল্য অলংকারগুলি বর্তমান মালিক তো তিনিই । অন্যদিকে বংশগৌরবের উজ্জ্বলতা বিচার করতে করতে ঘরে ফিরে চলেছেন মৃতের আত্মীয়স্বজন - চাদরের তলায় কর গুণে-গুণে হিসেব করছেন স্ত্রীর মৃত্যু হবার দরুণ মৃতের কতখানি স্থাবর - অস্থাবর সম্পত্তির মালিক হলেন তারা । অনেক ক্ষেত্রে দাহকার্যের পূর্বে মদ , ভাঙ , ইত্যাদি উত্তেজক দ্রব্য খাইয়ে সতীনারীর মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে ফেলা হত । কি অপরিসীম মানসিক স্থৈর্যের অধিকারিণী ছিলেন এই সতীনারীরা , ভাবলে বিস্ময় লাগে। এক অদ্ভুত অপার্থিব সুখভােগের আশায় , স্বর্গ নামক এক অজ্ঞাত মনােহারী স্থানে মিষ্টি সুখে স্বামী-সঙ্গ লাভের কামনায় তারা দলে দলে অবিচলভাবে হেঁটে গেছেন আগুনের কোলে — শিকার হয়েছেন পৃথিবীর নৃশংসতম প্রথার । কিন্তু এই প্রথার বিরুদ্ধে তর্জনী উত্তোলনের মত সাহসও কারুর ছিল না ।


তথ্যসূত্রঃ

সতীদাহ | লেখকঃ গোরাচাঁদ মিত্র | শঙ্খ প্রকাশনী

(পৃষ্ঠা ২-৩)


#sati

সংগৃহীত : Sukanta Saha Suhrid

শাস্ত্রপৃষ্ঠা

বুধবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১

ভগিনী ক্রিষ্টিন স্বামী বিবেকানন্দ

 ※※※     স্বামী বিবেকানন্দ এক স্বতন্ত্র  ভূমিতে একাকী বিরাজমান  |  তিনি এক অন্য শ্রেণীর মানুষ | এই জগতের নন তিনি  |  আমার অন্তরের  সমস্ত শ্রদ্ধা ভক্তি  তাঁর পাদপদ্মে  ঢেলে দিয়েছি  | 

    

                 ---   ভগিনী  ক্রিস্টিন 


""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""

    

    স্বামীজী প্রায়ই বলতেন ,  

 

       ""  আমি  পবিত্রতা  ভালবাসি  |  ( নারী-কল্যাণ সম্পর্কিত )  সমস্ত প্রচেষ্টাই সীতার আদর্শকে ভিত্তি করে গড়ে তোলা উচিৎ  | সীতা ---  পবিত্রতার চেয়েও পবিত্রতর  ;  বিশুদ্ধতার চেয়েও বিশুদ্ধতর |   সহিষ্ণুতা  ,  তিতিক্ষার প্রতিমূর্তি — ভারতীয় নারীর আদর্শস্বরূপ | ভারতীয় নারীদের যা হওয়া উচিত  , সীতা তারই প্রতিরূপ  |  ভারতীয়  নারীত্বের সমস্ত আদর্শ-ই  এই সীতা চরিত্রকে কেন্দ্রে  গড়ে  উঠেছে  |  এই  আর্যাবর্তের প্রতিটি নারী-পুরুষ-শিশুর আরাধ্যা দেবীরূপে হাজার হাজার বছর ধরে সীতা এখানে স্বমহিমায় বিরাজিতা  "" 


           [  সীস্টার  ক্রিস্টিনের  লেখা  থেকে  ]  


********************************************


                         করোনা  উদ্ভুত

                     বর্তমান পরিস্থিতিতে 

    সকল  শিশুদের  যথা  সম্ভব  সতর্কে  রাখুন  |


*******************************************


           বানী ও  রচনা থেকে নেওয়া 

          """""""""""""""""""""""""""""""""""""""


     শিষ্যঃ -----  ভারতবর্ষে এত সাম্প্রদায়িক ভাব

                       প্রবল কেন  ?  ভক্তি বা জ্ঞান শাস্ত্রেই

                       বা এত বিরোধ কেন  ? 


     স্বামীজীঃ ------  কি জানিস ,  গৌনভাব নিয়েই 

                            অর্থাৎ  যে  ভাবগুলো  ধরে 

                            মানুষ  ঠিক জ্ঞান  বা ঠিক ভক্তি

                            লাভ করতে অগ্রসর হয় , 

                            সেইগুলো নিয়েই যত লাঠালাঠি

                            দেখতে পাওয়া যায়  |  কিন্তু তোর কি বোধ হয়  ?  End ( উদ্দেশ্য )  বড়  ,  কি means ( উপায় গুলো ) বড়  ?  নিশ্চয়ই  উদ্দেশ্য  থেকে  উপায় কখনও বড় হতেপারে না |  কেননা ,  অধিকারিভেদে একই উদ্দেশ্য লাভ নানাবিধ উপায়ে হয় | 

                    এই যে দেখছিস ---- জপ ধ্যান পূজা

                    হোম  ইত্যাদি ধর্মের অঙ্গ ,  এগুলি

                    সবই হচ্ছে উপায়  |  আর পরাভক্তি

                    বা পরব্রহ্মস্বরূপকে দর্শনই হচ্ছে

                    মুখ্য উদ্দেশ্য | 


অতএব একটু তলিয়ে দেখলেই 

বুঝতে পারবি ------- বিবাদ হচ্ছে মুখ্য কি নিয়ে  | 


 একজন বলেছেন ----- পূবমুখো হয়ে বসে

                                   ভগবানকে ডাকলে তবে

                                   তাঁকে পাওয়া যায় ;  আর


 একজন বলছেন ------ না ,  পশ্চিমমুখো  হয়ে

                                  বসতে হবে  ,  তবেই  তাঁকে 

                                 পাওয়া  যাবে |  হয়তো


                      একজন বহুকাল পূর্বে

                 পূবমুখো হয়ে বসে ধ্যানভজন 

                   করে ঈশ্বরলাভ করেছিলেন  ;  

তাঁর  চেলারা তাই দেখে 

অমনি ঐ মত চালিয়ে দিয়ে  

বলতে  লাগল , পূবমুখো হয়ে না বসলে 

                  ঈশ্বরলাভ কখনই  হবে  না  |  


আর একদল  বলতে  লাগল ------ সে কি কথা  ? 

                                       পশ্চিমমুখো হয়ে  বসে 

                                       অমুক  ভগবান  লাভ 

                            করেছে ,  আমরা  শুনেছি  যে  ! 

