রবিবার, ১ ডিসেম্বর, ২০১৯

মতুয়ার সম্ভাব্য উৎপত্তি।। ** দ্বিতীয় পর্ব **

শ্রীশ্রী হরিগুরুচাঁদ জয়তুঃ।।


তথাকথিত ভারতীয় উপমহাদেশে, যাহার মধ্যে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া, এমনকি চিনদেশটি ও আমার লেখার তথ্যের আওতা ভূক্ত।সেই সহ বর্তমান ভারতের বিভিন্ন অঙ্গ রাজ্য বা প্রদেশের মধ্যে বিভিন্ন জনজাতির বসবাস তেমনই বিভিন্ন ভাষা ভাষীর ও প্রচল ঘটে,ফলে বহু গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়।এটাই বাস্তব যাহার জলন্ত প্রমান ভারতীয় ইতিহাস।সেইসব সম্প্রদায়ের মধ্যেই যে যাহার মাতৃভাষাকেই প্রধান্য
দিয়ে থাকেন আর সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা। উল্লেখ রাখা ভালো( প্রাচিন ভারত বর্ষ তখন সরকারি শাসন ব্যাবস্থা ছিলনা, তখন আর্য্যদের ৪টি প্রধান মন্দির দ্বারাই ভারত বর্ষের সমাজ সংস্কার বা শাসন ভার নিয়ন্ত্রিত ছিল, সেই মন্দির ভারতবর্ষের প্রধান চারটি জায়গায় স্থাপিত যা আজও তার স্মৃতি চিহ্ন বহন করে চলছে, এবং নতুন আংগীকে উন্নত মানের কাঠামোয় আবৃত।) 'যাহোক কালক্রমে ঐ সম্প্রদায়ের মধ্যেই কোন কোন দেব দেবতাকে উপাস্য হিসাবে চিহ্নিত করে,এমনকি কোনও কোন  সম্প্রদায়ের মধ্যে থেকেই কোন ব্যাক্তি বিষেস কাউকে প্রধান্য দিয়ে তার দর্শন অনুযায়ী তার নামে সম্প্রদায় থেকে ধর্মীয় নামে ধর্ম শাখায় রুপান্তরিত করেন।এবং সেটা যার যার সীমানা ভিক্তীক, বর্তমান রাজ্য /প্রদেশ অনুশারেই স্বীকৃত অথবা বিদ্যমান হয়। এ-ই ধর্ম শাখা বা সম্প্রদায় গুলি সরকারী শাসন ব্যাবস্থা চালু হওয়ার পরে কিছু কিছু সরকারীভাবে তালিকা ভূক্ত করেন।এখানে জরুরি ভা
বে উল্লেখ রাখা দরকার**-
**--**,(শুধু ভারত বর্ষই নয় পৃথিবীর মধ্যে যত ধর্ম মত প্রচলিত হয় বা হবে তাহা কোন সরকার প্রাথমিক ভাবে স্বীকৃতি বা তালিকা ভূক্ত করেনা, সেই সম্প্রদায়/ধর্মকে, নিজেদের করেই প্রচলন করতে হয়।পরবর্তী পর্যায়ে জনসংখ্যা ও তার গুনা বলী বিচার করে সরকার স্বীকৃত বা তালিকা ভূক্ত করে নেয়)
*****------***-**-*-**
ভারতীয় পৌরানিক গ্রন্থাবলীতে ঐসব ধর্ম শাখার পরিমান প্রায় সারে চার হাজার থেকে সারে ছয় হাজারের মতো। পরবর্তী কালে ঐই ভারত বর্ষেই অন্য মহাদেশ বা অন্য দেশ থেকে জনজাতির বসবাস শুরু করেন। কেহ বানিজ্য হিসাবে কেহবা ভালো লাগার কারনে কেহবা প্রতিষ্ঠা পাওয়ার তাগিদে। মজার ব্যাপার হলো সেই সব মানুষ কাল ক্রমে ভারতের রাজ ক্ষমতাও এক সময় দখল করে নেয়, ফলে তাদের দেশে যে ধর্মীয় সাবজেক্টের উপর তারা ছিলেন,, সেই ধর্ম মত পথও ভারত বর্ষের মধ্যে বিস্তারিত হল,। ফলে ভারত বর্ষের রুপ নেয় বহু ভাষা বহু ধর্ম বহু সম্প্রদায়। যাহা কিনা বৈদেশিক শাসন ব্যাবস্থা চলে যাওয়ার পরও
ভারতের মানুষের হাতে রাজ শক্তির প্রভাব ঘটলেও
একক কোন ধর্ম শাখাকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি
প্রদান করতে পারেনি।(অবশ্য বিদেশীরাও পারতেন না) তাইতো ভারতীয় সংবিধানে দাঁড়িয়ে
বলতে হয় ভারত ভূমির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বহুত্ব্যের মধ্যে এককত্তা বা বৈচিত্রের ভারত যাহা (সীমার মাঝে অসীম)।। স্বামী বিবেকান্দের ভাষায় মানবতাবাদী ধর্ম।। কিছুটা ইতিহাস তুলে না ধরলে নয়, অবশ্য আমার পান্ডুলিপিতে বিভিন্ন বিষয়ের উপর সাধ্যানুসারে সংগ্রহ করে রেখেছি এবং ভারত বর্ষের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ সম্প্রদায়ের তথা তাদের কৃষ্টির বিষয় একটা জানার অদম্য আগ্রহ আমার ছিলো শুধু যে মতুয়াদের জন্য তা নয় ভারত বর্ষকে জানার জন্য।সেটা কতটুকু সমাপ্ত করতে পারব জানিনা। তবে একটা কথা জোর গলায় বলতে পারি ভারত বর্ষকে যে জানতে পারবে পৃথিবীর অন্য দেশের সম্পর্কে ও তার ধারনা বেশির ভাগই জন্ম নেবে,, এটা আমি মনে করি।। যা হোক নিজের প্রতিষ্ঠাকে আমি মান্যতা দিতে রাজী নই।।তাই যতটুকু ইতিহাস মতুয়া উৎপত্তির বিষয় প্রযোজ্য মনে করি সেটা প্রকাশ না করলে অসমাপ্ত থেকে যাবে।এমনকি গতানুগতিক পূর্বাপর না হলে ঐতিহাসিক ভাবে মতুয়া উৎপত্তি লেখার কোন মানেই হয়না।।যাহা হোক ঐসব প্রচলিত ধর্ম শাখার মধ্যে প্রধান্য হিসাবে উঠে আসে যথাক্রমে, আর্য, জৈন,শিক,বৌদ্ধ,সনাতন,হিন্দু ইসলাম, বৈদিক, খৃষ্টান ইত্যাদি।। লক্ষ্যনীয় হলো তৎকালীন বঙ্গবাসী বা বাংলা ভাষীদের মধ্যে উল্লেখ যোগ্য প্রধান ধর্ম শাখা গুলোর সবটি প্রচলন ঘটেনি,বিষেস করে বাংলা বলয়ের মধ্যে, সনাতন,হিন্দু, বৌদ্ধ,কিছু ইসলাম, এবং হাতে গনা কিছু কিছু খৃষ্টান ধর্মের মানুষ,।বৈষ্ষব  শব্দটির উৎপত্তি ভূত পূর্ব হলেও সেই নামে কোন সম্প্রদায় বা ধর্মের প্রচলন তখনও ঘটেনি।।কালক্রমে বৈদিক গন সনাতন ধর্মের মূল ধর্ম গ্রন্থ বেদকেই প্রধান্য দেয় যাহা কিনা তথাকথিত আর্য্য হিন্দুদেরও প্রধান গ্রন্থ
হিসাবে বিবেচিত,।। ধর্ম শাখার নাম ভিন্ন হলেও গ্রন্থে বা দর্শনের ব্যাপারটা এক। অবশ্য এ-ই সিদ্ধান্তে কিছু আর্যগণ বা বৈদিক গন এখনও দ্বিমত পোষন করেন। তবে তন্মধ্যে কিছু জ্ঞানী ব্যাক্তি বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে হিন্দু ধর্মকে সামনে রেখে সনাতন হিন্দু ধর্ম বা সনাতনী হিন্দু ধর্ম হিসাবে চিহ্নিত করেছেন।। যা কিনা আপনি /আমি বাংলা ভাষীদের মধ্যে বলে থাকি।।তবে ঐসকল ধর্মের মধ্যে তখন বাংলার ভিতর কোন মহা পূরুষের আবির্ভাব ঘটেনি। পর্যাক্রমে সনাতন বা হিন্দু ধর্ম যেটাই আমরা বলিনা কেন বাংলায় বা তথাকথিত
বঙ্গে এক কালজয়ী, কিংবা মহাপূরুষ বা অবতার পূরুষ 
অথবা বঙ্গের হিন্দু বা সনাতনধর্মের ভাগ্য বিধাতা রুপে চৈতান্য মহাপ্রভু জন্ম গ্রহন করলেন।।
     ৷         (চলবে)পরবর্তী অংশের জন্য অপেক্ষা করুন।। যে কোন ভুল শোধরাতে আমার কৃতজ্ঞতা রইল।। হরিবোল।

