বৃহস্পতিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০২০

মূলবিনাশী ষড়যন্ত্র

 মূলবিনাশী ষড়যন্ত্র

১   
আরব সম্রাজ্যবাদীদের আক্রমণে আমরা পর্যুদস্ত ও পরাধীন হয়েছি। সেকালের সেই আক্রমণ প্রতিহত করতে না পারার কারণ আমাদের অনৈক্য আর সেদিনের সেই অনৈক্যের কারণ ছিল তথাকথিত উচ্চবর্ণের লোকেরা। সম্রাজ্যবাদী নিষ্পেষণে আমরা হারিয়েছি আমাদের ভূমি, স্বজন ও সংস্কৃতি। খণ্ডিত এই অবশিষ্ট ভারত যাকে আমরা স্বাধীন ভারত বলি তাও কিন্তু সম্পূর্ণ স্বাধীন নয়। কারণ কিছু অধিকার এখানে ফিরে পেলেও আমরা আরব সম্রাজ্যবাদের কবল থেকে মুক্ত হতে পারিনি। অবশিষ্ট ভারতকেও পুনর্দখল করতে তারা অত্যন্ত সক্রিয় এবং আমাদের স্বাধীনতা আজ হুমকির সম্মুখীন। অতীতের মত আজও আমাদের অনৈক্যের থেকে তারা সুযোগ নিচ্ছে। তবে এবারে আমাদের ঐক্যের পথে প্রধান অন্তরায় অনগ্রসর সমাজের একটা বিপথগামী অংশ। বামৈস্লামিক অক্ষশক্তি অবশিষ্ট ভারতকেও পুনর্দখল করতে এদের মগজ ধোলাই করে আত্মহননে প্ররোচিত করেছে। কালের আবর্তে এবং বিশ্বায়নের প্রভাবে ভারতীয় সমাজের যে অনৈক্য ও বিভেদ ক্ষয়িষ্ণু ও ম্রিয়মাণ হয়ে গেছে সেটাকে পুনরায় প্রকট করে তুলতে এরা অত্যন্ত সক্রিয়। লুপ্ত হয়ে যাওয়া অস্পৃশ্যতাকে নতুন আঙ্গিকে এরা ফিরিয়ে আনতে চাইছে, যাকে বলা যেতে পারে  প্রতীপ অস্পৃশ্যতা। এই অসদুদ্দেশ্যে তারা ব্রিটিশ সম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা উদ্ভাবিত ষড়যন্ত্রমূলক আর্য আক্রমণ তত্ত্বকে ব্যবহার করছে। প্রচার করছে যে ব্রাহ্মণাদি উচ্চবর্ণের লোকেরা হল বহিরাগত আর্য আর মূষলমান খৃস্টান সহ নিম্নবর্ণের লোকেরা হল ভারতের মূলনিবাসী ! এই মূলনিবাসী ঐক্য (যার আর এক নাম দলিত মুসলিম ঐক্য) গড়ে হিন্দুদের বিতাড়িত করে ভারতের ক্ষমতা দখল করতে হবে। যুক্তি, তথ্য, ইতিহাস, নৃতত্ত্ব সব কিছুকে এরা বর্বরতার সাথে ধর্ষণ করছে। সে দীর্ঘ বর্বরতাকে খণ্ডন করতে যথেষ্ট সময় এবং পরিসর প্রয়োজন। এখানে মাত্র একটি দিকে আলোকপাত করব। তথাকথিত মূলনিবাসী তথা দলিত মুসলিম ঐক্যের ধ্বজাধারীরা তাদের ভ্রান্ত তত্ত্ব বাজারে চালাতে ব্যাপক ভাবে বাবাসাহেব আম্বেদকরের নাম এবং প্রতিকৃতি ব্যবহার করে এবং নিজেদের বাবাসাহেবের অনুগামী বলে জাহির করে। কিন্তু বাস্তবে তাদের অবস্থান এবং বিচরণ বাবাসাহেবের শিক্ষা সিদ্ধান্ত এবং প্রদর্শিত পথের সম্পূর্ণ বিপরীতে। এই মূলনিবাসী তত্ত্ব প্রকৃতপক্ষে মূলবিনাশী এক ষড়যন্ত্র। আসুন দেখা যাক এই প্রসঙ্গে বাবাসাহেবের দৃষ্টিভঙ্গি ও সিদ্ধান্ত কি ? তিনি সম্পূর্ণ নিজের উদ্যোগে গবেষণা করে পাশ্চাত্য মতবাদ খণ্ডন করে আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করেছিলেন। তাঁর মত অনুসারে -
(১) শুদ্ররা আর্যদের একটি শাখা এবং তারা সূর্যবংশজাত।
(২) ভারতীয় আর্যসমাজে শুদ্ররা ক্ষত্রিয় বর্ণভুক্ত।
(৩) প্রথমে আর্যরা তিনটি বর্ণে বিভক্ত ছিলেন – ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য। পৃথক কোন শুদ্র বর্ণ ছিল না, শুদ্ররা ক্ষত্রিয়দেরই একটি অংশ ছিলেন।
(৪) শুদ্র রাজা ও ব্রাহ্মণদের মধ্যে ধারাবাহিক বিবাদ চলেছে। এর ফলে ব্রাহ্মনেরা অনেক অত্যাচার ও অপমানের শিকার হয়েছেন। এই অপমান অত্যাচারের জন্য ব্রাহ্মনেরা শূদ্রদের উপনয়ন সংস্কার থেকে বঞ্চিত করেন। এর ফলে শুদ্রদের স্থান হয়েছে চতুর্থ বর্ণে।