                                  আমরা  তোদের  মানি  না  | 

                               এই রূপে সব দল বেঁধেছে  |  


 একজন  হয়তো  হরি নাম  

করে  পরাভক্তি  লাভ  করেছিলেন  ;  

অমনি  শাস্ত্র  তৈরি  হল ------  

                               ""  নাস্ত্যেব  গতিরন্যথা ""  | 


 কেউ  আবার  "" আল্লা "" বলে  সিদ্ধ হলেন  , 

                         তখনি  তার আর এক মত 

                        চলতে  লাগল  |  


আমাদের  এখন  দেখতে  হবে  ,  ------ এই সকল  জপ-পূজাদির  খেই  (  আরম্ভ  ) কোথায়  |  সে  "খেই "  হচ্ছে. শ্রদ্ধা  ;  সংস্কৃতভাষায়   " শ্রদ্ধা "  কথাটি  বুঝাবার  মতো শব্দ আমাদের  ভাষায়  নেই. |  উপনিষদে আছে  ,  ঐ শ্রদ্ধা  নচিকেতার  হৃদয়ে  প্রবেশ  করেছিল  |  "" একাগ্রতা "" কথাটির  দ্বারাও  " শ্রদ্ধা "  কথার  সমুদয় ভাবটুকু  প্রকাশ  করা  যায়  না  |  বোধ  হয়. ""  একাগ্রনিষ্ঠা  ""  বললে  সংস্কৃত " শ্রদ্ধা "  কথাটির অনেকটা কাছাকাছি মানে  হয়  | 

                           নিষ্ঠার  সহিত  

                         একাগ্র  মনে যে-

             কোন  তত্ত্ব  হোক না  ,  ভাবতে  

             থাকলেই দেখতে পাবি  মনের  

                            গতি  ক্রমেই  

                            একত্বের দিকে  

              চলছে  বা  সচ্চিদানন্দ-স্বরূপের

              অনুভুতির দিকে  যাচ্ছে  |  ভক্তি  

                           ও  জ্ঞান  শাস্ত্র  

                          উভয়েই  ঐরূপ 

           এক-একটি নিষ্ঠা  জীবনে  আনবার 

            জন্য  মানুষকে  বিশেষভাবে  উপদেশ 

                            করছে  | 

 যুগ  পরম্পরায়  বিকৃত  

ভাব  ধারণ  করে সেই  সব  

মহান  সত্য  ক্রমে  দেশাচারে 

পরিণত হয়েছে  |  শুধু  যে  তোদের  ভারতবর্ষে 

                            ঐরূপ  হয়েছে  তা  নয়  , 

                            পৃথিবীর  সকল  জাতিতে  

                             ও  সকল  সমাজেই. ঐরূপ  হয়েছে  |  আর  বিচার  বিহীন  সাধারণ  জীব  ঐ  গুলো  নিয়ে  সেই  অবধি  বিবাদ  করে  মরছে  ,  খেই  ( আরম্ভ )  হারিয়ে  ফেলেছে  ;  তাই  এত  লাঠালাঠি  চলছে  | 


   শিষ্যঃ ------ মহাশয় ,  তবে  এখন  উপায়  কি  ?  


স্বামীজীঃ ---- "" পূর্বের  মতো ঠিক ঠিক  শ্রদ্ধা 

                        আনতে  হবে  |  আগাছা গুলো

                         উপড়ে  ফেলতে  হবে  |  সকল 

                        মতেই  সকল  পথেই  

                       দেশ-কাল-অতীত সত্য পাওয়া 

                        যায়  বটে  ,  কিন্তু  সেগুলোর  উপর  অনেক  আবর্জনা  পড়ে  গেছে  |  সেগুলো  সাফ  করে  ঠিক  ঠিক  তত্ত্বগুলি  লোকের সামনে  তুলে  ধরতে  হবে  ;  তবেই  তোদের  ধর্মের  ও  দেশের  মঙ্গল  হবে  |  ""


   শিষ্যঃ ----- মহাশয় ,  কেমন করে  উহা  

                    করতে  হবে  ?  

 

  স্বামীজীঃ  ------ "" কেন ,  প্রথমতঃ  মহাপুরুষদের 

                             পূজা  চালাতে  হবে  |  যাঁরা 

                             সেইসব  সনাতন  তত্ত্ব  প্রত্যক্ষ

                             করে  গেছেন  ,  তাঁদের  ------- লোকের  কাছে   ideal ( আদর্শ বা ইষ্ট  ) রূপে  খাঁড়া  করতে  হবে  |  যেমন ------ ভারতবর্ষে  শ্রীরামচন্দ্র  , শ্রীকৃষ্ণ  ,  মহাবীর  ও  শ্রীরামরৃষ্ণ  | 

                   দেশে  শ্রীরামচন্দ্র ও  মহাবীরের  পূজা 

                   লাগিয়ে  দে  দিকি  |  বৃন্দাবন  

                   লীলা-ফীলা  এখন  রেখে  দে  |  

গীতা-সিংহনাদকারী  শ্রীকৃষ্ণের  পূজা  চালা  ,  শক্তিপূজা  চালা  |  ""


※※※  জয়  স্বামীজী  মহারাজজী  কী  জয় ...

             প্রণাম স্বামীজী... প্রণাম স্বামীজী ... 

                    🙏  প্রণাম স্বামীজী ...🙏

রানী ভবশঙ্করী

 From Prasun Maitra 


পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির কাছে #রানী_ভবশঙ্করী নামটা ততটা পরিচিত নয়। কিন্তু রানী ভবশঙ্করী অবিভক্ত বাংলার মুসলমান শাসকদের কাছে একটা আতঙ্ক ছিল, যাকে বাংলার সুলতানি শাসক, পাঠান শাসকরা কোনোদিন পরাজিত করতে পারেনি। এমনকি রানী ভবশঙ্করীর শাসনকালে মুঘল শাসক আকবর ভুরীশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্যের সার্বভৌমত্ব মেনে নেন।


রানী ভবশঙ্করীর জন্মসূত্রে নাম ছিল ভবশঙ্করী চৌধুরী। তাঁর জন্ম হয়েছিল ভুরীশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্যে ( ইংরেজি Bhurshut kingdom), সেই সময় ভুরীশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্য বর্তমান হাওড়া ও হুগলি জেলা জুড়ে ছিল।

তাঁর পিতার নাম দীননাথ চৌধুরী। তিনি রাজা রুদ্রনারায়ণের সাম্রাজ্যে একজন দুর্গরক্ষক ছিলেন। তাঁর পিতা দীনানাথ চৌধুরী দুর্গের রক্ষক ছিলেন, সেইসঙ্গে সেনাদের যুদ্ধ বিদ্যার প্রশিক্ষণ দিতেন।


আর তাই ছোটবেলা থেকেই ভবশঙ্করী পিতার কাছে অস্ত্র শিক্ষা পান। তিনি তাঁর পিতার কাছ থেকে ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ করা, তরোয়াল যুদ্ধ, তীর ছোঁড়া ইত্যাদির প্রশিক্ষণ নেন। সেইসঙ্গে তিনি মাঝে মাঝে পিতার সঙ্গে যুদ্ধ অভিযান এবং শিকার অভিযানে যেতেন।এছাড়াও ভবশঙ্করী ভুরিশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ পন্ডিতদের কাছ থেকে সমাজশাস্ত্র, রাজনীতি, দর্শন, কূটনীতি এবং ধর্মশাস্ত্র সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন।


এইভাবে সময় কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু এর কিছু সময় পরেই ভবশঙ্করীর মায়ের মৃত্যু হয়। তারপরেই দীনানাথ তাঁর কন্যার বিবাহ দেওয়ার জন্য উপযুক্ত পাত্রের সন্ধান করতে থাকেন। কিন্তু স্বাধীনচেতা, যোদ্ধা ভবশঙ্করী এক অদ্ভুত শর্ত দেন যে যে পুরুষ তাকে তরোয়াল যুদ্ধে হারাতে পারবেন তিনি তাকেই বিয়ে করবেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। কারণ সময়ের ফেরে ভবশঙ্করীর সঙ্গে রাজা রুদ্রনারায়ণ-এর বিবাহ সম্পন্ন হয়। এ নিয়ে আজও হাওড়া এবং হুগলী জেলার গ্রামে-গ্রামে লোকমুখে কাহিনী প্রচলিত আছে...….