মতুয়ার সম্ভাব্য উৎপত্তি।। ** তৃতীয় পর্ব **

শ্রী শ্রী হরিগুরচাঁদ জয়তুঃ।

দ্বীতিয় পর্বের উল্লেখিত বিষয় সমুহের মধ্যে দেখতে পেলাম। বৈদিক, আর্য্য,  সনাতন,বৃহত্তর স্বার্থে প্রবল মতানৈক্য /মতান্তর থাকা সত্ব্যেও (সনাতন হিন্দু ধর্ম) নামে চলতে থাকলেন বা এখনো সেই নামেই বেশির ভাগ চলে,, তবে কিছু মানুষ   এখনো তারা আদি ধর্ম সনাতন ধর্ম বলেই জানেন, তারা সোনাতনের সংগে কোন রুপ মিশ্রন দেখতে পছন্দ করেন না। সেটা তাদের ভালো লাগা হোক, একনিষ্ঠতা হোক,আস্থা বিশ্বাস হোক, তাদের কাছে সনাতনধর্মই সার কথা।দুঃখের বিষয় সেই দাবীটা যারা জোরের সহিত করেছেন তারা একটা জায়গায় মকরশার জালের মত বন্দী, সেই সংগে সনাতন ধর্ম বলে যারা জোর দাবী করেন তারা বেশির ভাগই বঙ্গবাসী বা বাঙালি,।।,যখনই দেখলেন সনাতন ধর্মের নাম আছে তার (মুলধর্ম গ্রন্থ নেই) যে দর্শন তাহা বৈদিক, আর্য্য,বা হিন্দু ধর্মের নামেই খ্যাত, বলার অপেক্ষা রাখেনা( মকরশার জাল)একটা কথা না বললে নয়,, যারা  সনাতনধর্ম আদি ধর্ম জেনে আসছেন তাদের বিশ্বাস ভারতের আদি সভ্যতা দ্রাবিড় সভ্যতা, এটা ঐতিহাসিক সত্য,,এ-ই সভ্যতার মধ্যে থেকেই আর্য্য সভ্যতায় রুপান্তরিত হয়।। তথাকথিত আর্য্যরাই ভারতবর্ষের শিক্ষীত জাতী, এবং তাদের মত করে তারা  তাদের যাবতীয় দর্শন তৈরী করেন,,।। ফলে দ্রাবিড় সভ্যতার কম শিক্ষিতরা (আর্য্যরা) যেভাবে চালিয়েছে সেই ভাবেই চলতে হয়েছে।।এবং সেখান থেকে ই তাদের আদি মানুষ, আদি ধর্ম সনাতন, আদি ভারতবাসী,, এ-ই ধারনাটা পোষন করে আসছে।। এবং সেখানেই জাতি ভেদের বিজ বপন করা হয়েছে,,।।  একই সভ্যতার মানুষ হয়ে কাল ক্রমে একাধিক সভ্যতা বা একাধিক ধর্ম শাখার রুপ নেয়। বর্তমানে ভারতের আদিবাসী বলে আমরা যাদের চিহ্নিত করি বা এসটি, এস সি, কিংবা ওবিসি সম্প্রদায়ের মানুষ তাদেরই উত্তরশূরি।।এ-ই জন্য হরিচাঁদ ঠাকুর  বলেছিলেন,, আমি প্রচারিব গূঢ়গম্য সূক্ষ্মসনাতন ধর্ম (এ একটি কারন উল্লেখ রাখা হল পষ্চাতে বলব)যে কথায় যাব চৈতন্য দেব ছোট বেলার নাম নিমু, নিমাই মিশ্র, পিতা জগন্নাথ মিশ্র,গৌরাঙ্গ, গৌড় সুন্দর,মহা প্রভু,ও চৈতান্য দেব। কেউ বা ভগবান, কেহ বা ইশ্বরঃ, কেহ বা অবতার তাকে আখ্যা দিয়েছেন।।আমি তাদের সাথে একমত,, তবে আমার লেখার মাধ্যমে (ইশ্বর বা ইশ্বরঃ পূরুষ) বাদেই বর্ণনা করব কারন যতদুর পারি ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী চেষ্টা করছি,,।। তবে আমার ভাষায় গৌড় সুন্দরকে কি বলব তার যে কতগুন কি নামে ডাকব তার অনন্ত কর্মপন্থা , তাই তিনি আমার দৃষ্টিতে মানব সুন্দর বললে কম হয়।। তিনি মানব মহা সুন্দর।। তথাকথিত বঙ্গবাসী বঙ্গভাষী দের বা সনাতন ধর্মের প্রতি যাদের আজও একনিষ্ঠ আস্থা বিশ্বাস তারা কালজয়ী, বলেন, মহাপুরুষ বলেন,ত্রাতা কিংবা কান্ডারি বলেন  সকল গুনের অধিকার অর্জন করে মানুষের পাশে দাড়াতে লাগলেন গৌড়সুন্দর প্রথমেই তিনি অল্প বয়স থেকেই বেদ বেদান্তের বিষয়ে পারদর্শিতার চরম উচ্চ পর্যায়ে লক্ষ্য ভেদ করেন।। এবং যে যে ভাষায়  বেদ লেখা ছিল সেই ভাষাকে রপ্ত করেন। যাহা কিনা ঐ সম সাময়িক কোন ব্রাহ্মন পন্ডিত, কিংবা কোন আর্য্য পন্ডিত গন ঐ বয়সে কেহ অর্জন করতে পারেনি।। ঐ সময় পালা করে শাস্ত্রীয় তর্ক যুদ্ধ হতে,,কোন এক সময় তার প্রতিভা দেশ দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়ায়,, তর্কযুদ্ধের পন্ডিতদের মধ্যে একটি প্রতিহিংসার সৃষ্টি হয়।এ-ই বালক যা শাস্ত্রীয় ব্যাখা দিয়ে মানুষকে তার পক্ষে নিচ্ছে আমরা সেই শাস্ত্রের রচনা কারী বা প্রনেতা হয়েও নিমাই এ-র কাছে হারতে হচ্ছে।। তারা নিমাইকে সর্বোচ্চ জবাব দেওয়ার জন্য,, আরও একটি শাস্ত্রীয় বিতর্ক সভা করলেন,, বিপক্ষে তৎকালীন মহা পন্ডিতজ্ঞ শ্রী হাড়াই পন্ডিত মহাশয়।। তার কাছে সকল পন্ডিত গন হেরে যেতে তাই তার নাম করন হাড়াই পন্ডিত।। সেখানে নিমাই হেরে যাবে ধরে নিয়েই, তাকে শাস্ত্রীয় দর্শন থেকে অবসর নিতে হবে এব্যাবস্থা তারা পাকা পোক্ত  ভাবেই করে রেখে ছিলেন।। কিন্তু সেটি নিমাই এ-র প্রতিটির শ্লোকের ব্যাখায় বিপক্ষের পন্ডিত মহাশয় হেরে যায়।। কি ছিল সেই ব্যাখায়,, আগামী পর্বে।। কেহ ভাবছেন মতুয়ার উৎপত্তিতে নিমাই বা গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর এতটা না টেনে সহজে,,কিছু লিখে ভালো হতোনা। না হতেনা গৌড় সুন্দরের ব্যাখার মমার্থেই মতুয়া দের সূচনার বেশ কিছু ইঙ্গিত বহন করবে।।পরবর্তী পর্বের জন্য অপেক্ষা করুন।।জয় হরিবোল।। যে কোন ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।।