  (এই ১ম থেকে ৪র্থ সিদ্ধান্তগুলির জন্য দেখুন তাঁর রচনাবলীর ৭ম খণ্ডের ২০৪ পৃষ্ঠা।)
(৫) ‘আর্য’ জাতিতত্ত্ব কেবল মাত্র একটি অনুমান, এর বেশী কিছু নয়। ডঃ ব প নামে একজন পণ্ডিত ১৮৩৫ খৃঃ ভাষাতত্ত্বের উপর ‘Comparative Grammar’ নামে একটি বই লেখেন। এই ভাষাতত্ত্বের উপর ভিত্তি করে আর্য জাতিতত্ত্বের উদ্ভব হয়েছে। এটি একটি উদ্ভাবনী আবিস্কার (an invention)
(৬) এই তত্ত্বের উদ্ভাবকেরা এতই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে তাদের তত্ত্বের পিছনে যে সব অবাস্তবতা আছে তা খতিয়ে দেখার মত ধৈর্য্য তাদের ছিল না। এই তত্ত্ব এতই অবাস্তব যে অনেক আগেই এর মৃত্যু হওয়া উচিৎ ছিল।
  (এই ৫ম ও ৬ষ্ঠ সিদ্ধান্তের জন্য দেখুন ৭ম খণ্ডের ৭৮-৮০ পৃষ্ঠা।)   
(৭) একথা বিশ্বাস করা ভুল হবে যে শুদ্ররা আর্য আক্রমণকারীদের দ্বারা বিজিত হয়েছিল। প্রথমত, যে গল্পটিতে বলা হয়েছে যে আর্যরা বাইরে থেকে এসে মূল ভারতবাসীদের পরাজিত করেছেন, সে গল্পটি সমর্থন করার কোন ভিত্তি নেই। বরং আর্যরা যে ভারতীয় তার পক্ষে অনেক অনেক প্রমাণ আছে। দ্বিতীয়ত, আর্য এবং দস্যুদের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ হয়েছিল এমন কোন প্রমাণ নেই। তৃতীয়ত, এ কথা বিশ্বাস করা কঠিন যে কথিত আর্যরা সামরিক সম্ভার সহ কোন শক্তিশালী জনগোষ্ঠী ছিল।
   (দেখুন ৩য় খণ্ডের ৪২০ পৃষ্ঠা)
(৮) সুর এবং অসুর একই পিতা কশ্যপের সন্তান। - (৩য় খণ্ড, পৃঃ – ৪১৯)
(৯) ব্রাহ্মণরা আর্য হলে অস্পৃশ্যরাও আর্য, ব্রাহ্মণরা দ্রাবিড় হলে অস্পৃশ্যরাও দ্রাবিড়, ব্রাহ্মণরা নাগা হলে অস্পৃশ্যরাও নাগা – (৭ম খণ্ড, পৃঃ – ৩০৩)।
(১০) আর্যরা কোন বিশেষ জাতির লোক ছিল না। তারা ‘আর্য সংস্কৃতি’ দ্বারা আবদ্ধ একটি জনগোষ্ঠী ছিল। যাঁরাই এই সংস্কৃতি গ্রহণ করতেন তাঁরাই আর্য বলে পরিচিত হতেন। (৩য় খণ্ড, পৃঃ – ৪১৯)।
(১১) ঋগ্বেদ(১/১০৮/৮) এবং অথর্ব বেদ(৩/২৪/২) থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে দেখিয়েছেন যে ভারতের ৫টি উপজাতি(Yadus, Turvasas, Druhyus, Anus & Purus) একত্রিত হওয়ার ফলে আর্য জনগোষ্ঠীর উদ্ভব হয়েছে। - (৭ম খণ্ড, পৃঃ – ৩১)।

   আধুনিক কালে আবিষ্কৃত প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যপ্রমান তাঁর সিদ্ধান্তকে অভ্রান্ত প্রমাণ করেছে। দুষ্ট চক্র বাবাসাহেবের নাম নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে চাইছে। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে অনুরোধ জানাচ্ছি ‘আর্য আক্রমণ’ এবং ‘মুলনিবাসী’ নামক শয়তানী তত্ত্বের বিষয়ে পরবর্তী পর্যায়ে আরও কিছু তুলে ধরব ( চলবে )


  এই প্রসঙ্গে প্রথম পর্যায়ের আলোচনা কেবলমাত্র বাবাসাহেবের মূল্যায়নের উপরেই কেন্দ্রীভূত ছিল। এবারে আমরা অন্যান্য দৃষ্টিকোণ থেকেও পর্যালোচনা করব। সুদীর্ঘ কালের আরব ঔপনিবেশিক বর্বরতায় আমাদের দেশে বিদ্যাচর্চা প্রায় স্তব্ধ হয়ে যায়। বিস্মৃতির সাথে সাথে আসে প্রচুর বিচ্যুতিও। এমতাবস্থায় আমরা অন্য আর এক ঔপনিবেশিক শক্তি ব্রিটিশদের পদানত হই। ব্রিটিশ শাসকেরা ভারতে তাদের উপনিবেশকে স্থায়ী ও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে  সুদুর প্রসারী পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নিয়েছিল। লর্ড