শনিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

মুসলিম লীগ

 ডিয়ার শতরূপ ঘোষ,


দুদিন আগে আপনি একটি টিভি ডিবেটে 'ইতিহাসচর্চা' র নামে একটি উক্তি করেছিলেন। যা খানিকটা এই রকম, 1946 এ মুsলিম লীগের প্রধানমন্ত্রী সুরাবর্দীর মন্ত্রিসভায় মিনিষ্টার ছিলেন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তাই, শ্যামাপ্রসাদের হাতে গড়া বর্তমান জাতীয়তাবাদী দলটির সুরাবর্দীকে নিয়ে কিছু বলা সমীচীন নয়। জনগন কিছুটা বিভ্রান্ত হয়েছে। তবে, এসব ক্ষেত্রে গোল্ডেন রুল হলো, কেউ কিছু বললে সেটা ক্রসচেক করে দেখতে হয়। বিশেষত, বামপন্থীরা কিছু বললে বিশ্বাস করা যাবে কিনা ভাবতে হবে। এই যেমন, সূর্য মিশ্র বলছেন আব্বাস সাম্প্রদায়িক নন। তিনি দলিত-আদিবাসী সহ বহুজনের কথা বলেন। আমরাও 'বিশ্বাস' করছি। যাক, সেটা অন্য প্রসঙ্গ। আপনার পার্টি বছর দশেক ক্ষমতায় না থেকে এতটাই ব্যাকুল হয়ে পড়েছে যে, দুধে জল মেশানো এখন অতীত। পাঁচতলা মল, পুরোটাই জলে কর্নফ্লাওয়ার গোলা।


Vote for left আইটিসেল থেকে ইতিহাস পড়লে যা জানা যায় না, সেই সুবাদে আপনিও জানেন না, তা হলো মুSলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অবিভক্ত বঙ্গে 1946 সালের বঙ্গীয় প্রাদেশিক নির্বাচনে মু.সলিম লীগ একাই মুsলিম সংরক্ষিত 121 টি আসনের 114 টিতে জয়লাভ করে সরকার গঠন করেছিলো। তারা মুsলিম ভোটের 86% পায়। ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি পায় 4 টি আসন। মুsলিমরা বরাবর রাজনীতি সচেতন, তারা কওমী যোদ্ধা। 24 লক্ষ মুsলিম ভোটের মধ্যে মুsলিম লীগ পেয়েছিল 20,36,049 ভোট, ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি 1,31,191 ভোট, মুsলিম ইন্ডিপেন্ডেন্ট 1,86,255, জমিয়ত উলেমা হিন্দ 27,756 ভোট। NO CAA ক্যাম্পেন করার আগে মনে রাখবেন শতরূপ বাবু, সেদিন আপনাদের নিপীড়িত ভাইরা মাত্র 3244 ভোট দিয়েছিলো কমিউনিস্ট পার্টিকে। স্রেফ, এই পরিসংখ্যানেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মুsলিম দেশ ভাগ চায় নি, এই মিথ চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যায়। জাতীয়তাবাদী মুsলিম প্রার্থী দাঁড় করিয়েও কংগ্রেস মাত্র 11769 টি মুsলিম ভোট পায়। 


অন্যদিকে, কংগ্রেস হিন্দু বহুল 86 টি আসনে জয় লাভ করে। হিন্দুরা সেকুলার বোদ্ধা। তারা কংগ্রেসকে বেছে নেয়। কংগ্রেস নির্বাচনের পূর্বে বলেছিলো, তারা দেশভাগের বিরোধী। হিন্দুরা বিশ্বাস করেছিলো। তবে, এখানেও 'অশ্বত্থামা হত' র পরে একটা 'ইতি গজ' ছিলো। নির্বাচনের পর জানা গেলো, কংগ্রেস দেশভাগের বিরোধী। কিন্তু দেশের কোন অংশ বিচ্ছিন্ন হতে চাইলে তারা জোর করে সেই অংশকে ধরে রাখবে না। এই নির্বাচনে হিন্দু মহাসভার পক্ষ থেকে একমাত্র জয়ী হন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী। কমিউনিস্ট পার্টি তিনটি আসন পায়। শিডিউল কাস্ট ফেডারেশন একটি আসন পায়।