একবার ভবশঙ্করী শিকার অভিযানে গিয়েছিলেন। সেখানে একদল বুনো মহিষ ভবশঙ্করীকে আক্রমণ করে। কিন্তু ভবশঙ্করীর তরোয়াল চালানোয় অসাধারণ দক্ষতা ছিল। সেই দক্ষতায় সবকটি বুনো মহিষকে তিনি হত্যা করেন এবং শিকার অভিযানে থাকা বাকিদের রক্ষা করেন। এই দৃশ্য রাজা রুদ্রনারায়ন দূর থেকে লক্ষ্য করেন এবং যুদ্ধ দক্ষতায় মুগ্ধ হন। তিনিই ভবশঙ্করীর পিতাকে বিবাহের প্রস্তাব দেন এবং খুব শীঘ্রই তাদের বিবাহ সম্পন্ন হয় গড় ভবানীপুর দুর্গের কাছে দামোদর রাজপ্রাসাদে। এরপরেই ব্রাহ্মণ কন্যা ভবশঙ্করী চৌধুরী পরিচিত হন রানী ভবশঙ্করী নামে।


বিবাহের পরেই রানী ভবশঙ্করী রাজ্য শাসন বিষয়ে রাজা রুদ্রনারায়নকে সাহায্য করতেন। একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো রানী ভবশঙ্করী দেবী চন্ডীর ভক্ত ছিলেন। সেই কারণে বিবাহের পরেই রাজপ্রাসাদের পাশেই দেবী চন্ডীর মন্দির নির্মাণ করান। তিনি রোজ নিষ্ঠাভরে মা চন্ডীর পূজা করতেন। আজও হাওড়া ও হুগলী জেলার বিভিন্ন প্রান্তে যে বেতাই চন্ডী এবং মেলাই চন্ডীর পূজা হয়ে থাকে, তা ভবশঙ্করীর শাসনকালেই হিন্দুদের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে। তিনি রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে দেবী চন্ডীর অনেকগুলি মন্দির নির্মাণ করেন।


এছাড়াও তিনি সাম্রাজ্যের সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে বিশেষ নজর দেন। রানী ভবশঙ্করী ভুরিশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে অনেকগুলো সামরিক দুর্গের নির্মাণ করেন। তিনি খানাকুল, ছাউনপুর, তমলুক, আমতা , উলুবেড়িয়া, নস্করডাঙ্গায় দুর্গ নির্মাণ করেন। সেই সঙ্গে রাজ্যের সামরিক প্রশিক্ষণের বিষয়টিও দেখভাল করতেন। তাঁর নজরদারির মধ্যেই অনেকগুলি সামরিক প্রশিক্ষণ শিবির পরিচালিত হতো। তিনিই প্রথম ভুরিশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনীতে মহিলাদের যুদ্ধ প্রশিক্ষণ দিয়ে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করেন।সেই সঙ্গে তিনি নিয়ম করেন যে ভুরিশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্যের প্রতিটি পরিবারের একজনকে যুদ্ধ প্রশিক্ষণ নিতে হবে, যাতে আপদকালীন পরিস্থিতিতে সেনার দরকার পড়লে যুদ্ধ যোগ দিতে পারে। রানী ভবশঙ্করীর প্রশাসনিক দক্ষতায় ভুরিশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্য হাওড়া ও হুগলী ছাড়িয়ে পূর্ব বর্ধমান, পূর্ব মেদিনীপুর এবং পশ্চিন মেদিনীপুরের বিস্তীর্ণ অংশে বিস্তার লাভ করে। সেই সঙ্গে তিনি নৌবাহিনীর দিকেও নজর দেন। রানী ভবশঙ্করীর তত্ত্বাবধানে ভুরিশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্যের নিজস্ব নৌবাহিনী গঠন করেন, যা যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল।


সেইসময় গৌড়ের শাসক ছিলেন পাঠান বংশীয় সুলেমান কারী। মুসলিম শাসকদের লুটেরা বাহিনী ভুরিশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে অতর্কিত হামলা করার লুঠ-পাট চালাতো। তাই এদের শায়েস্তা করতে রানী ভবশঙ্করীর পরামর্শে উড়িষ্যার রাজা মুকুন্দদেবের সঙ্গে জোট করেন রাজা রুদ্রনারায়ন । ১৫৬৫ খ্রিস্টাব্দে ত্রিবেনির যুদ্ধে ভুরিশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্য এবং মুকুন্দদেবের মিলিত সেনাবাহিনী গৌড়ের সুলতান সুলেমান কারীকে পরাজিত করেন। এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মুকুন্দদেবের সেনাপতি রাজীবলোচন রায়, যিনি কালাপাহাড় নামে বিখ্যাত। সুলেমানের মৃত্যুর পরে তাঁর পুত্র দাউদ খান গৌড়ের শাসক হন। তিনি মুঘলদের পরাজিত করার জন্যে রাজা রুদ্রনারায়নের সাহায্য চান। রুদ্রনারায়ন রাজি না হলে দাউদ খান তাঁর সেনাপতি কলটু খানকে ভুরিশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্য আক্রমণের নির্দেশ দেন । রুদ্রনারায়নের সেনাবাহিনী কলটু খানের সেনাকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে এবং হত্যা করেন। এইযুদ্ধে বিশাল সংখক পাঠান সেনার মৃত্যু হয়। এরফলে বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল মুসলিম শাসনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পায়।


এর পরেই রানী ভবশঙ্করী এক পুত্র সন্তান প্রতাপনারায়নের জন্ম দেন।প্রতাপনারায়নের বয়স যখন ৫ বছর, তখন রাজা রুদ্রনারায়নের মৃত্যু হয়। রাজা রুদ্রনারায়ণের মৃত্যুর পর রানী ভবশঙ্করী মানসিক দিক থেকে অত্যন্ত ভেঙে পড়েন। তিনি মানসিক দিক থেকে এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন যে তিনি রাজা রুদ্রনারায়ণের চিতায় নিজেকে আহুতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।