টমাস ব্যারিংটন মেকলেকে এডুকেশন বোর্ডের চেয়ারম্যান করে তাঁর উপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ব্রিটিশদের স্বার্থবাহী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের। অদ্যাবধি আমাদের দেশে সেই মেকেলাইট শিক্ষা ব্যবস্থাই চালু আছে। অন্তত ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকের কোন পরিবর্তন হয়নি। ভারতীয় অস্মিতা বিনষ্ট করে ভারতীয়দের খৃষ্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত করা ছিল তাঁর অসদুদ্দেশ্যগুলির মধ্যে একটি। তিনি নিজেই বলেছেন – “আমার পরিকল্পনা মত যদি ঠিক ঠিক ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা চলে তাহলে তিরিশ বছর পরে শিক্ষিত ভারতীয়দের মধ্যে মূর্তি পূজারী আর থাকবে না (মেকলে, দি শেপিং অফ দি হিস্টোরিয়ান – জন ক্লাইভ, পৃ – ৪১২-৪১৩)। সেজন্য প্রয়োজন ছিল ভারতীয় শাস্ত্র সমূহের এমন ব্যাখ্যা করা যাতে সে সব ত্যাগ করে ভারতীয়রা নিউ টেস্টামেন্টের প্রতি আগ্রহী হয় ; চেহারায় ভারতীয় হলেও মানসিকতায় ইংরেজের দাস হয়। এজন্য প্রথমে তিনি হোরেস হেমান উইলসনকে ধরেন। উইলসন নিজে রাজি না হয়ে ফ্রেডেরিক ম্যাক্সমুলারকে এগিয়ে দেন। ১৮৫৪-র ডিসেম্বরে ১ লক্ষ টাকার বিনিময়ে মুলার চুক্তিবদ্ধ হন বৈদিক শাস্ত্র সমূহের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা এমনভাবে করার যাতে ও সবে হিন্দুদের বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়। নিজে জার্মান (ইংরেজ বিরোধী) হলেও বিপুল অর্থ প্রাপ্তি ও খৃষ্টধর্মের স্বার্থে তিনি এই কাজের দায়িত্ব নেন। এজন্য তাঁকে বৈদিক শাস্ত্রসমূহ অধ্যয়ন করতে হয় এবং সেখানে তিনি আর্য সংস্কৃতি ও আর্য জনগোষ্ঠীর ধারণা লাভ করেন। তিনি লেখেন –Sacred Books of the East এবং পরিকল্পিত প্রচারে হয়ে গেলেন বিশ্ববিখ্যাত ভারততত্ত্ববিদ যদিও মানচিত্রে ছাড়া ভারতবর্ষকে দেখেননি কোনও দিন। ভারতবর্ষের ইতিহাস ম্যাক্সমুলার তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে রচিত হল। ব্রিটিশ শাসনকে স্বাভাবিক ও বৈধ প্রতিপন্ন করার জন্য আর্য সভ্যতা ও সংস্কৃতিকেও বহিরাগত বলে প্রচার করা হয়েছিল। মুলার সাহেব একটি চিঠিতে তাঁর স্ত্রীকে লিখেছিলেন – “আমার এই গ্রন্থ (দি স্যাক্রেড বুকস অফ দি ইষ্ট) ভারতের লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলবে। -- গত তিন হাজার বছর ধরে তারা যা বিশ্বাস করে এসেছে তার মূলোৎপাটন করার এটাই একমাত্র উপায় বলে আমি মনে করি”(Life and letters of F. Max Muller, Edited by Georgina Muller, Page -328)। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান হলে প্রতিশ্রুতি মতো টাকা পেতে মুলার সাহেবের কিছু সমস্যা হয়েছিল। সেজন্য তিনি সেক্রেটারি অফ স্টেট ফর ইন্ডিয়া – ডিউক অফ আরগিলকে লেখা চিঠিতে লিখেছিলেন – “ভারতের প্রাচীন ধর্মের সর্বনাশ করা হয়ে গেছে, এর পর যদি খৃষ্টধর্ম সে স্থানের দখল না নিতে পারে, সেটা কার দোষ ?”(পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃ- ৩৫৭-৩৫৮)। এই দুটো চিঠি মুলার সাহেবের দুরভিসন্ধির প্রমাণ।