মু.সলিম লীগ সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়ার পর মন্ত্রিসভা গঠনের জন্য এক সিট বিশিষ্ট হিন্দু মহাসভার সমর্থনের প্রয়োজন হবেই বা কেন? শতরূপ কেন স্বয়ং শিবশম্ভুও এর উত্তর জানেন না। সম্প্রতি মহারাষ্ট্রে শিবসেনা-এনসিপি-কং সরকার গঠনের সময় বামেরা সবেধন নীলমণি বিধায়কটিকে নিয়ে কিং মেকার হতে উদ্যত ছিলেন। ফ্যাসিস্ট বিরোধী নৈবেদ্যর উপর চূড়া সন্দেশ হওয়ার লোভে তারা বেমালুম ভুলে গেছিলেন, অযোধ্যায় বিতর্কিত স্থাপত্য ভাঙায় বাল ঠাকরের শিবসেনার কি ভূমিকা ছিলো। এমনও নয় যে, শিবসেনা ওই কাজের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে। নিজেরা যেন তেন প্রকারেন ক্ষমতার স্বাদ পেতে আগ্রহী হওয়ায়, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির মূল্যায়নও তেমন ভাবেই করেন শতরূপ এন্ড কোং। বামেরা গোটা ৭০ এর দশককে কম্বল চাপা দিয়ে বুর্জোয়া কংগ্রেসের সাথে পুলকচিত্তে জোট করেছেন। কিন্তু শ্যামাপ্রসাদ 46 কেন, কোনদিনই লীগ মন্ত্রিসভায় যোগদান করেন নি। অতএব, সিপিয়েম 2021 এ দুশো পাবে এবং শ্যামাপ্রসাদ সুরাবর্দীর মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী ছিলেন, দুটোই একই রকম সত্য। 


ইতিহাস বলে, 16 ই আগস্টের ক্যালকাটা কিলিং এর সময় এবং তার পরে বিধানসভায় বামেদের কি ভূমিকা ছিলো, সেসব বিশ্লেষণ করলে শতরূপ বাবু, আপনি বেশ অপ্রস্তুতে পড়বেন। ইতিহাসের কথা আপনারা যত কম বলবেন, ততই মঙ্গল। 13 ই আগষ্ট, 1946 বিধানসভায় এক প্রেস রিলিজে জ্যোতি বসু জানান, সি.পি.আই যেখানে প্রয়ােজন সেখানে লীগের ডাকা বনধ (16ই আগস্টের) সমর্থন করবে এবং যেখানে প্রয়ােজন নেই,সেখানে সমর্থন করবে না। অর্থাৎ, মুsলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে সমর্থন। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে বিরোধীতা। শতরূপ বাবু, একদিকে আপনি বলছেন লীগের মন্ত্রী নাকি শ্যামাপ্রসাদ! অন্যদিকে, লীগের ডাকা বনধ হিন্দু মহাসভা সমর্থন করছে না, সমর্থন করছে জ্যোতি বোসের সি পি আই! আপনিই বলুন এটা যদি বিড়াল হয়, তবে মাংসটা কৈ? এটা যদি মাংস হয়, তবে বিড়ালটা কৈ?


16ই আগস্ট, 1946 এর গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং এর পর সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে বঙ্গীয় বিধানসভার অধিবেশনে শ্যামাপ্রসাদ ও প্রধানমন্ত্রী শহীদ হোসেন সুরাবর্দীর মধ্যে প্রবল বাদানুবাদ হয়। এক পর্যায়ে,সুরাবর্দী শ্যামাপ্রসাদকে বলেন, 'You are a goonda', শ্যামাপ্রসাদ পাল্টা সুরাবর্দীর উদ্দ্যেশ্যে বলেন, "if he says that I am a goonda then I too can say thar he is the best goonda that is available not only in this province but throughout the world".


এই ব্যাপারটা জানেন শতরূপ বাবু? বোধহয়, জানেন না। আলিমুদ্দিনে কিছু না পড়িয়েই পুকুরের তেলাপিয়াকে সমুদ্রে ছেড়ে দিয়েছে। 


‘কসাই’ সুরাবর্দীর লীগ মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে আনীত অনাস্থা প্রস্তাবের পক্ষে ভােট দিতেও কমিউনিস্ট পার্টির তিন সদস্য জ্যোতি বােস, রুপনারায়ন রায়, রতনলাল ব্রহ্মের সাহস হয় নি। 