মতুয়ার সম্ভাব্য উৎপত্তি।। ** চতুর্থ পর্ব **

শ্রীশ্রী হরিগুরুচাঁদ জয়তুঃ।।

গৌড় সুন্দরের আলচনায়, যাওয়ার পূর্বে একটি বিষয়ে,স্মরন করার জন্য উত্থাপিত করে নিতেই হবে।। তথা কথিত সনাতন ভারতবর্ষ বা এখনো আদি সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী মানুষের মধ্যে ধারনা, বৌদ্ধ ধর্মের মানুষ এরা সনাতন ধর্মেরই মানুষ।। এবং এ-ই ধারনার সংগে আশা করি বেশির ভাগই একমত হবেন।। এবং এর যথেষ্ট যুক্তি আছে,, ভূতাত্ত্বিক গনের বিশ্লেষণ বা ঐতিহাসিক গনের একশ্রেনীর তথ্য তাই ইঙ্গিত করে।। বৌদ্ধ নিদর্শনের অনেক পূর্বেই দ্রাবিড় সভ্যতার বিকাশ এ-র আগে কোন সভ্যতা ছিল বলে এখনো কোন স্পষ্ট ধারনা পাওয়া যায়নি।।তৃতীয় পর্বের আলচনায়,, আর্যের বিষয়টা উল্লেখিত রেখেছি।।তাই আর্যরা বাদে দ্রাবিড় সভ্যতার বাকী অংশ।। যুক্তিতে আদি সনাতন ধর্মের মানুষ বলে ধরে নিতেই পারে।।এবিষয় নিয়ে প্রসংগ ক্রমে পরে বিস্তারিত তুলে ধরার চেষ্টা করব।। তা না হলে মতুয়ার উৎপত্তির দিকে পূর্ণাঙ্গ ভাবে রুপ দান করা হবেনা।।কারন বুদ্ধের অহিংসা নিতী ও সাম্য দর্শনের, মর্মার্থের বাস্তবতা কর্মের মাধ্যমেই,, এক মাত্র হরিগুরুচাঁদ ঠাকুরই, বঙ্গভাষীদের তথা বাঙালির মধ্যে নিপুনতার সহিত পালন করে দেখিয়েছেন।।আরও একটি বিষয় গোড়া হিন্দুদের বা আর্য হিন্দুদের মধ্যে।। বুদ্ধ ধর্মালম্বীদের সংগে মতানৈক্য এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।। সেই মতান্তর এমন এক পর্যায়ে পৌছায় ধর্ম দন্দকে সামনে রেখে।। যাহা অঘোষিত হলেও ভারতবর্ষ বিভক্ত হওয়ার অন্তরায়।।আমি১৯ ৪৭সালের পাক ভারত বিভক্তের কথা বলছিনা।। তবে ইঙ্গিত সেই ধর্মদন্দ জাতি তত্ব্য।।আমার ইঙ্গিত চিনদেশ। অবশ্য বিভক্ত হওয়ার  ঐতিহাসিক আরও ব্যাখা আছে। আমি এই জন্যই শব্দটি লিখে ছি( অঘোষিত)
চিনের সংগে ভারতের যুদ্ধের কারনের মধ্যে তথাকথিত একটি ধর্ম যুদ্ধও কারন।। (অঘোষিত) এমন কি আছে দুটিদেশ আলাদা স্বাধীন হওয়ার পরেও প্রতিনিয়ত এখনও কুট নৈতিক যুদ্ধ করে যেতে হবে।। এ-ই সভ্যতার যুগে দুটি দেশই পৃথিবীতে উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে নজির গড়েছে।। চোখের দেখা যে সমস্থ চিন ভারতের সিমান্ত সমস্যা এটা বৃহত্তর দেশ হিসাবে কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়।। অমি মনে করি এ-ও ধর্ম দন্দ বা মতান্তর, (অঘোষিত) অনেক ইতিহাস লিখে যেতে পারেনা,, প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ও বাস্তব অনুভূতির মধ্যে জেনে নিতে হয়।। এ-ই কথা গুলো তুলে ধরার কারন আজও যারা খাটি বা আদি সনাতন ধর্ম বলে বিশ্বাসী তাদের মনে দাগ কাটে,, এই সব মানুষ গুলোতো আমার সনাতন ধর্মেরই মানুষ।। আজ আলাদা ধর্ম কেন -? তাহলে কি আর্য্য হিন্দু বা গোড়া হিন্দু অথবা বেদ নামক সেই শ্লোকের কোন ব্যাখায় জাতি ভেদের রোষানলে পড়েনিতো-?এরাকি তারাই যারা তথাকথিত বড় বড় হিন্দু, বা আর্য বা বৈদিক গনের প্রতিষ্ঠীত মন্দিরে উপাষনা করতে পারতনা -?এরা কি তারা যারা বেদ পুরান পরতে পারতনা বা দিতনা পাঠ করার অধিকার -?এরা-ইত সোনাতনের খাটি মানুষ।। কেন বুদ্ধনামেই ধর্মীয় পরিচিতি নিলেন-?এভাবে চলতে থাকলে সনাতন বলি,, হিন্দু বলি, আর্য্য বলি,, কতটা ধর্মের বৃদ্ধি পাবে।। উল্লেখিত ধারনা কিছু মানুষের মধ্যে তখন থেকেই চলে আসে।।
************-------******
যাচ্ছি গৌড় সুন্দরের কর্ম প্রতিভায়।।বিতর্ক সভার শ্লোক একাধিক যাহার প্রতিটির অংশ বা যতটুকু সেই দর্শনের মাধ্যমে পাওয়া যায়,, সেটা পুর্নাঙ্গ অনুবাদ করা ফেসবুকে সম্ভব নয়।। কিন্তু কিছুটা মর্মার্থ তুলে ধরতেই হয়।।বেদ শাস্ত্রের শ্লোকের মধ্যেই তথাকথিত সমাজ ব্যাবস্থার
পরিচালনা করার,, একটা শাসন পদ্ধতি সূক্ষ্মাকারে নিরুপন করা ছিল ।। যাতে করে ঐ নিতী পদ্ধতির ধারক বাহক যারা রচনা করেছেন তারাই।। এবং এটা যারা উপেক্ষা করবে তারা তাদের হাতেই সমাজচ্যুত হবেন।। এবং সেই বেদ নামক শাস্ত্র তাহা ছিল সংস্কৃত ভাষায়।। যাহার অর্থ সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়।। পরে অবশ্য বিভিন্ন নাম দিয়ে বাংলায় বেদশাস্ত্র অনুবাদ করেছে।। তবে উল্লেখ রাখা ভালো বাংলায় অনুবাদ কারিরা,, কিছুটা বুদ্ধিমত্তার সহিত অনেকাংশে, কঠোর সিদ্ধান্তের কিছু অংশ যাহাতে,, একেবারে দৃষ্টি কটু না হয়, সেভাবেই তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।।বেদ শব্দের অর্থের মর্মার্থে যা বুঝায়,, বেদ মানে অপরিসীম জ্ঞানের ভান্ডার।। এটাকেই বর্তমান শিক্ষিত সমাজের মানুষেরা বলে থাকে।। এবং ছোট বেলায় পাঠশালায় পড়ানো হতে চারি বেদ।। সাম, ঋৃগ্ব,যজু অথর্ব। বর্তমানে দেখবেন, সাম মনুসংহিতা, ঋৃগ্বমনুসংহিতা, যজুর মনুসংহিতা, ইত্যাদি মনুসংহিতাকে সংযোজন করা হয়েছে।। এগুলো লেখার কারন বেদ একটি শব্দ,, বেদশাস্ত্র একটিশব্দ, বেদকে উদৃত করে যাহা কিছু পান্ডুলিপি, বা বইয়াকারে মুদ্রিত করা হয়। তাকে বেদশাস্ত্র বলে, ক্ষেত্র বিষেশ আখ্যা দেওয়া হয়েছে।। প্রথমে বলা হয়েছে বেদের শ্লোকের মধ্যে লুকাইত ছিল তথাকথিত সমজব্যাবস্থা বা সেই সময়কার শাসন ব্যাবস্থা।। কি নাম সেই বেদশাস্ত্রের বা এখনো সেই আইনের ক্ষুরধার অস্ত্রের রোষানলে  অঘোষিত ভাবে আদি সনাতন ধর্ম বলে যারা জেনে আসছে তাদের বহু ভাগে বিভক্ত করছেনাত-?সেই আইনের বীজ নিয়ে যারা রাজ ক্ষমতায় বর্তমানেও আছে। তারাকি অঘোষিত ভাবে সেই শাসন তন্ত্রকে প্রযোগ করছেনাত-?সেই বেদশাস্ত্রটির নাম হল,, পুরহিত তন্ত্র /পুরোহিত দর্শন /ব্রহ্মপুরান ইত্যাদি।। সবাই বেদকেই উদৃত করে লিখেছেন।।যাহা হোক ঐ সকল  শাস্ত্রের বিষয় ও নিমাই পন্ডিত ভালো করে রপ্ত করেছেন।।হাড়াই পন্ডিতেরা, জানতেন সেই শাসন তন্ত্রে বিধানের বাহিরে নিমাই  পন্ডিতের আচরন বা চালচলন।। অর্থাৎ নিমাই ছোট বেলা থেকেই মানুষকে সমদয়া,,তার প্রতি নিষ্ঠা, সাম্যবাদ,জাতিভেদ এসব তিনি মানতেনা।।এবং যাহা কিনা ঐ শাসন তন্ত্রের সম্পূর্ণ বিপরীতে।।, ঠিক নিমাই এ-র এই দুর্বল জায়গাটা দুর্বল ভেবে বিপক্ষে পন্ডিতেরা প্রশ্নবানে বিদ্ধ করতে লাগলেন।। কিন্তুু নিমাই সকল প্রশ্নকে হাসি মুখে গ্রহন করে তার উত্তর দিতে লাগলেন।।কি তার উত্তর ছিল যার জন্য বিজ্ঞ পন্ডিত দের হারতে হলো।। কি এমন বিষয় বস্তুু ছিল যাহা মতুয়ার উৎপত্তি সহায়ক হলো।। অপেক্ষা করুন আগামী পর্বের জন্য।। যে কোন ত্রুটির জন্য ক্ষমার চোখে দেখবেন।। সবাই ভালো থাকুন জয়হরিবল।।

মতুয়ার সম্ভাব্য উৎপত্তি।। ** পঞ্চম পর্ব **

শ্রী শ্রী হরিগুরুচাঁদ জয়তুঃ।

চতুর্থ পর্বে আমার সংগে থাকা সবাইকে শ্রেনীনুযায়ী প্রনাম ভালো বাসা জানিয়ে শুরু করছি।। **********-মহাপ্রভু পন্ডিতদের সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। সেক্ষেত্রে পূুর্বেই মহা প্রভু অবগত ছিলেন।। তাকে পন্ডিত বর্গের শাস্ত্রীয় রোষানলে পরতে হচ্ছেই। সেই সকল প্রশ্ন মুলুক শ্লোক বা তার প্রতি উত্তর ফেসবুকে সব তুলে ধরা সম্ভব না।। আগেই বলেছি,, এবং যারা ফেসবুকে আছেন তারা এত লেখা ধৈর্য্য ধরে পড়ার সময়ও নেই,,তাই শুধু মাত্র মর্মার্থই তুলে ধরেছি।।
****--********---******-*মহাপ্রভু বললেন,হে আমার পূজ্যপাদ মহা পন্ডিত গন-বেদ,পুরান, শাস্ত্র দর্শন এ-র সর্বা মুলাধারকে-?এবং আমরা-- যে ধর্ম পালন করি তারইবা স্রষ্ঠা কে -?আমরা যে দর্শন শাস্ত্রনুযায়ী সংস্কারে  চলছি কিই বা  তার সঠিক পদ্ধতি -?
**----*****-***--****
বাংলা অনুবাদে,এবং ঐতিহাসিক সু যুক্তির বিধানে বা পর বর্তী কালের মহা প্রভুর জীবনালেখ্য,, যে সকল গ্রন্থাকারে পূস্তক বেরিয়েছে,, যথা ক্রমে নিমাই সন্যাস,,অমিয় নিমাই চরিত,, চৈতান্য চরিতামৃত,, চৈতান্য ভগবৎ, ইত্যাদি গ্রন্থ।।তৎ সহ নিমাই এ-র জন্ম ভিটায় আজও কিছু ভূতপূর্ব নিদর্শন আছে।। যাহা ঐ সমাজের এখনও বেশ কিছু মানুষ,, ঐ এলেকায় যে কোন গৌড় সুন্দরকে কেন্দ্র করে মঠ মন্দিরে তারা থাকেনা।। অথচ মহাপ্রভুকে নিয়ে তার ঐতিহাসিক কিছু সত্যতা লোক কথার  ন্যায় তারা বলে থাকেন।।আরও একটি বিষয় বর্তমান মায়াপুরে বা নবদ্বীপে। মহা প্রভুকে কেন্দ্র করে বহু মঠ মন্দির গড়ে উঠেছে সবাই পরম সত্যটা স্বীকার না করলেও।। অনেকেই জানেন মহা প্রভুর জীবনে কতটাই,, ঐ শাস্ত্র যুদ্ধের নামে--ব্রাহ্মন পন্ডিত গনের সংগে-।।- ধর্ম যুদ্ধকে অগ্রভাগে রেখে জীবন যুদ্ধ করতে হয়েছে।।
অবশ্য উল্লেখিত বেশির ভাগ গ্রন্থের মধ্যে মহাপ্রভুর ঐতিহাসিক পটভূমিকার কথা লেখার ধরনটা খুবই কম।।  অনেকে প্রথমে আমার কথা বুঝতে সময় লাগতে পারে।।তবে পরবর্তীতে ভক্তি মার্গের শ্রতাদের অনেক ধোঁয়াসা কেটে যাবে।।
********------******-***
সুতরাং ধর্মীয়ী তর্ক যুদ্ধের কারনেই তার সারাংশ ধরে প্রশ্নের মালায়,, ধর্মের মূলা ধারকে,, বেদশাস্ত্রে মূলে কে,,ও সংস্কার কি বা কেন-এটা আমাকে লিখতে হয়েছে।।মহা প্রভু তাদেরই উদ্দেশ্য বেদশাস্ত্রের ভক্তিবাদের তত্ব্যকে দাড় করিয়ে বললেন,।। হে পন্ডিত গন শুনুন আপনি/আমি এমনকি জগতের সবকিছুর মূলে রয়েছেন একজন স্রষ্ঠা।।*** ধর্মমূলহিঃ ভগবান, স্বর্ব বেদময়ঃহরি।।******ধর্মের মূলে হরি,বেদের মূলে হরি সংস্কারে হরি,আপনার আমার মধ্যে হরি, জগৎটাই হরিময়।তর্কে হরি, হরিকে কি কখনও হারানো যায় -?ভক্তি বাদের ব্যাখায় পন্ডিত গন চৈতান্য দেবের উদারতা,মহানুভবতা,, সততা,এবং সর্বোপরি সাম্যবাদ বেরিয়ে আসায় তাদের বাক শক্তি রহিত হয়ে যায়।। এবং এভাবেই ভক্তিবাদের গতিবৃদ্ধি পেতে শুরু করেন।। এবং সেটার নিদর্শন চৈতান্য মহাপ্রভু নিজেই।। পরবর্তী কালে মানুষের মধ্যে হরিনাম বিতরন করার কাজে নিজেকে নিয়জিত করেন।। এবং  তার কর্মময় জীবনে ভগবান কৃষ্ণকে,, তুলে ধরলেন অন্য মাত্রায়।। এখানে অন্য মাত্রায় কৃষ্ণকে বলা হলো কেন-? তবে একোন কৃষ্ণ -? এ-র ব্যাখায় মতুয়া উৎপত্তির কতটুকুই বা সহায়তা পেতে পারে।।চোখ  রাখুন ও সংগে থাকুন।। আগামী পর্বের অপেক্ষায়।।
**********-------******--*
যে কোন ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থী।।জয়হরিবল।।