   মুলার সাহেবের তত্ত্ব অনুযায়ী আনুমানিক ১৫০০ খৃষ্টপূর্বাব্দে ভারতের বাইরে থেকে কিছু যাযাবর শ্রেণীর লোক ভারতে প্রবেশ করে। তারা ছিল আর্য জাতি এবং সম্ভবত মধ্য এশিয়া থেকে তারা এসেছিল। বেদ তাদেরই রচনা এবং তা আনুমানিক ১২০০ খৃষ্টপূর্বাব্দে। এই তত্ত্বের সমর্থনে কস্মিন কালেও কোন তথ্যপ্রমাণ ছিল না। তথ্যের ভিত্তিতে তত্ত্ব নির্মাণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নয়, তত্ত্বের অনুকুলে তথ্যকে খাপ খাওয়ানোর অবৈজ্ঞানিক ও অযৌক্তিক পদ্ধতি অবলম্বন করে যে সব অবাস্তব কল্পকাহিনী ও উদ্ভট যুক্তির অবতারণা হয়েছিল তা পরবর্তীকালে আবিষ্কৃত প্রত্নতত্ত্ব, ভূগোল, গণিত, ধাতুশাস্ত্র, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও পরিবেশ বিজ্ঞানের আলোকে ভ্রান্ত প্রতিপন্ন হয়েছে। তবুও আমাদের ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হয়নি। ‘অনেক ঐতিহাসিকের মতে ভারতই আর্যদের আদি বাসভূমি’ কেবলমাত্র এই একটি বাক্যই সংযুক্ত করা হয়েছে। বহিরাগত আর্যরা ভারতে এসে বিশাল সাহিত্য রচনা করল – বেদ, ব্রাহ্মণ, সুত্র, পুরাণ, মহাকাব্য ইত্যাদি যার সম্পূর্ণ আমাদের কাছে না পৌঁছালেও যতটুকু পাওয়া গেছে তার ভিত্তিতেই বলা যায় – বিশ্বের বিশালতম সাহিত্য কীর্তি। কিন্তু তাঁদের কোন ইতিহাস আমরা জানতে পারলাম না, পেলাম না কোন প্রত্নতাত্তিক নিদর্শন। ঐ বিশালতম সাহিত্য সম্ভারের কোথাও তাঁদের ফেলে আসা স্থানের ভূগোল বা সভ্যতা-সংস্কৃতির কোন স্মৃতিচারণা পাওয়া গেল না। ঋগ্বেদ সহ প্রাচীনতম গ্রন্থাদিতে যে সব ভৌগোলিক বিবরণ আছে তা সবই ভারতভূমির অন্তর্গত।
  আর্য আক্রমণ তত্ত্ব উদ্ভাবনের সময় ভাষাতত্ত্ব সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত ছিল। এর ভিত্তিতে যে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল তা ছিল অত্যন্ত দুর্বল যাকে বাবাসাহেব অবাস্তব বলেছিলেন তা আজকের সমৃদ্ধ ভাষাতাত্ত্বিক জ্ঞানের আলোকে দাঁড়াতেই পারে না। নিরপেক্ষ বিচারে বর্তমান কালের অধিকাংশ ভাষাতাত্ত্বিক একথা স্বীকার করেন যে সংস্কৃত ভাষা সর্বাধিক বিজ্ঞান সম্মত এবং বিশ্বের অধিকাংশ ভাষার জননী স্বরূপা। এজন্য ‘নাসা’ও আজ সংস্কৃত ভাষার ব্যবহার শুরু করেছে। সংস্কৃত ভাষায় ব্যবহৃত কিছু শব্দের সাথে কিছু পাশ্চাত্য ভাষার শব্দের সাদৃশ্য দেখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া ভুল যে সংস্কৃত ভাষা বহিরাগত। একটা উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট করা যাবে। ভারতীয় কালগণনা পদ্ধতিগুলির একটিতে এক সূর্যোদয় থেকে পরবর্তী সূর্যোদয় পর্যন্ত সময়কে বলা হয় ‘অহোরাত্র’। ‘অহ’ অর্থ দিন এবং ‘রাত্র’ অর্থ রাত। যেহেতু ঐ সময়কাল একটা দিন এবং একটা রাত দ্বারা বিস্তৃত (অহ+রাত্র) তাই এরূপ নামকরণ। এই ‘অহোরাত্র’কে সমান চব্বিশ ভাগে ভাগ করে আদ্যাক্ষর ‘অ’ ও অন্তাক্ষর ‘ত্র’ বাদ দিয়ে প্রতিটি খণ্ডাংশের নাম দেওয়া হয়েছে ‘হোরা’ (সূর্যসিদ্ধান্ত – ১২/৭৯)। এই হোরা থেকেই ল্যাটিন হোরা (hora) গ্রীক ওরা (ωρα) এবং ইংরেজি আওয়ার (hour) শব্দের উৎপত্তি। কাণ্ডজ্ঞান সম্পন্ন যে কোন মানুষই বলে দিতে পারবেন যে অহোরাত্র থেকে আওয়ারে যাওয়া সম্ভব না কি আওয়ার থেকে অহোরাত্রে। এরকম আরও অনেক দৃষ্টান্ত আছে যার দ্বারা প্রমাণ করা যায় যে প্রাচীন সভ্যতা ও জ্ঞান বিজ্ঞানের বিস্তার ভারত থেকেই পাশ্চাত্যে প্রসারিত হয়েছিল। ( চলবে )....