কিন্তু ভুরীশ্রেষ্ঠ রাজ্ বংশের কুল পুরোহিত রানী ভবশঙ্করীকে বাধা দেন। রাজ পুরোহিত রানী ভবশঙ্করীকে রাজ্যের শাসনভার নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার অনুরোধ জানান, যতদিন না পর্যন্ত রাজকুমার প্রতাপনারায়ণ প্রাপ্তবয়স্ক না হয়ে ওঠেন। তার পরেই রানী ভবশঙ্করী রাজ্যের শাসনভার সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু শাসনভার গ্রহণ করার পূর্বে রাজ্যের সভাসদদের কাছে তিন মাস সময় চেয়ে নেন নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করার জন্যে। এরপরে তিনি তাঁর রাজ্যের দায়িত্বভার সেনাপতি চতুর্ভুজ চক্রবর্তী এবং রাজস্ব মন্ত্রী দুর্লভ দত্তের ওপর ছেড়ে দিয়ে কাস্তাসনগড়-এর মহাদেব মন্দিরের উদ্দেশে যাত্রা করেন। তিনি পাঠান আক্রমণের সম্ভাবনা মাথায় রেখে তাঁর সঙ্গে খুবই বিশ্বস্ত এবং শক্তিশালী মহিলাদের একটি সেনাদলকে নিয়ে গিয়েছিলেন। মহাদেব মন্দিরে তিনি রোজ নিষ্ঠাভরে পূজা করতেন এবং সেইসঙ্গে গরিব-দুঃখী, ভিখারিদের অর্থ, অন্ন-বস্ত্র দান করতেন।


কিন্তু তাঁর অবর্তমানে সেনাপতি চতুর্ভুজ চক্রবর্তী রাজ্যের ক্ষমতা দখলের জন্যে সচেষ্ট হলেন। সেনাপতি চতুর্ভুজ সুলতান ওসমান খানের সঙ্গে চক্রান্ত করেন রানী ভবশঙ্করী এবং তাঁর নাবালক পুত্র প্রতাপনারায়ণকে হত্যা করার। সেইমতো চতুর্ভুজ সমস্ত তথ্য ওসমান খানের কাছে পৌঁছে দেন। ওসমান খান তাঁর সেনাবাহিনীর বাছাইকরা শক্তিশালী সেনা নিয়ে রানী ভবশঙ্করীকে হত্যার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।


ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী ওসমান খানের সেনারা হিন্দু সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে ভুরীশ্রেষ্ঠ রাজ্যে প্রবেশ করেন। এছাড়াও বহু পাঠান সৈন্য ব্যবসায়ী, পর্যটক, ফকির ইত্যাদি ছদ্মবেশে ভুরীশ্রেষ্ঠ রাজ্যে প্রবেশ করেন। কিন্তু বর্তমান হাওড়া জেলার আমতার দুর্গে থাকা সেনা ইউনিটের গোয়েন্দারা পাঠান সেনাদের চিনতে পারেন। তারাই রানী ভবশঙ্করীকে পাঠান সেনার আগমনের খবর পৌঁছে দেন।


রানী ভবশঙ্করী এই সংবাদ পাওয়া মাত্রই পাঠান সেনাদের হত্যা করার পরিকল্পনা করেন। সেই মতো তিনি আশেপাশের দুর্গগুলি থেকে দক্ষ সেনাদের ডেকে নেন এবং তাদেরকে আশেপাশের জঙ্গলে লুকিয়ে থাকতে বলেন। তিনি নিজের সঙ্গে বিস্বস্ত নারী সেনাদের রাখেন। রাতে রানী ভবশঙ্করী যুদ্ধের পোশাক পরে, অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পূজায় বসেন। পূজায় বসার সময় তিনি নিজের শরীরে একটি সাদা কাপড় জড়িয়ে নেন। গভীর রাতে ওসমান খানের সেনাবাহিনী রানী ভবশঙ্করীকে হত্যার উদ্দেশ্যে মন্দিরে আক্রমণ করেন। কিন্তু সেনারা প্রস্তুত থাকায় তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। রানী ভবশঙ্করীর নেতৃত্বে থাকা সেনারা পাঠান সেনাদের খণ্ডবিখণ্ড করেন। পিছনে থাকা পাঠান সেনাদের একটি দল এই খবর পাওয়ার পর ভোরের সময়ে কিছু দূরের গ্রামে থাকা একটি শৈব সাধুদের আখড়ায় আক্রমণ করেন। কিন্তু শৈব সাধুরা পাঠানদের তরোয়ালের জবাব তরোয়ালের দ্বারাই দেন। সেখানে শৈব সন্ন্যাসীরা বহু পাঠান সৈন্যকে হত্যা করেন। ওসমান খান রাতের অন্ধকারে পালিয়ে নিজের প্রাণ বাঁচান। পরেরদিনই রানী ভবশঙ্করী নিজের রাজধানী গড় ভবানীপুরে ফিরে আসেন। তিনি গোয়েন্দা মারফত খবর পেয়েছিলেন চতুর্ভুজ চক্রবর্তীর চক্রান্তের কথা। কিন্তু প্রমানের অভাবে তাকে কোনো শাস্তি দিতে পারেননি। কিন্তু এরপরেই রাজ্যের শাসনভার সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করেন রানী ভবশঙ্করী।


দায়িত্ব নিয়েই তিনি চতুর্ভুজ চক্রবর্তীকে সেনাপতির পদ থেকে সরিয়ে দেন এবং ভূপতি কৃষ্ণ রায়কে সেনাপতি নিযুক্ত করেন। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সেনা প্রশিক্ষণের শিবির স্থাপন করেন, যেগুলি রানী ভবশঙ্করী নিজে তদারকি করতেন। এরপরেই পাঠান সেনাদের বিরুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে লড়াইয়ের কথা, বাঘের মতো ক্ষিপ্রতায় তাঁর যুদ্ধ করার কাহিনী ভুরীশ্রেষ্ঠ রাজ্যের লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। যদি রানী ভবশঙ্করী বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ না করে ওসমান খানকে পরাজিত করতেন, তাহলে ভুরীশ্রেষ্ঠ রাজ্য ইসলামের শাসন শুরু হতো এবং হিন্দুর মঠ-মন্দির, হিন্দুর সংস্কৃতি, সুখ-শান্তি সব ধ্বংস হয়ে যেত।


এর কিছুদিন পরেই রানী ভবশঙ্করীর রাজ্যাভিষেকের দিনক্ষণ স্থির হয়। ঠিক হয় যে এক বিশেষ দিনে তান্ত্রিক মতে ছাউনাপুরের অন্তর্গত বাঁশুরি গ্রামের ভবানী মন্দিরে রানী ভবশঙ্করীর রাজ্যাভিষেক হবে। স্থির হয় যে গোলক চট্টোপাধ্যায় নামক একজন তান্ত্রিক রাজ্যাভিষেকের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন।


কিন্তু পদচ্যুত সেনাপতি চতুর্ভজ চক্রবর্তী চক্রান্ত করতে থাকেন রানী ভবশঙ্করীকে হত্যা করে ভূরিশ্রষ্ঠ রাজ্যের ক্ষমতা দখলের। এবারেও তিনি পাঠান সেনাপতি ওসমান খানের সঙ্গে হাত মেলান। এবারে চতুর্ভুজ চক্রবর্তী, ওসমান খানকে প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি তাঁর অনুগত সেনাদের নিয়ে ভুরীশ্রেষ্ঠ রাজ্যে আক্রমণ করবেন। পরিকল্পনা মতো ওসমান খান কয়েকশো সেনা নিয়ে রাতের অন্ধকারে খানাকুলে এসে পৌঁছান। খানাকুলে এসে জঙ্গলে ঘাঁটি গাড়েন। কিন্তু জঙ্গলে শিকার করতে যাওয়া এক শিকারী এদের দেখতে পেয়ে খানাকুলের দুর্গে খবর দেন। সেই খবর যখন চতুর্ভুজ চক্রবর্তীর কাছে পৌঁছায়, তিনি তা গুজব বলে উড়িয়ে দেন( ওই সময় সেনাপতি ভূপতি কৃষ্ণ রায় বিশেষ কাজে দূরে থাকায় চতুর্ভুজ চক্রবর্তী খানাকুল দুর্গের দায়িত্বে ছিলেন)।