মতুয়ার সম্ভাব্য উৎপত্তি।। ** ষষ্ঠ পর্ব **

শ্রীশ্রীহরিগুরুচাঁদ জয়তুঃ।।

পঞ্চম পর্বের সঙ্গে থাকা সবাইকে প্রনাম ভালো বাসা জানিয়ে শুরু করছি
     ***-****-----****   
শ্রী কৃষ্ণকে মহা প্রভু অন্য রুপে তুলে ধরলেন।।আমরা যদি মহাভারতের দিগে লক্ষ্য করি,,  সেখানে দেখবেন- শ্রী কৃষ্ণ এবং অর্জনের বাদানুবাদ।। এবং এক ধর্মরাজ্য বা সামরাজ্য প্রতিষ্ঠা গড়ার লক্ষ্যে,, যুদ্ধ বিগ্রহে যে যাহার মত তৈরী হচ্ছে ও যুদ্ধ করছে।। লক্ষ্যনিয় বিষয় হলো
মহা ভারতের মধ্যে মুনিঋৃষী সহ দেব দেবী এমনকি দেবতা উপদেবতার,, চরিত্রের শেষ নেই।। তেমনই তাদের কৌশলগত রন নিতীরও শেষ নেই।। অতএব যুদ্ধেরও শেষ নেই,, মজার ব্যাপার হলো --ঐ মহা ভারতের  চরিত্রের মধ্যে যার সাথে যার,,বা যে গ্রুপের সংগে,, যে গ্রপের যুদ্ধ হোকনা কেন কৃষ্ণই তার চালিকা শক্তি।।যাকে এক কথায় পরিচালক ও প্রযজোক বলা হয়।।আরও একটি বিষয়,, মহাভারতেই একাধিক কৃষ্ণকে দেখা যায়।। কখনও দ্বিভুজ,,কখনও  চতুর্ভুজ, ইত্যাদি এবং এ-ই কৃষ্ণদের বর্ন  (গায়ের রং)অতি উজ্জ্বল ও রাজকীয় আভারনে আবৃত।। এ-র যথার্থ সত্যতা চলমান বৈদুতিন টি ভি সিরিয়ালে।। মহাভারতকে উদৃত করে কৃষ্ণকে নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদি সিরিয়াল,, দেখলেই বুঝতে আর অসুবিধা হবেনা।সর্বশেষ মহাভারতের গ্রন্থে যত কৃষ্ণই হোক।। তারা শুধু ঐশ্বর্য,, প্রায়ুর্য্য, রাজ ক্ষমতা, শৌর্য, শৌর্যবীর্য যুদ্ধং দেহি,, এবং জাতীত্ব্যের গৌরবের ছোয়া বেরিয়েছে।।সেটা কখনও ঘোষিত কখনও অঘোষিত।। আরও যেটা লক্ষ্যনীয় মহাভারতের কৃষ্ণের চরিত্রের মধ্যে শ্রী মতি রাধিকার বিস্তার বা প্রভাব ঘটেনি। তাহলে প্রশ্ন আসতেই পারে,,আমরা  বঙ্গ বা বাংলা ভাষীদের মধ্যে,, যে কৃষ্ণের ধর্মীয় ভাবে যুগলপ্রেমে বন্দী মনের মাধুরী মিলিয়ে রাধা কৃষ্ণকে-দেখি।। (রাধারুপে তনু পোড়া  বৈষ্ণবীয় ভাষা) বঙ্গীয় বৈষ্ণবদের এবং বাংলা ভাষী সনাতন বা হিন্দু ধর্মের।। প্রতি গৃহে গৃহে যার ছবি রেখে পুজা করা হয়, সে কোন কৃষ্ণ-?বৈষ্ণবীয় একশ্রেনীর মতবাদ মথুরা জেলার বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ,, লীলা করতেন বিভিন্ন সখা সখীরা তার সহিত মিলিত হতেন।। বিষেশ করে রাধা সখী কৃষ্ণের বিভিন্ন সখীদের চেয়ে,, বেশি কষ্ট বা ত্যাগ স্বীকার করেই কৃষ্ণের লীলা সংগীনি হতে পেরেছেন। তবে আরও একটি বিষয় প্রাচিন ঐতিহাসিক নিদর্শনে দ্বারকায় রাজত্ব করতেন এক কৃষ্ণ।।উল্লেখ রাখা ভাল দ্বারকার কৃষ্ণের বাস্তবতার সঙ্গে বৃন্দাবনের কৃষ্ণের তথ্যের ভিত্তিতে কোন মিল নেই।। সুতরাং মহা ভারতের কৃষ্ণ একাধিক,, তথা বাস্তবের মাটিতে দাড়িয়েও কৃষ্ণ একাধিক।। উল্লেখিত সকল কৃষ্ণের বিষয় -ই- চৈতান্য মহাপ্রভু জানতেন।।চৈতন্য মহা প্রভু তন্নধ্যে কৃষ্ণকে কি রুপে দাড় করালেন।। কি সেই নামের ব্যাখা। সেই সূত্রপাত  থেকে মতুয়ারা যে মূল মন্ত্র উচ্চারণ করে সেটিকি আবিষ্কার হয়েছে -? না বেদ পুরান গ্রন্থে যাকে ইশ্বরঃ বলে নির্ণয় করেছে।। তাকেই মূলাধার বা মহা মন্ত্র উচ্চারণ (নাম রুপে) হরিগুরুচাঁদ ঠাকুরের বাস্তব মুখী মতুয়া ধর্মের উন্নয়নের কর্ম যজ্ঞকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে -? তার আগে চৈতন্য দেবের কর্মকাণ্ডের কিছু কথা না লিখলে অসম্পূর্ণ থেকেই যাবে।।**-********--****
চৈতন্য দেব একজন দার্শনিক, একজন গবেষক, একজন সমাজ সংস্কারক(সেকালের) ইহাতে সন্দেহের অবকাশ নেই,, এটা আমি মনে করি।।  এখানে আরও একটি বিষয় লক্ষ্য করবেন, লেখার মাধ্যমে স্পষ্ট করছি।। চৈতন্য দেব মানুষের মধ্যে যখন নগরে বেরিয়ে হরিনাম,, প্রচার করতে করতে বক্ষালিঙ্গন দিয়ে মানুষকে জরিয়ে ধরতেন।। সেই মানুষটি কি হিন্দু, মুসলিম, কি উচু কিংবা নিচু এটা তিনি কখনও ভাবতেন না।। এবিষয়টা যেমন চৈতন্য দেবকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় বই পুস্তকে নিদর্শন আছে।। ঠিক একই ভাবে ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী তাহা সু নির্দিষ্ট ভাবে ও  প্রমানিত।।আজকের দিনে অনেকে মনুবাদের বা ব্রাহ্মন্য বাদের বিরুদ্ধাচারন, করি বা করে থাকেন।।এটায় আমিও একমত।। তবে ব্রাহ্মন্য বাদের নিতীর বিরোধীতা করতে গিয়ে ব্যাক্তি ব্রাহ্মনদের বিরোধিতা করায়,, আমি সম্পূর্ণ বিপরীতে।। কারন ঠাকুর হরি গুরু চাঁদের সু শিক্ষা অবলম্বন করে হিংসা দিয়ে, হিংসা উৎখাত করা যায়না।। তাহলে তো বিগত দিনের শাস্ত্রীয় দর্শনে যে ভাবে মানুষকে পদ দলিত করে- দাস,দাসী,ব্রাহ্মন,চন্ডাল করে রেখেছে,, সেটারই পূনঃ উৎথাপিত করা হয়।।
আমরা খাটি মতুয়ারা এ-ই বিভেদ পছন্দ করি না।। আশাকরি আমার সাথে অনেকে এক মত হবেন।।কারন ঐ শাস্ত্রীয় রোষানলে যে মানুষ গুলো বিভক্ত হয়েছে হরি গুরু চাঁদ তাদেরকেই নিয়ে এক মহা জাতি গঠন করেছে।। যেটা তার উত্তরশুরি হয়ে মতুয়ারা দিন দিন করে চলছে।। যাহোক চৈতান্য দেবের কর্মকাণ্ডের দিগটা,,বা নাম প্রচারের ভেদা ভেদ কে না মানাটা।  তৎকালীন ব্রাহ্মন্য বাদী সমাজ সংস্কারকেরা মেনে নিতে পারেনি
।। কারন চৈতন্য দেবের তৎকালীন জাতিভেদ প্রথার উর্ধে উঠে হরিনাম প্রচার করাটা ই ব্রাহ্মন্য বাদী সমাজ ব্যাবস্থার উপর চরম ভাবে কুঠার আঘাত হানা হয়েছে।। সেই কুঠার আঘাতের প্রত্যাঘাত চৈতন্য দেবকে কতটা বিপাকে,, ফেলেছে।। নাকিনা সেটাকে টপকে গিয়ে চৈতন্য দেব রাজ ক্ষমতা অর্জন করে গৌড়ের সাম রাজ্য বিস্তার করেন।।যাহার মধ্যেও  লুকিয়ে থাকতে পারে মতুয়া উৎপত্তির ইতিহাস।। সংগে থাকুন আগামী পর্বে।। ********
যে কোন ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থী।।**********সবাই ভালো থাকবেন।। হরিবোল।।

শনিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০১৯

যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল এর খোলা চিঠি ও জীবনী।

বামে- যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল, ডানে- পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
পূর্ব বাংলার পিছিয়ে পড়া হিন্দু সমাজের অবস্থা উন্নয়নের জন্য আমার প্রচেষ্টার ব্যর্থতার পর চরম হতাশা এবং দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে আমি আপনার মন্ত্রীসভা থেকে পরদত্যাগ করছি। আমার মনে হয় আমার জানানো উচিত কেন ভারতীয় উপমহাদেশের এই ক্রান্তিকালে আমি এই সিদ্ধান্ত নিলাম।
১। আমার পদত্যাগের পিছনের কারণগুলো বলার আগে, আমার মনে হয় মুসলিম লীগের সাথে আমার সহযোগিতাকালে কি কি ঘটেছিল সেই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো বলা উচিত। ১৯৪৩ এর ফেব্রুয়ারিতে লীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার সাথে কথা হয়। আমি তাদের সাথে বাংলার প্রাদেশিক পরিষদে কাজ করার বিষয়ে সম্মত হই। ১৯৪৩ সালের মার্চে ফজলুল হকের মন্ত্রীসভার পতনের পর ২১ জন নমঃশূদ্র সদস্যের প্রত্যক্ষ সম্মতিতে তদানীন্তন মুসলিম লীগের নেতা কাজা নাজিমুদ্দিন ১৯৪৩ এর এপ্রিলে আবার মন্ত্রীসভা গঠন করেন। আমাদের সমর্থনের পিছনে কিছু শর্ত ছিল। এর ভিতর ছিল মন্ত্রীসভায় তিনজন নমঃশূদ্র মন্ত্রীকে নিয়োগ, নমঃশূদ্রদের লেখাপড়ার উন্নয়নে ৫ লাখ টাকা সহায়তা প্রদান এবং সরকারী চাকুরিতে কোটা প্রচলন করা।


২। এসব শর্তের বাইরেও মুসলিম লীগকে সহায়তার পেছনে আমার কিছু প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। প্রথমত, বাঙ্গালী মুসলিমদের সাথে নমঃশূদ্রদের অর্থনৈতিক স্বার্থের মিল রয়েছে। মুসলিমরা ছিল মূলত কৃষক-শ্রমিক, অস্পৃশ্যরাও তাই। মুসলিমদের একটি অংশের মত নমঃশূদ্রদের একটি অংশও ছিল জেলে। দ্বিতীয়ত, তারা উভয়েই ছিল লেখাপড়ার দিক দিয়ে পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী। আমাকে বোঝানো হয়েছিল যে লীগ এবং এর মন্ত্রিসভার সাথে আমার সহযোগিতা বিশাল পরিসরে আইনগত এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণে সহায়তা করবে। এই পদক্ষেপসমূহ ব্যক্তিগত স্বার্থ ও সুবিধাকে আমলে না নিয়ে বাংলার এই বিশাল জনগোষ্ঠীর পারস্পারিক উন্নতিতে ভূমিকা রাখবে এবং সাম্প্রদায়িক শান্তি-সৌহার্দ্য আরো মজবুত হবে, এমনটিই বলা হয়েছিল। এখানে উল্লেখ করা যায় যে খাজা নাজিমুদ্দিন তার মন্ত্রীসভায় অস্পৃশ্য সম্প্রদায়ের ৩ জন সদস্যকে নিয়েছিলেন। তিনি আমার এই সম্প্রদায় থেকে ৩ জনকে সংসদ সচিব হিসেবেও নিয়োগ দিয়েছিলেন।

সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রীসভাঃ
৩। মার্চ, ১৯৪৬ এর সাধারণ নির্বাচনের পর জনাব এইচ. এস. সোহরাওয়ার্দী সেই মাসেই লীগের সংসদ নেতার পদ পান এবং এপ্রিল, ১৯৪৬ এ লীগের মন্ত্রীসভা গঠন করেন। ফেডারেশনের টিকেটে কেবলমাত্র আমিই আমার সম্প্রদায়ের মধ্যে নির্বাচনে জয়লাভ করতে সক্ষম হই। আমি জনাব সোহরাওয়ার্দীর মন্ত্রীসভার অন্তর্ভূক্ত ছিলাম। সেই বছরের ১৬ আগস্ট কলকাতায় মুসলিম লীগ কর্তৃক ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন দিবস’ পালিত হয়। আপনার জানা আছে যে শেষ পর্যন্ত এটা এক হত্যাযজ্ঞে রূপ নেয়। হিন্দুরা লীগের মন্ত্রীসভা থেকে আমার পদত্যাগপত্র দাবী করে। আমি প্রতিদিন চিঠির মাধ্যমে হুমকি পেতে থাকি। আমার জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। কিন্তু আমি আমার পথে অবিচল থাকি। তদুপরি, আমি আমার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের পত্রিকা ‘জাগরণ’ এর মাধ্যমে নমঃশূদ্রদের কাছে আবেদন জানাই তারা যেন নিজেদের কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের এই রক্তাক্ত লড়াই থেকে দূরে রাখে। আমার অস্পৃশ্য সম্প্রদায়ভুক্ত প্রতিবেশীগণ যেভাবে আমাকে ক্রুদ্ধ হিন্দুদের হাত থেকে নিরাপত্তা দেন তা আমি কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করি। কলকাতা হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৪৬ এর অক্টোবরে শুরু হয় নোয়াখালীর দাঙ্গা। সেখানে শত শত হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষকে(নমঃশূদ্র সহ) হত্যা করা হয় এবং জোরপূর্বক ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়। হিন্দু মহিলারা অপহরণ এবং ধর্ষণের শিকার হন। আমার সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষেরও জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি ঘটে। তাৎক্ষণিকভাবে আমি ত্রিপুরা ও ফেনী যাই এবং কিছু দাঙ্গাপীড়িত এলাকা পরিদর্শন করি। হিন্দুদের দুর্দশা আমাকে গভীরভাবে ব্যথিত করে, কিন্তু আমি মুসলিম লীগের সাথে সহযোগিতা চালিয়ে যাই। কলকাতার বিশাল হত্যাযজ্ঞের পরপর সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রীসভার বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে এক ভোটাভুটি আয়োজিত হয়। শুধুমাত্র আমার চেষ্টা দ্বারাই কংগ্রেসের পক্ষের চারজন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সদস্য এবং চারজন অস্পৃশ্য সদস্যের সমর্থন যোগাড় করা সম্ভব হয় যা ব্যতীত মন্ত্রীসভার পরাজয় ছিল অবশ্যম্ভাবী।
৪। ১৯৪৬ এর অক্টোবরে সম্পূর্ণ অননুমিতভাবেই জনাব সোহরাওয়ার্দীর মাধ্যমে আমার কাছে প্রস্তাব আসে ভারতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে একটি পজিশন গ্রহণ করার জন্য। এক ঘণ্টার মধ্যে আমাকে আমার সিদ্ধান্ত জানাতে বলা হয়। বেশকিছু সময় দোদুল্যমান থাকার পর আমি এই শর্তে রাজি হই যে আমার নেতা ড. বি. আর. আম্বেদকার যদি আমাকে ঐ জায়গায় না চান তবে আমাকে পদত্যাগের অনুমতি প্রদান করা হবে। ভাগ্যক্রমে, তিনি লন্ডন থেকে টেলিগ্রামের মাধ্যমে তাঁর অনুমতি প্রদান করেন। আইনসভার সদস্য হিসেবে যোগদানের লক্ষ্যে দিল্লীতে রওনা দেয়ার আগে আমি তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী জনাব সোহরাওয়ার্দীকে রাজি করাতে সক্ষম হই যে তিনি আমার স্থানে ২ জন মন্ত্রীকে মন্ত্রীসভায় জায়গা দিবেন। তিনি নমঃশূদ্রদের ফেডারেশন গ্রুপ থেকে ২ জনকে সংসদ সচিব হিসেবে নিয়োগ দিতেও সম্মত হন।
৫। আমি ১৯৪৬ সালের ১ নভেম্বর মধ্যবর্তী সরকারে যোগ দেই। এক মাস পর কলকাতাতে আমি যাই। তখন জনাব সোহরাওয়ার্দী আমাকে জানালেন পূর্ব বাংলার বিভিন্ন জায়গাতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার কথাঃ বিশেষ করে গোপালগঞ্জের কিছু জায়গাতে যেখানে নমঃশূদ্ররা সংখ্যাগরিষ্ঠ। তিনি আমাকে অনুরোধ করলেন সেই অঞ্চলগুলো পরিদর্শনে যেতে এবং মুসলিম ও নমঃশূদ্রদের মাঝে সমঝোতা করতে। সেইসব এলাকার নমঃশূদ্ররা মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আমি কয়েক ডজন সভা করে তাদেরকে সেই পথ থেকে দূরে ছড়িয়ে আনি। একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থেকে সে এলাকা মুক্তি পায়।
৬। কয়েকমাস পর ব্রিটিশ সরকার তাদের ৩ জুন ঘোষণা (১৯৪৭) প্রদান করে যাতে ভারত ভাগ বিষয়ে কিছু প্রস্তাবনার অবতারণা করা হয়। পুরো দেশ, বিশেষ করে সমগ্র অমুসলিম ভারত এতে হতবাক হয়ে যায়। সত্যি কথা বলতে আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবিকে আমি সবসময় শুধুমাত্র দামাদামির অংশ হিসেবেই দেখে এসেছি। যদিও আমি বিশ্বাস করি যে ভারতের সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিতে উঁচুবর্ণের হিন্দুদের অন্যায় প্রভাবের বিরুদ্ধে মুসলিমদের ক্ষোভ ন্যায়সঙ্গত, এ বিষয়ে আমার দৃষ্টিভঙ্গী পরিষ্কার যে পাকিস্তানের জন্ম সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান কখনোই করবে না। বরঞ্চ, এটা কেবলমাত্র সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও শত্রুতা বৃদ্ধিই করবে। পাশাপাশি আমি এই ধারণা পোষণ করতাম যে পাকিস্তানের সৃষ্টি মুসলিমদের অবস্থা উন্নয়ন করবে না। দেশভাগের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হিসেবে আসবে দরিদ্রতা, অশিক্ষা এবং উভয় দেশের জনগণের দুর্দশা যা অনির্দিষ্টকাল না হলেও বহুদিন ধরে চলতে থাকবে। আমার আশঙ্কা ছিল পাকিস্তান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে পশ্চাৎপদ এবং অনুন্নত দেশগুলোর একটিতে পরিণত হবে।
লাহোর ঘোষণাঃ
৭। আমি আগেই সন্দেহ করেছিলাম যে পাকিস্তানকে ইসলামী শরিয়ত এবং নিয়ম-নীতির উপর ভিত্তি করে একটি শতভাগ ‘ইসলামী’ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়াস করা হবে, যা এখন করা হচ্ছে। আমার অনুমান ছিল মার্চ ২৩, ১৯৪০ এ মুসলিম লীগের গৃহীত ঘোষণা অনুসারে সকল গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ ঘটানো হবে। অন্যান্য জিনিসের মাঝে এই ঘোষণায় ছিলঃ ১- ভৌগলিকভাবে পাশাপাশি অবস্থিত স্থানসমূহ প্রয়োজনীয় ভূমির অদল-বদলের মাধ্যমে এমনভাবে ভাগ করা হবে যেন ভারতের উত্তর-পশ্চিম এবং পূর্বাঞ্চলের মত মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে স্বাধীন-সার্বভৌম একাধিক রাষ্ট্র গঠন করা যায় এবং ২- এসব অঞ্চলের সংখ্যালঘুদের নিজস্ব ধর্ম, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং অন্যান্য স্বার্থ-অধিকার রক্ষার নিমিত্তে তাদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সংবিধানে যথেষ্ঠ, কার্যক্ষম ও আবশ্যিক নিরাপত্তা প্রদানের ধারা যুক্ত করা হবে। এই ঘোষণার মধ্যে অন্তর্নিহিত ছিল ক) উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বের মুসলিম অঞ্চলগুলোতে ২টি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করা হবে, খ) এই রাষ্ট্রগুলোর অংশসমূহ হবে স্বাধীন ও স্বায়ত্বশাসিত, গ) সংখ্যালঘুদের প্রদত্ত নিশ্চয়তা তাদের স্বার্থ ও অধিকার সংশ্লিষ্ট হবে এবং জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে তা ভূমিকা রাখবে এবং ঘ) সংবিধানে সংখ্যালঘুদের এই সাংবিধানিক সুবিধাদি সংখ্যালঘুদের নিজেদের দ্বারাই নির্বাচিত হবে। গণপরিষদের সভাপতি হিসেবে কায়েদ-ঈ-আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এর ১১ আগস্ট ১৯৪৭ এ দেয়া ভাষণ এই ঘোষণা ও লীগের নেতৃবৃন্দের ব্যাপারে আমার বিশ্বাস আরো পোক্ত করে। এই ভাষণে তিনি হিন্দু ও মুসলিম উভয় পক্ষকেই সমানভাবে বিবেচনার দৃঢ় আশ্বাস প্রদান করেন এবং তাদের আহ্বান করেন এটা মনে রাখতে যে তারা সবাই পাকিস্তানী। ইসলামিক রাষ্ট্র ও তার মুসলিম নাগরিকদের সার্বক্ষণিক হেফাজতে সেখানে ধর্মের ভিত্তিতে পূর্ণাংঙ্গ মুসলিম এবং ‘জিমি’দের মধ্যে কোনোরূপ ভেদাভেদের প্রশ্নই ছিলনা। এটা প্রতীয়মান হয় যে আপনার জ্ঞাতসারে এবং সম্মতিক্রমে কায়েদ-ঈ-আজমের ইচ্ছা ও মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী হিসেবে এই সকল ওয়াদার বরখেলাপ করা হচ্ছে যা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য ক্ষতি ও অপমানের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলা ভাগ হল
৮। এই প্রসঙ্গে এটা বলে রাখা ভালো যে বাংলা ভাগের সময় আমাকে প্রবল বিরোধের মুখে পড়তে হয়েছিল। এই ধরণের ক্যাম্পেইনের ফল আমি শুধু বিরোধিতার সম্মুখীন হই নাই, হয়েছি শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত, অপমানিত এবং অবজ্ঞার শিকার। হতাশার সাথে আমি সেই সব দিনের কথা চিন্তা করতে চাই যখন ভারতবর্ষের ৩২ কোটি হিন্দু আমাকে হিন্দু এবং হিন্দু ধর্মের শত্রু বানিয়ে ছিল।আমি ছিলাম পাকিস্তানের প্রতি একান্ত অনুগত এবং অবিচল আস্থা। আমি চিন্তা করতাম পাকিস্তানের ৭০ লক্ষ হিন্দু দলিতের কথা যারা ছিল আমার সাথে। তারাই আমাকে সর্বদা সাহস যুগিয়েছে এবং অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।
৯। ১৪ আগস্ট, ১৯৪৭এ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হবার পর আপনি পাকিস্তান মন্ত্রীসভা গঠন করেন। আমি এর একজন সদস্য ছিলাম। খাজা নাজিমুদ্দিন পূর্ব বাংলার জন্য একটি প্রাদেশিক মন্ত্রীসভা গঠন করেন। আগস্টের ১০ তারিখে আমি করাচীতে খাজা নাজিমুদ্দীনের সাথে কথা বলে পূর্ব বাংলার মন্ত্রীসভায় নমঃশূদ্রদের মধ্যে থেকে ২ জনকে নিয়োগ দেয়ার জন্য অনুরোধ করি। তিনি কিছুদিন পরেই তা করবার আশ্বাস দেন। পরবর্তীতে এ ব্যাপারে আপনার, খাজা নাজিমুদ্দীন এবং পূর্ব বাংলার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিনের সাথে আমার অপ্রীতিকর এবং হতাশাজনক আপসরাফা চলে। যখন আমি বুঝতে পারলাম যে খাজা নাজুমুদ্দীন এই-সেই অজুহাতে ব্যাপারটিকে এড়িয়ে চলছেন তখন আমি একইসাথে ক্রুদ্ধ এবং অধৈর্য হয়ে পড়লাম। আমি এই ব্যাপারে পাকিস্তান মুসলিম লীগে এবং এর পূর্ব বাংলা শাখার সভাপতিদ্বয়ের সাথেও আলোচনা করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমি ঘটনাটি আপনার গোচরে আনি। আপনি সাগ্রহে আমার উপস্থিতিতে আপনার বাসায় খাজা নাজিমুদ্দীনের সাথে এই ব্যাপারে আলোচনা করেন। খাজা নাজিমুদ্দীন ঢাকায় ফিরে অস্পৃশ্য সম্প্রদায়ভুক্ত একজনকে মন্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে সম্মত হন। তার আশ্বাসের ব্যাপারে ইতোমধ্যেই সন্দেহবাতিকগ্রস্ত হয়ে ওঠায় আমি কাজটি সম্পাদনের নির্দিষ্ট সময়-সূচী জানতে চাই। আমি জোর দাবী জানাই এই ব্যাপারে এক মাসের মধ্যে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য, অন্যথায় পদত্যাগের ব্যাপারে আমার সিধান্তে কেউ বাধা দিতে পারবে না। আপনারা দুজনেই এই প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করেন। কিন্তু হায়, সম্ভবত আপনার মুখের কথা আপনার মনের প্রতিচ্ছবি ছিল না। খাজা নাজিমুদ্দীন তার ওয়াদা পালন করেন নি। জনাব নুরুল আমিন পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী হবার পর আমি তার কাছেও এই বিষয়টি নিয়ে যাই। তিনিও সেই পুরাতন এড়িয়ে চলার নীতি চালিয়ে যান। ১৯৪৯ এ আপনার ঢাকা আগমনের প্রাক্কালে যখন আমি ব্যাপারটি আবারো আপনার গোচরে আনি আপনি আমাকে আশ্বস্ত করেন যে পূর্ব বাংলায় সংখ্যালঘু মন্ত্রী অবশ্যই নিয়োগপ্রাপ্ত হবে। আপনি আমার কাছে বিবেচনার জন্য ২/৩ জনের নামও চান। আপনার চাওয়ার প্রতি সশ্রদ্ধ বাধ্যবাধকতা প্রদর্শন করে আমি আপনার কাছে পূর্ব বাংলা পরিষদের ফেডারেশন গ্রুপ এবং ৩ জনের নাম সুপারিশ পূর্বক চিঠি পাঠাই। আপনি ঢাকা থেকে ফেরার পর আমি বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিতে গেলে আপনি কঠিন মনোভাব প্রকাশ করেন এবং “নুরুল আমিনকে দিল্লী থেকে ফিরতে দাও” কেবলমাত্র এই মন্তব্যটুকু করেন। কিছুদিন পর আমি আবার বিষয়টি তুলে ধরি, কিন্তু আপনি তা এড়িয়ে যান। তখন আমি এই উপসংহারে আসতে বাধ্য হই যে আপনি বা নুরুল আমিন কেউই চান না যে পূর্ব বাংলা মন্ত্রীসভায় কোনো নমঃশূদ্র ব্যক্তি নিয়োগ পাক। এছাড়াও আমি দেখতে পারছিলাম যে জনাব নুরুল আমিন এবং পূর্ব বাংলা লীগের কিছু নেতৃবৃন্দ নমঃশূদ্রদের ফেডারেশন সদস্যদের মধ্যে বিভাজন তৈরির চেষ্টা করছিলেন। আমার কাছে প্রতীয়মান হয় যে আমার নেতৃত্ব এবং বিশাল জনপ্রিয়তাকে খারাপ চোখে দেখা হচ্ছে। পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে নমঃশূদ্রদের স্বার্থ সংরক্ষণে আমার স্পষ্টবাদিতা, তদারকি এবং আন্তরিক কার্যকলাপ পূর্ব বাংলা সরকার এবং লীগের কিছু নেতার মনে বিরক্তির সৃষ্টি করে। কিন্তু এসব কিছুর পরোয়া না করে আমি পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের স্বার্থ সংরক্ষণে দৃঢ় ভূমিকা গ্রহণ করি।
হিন্দু বিদ্বেষী নীতি
১০। বাংলা ভাগের প্রসঙ্গ উঠতেই নমঃশূদ্ররা এর বিপদজনক ফলাফলের কথা অনুমান করে শঙ্কিত হয়ে উঠেছিল। তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী জনাব সোহরাওয়ার্দীর কাছে তারা কিছু প্রতিনিধি পাঠালে তিনি সানন্দে একটি প্রেস রিলিজ ইস্যু করেন যাতে বলা ছিল নমঃশূদ্ররা ভোগ করছে এমন কোনো সুবিধা ও অধিকারই কর্তন করা হবেনা, বরং আরো বৃদ্ধি পাবে। জনাব সোহরাওয়ার্দী এই আশ্বাস কেবলমাত্র ব্যক্তিগত ভাবেই দেননি, লীগ মন্ত্রীসভার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবেও দিয়েছেন।অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে যে ভারত ভাগের পরে, বিশেষ করে কায়েদ-ঈ-আজমের মৃত্যুর পর থেকে নমঃশূদ্ররা কোনো বিষয়েই তাদের প্রাপ্য বুঝে পায়নি। আপনার স্মরণে থাকবে যে আমি সময়ে সময়ে এই অস্পৃশ্য জাতিগোষ্ঠীর দুর্দশার চিত্র আপনার সামনে তুলে ধরেছি। বেশকিছু ক্ষেত্রে পূর্ব বাংলার অকার্যকর প্রশাসনের চিত্র আপনার কাছে ব্যাখ্যা করেছি। পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ দাখিল করেছি। অসার ভিত্তির উপর নির্ভর করে পুলিশের বর্বর নৃশংসতার ঘটনাসমূহও আমি আপনার নজরে এনেছি। পূর্ব বাংলার সরকার বিশেষ করে পুলিশ প্রশাসন ও মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দের একাংশের হিন্দু বিদ্বেষী নীতির কথা আপনাকে জানাতেও আমি কুণ্ঠাবোধ করিনি।