   ভারতের কোন নিজস্ব সভ্যতা সংস্কৃতি নাই, এটা প্রতিপন্ন করাই ছিল মুলার সাহেবের অপপ্রয়াসের মূল লক্ষ্য। পরবর্তীকালে (১৯২১-২২) হরপ্পা ও মহেঞ্জোদড়োতে প্রত্নতাত্ত্বিক আবিস্কার মুলারপন্থীদের বাধ্য করে নতুন ভাবে গল্প সাজাতে। বলা হল হরপ্পা সভ্যতার সাথে বৈদিক সভ্যতার কোন যোগসূত্র ছিল না। আসরে নামেন বামপন্থীরা। প্রচার করা হল হরপ্পা সভ্যতা আর্যদের আক্রমণে ধ্বংস হয়েছে। কয়েকটা কঙ্কাল পাওয়া গিয়েছিল, তার ভিত্তিতে গণহত্যার তত্ত্ব খাড়া করা হল। কিন্তু সেই কঙ্কালের বয়স নির্ণীত হওয়ার পরে দেখা গেল যে তথাকথিত আক্রমণকারীদের পৌঁছাবার বহু পূর্বেই সেগুলি কঙ্কাল হিসাবেই বিরাজমান ছিল। প্রথমে মহেঞ্জোদড়ো ও হরপ্পার মাত্র দুটি স্থানে প্রাপ্ত প্রত্নসামগ্রীর অপ্রতুলতার সুযোগে ঐ সভ্যতার সাথে বৈদিক সভ্যতার যোগসূত্রকে অস্বীকার করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে আরও বহু স্থানে (সিন্ধু অববাহিকায় ১২৪৩টি এবং সরস্বতী অববাহিকায় ১০৭৪টি) আবিষ্কৃত অজস্র প্রত্নত্তাত্তিক নিদর্শন প্রস্তর যুগ থেকে বৈদিক যুগ পর্যন্ত ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারাবাহিক ক্রমবিবর্তন প্রদর্শন করেছে। সে সব থেকে এটা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে হরপ্পা-মহেঞ্জোদড়োর সভ্যতা বৈদিক যুগের শেষ দিককার নিদর্শন। ঋগ্বেদে প্রদত্ত ভৌগোলিক বিবরনের মিল দেখতে পাওয়া যায় খৃঃ পূঃ চতুর্থ সহস্রাব্দের ভূ-সংস্থান ও তখনকার আবহাওয়ার সঙ্গে। বৈদিক সাহিত্যে বর্ণিত পশুপক্ষী ও গাছপালা বিশেষতঃ যেগুলিকে পবিত্র প্রতীক বলে চিণ্হিত করা হয়েছে সেগুলি সবই ক্রান্তীয় এবং উপক্রান্তীয় অঞ্চলের প্রজাতি, নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে যা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
   বৈদিক সাহিত্যাদিতে প্রাপ্ত সুত্র ধরেই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া সরস্বতী নদীর গতিপথ খুঁজে পাওয়া গেছে। ‘নাসা’ ও ‘ইসরো’-র উপগ্রহ চিত্র এবং নদীখাতে প্রাপ্ত জলপ্রাণীদের জীবাশ্ব নিরীক্ষণের পরে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে ওটাই ঋগ্বেদের বহুস্তুত (অম্বিতমে, নদীতমে ইত্যাদি) সরস্বতী নদীর শয্যা। ঋগ্বেদে যেখানে সুবিস্তৃত বেগবান জলপ্রবাহের কথা আছে। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাহায্যে জীবাশ্ব সমূহের বয়স নির্ণয়ের মাধ্যমে বিজ্ঞানীদের সিদ্ধান্ত – চার হাজার খৃষ্টপূর্বাব্দেই নদীটি শুকিয়ে গেছে এবং দু’হাজার খৃষ্টপূর্বাব্দের মধ্যে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে ঋগ্বেদ চার হাজার খৃষ্টপূর্বাব্দের চেয়েও প্রাচীন। সুতরাং ১৫০০ খৃষ্টপূর্বাব্দে আর্যদের আগমন এবং ১২০০ খৃষ্টপূর্বাব্দে বেদ রচনার মুলার সাহেবের তত্ত্ব সমূলে উৎপাটিত করে আস্তাকুড়ে নিক্ষেপের যোগ্য। বৈদিক সভ্যতা প্রধানত সরস্বতী অববাহিকাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। ঋগ্বেদে প্রজ্ঞা ও সমৃদ্ধি প্রদায়িনী মাতা ও দেবী রূপে সরস্বতীর স্তুতি করা হয়েছে অন্তত পঞ্চাশ বার। ভৌগোলিক ও জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে নদীটি শুকিয়ে গেলে তার তীরবর্তী বসতি ও জনপদ সমূহ ক্রমশ সিন্ধু ও অন্যান্য নদীতীরে স্থানান্তরিত হয়ে যায়। এ বিষয়ে ২০০৩ এর অক্টোবরে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি একটি আন্তর্জাতিক আলোচনা চক্রের আহ্বান করে, সেখানে উপস্থিত পণ্ডিতেরা ঐক্যমতে পৌঁছেছেন যে ‘আর্য আক্রমণ তত্ত্ব মৃত’। সংগঠক প্রফেসর কামিনস্কি ও সঞ্চালক ডঃ সারদেশাই এর উদ্যোগে ভারত সহ সারা পৃথিবীর বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে এই সিদ্ধান্ত গবেষণালব্ধ তথ্যসহ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। দেরীতে হলেও মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক আর্য আক্রমণ তত্ত্ব সম্পর্কে বাবাসাহেব, স্বামী বিবেকানন্দ, মহর্ষি দয়ানন্দ ইত্যাদি ধীশক্তি সম্পন্ন ভারতসন্তানদের মূল্যায়ন ও সিদ্ধান্ত আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রত্নতত্ত্বের আলোকে সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছে। সন্দেহাতীত ভাবে নিশ্চিত হওয়ার পরে ২০০৫ এর নভেম্বরে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় তাঁদের পাঠ্যক্রম থেকে আর্য আক্রমণ তত্ত্ব বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইকেল উইৎজেল ও ভারতের রোমিলা থাপার অ্যান্ড কোম্পানী তাতে আপত্তি তোলে আবার দ্বিতীয় দফা শুনানির পরেও সংশ্লিষ্ট কমিটি আর্য আক্রমণ তত্ত্ব সম্পূর্ণ বাতিল করার সুপারিশ করেন। অনেক চাপাচাপির পর নাছোড়বান্দা উইৎজেলের মুখ রক্ষার জন্য কর্তৃপক্ষ ‘Aryan Invasion’ এর পরিবর্তে ‘Aryan Migration’ এবং ‘Some historians believe’ কথাটি যোগ করে সমস্যাটি ধামাচাপা দেওয়া হয়। ঔপনিবেশিক শক্তির সেবাদাস রোমিলা থাপার, ইরফান হাবিব, ডি এন ঝা, রাজেশ কোচর, শিরীন রত্নাগর ইত্যাদি অপঐতিহাসিকদের কারণেই আমাদের পাঠ্যপুস্তকে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা সম্ভব হয়নি। অবুঝ মা যেমন তাঁর মৃত সন্তানকে সৎকারকারীদের হাতে সমর্পণ না করে বুকে আঁকড়ে রাখতে চান বাম্পন্থীরাও ঠিক তেমনি মৃত আর্য আক্রমণ তত্ত্বকে প্রাণপণ আঁকড়ে থাকতে চাইছেন কারণ এটাই তাঁদের অপরাজনীতির মূলধন। শুধু আর্য আক্রমণ তত্ত্বই নয় আমাদের পাঠ্য ইতিহাসে যা পড়ানো হয় তাতে আরও অনেক অসত্য আছে।
  ভারতীয় সমাজকে খণ্ড বিখন্ড করে রাখার জন্য আর্য-আক্রমণ তত্ত্ব একটি শক্তিশালী অস্ত্র যাকে ব্যবহার করে বামৈসলামিক অক্ষশক্তি অবশিষ্ট ভারত থেকেও ভারতীয়ত্বকে মুছে ফেলতে তৎপর। এদের প্ররোচনায় ভারতীয় অনগ্রসর সমাজের একটা বিপথগামী অংশ নয়া এক দ্বি-জাতিতত্ত্ব ও অস্পৃশ্যতাবাদের প্রচার করছে যা প্রথম পর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। বহিরাগত আর্য আক্রমণ তত্ত্বের ভিত্তিতে প্রচারিত এই দ্বিজাতিতত্ত্বের (মূলনিবাশী ও বহিরাগত আর্য) অসারতা সংক্ষেপে তিনটি পর্বে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। অন্যান্য দৃষ্টিকোণ থেকেও এই ধ্বংসাত্বক কুযুক্তিকে পরবর্তী পর্বে তুলে ধরা হবে। (চলবে)....
  মূলনিবাসী তত্ত্বের প্রবক্তারা ভারতবাসীদের সরাসরি দুই ভাগে ভাগ করে দেখাচ্ছেন– বহিরাগত এবং মূলনিবাসী। ব্রহ্মণাদি উচ্চবর্ণের লোকেদের তাঁরা বহিরাগত আর্য হিসাবে চিণ্হিত করেছেন এবং তাদেরকে বিতাড়িত করে তথাকথিত মূলনিবাসীদের 'মুক্তি'র খোয়াব দেখেচ্ছেন। আর্যরা যে বহিরাগত নয় বরং একান্তভাবেই ভারতীয়, যুক্তি এবং তথ্যপ্রমাণ দিয়ে আগের তিন পর্বে তা দেখানো হয়েছে। এই দ্বিজাতিতত্ত্বের অন্য যেসব উদ্ভট ও অবাস্তব ফলাফল চলে আসছে সেগুলি এবার তুলে ধরছি।
এই তত্ত্বের প্রবক্তারা বাবাসাহেব আম্বেদকরের সাথে সাথে ভগবান বুদ্ধেরও নাম নিয়ে থাকেন যিনি স্পষ্টভাবেই ‘শক’ জাতি সম্ভূত যে জন্য তাঁকে শাক্যমুনিও বলা হয়। ‘শক-হুন দল পাঠান-মোগল’-রা যে ভারতে বহিরাগত সে সম্পর্কে কোথাও কোন সংশয়ের অবকাশ নেই। ভগবান বুদ্ধকে তাহলে এবার আমরা কোথায় ফেলব ? আরও অবাক করার বিষয় হল এই দ্বি-জাতিতত্ত্বে মূষলমান এবং খৃস্টানদের মূলনিবাসী বলা হচ্ছে। প্রস্তর যুগ থেকে এই ভারতভূমে যারা সভ্যতা বিকশিত করেছে, আলো ও পথ দেখিয়েছে অন্য সবাইকে তারা হয়ে গেল বহিরাগত আর ‘রণধারা বাহি জয়গান গাহি উন্মাদ কলরবে, ভেদি মরুপথ গিরি পর্বত’ যারা এসে আমাদের দেশে রক্তপ্লাবন বইয়ে আমাদের গৌরবময় সংস্কৃতিকে ধ্বংস করেছে তারা হয়ে গেল মূলনিবাসী ! ইসলাম যে বাইরে থেকে এসে ভারতে অনুপ্রবেশ করেছে এ সত্যটি ধামাচাপা দিয়ে তারা বলেন ভারতীয়রা ধর্মান্তরিত হয়ে মূষলমান হয়েছে তাই তারা মূলনিবাসী। আরব তুরস্ক থেকে এসে তরবারির মুখে যারা এদের ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করেছ তাদের কিন্তু পৃথক ভাবে দেখানো হয়নি কারণ এই ষড়যন্ত্র ও তার পুষ্টি এখনও ওখান থেকেই আসে।