কিন্তু রানী ভবশঙ্করীর গুপ্তচর ব্যবস্থা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, এই খবর তাঁর কাছে পৌঁছে যায়। খবর পাওয়ার সঙ্গেই তিনি ব্যবস্থা নেন। তিনি দূতের মাধ্যমে ভূপতি কৃষ্ণ রায়কে ফিরে আসতে বলেন। সেই সঙ্গে বিভিন্ন দুর্গে থাকা সেনাদেরকে ডেকে নেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, রানী ভবশঙ্করী নিজের রাজ্যকে সুরক্ষিত রাখতে সেনাবাহিনীকে রাজ্যের সীমান্ত বরাবর সেনাকে ছড়িয়ে রাখতেন। সেই জন্যে রাজধানীতে কখনো বেশি সংখক সেনা থাকতো না। তিনি রাজ্যের সীমানা বরাবর নির্দিষ্ট দূরত্বে বহু দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন এবং প্রতিটি দুর্গে একটি করে সেনা ইউনিট থাকতো। এছাড়াও প্রতিটি দুর্গে অশ্বারোহী সৈন্য, হস্তী বাহিনী এবং পদাতিক সৈন্য থাকতো। সেই কারণে রানী ভবশঙ্করী ছাউনাপুর, বাঁশডিঙ্গাগড় এবং লস্করডাঙ্গা দুর্গের সেনা ইউনিটগুলোকে নিজের কাছে ডেকে নেন এবং তাদেরকে আশেপাশের এলাকায় মোতায়েন করেন। সেই সঙ্গে রানী ভবশঙ্করী তাঁর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা হরিদেব ভট্টাচার্যের পরামর্শে আশেপাশের বাগদি(বর্গ ক্ষত্রিয়) এবং নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের বাছাই করা যোদ্ধাদের সামিল করেন, যারা তীর ছোঁড়া এবং তরোয়াল চালানোয় বিশেষ দক্ষ ছিলেন। তাছাড়া, তাদের পূর্বেই যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেওয়া ছিল, যেহেতু রানী ভবশঙ্করী রাজ্যের প্রত্যেক পরিবারের একজনের সেনা প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করেছিলেন।


পাঠান সেনাপতি ওসমান খানের নেতৃত্বে পাঠান সেনাবাহিনী এবং বিশ্বাসঘাতক চতুর্ভুজ চক্রবর্তীর সঙ্গে থাকা সেনাবাহিনী একসঙ্গে বাশুড়িতে আক্রমণ করেন। কিন্তু রানী ভবশঙ্করীর সেনাবাহিনী পূর্বেই প্রস্তুত ছিল ।ফলে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় দুই বাহিনীর মধ্যে। রানী ভবশঙ্করী নিজেই এই যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন। রানী ভবশঙ্করীর সৈন্যরা যাদেরকে তিনি নিজে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন, ক্ষিপ্রতার সাথে পাঠান সৈন্যদেরকে খণ্ডবিখণ্ড করেন। সমসাময়িক পাওয়া সূত্র অনুযায়ী, রানী ভবশঙ্করী নিজে হাতির পিঠে চেপে যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। এই যুদ্ধে বাগদি ও চন্ডাল সেনারা অসীম বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। কয়েক ঘন্টার যুদ্ধে পাঠান সেনাবাহিনী পরাজিত হয় এবং পাঠান সেনাপতি ওসমান খান পালিয়ে প্রাণে বাঁচেন। পরে তিনি ফকিরের ছদ্মবেশে উড়িষ্যা পালিয়ে যান। এই যুদ্ধের পরে রানী ভবশঙ্করীর রাজ্যাভিষেক সম্পন্ন হয়।


রানী ভবশঙ্করীর বীরত্বের কথা, পাঠান সেনাদের ধূলিসাৎ করার কথা মুঘল সম্রাট আকবরের কানে পৌঁছায়। এই খবর আকবরের কাছে পৌঁছনোর পর আকবর ভুরিশ্রেষ্ঠ রাজ্যের সঙ্গে মিত্রতা গড়ে তুলতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এর পিছনেও কারণ ছিল। সেই সময় অবিভক্ত বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা- যাকে সুবে বাংলা বলা হতো, তার সুবেদার ছিলেন মান সিংহ। কিন্তু সেই সময়ে অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন অংশে পাঠানদের অত্যাচার ছিল খুব। পাঠানরা মুঘল সাম্রাজ্যের বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যকেন্দ্রে হামলা ও লুটপাট চালাতো। এ নিয়ে খুবই চিন্তিত ছিলেন আকবর কারণ বাংলা সেসময় ছিল সোনার বাংলা। কিন্তু রানী ভবশঙ্করী অসাধারণ রণকৌশল ও বীরত্বে সেই পাঠান সৈন্যদের পরাজিত করেছিলেন। ফলে আকবর ভুরিশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্যে মান সিংহকে পাঠান। মান সিংহ ভুরিশ্রেষ্ঠ রাজ্যের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করেন। সেইসঙ্গে আকবর ভুরিশ্রেষ্ঠ রাজ্যের সার্বভৌমত্ব মেনে নেন। মুঘল সম্রাট আকবর রানী ভবশঙ্করীকে ‘রায়বাঘিনী’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এরপর অনেক বছর রানী ভবশঙ্করী রাজ্য শাসন করেন।


পরে তাঁর পুত্র প্রতাপনারায়ন প্রাপ্তবয়স্ক হলে তাঁর হাতে রাজ্যের ভার দেন এবং তিনি কাশীতে চলে যান। আজও হাওড়া জেলার উদনারায়নপুরে রানী ভবশঙ্করী প্রতিষ্ঠিত রায়বাঘিনী মন্দির রয়েছে। আজও গড় ভবানীপুর রয়েছে।


তথ্যসূত্র- ১. বীরত্বে বাঙালি; অনিল চন্দ্র ঘোষ


২. Land and Local Kingship in Eighteenth -Century Bengal ; John R. McLane


কৃতজ্ঞতা - সুমন্ত ঘোষ।

সমাজ বিপ্লব হরিগুরুচাঁদ

 শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরের দেখানো ‘প্রশস্ত গার্হস্থ্য ধর্ম’ই দেখাবে জাতিকে সঠিক উন্নতির পথ--------


শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর উনবিংশ শতাব্দীর সমাজ বিপ্লবে এক মহাপ্লাবনের নাম । গার্হস্থ্য জীবন’কে কেন্দ্র করে এবং ‘এক ও অভিন্ন’ ধর্মীও সত্ত্বার মাধ্যমে যেখানে ধর্মের ভিন্ন ভিন্ন মতের বেড়াজাল ও ভেদাভেদ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় । সংক্ষিপ্ত আলোচনার প্রারম্ভে ধর্ম ও ধর্মমত বিষয়ে আমাদের পরিস্কার ধারণার জন্য উদাহরণ স্বরূপ কিছু কথা দিয়ে শুরু করা হল ।


পৃথিবীর কোটি-কোটি প্রজাতির জীবের মধ্যে আমরা মনুষ্য প্রজাতি একটা । বুদ্ধিমত্তা ও বিবেকের প্রয়োগে আমরা শ্রেষ্ঠ ও অন্যান্য জীবের উপর প্রভুত্ব বজায় রেখে চলেছি । ১) খেয়ে-পরে সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকাই আমাদের ধর্ম । ২) স্থান-কাল ভেদে যার প্রণালীগত পার্থক্য তৈরী হয় । এখন, ১) খেয়ে-পরে সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকা যা আমাদের Basic needs----‘ধর্ম’-এর সাথে তুলনীয় । ২) স্থান-কাল ভেদে প্রণালীগত পার্থক্য-----অর্থাৎ কি খেয়ে বাঁচবে বা কি প্রকারে খাবে------যা ‘ধর্মমত’ এর সাথে তুলনীয় এবং পরিবেশ-জলবায়ু-স্থান-কাল বা শর্ত সাপেক্ষ ।


সুতরাং, ‘ধর্ম’ এক ও অভিন্ন যেখানে বাহ্যিক উপাচারকে প্রাধান্য দেওয়া হয় না । কিন্তু ধর্মমতে বাহ্যিক উপাচার থাকবেই । আমরা বেশিরভাগ মানুষ কিছু বিশেষ নিয়ম-কানুনের মধ্যে দিয়ে ধর্মের পালন করা বুঝে থাকি । যেমন মন্দির, মসজিদ, গির্জা বা মঠে যেতে হবে । সেখানকার বিধি অনুযায়ী পূজা, প্রার্থনা বা ধ্যান করতে হবে বা বিশেষ পোষাক পরিহিত হতে হবে ইত্যাদি । বাকী সময় কিভাবে জীবন অতিবাহিত করলাম সেদিকে ফিরে তাকাবার সময় আমাদের থাকে না ! বলা যায়, ভিন্ন ভিন্ন বাহ্যিক উপাচার বা সাধন ভজনের নিয়ম-কানুন ‘এক ও অভিন্ন’ ধর্মীয় সত্ত্বার ভিন্ন ভিন্ন ‘মত’ সৃষ্টির কারণ । ধর্মের পথ ধরে থাকতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন নিজেকে সৎ ও শুদ্ধ মানুষ হিসাবে গড়ে তোলা । অখন্ড ভারতবর্ষে যা সর্বপ্রথম দেখিয়েছেন শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর । তিনি বলেছেন----


গৃহধর্ম রক্ষা করি বাক্য সত্য কয় ।

বানপ্রস্থী পরমহংস তার তুল্য নয় ।।


বর্তমান যুগে যার প্রাথমিক কিছু শর্ত হ’ল শিক্ষা, সু-স্বাস্থ্য, সত্য কথা বলা, চরিত্র গঠন করা ইত্যাদি । যার মূল কেন্দ্র কোনো মন্দির, মসজিদ, গির্জা বা মঠ নয় । যে শিক্ষা কোনো বিশেষ ধর্মগুরু দেয় না । এ-শিক্ষার সূত্রপাত পবিত্র গৃহ হ’তে । যেখানে প্রাথমিক শিক্ষাগুরু হলেন আমাদের মাতা-পিতা । তাই পিতা-মাতা বা স্বামী-স্ত্রী’র সম্পর্কের উপর বিশেষ যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন । কারণ স্বামী-স্ত্রী’র মানসিকতা ও সম্পর্কের উপর সন্তানের মানসিক গঠন অনেকাংশে নির্ভর করে । তাহলে একথা বলা যায়, সর্বধর্মের মূল কেন্দ্র হ’ল আমাদের গৃহ । প্রশস্থ গার্হস্থ্য ধর্ম পালনের মধ্য দিয়ে শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর যা হাতে ধরে শিক্ষা দিয়েছেন । ‘একনারী ব্রহ্মচারী’ কথাটি সর্বপ্রথম তাঁরই কন্ঠে ধ্বনিত হয় । তিনি আরও বলেছেন----- 


পরনারী মাতৃতুল্য মিথ্যা নাহি কবে ।

পরদুঃখে দুঃখী সদা সদ্চরিত্র রবে ।।


লক্ষ লক্ষ বিপথগামী মানুষ তাঁর দেখানো পথে খুঁজে পেয়েছেন ধর্মের সঠিক পথ । যা কোনো বন-জঙ্গল, পাহাড়, মন্দির, মসজিদ বা তীর্থস্থানে গিয়ে দেখাতে হয় না । কারণ, ধর্ম দেখাবার বস্তু নয়, ধর্মের পালন করতে হয় প্রতি ক্ষণে নিজের আচার-আচরণে, নিজের কৃত-কর্মের মধ্যে দিয়ে । সত্যের পথযাত্রী ঠাকুর হরিচাঁদ তাইতো বলেছেন-----


যত যত তীর্থ আছে অবনী মাঝারে ।

সত্য বাক্য সমকক্ষ না হয়তে পারে ।।


ধর্ম এক এবং অদ্বীতিয়----যার সৃষ্টি বা ধ্বংস নাই । যা যুক্তি ও মানবতাবাদের মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করতে হয় ।  ‘ধর্মমত’-এর কাজ হ’ল ব্যক্তি’কে ‘ধর্ম’ চিনতে সাহায্য করা, যাতে সে সঠিক উন্নতির পথে চলতে পারে । যে ‘ধর্মমত’ তা করার ক্ষমতা রাখে না তেমন ধর্মমত’কে বর্জন করাই শ্রেয় ও মঙ্গলদায়ক । ‘ধর্মে’র চেয়ে ‘ধর্মমত’ কখনোই মহান হ’তে পারে না । যে ‘ধর্মমতে’র নিয়ম-রীতির বেড়াজালে হারিয়ে যায় মানুষের মনুষ্যত্ব, যার বেড়াজালের চক্রবূহ্য ভেদ করতে সারাজীবন পার হয়ে যায় ! সেখানে তো ধর্ম মৃত ! তাহলে ধর্মের পালন হবে কিভাবে ? এককথায় হবে না । কারণ ধর্ম’কে না চিনলে ধর্মের পালন করা যায় না । মানুষ যাতে সহজেই ধর্মের পালন করতে পারে শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর তাই শিখিয়েছেন সহজ সরল গৃহধর্ম । দেখিয়েছেন কিভাবে গৃহে থেকে ব্রহ্মচর্য, বানপ্রস্থ্য, সন্ন্যাস নীতি পালন করতে হয় । কিভাবে সুন্দর গৃহ তথা সমাজ গঠনের মধ্য দিয়ে ধর্মের প্রকাশ করা যায় । সর্বোপরি মানব জাতির জৈবিক জীবনের উন্নতির বিকাশ ঘটতে থাকে । তাই দয়াল হরিচাঁদের দেখানো মতাদর্শে তথাকথিত দীক্ষাপ্রথা, তীর্থ পর্যটন বা কাল্পনিক মুক্তিলাভের জন্য সাধন-ভজনের কোন স্থান নাই । তাই তিনি বলেছেন-----