কিছু
 ঘটনাঃ
১১। প্রথম যে ঘটনা আমাকে মর্মাহত করে তা ঘটেছিল গোপালগঞ্জের দিঘারকুল গ্রামে। সেখানে স্থানীয় নমঃশূদ্রদের বিরুদ্ধে মুসলিমরা মিথ্যা অভিযোগে গুজব রটিয়ে বর্বরতা চালায়। প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে একজন মুসলিম জেলে মাছ ধরতে জাল ছুঁড়ে মারে। একজন নমঃশূদ্র একই উদ্দেশ্যে জাল ছুঁড়ে মারে। এই নিয়ে দুইজনের ভিতর কথা কাটাকাটি হয়। মুসলিম যুবক গ্রামে গিয়ে মিথ্যা গুজব রটায় যে তাকে এবং এক মহিলাকে নমঃশূদ্ররা আক্রমণ করেছে। গোপালগঞ্জের উপ জেলা প্রশাসক সে সময় নৌকায় করে সে জায়গা দিয়ে যাচ্ছিলেন। তার কাছে অভিযোগ করলে তিনি কোন তদন্ত ছাড়াই সশস্ত্র পুলিশ পাঠান নমঃশূদ্রদের দমন করতে। তাদের সাথে স্থানীয় মুসলিমরা যোগ দেয়। তারা নমঃশূদ্র হিন্দুদের উপর নির্মম অত্যাচার চালায়। তাদের হামলায় বাড়িঘর ধ্বংস হয়, প্রচুর নারী পুরুষ আহত হয়। শেষ সহায় সম্বলটুকু লুট করে নিয়ে যায় মুসলিমরা। এক হিন্দু মহিলা যিনি কিনা ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা তাকে পিটিয়ে গর্ভপাত করে দেয় তারা। বিশাল এলাকা জুড়ে আতংক সৃষ্টি হয়।
১২। হিন্দুদের উপর পুলিশ দিয়ে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের পরের ঘটনা ঘটে ১৯৪৯ সালের শুরুতে। বরিশাল জেলার গৌরনদীর পুলিশ সুপারের অধীনে। পুলিশের একদল সোর্স তাদের প্রতিপক্ষকে কমিউনিস্ট বলে চালিয়ে দেয় পুলিশের কাছে। তারা এও বলে ঐ পক্ষ পুলিশ স্টেশন আক্রমণ করবে। গৌরনদী থানার ওসি এই শুনে কোনরকম সত্যতা যাচাই না করে হেডকোয়ার্টার থেকে পুলিশের রিসার্ভ ব্যাটালিয়ন নিয়ে আসেন। পুলিশ বাহিনী বিশাল এলাকা অবরুদ্ধ করে লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগ চালায়। প্রচুর লোককে গ্রেপ্তার করা হয়। শিক্ষক এবং ছাত্রদের কমিউনিস্ট সন্দেহে আটক করা হয়। তাদের উপর নির্যাতন চালানো হয়। আমি ঘটনাটা জানতে পারি কারণ ঘটনাস্থল আমার গ্রামের বাড়ির কাছেই। আমি জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপারকে জানাই এবং নির্দেশ দেই ঘটনা তদন্তের জন্য। কিন্তু আমার চিঠিতে কোন কাজ হয় নাই। আমি তখন পাকিস্তানের সর্বোচ্চ মহল মানে আপনার কাছে ঘটনাটা জানাই। কিন্তু আপনি কোন ব্যবস্থা নেন নাই।
সামরিক বাহিনী দিয়ে মহিলাদের উপর নির্যাতন
১৩। সিলেট জেলার হাবিবগড়ের নিরীহ হিন্দুদের উপর পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী এবং পুলিশ বাহিনীর অত্যাচারের বিষদ বিবরণ দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করছি। নিরীহ হিন্দু এবং মহিলাদের উপর  নির্মম নির্যাতন চলে। বিশেষ করে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা এর শিকার হয়। মহিলাদের শ্লীলতাহানি করা হয় এবং তাদের বাড়িঘরে লুটপাট চলে। পুলিশের সাথে স্থানীয় মুসলিমরা যোগ দেয়। সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে হিন্দু মহিলাদের নিয়ে ধর্ষণ করা হয়। আমি আপনার কাছে এই ঘটনার কথাও রিপোর্ট করেছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আপনি তদন্তের আশ্বাস দিয়েও এর কোন সুরাহা করেন নাই।
১৪। রাজশাহীর নাচোলে একটি ঘটনার কথা বলি। কমিউনিস্টদের দমনের নামে পাকিস্তানের পুলিশ স্থানীয় মুসলিমদের নিয়ে হিন্দুদের উপর নির্যাতন চালায় এবং তাদের সম্পদ লুটপাট করে। স্থানীয় সাঁওতালরা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। তারা সেখানে তাদের উপর চালানো বর্বরতার কথা বলে।
১৫। খুলনা জেলার মোল্লারহাটের অন্তর্গত কালশিরা গ্রামে ২০ ডিসেম্বর,১৯৪৯ এ ঘটে যাওয়া ঘটনাটি নির্মম ও ঠাণ্ডা মাথায় ঘটানো এসব ঘটনার একটি উদাহরণ। সেদিন গভীর রাত্রে কালশিরা গ্রামের জনৈক জয়দেব ব্রাহ্মা এর বাড়িতে সন্দেহজনক কমিউনিস্টদের খোঁজে ৪ জন কনস্টেবল হানা দেয়। পুলিশের আসার সংবাদে জনা ছয়েক তরুণ, কমিউনিস্ট বা সাধারণ, বাড়িটি ছেড়ে পালিয়ে যায়। পুলিশ বাড়িতে ঢুকে জয়দেব ব্রাহ্মার স্ত্রী এর উপর আক্রমণ চালালে তার চিৎকার তার স্বামী এবং বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া তার কিছু সঙ্গীর কানে আসে। মরিয়া হয়ে তারা গৃহে পুনঃপ্রবেশ করে এবং ৪ জন কনস্টেবলকে কেবলমাত্র একটি বন্দুক সহ পায়। সম্ভবত এই দৃশ্য তাদের প্রণোদিত করে এবং তাদের আঘাতে অস্ত্রধারী কনস্টেবলটি ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। তারা তারপর দ্বিতীয় কনস্টেবলের উপরও হামলা চালালে বাকি ২ জন সেখান থেকে পালিয়ে যেয়ে আশেপাশের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন এবং সফল হন। কিন্তু গ্রামবাসী এগিয়ে আসবার আগেই রাতের অন্ধকারে অপরাধীগণ মৃতদেহসহ গা ঢাকা দেয়। পরদিন বিকেলে খুলনার এস.পি. একদল মিলিটারি এবং আর্মড পুলিশসহ ঘটনাস্থলে পৌঁছান। ইতোমধ্যে অপরাধীগণ এবং বুদ্ধিমান প্রতিবেশীগণ অত্র এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। কিন্তু বেশিরভাগ গ্রামবাসীই তাদের নিজ ঘরেই রয়ে যায় কারণ তারা ছিল সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং পরবর্তীতে কি ঘটতে পারে সে সম্বন্ধে তাদের কোনো ধারণাই ছিলনা।
এর পর এসপি, মিলিটারি ও আর্মড পুলিশ পুরো গ্রামজুড়ে নিরীহ গ্রামবাসীকে মারধর শুরু করে এবং আশেপাশের মুসলিমদের লুটপাটে প্ররোচিত করে। বেশকিছু মানুষ নিহত হয়, বহু হিন্দু নর-নারীকে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হয়। বাসাবাড়ির দেব-দেবীর মূর্তি ভাঙচুর করা হয়, পূজোর স্থান অপবিত্র ও ধ্বংস করে দেয়া হয়। পুলিশ, মিলিটারি এবং স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্য কর্তৃক হিন্দু মহিলারা ধর্ষিত হন। এভাবে শুধুমাত্র এক থেকে দেড় মাইল দৈর্ঘ্যের গ্রাম, এক বিরাট জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল কালশিরাই নয়, এর আশেপাশের বেশকিছু নমঃশূদ্র গ্রামেও বাস্তবিক অর্থেই নরক নেমে আসে। কালশিরা গ্রামটি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক কখনোই কমিউনিস্ট কার্যকলাপের জন্য সন্দেহের তালিকাভুক্ত ছিল না। কালশিরা থেকে ৩ মাইল দূরবর্তী ঝালরডাঙ্গা গ্রামটি কমিউনিস্ট কার্যকলাপের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। ঘটনার দিন এই গ্রামটিতে সন্দেহভাজন কমিউনিস্টদের ধরতে পুলিশের এক বিরাট বাহিনী হানা দিলে তাদের কিছু সংখ্যক পালিয়ে কালশিরা গ্রামের পূর্বোল্লিখিত বাড়িতে আশ্রয় নেয় যা তাদের কাছে নিরাপদ আত্মগোপনের স্থান হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল।
১৬। ১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আমি কালশিরা গ্রাম এবং তার সংলগ্ন গ্রামগুলো পরিদর্শন করতে যাই। খুলার পুলিশ সুপার এবং মুসলিম লীগের নেতারা আমার সাথে ছিলেন। আমি যখন কালশিরাতে পৌঁছাই এক ধ্বংসপ্রাপ্ত বিরানভূমি দেখি। পুলিশ সুপ্র জানা এখানে ৩৫০ বাড়ি ছিল। এর ভিতর মাত্র ৩ টি বাড়ি টিকে আছে। সব লুটপাট করা হয়েছে। আমি পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী, প্রধান সচিব, পুলিশ প্রধান এবং আপনার কাছে ঘটনাটি জানিয়ে ছিলাম।
১৭। কালশিরার ঘটনা পশ্চিমবাংলার পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সেখানে হিন্দুদের মাঝে উত্তেজন দেখা দেয়। এই ঘটনায় বেঁচে যাওয়া হিন্দুরা সেখানে গিয়ে এই ভয়াবহতার কথা বললে সেখানে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা দেখা দেয়।