  আমাদের স্বজন জ্ঞাতি বান্ধব যারা কয়েক প্রজন্ম আগে ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছেন তাদের সাথে আমাদের ঐক্য ও সম্প্রীতির চিত্রটি একটু দেখে নেওয়া যাক। সম্রাট জাহাঙ্গীর হিন্দু মায়ের সন্তান কিন্তু তিনি এবং তাঁর বংশধরেরা হিন্দু নির্যাতনে বিন্দুমাত্র শৈথিল্য দেখাননি। কালাপাহাড় (রাজনারায়ন) এবং জালালউদ্দিন (রাজা গনেশের পুত্র) তো ছিলেন প্রবাদপ্রতিম বিভীষিকা। মাত্র দুই পুরুষ আগে মূষলমান হওয়া মহম্মদ আলি জিন্নাহ্ বলেছিলেন, “হয় আমরা ভারতকে ভাগ করব নয়তো আমরা ভারতকে ধ্বংস করব” এবং তা করেওছিলেন। কয়েক পুরুষ আগে যারা আমাদের জ্ঞাতি বন্ধু ছিল গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং এবং নোয়াখালীর রক্তস্নানে তাদের  হাতেই আমরা আক্রান্ত হয়েছিলাম। একাত্তরের নরপিশাচ জুলফিকার আলি ভুট্টো ছিলেন হিন্দু মায়ের গর্ভজাত। সে সময় পূর্ববঙ্গে প্রায় তিরিশ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। সেছাড়া ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগের মত ‘পবিত্র’ ইসলামী প্রক্রিয়াগুলি তো ছিলই। সামান্য কিছু ব্যাতিক্রম বাদ দিলে নিহত ও উপদ্রুতরা প্রায় সবাই হিন্দু এবং বলা বাহুল্য যে আক্রমণকারী দুর্বৃত্তরা কয়েক পুরুষ আগে আমাদের জ্ঞাতি বন্ধু ছিল। এসব দৃষ্টান্ত প্রমাণ করে যে আমাদের ভাই বন্ধুরাও ইসলাম গ্রহণ করার পরে আর আমাদের আপন জন থাকে না। ইসলামের আকর গ্রন্থ ‘পবিত্র’ কুরআন-এ মূষলমান ও অমূষলমানদের (কাফের) মধ্যে সম্পর্ক সুস্পষ্টভাবে নির্ণীত আছে। সেখানে অমূষলমানদের কেবল অপবিত্র(৯/২৮), পশ্বাধম(৮/৫৫) এবং নরকবাসী(৯/৭৩, ২১/৯৮ ইত্যাদি) বলেই থেমে থাকেনি, অত্যাচার করে তাদের বিনাশ করাই মূষলমানদের জন্য কর্তব্য হিসাবে নির্দেশিত হয়েছে। সেই সুদীর্ঘ ঘৃণার পদাবলী উদ্ধৃত করার পরিসর এখানে নেই তবে রক্তের সম্পর্কের মূল্য নির্ণয়ের জন্য দুটি আয়াতের উদ্ধৃতি দিচ্ছি। ‘কাফেরদিগকে নিজেদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করিও না’ (৪/১৪৪)। ‘তোমাদের বাপ ভাইয়েরাও যদি কাফেরদের সাথে মিত্রতা করে তবে তাহাদেরও আর স্বজন বলিয়া গ্রহণ করিও না’ (৯/২৩)। বদরের যুদ্ধে আল-জারা নামে এক যুবক নবী মহম্মদের পক্ষে যুদ্ধ করে আর তার পিতা আবু উবাইদ যুদ্ধ করেছিল কুরাইশদের পক্ষে। ইসলামের অপার মহিমায় ঐ যুদ্ধে পুত্র পিতাকে হত্যা করে। কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যথার্থই বলেছিলেন, “আজ মূষলমানদের একথা বলিয়া লজ্জা দেবার চেষ্টা বৃথা যে দুই পুরুষ আগে তোমরা আমাদের জ্ঞাতি ছিলে, আমাদের প্রতি একটু দয়া করো”। “বস্তুত মূষলমান যদি কখনও বলে হিন্দুর সহিত মিলন করিতে চাই, সে যে ছলনা ছাড়া আর কিছু হইতে পারে, ভাবিয়া পাওয়া কঠিন” (শরৎ রচনাবলী, জন্মশতবার্ষিক সংস্করণ, পৃ-৪৭৩)। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন, “পৃথিবীতে দু’টো ধর্ম আছে, অন্য সমস্ত ধর্মমতের সাথে যাদের বিরুদ্ধতা অত্যুগ্র – সে হচ্ছে খৃস্টান আর মূষলমান ধর্ম। তারা নিজের ধর্ম পালন করেই সন্তুষ্ট নয়, অন্য ধর্মকে সংহার করতে উদ্যত। এজন্য তাদের ধর্ম গ্রহণ করা ছাড়া তাদের সাথে মেলবার অন্য উপায় নেই” (রবীন্দ্র রচনাবলী, জন্মশতবার্ষিক সংস্করণ, ত্রয়োদশ খণ্ড, পৃ-৩৫৬)। বাবাসাহেব ডঃ বি আর আম্বেদকর বলেন, “ইসলামের ভ্রাতৃত্ব বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ব নয়। এটা কেবলমাত্র মূষলমানদের জন্য। ইসলামে এক প্রকার সাম্যও আছে তবে তা মূষলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। যারা এর বাইরে তাদের জন্য আছে কেবল ঘৃণা ও শত্রুতা” (পাকিস্তান অর দি পার্টিশন অফ ইন্ডিয়া, পৃ-৩৩০) “হিন্দু ও মূষলমানের মিলনের জন্য সব রকমের চেষ্টাই করা হয়েছে এবং তা সবই ব্যর্থ হয়েছে” (ঐ, পৃ-৩০৫)। ইতিহাসের নিরিখে একথা বলা যায় যে এই উপমহাদেশে মূষলমানরা দলনকারী এবং হিন্দুরা দলিত। সুতরাং এখানে দলিত-মলিম ঐক্যের অর্থ হয় দলিত-দলনকারী ঐক্য।
  আশ্চর্যের বিষয় হল, এই বাংলায় যাঁরা সর্বনাশা এই দলিত-মূষলিম ঐক্যের ধ্বজাধারী তাঁরা প্রায় সবাই ওপার বংলা থেকে মূষলমানদের দ্বারা নির্যাতিত হয়ে আসা উদ্বাস্তু। কেন এই ‘মহান’ ঐক্যটি পূর্বপুরুষের ভিটেমাটিতে বসে করা যায়নি বা এখনও করা যাচ্ছে না তার কোন সদুত্তর তাঁরা দিতে পারছেন না। ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর থেকে অদ্যাবধি পাকিস্তান বা বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকা হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি ‘পবিত্র’ ইসলামী প্রক্রিয়ার শিকার বেশীর ভাগ মানুষই তথাকথিত দলিত শ্রেনীর । তথাকথিত ঐ ঐক্যের নিদারুণ পরিণতি তো ইতিপূর্বে প্রত্যক্ষ করা গেছে। দেশ ভাগের সময় বাংলার তফসিলি সমাজকে বিপথগামী করে যোগেন্দ্র নাথ মণ্ডল মূষলিম লিগ ও পাকিস্তানের পক্ষে যোগ দিয়েছিলেন এই আশায় যে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের কবল থেকে মুক্ত হয়ে পাকিস্তানে তারা মূষলমানদের সাথে দুধে ভাতে থাকবেন। বাবাসাহেব এই অপপ্রয়াস রোধ করতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “তফসিলিদের এটা একটা অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, তারা হিন্দুদের অপছন্দ করেন বলেই মূষলমানদের বন্ধু বলে ভাবেন। এই চিন্তাধারা ভুল”। “নিজামের মত ভারতের শত্রুর পক্ষ নিয়ে কোন তফসিলি যেন নিজের সমাজকে কলঙ্কিত না করেন”(Dr. Ambedkar’s Role in National Movement, page-198) এরপরেও তিনি মণ্ডল মশাইকে ব্যাক্তিগত ভাবে চিঠি লিখে পাকিস্তানে যোগ দিতে নিষেধ করেন। তিনি লেখেন, “আমি মনে করি তফসিলিদের কাছে হিন্দুদের তুলনায় মুসলমানরা বড় বন্ধু নয়”। কিন্তু মণ্ডল মশাই তা অগ্রাহ্য করে পাকিস্তানে যোগ দেন। সেখানে তিনি তফসিলিদের জন্য ‘আলোকোজ্জ্বল’ ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছিলেন। অল্প কিছু দিনের মধ্যেই যখন সেই আলোর ঝলকানি তফসিলি অতফসিলি নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্ভ্রম ছারখার করে দিল মণ্ডল মশাই তখন নিজের প্রাণ বাঁচাতে এসে আশ্রয় নিলেন বহু নিন্দিত ব্রাহ্মণ্যবাদ কবলিত এই ‘নাপাক’ ভারতে। পেছনে পড়ে রইল লক্ষ লক্ষ অনুগামী ক্রন্দন আর হাহাকার। এই মুহূর্তেও, যখন এই লেখা লিখছি, আইনি ও বেআইনি সব রকম পন্থায় সেখানে অমূষলমানদের উপর নির্যাতন চলছে আর সেই সঙ্গে বিরামহীন ভাবে সেখান থেকে আসছে উদ্বাস্তুর স্রোত। ‘মূলনিবাসী’ তত্ত্ব অনুযায়ী তো এই উদ্বাস্তুদের ওখানেই ফেরত পাঠানো উচিত কারণ তারা তো ওখানকার মূলনিবাসী পশ্চিমবঙ্গ বা আসামের মূলনিবাসীরা তাদের মেনে নেবে কেন ? এত সব কিছুর পরেও যারা দলিত-মূষলিম ঐক্যের খোয়াব দেখেন তাদের মাথায় আদৌ মানুষের মস্তিস্ক আছে কিনা তা একটা গবেষণার বিষয় হতে পারে। সকল শুভবুদ্ধি সম্পন্ন ভারতপ্রেমীর প্রতি আমার আবেদন, আর্য আক্রমণ ও মূলনিবাসী তত্ত্বের প্রচারকারী প্যান ইসলামের দালালদের ফাঁদে পা দেবেন না। এদেরকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করুন। (সমাপ্ত)