অদীক্ষিত না করিবে তীর্থ পর্যটন ।

মুক্তিস্পৃহা শূন্য নাই সাধন ভজন ।।


গৃহ বা পরিবারের সমস্ত দায়-দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে আমাদের সুখ-শান্তির সকল উৎস । কারণ সন্তানের জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চরিত্র, নীতি-আদর্শ, সচেতনতা সব কিছুরই সূত্রপাত গৃহ হতেই । শিশুরা গৃহের প্রতিটি সদস্য বিশেষতঃ পিতা-মাতার প্রতি মুহূর্তের চালচলন, কথাবার্তা, ব্যবহার খুব সহজেই অনুকরণ করে যা তাঁর মস্তিষ্কে ছাপ ফেলে প্রকট বা প্রচ্ছন্নভাবে । তাঁর চরিত্র বা ব্যক্তিত্বের উপর যা অদূর ভবিষ্যতে প্রবলভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারে । শ্রীশ্রীহরিচাঁদের নীতি-আদর্শের উপর অটুট বিশ্বাস ও ভক্তি বজায় রেখে সৎ কর্মের মধ্য দিয়ে গৃহের সুস্থ পরিবেশ গড়ে তোলাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য হওয়া উচিৎ । 


গৃহ ধর্ম গৃহ কর্ম করিবে সকল ।

হাতে কাম মুখে নাম ভক্তিই প্রবল ।।


এক্ষেত্রে পিতা-মাতা বা স্বামী-স্ত্রী তাঁদের সম্পর্কের বন্ধন বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করে । ভূমিকা গ্রহণ করে আমরা পরিবারের প্রতিটি সদস্যের উপর কতখানি  যত্নশীল তার উপর । ‘পতিত পাবন’ শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর  বলতেন----‘পাপ দূরে কোথাও নাই, পাপ আছে আমাদের মনে, আমাদের গৃহে । এই পাপকে সর্বপ্রথম দূর করতে হবে; পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে গৃহের----- কারণ গৃহ কোনো পাপাচারের জায়গা নয় । গৃহ হবে আশ্রম সমতূল্য; ঈশ্বর লাভের আশায় গৃহত্যাগ করে বন-জঙ্গল, পাহাড়-পর্বত, শ্মশান বা তীর্থস্থান কোনোস্থানেই যাবার প্রয়োজন নাই ! ঈশ্বর বিরাজ করুক প্রতি মানুষের হৃদয় ও গৃহে । তিনি আরও বলেছেন-----


“গৃহেতে থাকিয়া যার ভাবোদয় হয় ।

সেই সে পরম সাধু জানিবে নিশ্চয় ।।” 


 

অর্থাৎ সৎচরিত্রের মানুষ, সত্যবাক্য ও সামর্থ অনুযায়ী যেকোনো সৎকর্মের দ্বারা গৃহ বা তাঁর পরিবারের প্রতি দায়-দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে ‘পরম সাধু’ হতে পারেন ।  এখানে চালাকীর কোনো স্থান নাই, নাই কোনো ‘বাহ্য অঙ্গ সাধুসাজ’ । ঠাকুর হরিচাঁদ চাইতেন, আত্মবলে বলীয়ান হয়ে প্রতিটি মানুষ গড়ে উঠুক গভীর আত্মপ্রত্যয়ে, সাবলম্বী হয়ে । কাজ না করে কাল্পনিক কিছু পাবার আশায় নিজের অমূল্য সময়ের অপব্যয় তিনি পাপ বলে বিবেচিত করতেন । কারণ সঠিক চেতনতাবোধ তৈরী হলে মানুষ আপনা হতেই জানবে ‘ধর্ম-মত’ এর বেড়াজালে আবদ্ধ না হয়েও ধর্মের পালন করা যায় ! তখন তাঁর কাছে ধর্মপালনের না থাকবে বিশেষ ক্ষণ, না থাকবে বিশেষ স্থান । না থাকবে উঁচু-নীচু, জাত-পাতের ভেদাভেদ । তৈরী হবে নিজের প্রতি স্বচ্ছ ধারণা । হিসাব কষতে পারবে ঠিক-ভুলের । তাই ঠাকুর হরিচাঁদ বলেছেন----- 


কিবা শূদ্র কিবা ন্যাসী কিবা যোগী হয় ।

যেই জানে আত্মতত্ত্ব সেই শ্রেষ্ঠ হয়  ।।


‘গার্হস্থ্য ধর্মে’র হাত ধরে বিশ্বের সমস্ত মানুষ সব ধর্ম-মতের খোলশ ছেড়ে একই সুরে সাম্য ও মানবতাবাদের জয়গান গাইতে পারে । তাই যদি আমরা প্রকৃত ও সার্বিক উন্নতি চাই, যদি মনে হয় ‘এ-বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য’ করে গড়ে তোলার প্রয়োজন তবে এখনই যত্নশীল হতে হবে পবিত্র চরিত্রে ‘গার্হস্থ্য ধর্ম’ পালনের । আজকের দিনে সুস্থ, সবল ও সংস্কৃতিবান সমাজ গঠনে শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের মতাদর্শের প্রয়োজন কোনো প্রশ্ন চিহ্নের অবকাশ রাখে না । অর্থাৎ একথা বলা যায়, ঠাকুর হরিচাঁদ গার্হস্থ্য ধর্মের মধ্য দিয়ে সর্ব-ধর্ম-মতের মিলন ঘটিয়েছেন । যা ঊনবিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে যুগান্তকারী এক মহাবিপ্লব । শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরের মতাদর্শে জীবন ধারণ করলে কোনো কিছুই অপূর্ণ থাকে না । যেখানে ধর্মমতের পরিবর্তন নয়----প্রয়োজন সংস্কারের মাধ্যমে নিজেকে মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা !  কারণ শ্রীশ্রীহরিচাঁদের পথ---- বিজ্ঞানের পথ, মানবতাবাদের পথ, সাম্যতার পথ । তিনি বলেছেন-----


পূর্ণ আমি সর্বময় অপূর্ণের পিতা ।

সাধনা আমার কন্যা আমি জন্মদাতা ।।


শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর ‘লীলা’ সম্পূর্ণ করেছেন তাঁর প্রিয় পুত্র শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুরের মধ্য দিয়ে । তাই মতুয়া’রা শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর ও শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুরকে আলাদা সত্ত্বা হিসাবে দেখেন না । তাই মতুয়া ভক্ত’রা  পিতা-পুত্র’কে একত্রে শ্রীশ্রীহরি-গুরুচাঁদ ঠাকুর নামে অভিহিত করে থাকেন । শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর চাইতেন, প্রতিটি মানুষ শিক্ষা পেয়ে হয়ে উঠুক সংস্কৃতিবান ও বিশেষজ্ঞ । আত্মোন্নতির সাথে সমাজের, দেশের ও জাতির উন্নতিসাধনই হোক শিক্ষার মূল কথা । কারণ মানুষের চরিত্র গঠন না হলে ব্যক্তির ‘মানুষ’ হয়ে ওঠা সম্পূর্ণ হয় না । ব্যক্তি মানুষ না হলে পরিবার তথা সমাজের কল্যাণ সম্ভব নয় । তাই তিনি পুত্র গুরুচাঁদ’কে বলেছেন-----