বঙ্গীয় বিধানসভার পূর্বোক্ত অধিবেশনে হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতা শ্যামাপ্রসাদ যখন মুsলিম লীগকে ১৬ই আগস্টের জন্য দায়ী করে তীব্র বিষােদগার করছেন, তাকে সমর্থন জানাচ্ছেন কামিনী কুমার দত্তের মত কংগ্রেস সদস্যরা। তখনও সি.পি.আই মুsলিম লীগকে সঙ্গ দিয়েছিলা। কংগ্রেস সেই সময় দুটো অনাস্থা প্রস্তাব আনে, প্রথমটির সুরাবর্দির বিরুদ্ধে আর দ্বিতীয়টি সমগ্র লীগ মন্ত্রীসভার বিরুদ্ধে, শ্যামাপ্রসাদ দুই ক্ষেত্রেই সমর্থন দিয়েছিলেন। সিপিআই প্রথম অনাস্থায় ভােট দেয় নি আর দ্বিতীয়টিতে লীগ মন্ত্রীসভার পক্ষে ভােট দিয়েছিল। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব আনা উচিত, বলেছিলেন, সিপিআইয়ের রূপনারায়ন রায়।


অধিবেশনের পূর্বে সিপিআইয়ের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পি সি যােশী ২৭শে আগস্ট, ১৯৪৬ সালে বাঙ্গালার কমরেডদের দের উদ্দেশ্যে যে চিঠি দিয়েছিলেন তার অংশ বিশেষ --- " We can vote against the Musl!m League Ministry PROVIDED IT DOES NOT EFFECT OUR MUSL!M WORKING CLASS BASE and we can carry it with ourselves through our intensive explanatory campaign. If we cannot keep up even our hold on existing organised working class, everything is lost, even for the future. Thus the best way possible to keep all in good humour was to stay neutral. Voting against the Musl!m League will have other serious implications ..." অর্থাৎ, মুsলিম ওয়ার্কিং ক্লাসকে চটানাে যাবে না। তাই পার্টি লিগের বিরুদ্ধে ভোট দান থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিচ্ছে! 


গত বছর শ্যামাপ্রসাদ এর জন্মদিনে অপরিমিত কুৎসার ঠিক দুদিন পর জ্যোতি বসুর জন্মদিনে তাদের প্রিয় নেতার সামান্য সমালোচনা দেখে, হিন্দুত্ববাদীদের 'দেখে নেওয়া'র হুমকি দেওয়া শতরূপ বাবু, জ্যোতি বসুদের লীগ ভজনার কারণ জানেন? জানলেও এড়িয়ে যান। 1946 এর প্রাদেশিক নির্বাচনে রেলওয়ে ওয়ার্কারদের সংরক্ষিত আসনে কমরেড জ্যোতি বসু জয়লাভ করেন। কাদের সমর্থনে বসু বাবু বিধানসভায় প্রবেশ করেন? ধর্মনিরপেক্ষ মেহনতি জনতা? আজ্ঞে না। আজকের মতই সেদিনও হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা সর্বদা ঘৃণিত হলেও, বিপরীত পক্ষের সাম্প্রদায়িকতা ততদূর অস্পৃশ্য ছিলো না। মুsলিম লীগের লেফটিস্ট উইং জ্যোতি বসুর সমর্থনে ছিলো। কমরেড সুজন চক্রবর্তী যে আবুল হাশিমের নামে ছলছলো হয়ে পড়েন, তিনিও এমনিই এক লেফটিস্ট মুsলিম লিগী ছিলেন। এবং 46 শে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুsলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক। আবুল হাশিম এবং কমরেড নিখিল চক্রবর্তী একত্রে মু.সলিম লীগের নির্বাচনী ইস্তেহার লেখেন। যার নাম, LET US GO TO THE WAR। বর্তমানে কমিউনিস্টদের আব্বাস পিরিতির উৎস এইখানে। গতি যার নীচসহ, নীচ সে দুৰ্মতি.........


আজকের মত এটুকুই থাক। শতরূপবাবু যখন বিতর্ক উস্কেই দিলেন, তখন আলোচনা বঙ্গ রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট 1937 সালে গিয়েই থামবে। একদিনে বেশি হজম করতে পারবেন না। স্বল্পবুদ্ধি শিক্ষার্থীকে ধীরেসুস্থে শেখানোই বিধেয়।।


তথ্যসূত্রঃ-


১. The sickle and the crescent: communist, muslim league and india's Partition, Soumya basu


২. The great calcutta killings and noakhali genocide, Dinesh chandra Sinha and asoka Dasgupta


৩. Minor Political Parties And The Politics Of Late Colonial Bengal 1920-1947,Kaushiki Dasgupta


৪. Leaves from a diary, Dr. Shyamaprasad Mukherjee


৫. The Indian Annual Register 1946 Jan-june Vol-i, Nripendra Nath Misra


৬. Brother against British Raj, Lionard A Gordon


৭. The foreshadowing of bangladesh , Harun or Rashid

 (আমাগো একখান দেশ আছিলো থেকে মহুয়ামৈত্রায়ন)