শোন বলি গুরুচাঁদ ধর্ম শিক্ষা পরে ।

ছেলে মেয়ে বিদ্যা শিক্ষা দিবে ঘরে ঘরে ।।


সকলের উর্ধে মানবিকতা ও মনুষ্যত্ত্ববোধ । এটা ঠিক যে জাতির উন্নতির জন্য শিক্ষা এবং অর্থের কোন বিকল্প হয় না । আবার ‘মনুষ্যত্ত্ববোধ’ না থাকলে সব’ই অর্থহীন হয়ে পড়ে । সুস্থ শরীর, সুস্থ মন ও সুকর্ম ছাড়া যেমন কেউ বড় হতে পারে না আবার সু-আদর্শ ছাড়া সমাজ জীবনের রূপরেখা তৈরী করা যায় না । কু-কর্মে হয়তো সাময়িকভাবে আনন্দ মেলে (বিকৃত), কিন্তু শান্তি আসে না । শুরু হয় বিবেকের সাথে মনের সংঘর্ষ । এর ফল হয় মারাত্মক । তৈরী হয় বিষ (আত্মত্পীড়ন) । আর এই বিষ ধীরে ধীরে শেষ করে দেয় আমাদের সুন্দর মন ও শরীর। শুরু হয় বিপথে চলা । আমরা হয়ে পড়ি দিক্-ভ্রান্ত । তারই দৃষ্টান্ত আমরা দিকে দিকে দেখছি । চোখ খুললেই দেখা যায় হাজারও বিকৃত ঘটনা । তাই ধর্মপথে নিজেকে ধরে রাখতে ইন্দ্রিয় সমূহ নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে গার্হস্থ্য জীবন যাপন করা একান্ত কর্তব্য বলে মনে করতেন শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর । সুস্থ সমাজ গঠনে যা একান্ত অপরিহার্য । তিনি বলেছেন-----


দেহের ইন্দ্রিয় বশ করেছে যে জন ।

তাঁর দরশনে সর্ব তীর্থ দরশন ।।


আমরা শিক্ষিত সাবলম্বী হয়ে যদি নিজেদের রুচীবোধ হারিয়ে ফেলি, বড়’কে সম্মান করতে না শিখি, যদি ভাষাজ্ঞান না থাকে , ইন্দ্রিয় সুখে বুঁদ হয়ে যদি নিজ কর্তব্য ভুলে যাই তাহলে কি মূল্য আছে আমাদের শিক্ষার, আমাদের অর্থের ? নৈতিকতা হারিয়ে যদি সমাজ ছুটে যায় ভয়ংকর দাবানলের দিকে, কিসের জন্য আমরা শিক্ষিত হচ্ছি, অর্থ উপার্জন করছি আর কাদের জন্যই বা আমরা অর্থ সঞ্চয় করছি ? আমরা যদি নিজেকে ভালোবেসে থাকি, নিজের সন্তান’কে ভালোবেসে থাকি, যদি মনে হয় একটা সুস্থ-সংস্কৃতি সম্পন্ন সমাজে আমার সন্তান মানুষ হয়ে গড়ে উঠুক, তাহলে এখনিই সচেতন হতে হবে আমাদের । তাই সকলের কাছে আমার অনুরোধ আসুন দেখি, মহান ‘সমাজ সংস্কারক’ হরি-গুরুচাঁদ ঠাকুর কি দিয়ে গেলেন আমাদের । তাঁরা হাতে-কলমে শিক্ষা দিয়েছেন কি করে চরিত্র গড়তে হয়, কিভাবে সন্তানকে লেখা-পড়া শেখাতে হয়, কেমন করে অর্থের উপার্জন করতে হয়, কিভাবে গৃহের সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখতে হয় । শিখিয়েছেন কিভাবে একজন সচেতন নাগরিক হিসাবে সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগবদ্ধ হতে হয় । নিজ অধিকার ও দাবী কিভাবে বুঝে নিতে হয় । অর্থাৎ মানুষের জৈবিক জীবনের প্রতিটি স্তরের উন্নতির বিধান তাঁরা হাতে-কলমে মানুষ’কে শিক্ষা দিয়ে গেছেন । যেখানে কর্ম ও কর্মফলের বাইরে আর কিছু নাই------নাই কোনো কাল্পনিকতার স্থান । কারণ পৃথিবীতে এযাবৎ যা কিছু হয়েছে তা মানুষের জ্ঞান ও কর্ম দ্বারাই হয়েছে । তাই ঠাকুর হরিচাঁদ বলেছেন-----


পুরাকালে মুনিগণ করিতেন ধ্যান ।

এবে সেই ধ্যান হয় জ্ঞানেতে বিজ্ঞান ।।


অর্থাৎ ধর্মের পালনে কল্পলোকের স্থান নাই । মানুষের উন্নতিই এখানে শেষ কথা । মানুষের উন্নতি হলেই দেশের উন্নতি হয় । দেশ কথা বলে মানুষের মুখে । মতুয়া দর্শনে মানুষই একমাত্র ইষ্ট-নিষ্ট । তাই দেখা যায় শ্রীশ্রীহরিচাঁদের আদর্শতলে তৎকালীন সময়ে নমঃশূদ্র, সাহা, ব্রাহ্মণ, মুসলীম, তেলী, মালী, কুম্ভকার, পন্ড্রক্ষত্রীয়, কুন্ডু সহ মোট ৩৬-টি বর্ণের মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন । ভক্তি ও যুক্তির পূর্ণ সমন্বয়ের এই মানবতাবাদী দর্শন যে সময়োপযোগি ও কালজয়ী তা বলার অপেক্ষা রাখে না । যেখানে নেই কোন জাত-পাত, ছোট-বড় বা তথাকথিত কোনো ধর্মমতের বেড়াজাল । সারা জীবনই এখানে এক মহা ধর্মক্ষেত্র । যা সমগ্র মানব জাতিকে পথ দেখাতে সক্ষম । মানব জাতিকে এক ও অভিন্ন সত্ত্বায় ঐক্যবদ্ধ করতে ধর্মমতের উপাচার নয়, শুদ্ধ মানুষ গড়াই হোক আমাদের লক্ষ্য । তাই মহর্ষি তারক চন্দ্র সরকার ‘শ্রীশ্রীহরিলীলামৃত’ মহাগ্রন্থে লিখেছেন -----


সর্ব ধর্ম লঙ্ঘি এবে করিলেন স্থূল ।

শুদ্ধ মানুষেতে আর্তি এই হয় মূল ।।


জয় হরিচাঁদ ।


লেখক - বরুন  ভক্ত