ফেব্রুয়ারির
 হিংসার কারণগুলো
১৮। এটা স্বীকার করতেই হবে কালশিরার মত পূর্ব বাংলার হানাহানির ফলে পশ্চিম বাংলাতেও সাম্প্রদায়িক হিংসা দেখা দেয়। পূর্ব বাংলার মিডিয়ার খবর সেখানে আলোড়ন ফেলে। ১৯৫০ এর ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে পূর্ব বাংলার আঞ্চলিক পরিষদে বাজেট অধিবেশনে সংসদ সদস্যরা স্পীকারের কাছে অনুমতি চান কালশিরা এবং নাচোলের পরিস্থিতি নিয়ে সম্পূরক আলোচনা করার জন্য। কিন্তু অনুমতি নিলে নাই। সদস্যরা প্রতিবাএ ওয়াক আউট করেন। কপ্রাদেশিক পরিষদের হিন্দু সদস্যদের এই প্রতিবাদ মুসলিম  মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং অফিসারদের রুষ্ট করে। সম্ভবত ১৯৫০ এর ফেব্রুয়ারিতে পূর্ব বাংলার হিংসার কারণ এটাই।
১৯। ১৯৫০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০ টা। ঢাকায় পূর্ব বাংলার সচিবালয়ে একজন মহিলাকে হাজির করা হয়। তার স্তন কাটা ছিল। বলা হয় সে কলকাতা দাঙ্গার শিকার। সাথে সাথে সচিবালয়ের কর্মকর্তা কর্মচারীরা কাজ বন্ধ করে হিন্দুদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দেয়। তারা মিছিল বের করে এবং হিন্দুদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক শ্লোগান দেয়। মিছিল ক্রমে বড় হয় এবং একসময় এক মাইল লম্বা হয়। ভিক্টোরিয়া পার্কের কাছে মিছিল শেষ হয় দুপুর বারোটার দিকে। সেখানে হিন্দুদের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দেওয়া হয়। এর ভিতর ছিল কিছু শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা।
সবথেকে মজার বিষয় হচ্ছে যখন সচিবালয়ের কর্মকর্তারা হিন্দুদের বিরুদ্ধে এই মিছিল বের করেছিলেন তখন পূর্ব বাংলার প্রধান সচিব পশ্চিমবাংলার প্রধান সচিবের সাথে সংবাদ সম্মেলন করছিলেন খোদ সচিবালয়ে কিভাবে দুই বাংলার সাম্প্রদায়িক হিংসা কমানো যায় সেই বিষয়ে!!!
সরকারী কর্মকর্তাদের মদদে লুটেরাদের হামলা

২০।  দাঙ্গা শুরু হল সেদিন দুপুর একটার দিকে। সারা শহরে একই সাথে। সারা শহরে হিন্দুদের হত্যা, লুণ্ঠন আর অগ্নিসংযোগ চলতে থাকে। মুসলিমরা পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতেই এইসব অপরাধ চালায়। হিন্দুদের স্বর্ণের দোকানে পুলিশের উপস্থিতিতেই লুটপাট চলে। এমনকি তারা লুটেরাদের দিকনির্দেশনাও দেয় কিভাবে লুটপাট করতে হবে সে বিষয়ে। আমি সেদিন অর্থাৎ ১৯৫০ এর ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় এসে পৌঁছাই বিকাল পাঁচটার দিকে। আমি কাছ থেকেই ঘটনাগুলো দেখি। যা দেখেছি এবং যা শুনেছি সত্যি তা ছিল মর্মস্পর্শী এবং হৃদয়বিদারক।
২১। ঢাকার দাঙ্গার পেছনে প্রধান কারণ ছিল ৫টিঃ
(i) কালশিরা এবং নাচোলের ঘটনাসমূহের উপর আনিত ২টি মুলতবি প্রস্তাব গণপরিষদে প্রত্যাখ্যাত হলে হিন্দু প্রতিনিধিদের স্পর্ধিত ওয়াক আউটের জন্য হিন্দুদের শিক্ষাপ্রদানের উদ্দেশ্যে
(ii)  সংসদীয় দলে সোহরাওয়ার্দী গ্রুপ এবং নাজিমুদ্দীন গ্রুপের মাঝে দিনকে দিন বেড়ে চলা মতবিরোধ ও পার্থক্য
(iii) পূর্ব বাংলার মন্ত্রণালয় এবং মুসলিম লীগ হিন্দু-মুসলিম উভয় পক্ষের নেতাদের দ্বারা পূর্ব-পশ্চিম দুই বাংলার মিলনের স্বপক্ষে একটি আন্দোলন শুরু হতে পারে এমন ভয়ে ভীত ছিল। তারা এই মিলন রোধ করতে চাইছিল। তাদের পরিকল্পনা ছিল যে পূর্ব বাংলায় যেকোনো বড় আকারের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রভাব পশ্চিম বঙ্গেও পড়বে এবং সেখানে মুসলিমদের হত্যার ঘটনা ঘটতে পারে। উভয় বঙ্গে এরূপ দাঙ্গা দুই বাংলার মিলনকে অসম্ভব করে তুলবে বলে তাদের বিশ্বাস ছিল।
(iv) পূর্ব বাংলার বাঙালী এবং অবাঙালী মুসলিমদের মধ্যে বৈরিতা ক্রমশ বাড়ছিল। এটা রোধের একমাত্র উপায় ছিল পূর্ব বঙ্গের মুসলিম ও হিন্দুদের মধ্যে ঘৃণার বিষবাষ্প ছড়ানো। ভাষার ব্যাপারটিও এর সাথে জড়িত ছিল এবং
(v) অবমূল্যায়নে অসম্মতি এবং ইন্দো-পাকিস্তান ব্যবসার ক্ষেত্রে অচলাবস্থার ফলাফল পূর্ব বাংলায় অনুভূত হচ্ছিল, প্রথমে শহরাঞ্চলে পরবর্তীতে গ্রামাঞ্চলেও। মুসলিম লীগের সদস্য এবং কর্মকর্তাগণ এই আসন্ন অর্থনৈতিক ধ্বস থেকে জনগণের মনোযোগ সরিয়ে দিতে হিন্দুদের বিরুদ্ধে জিহাদের সূচনা করতে চেয়েছিলেন।
হতভম্বকারী বর্ণনা-প্রায় ১০,০০০ মৃত্যুঃ
২২। ঢাকায় আমার ৯ দিনের অবস্থানকালে আমি শহর ও শহরতলীর বেশিরভাগ দাঙ্গা আক্রান্ত অঞ্চলে গিয়েছি। তেজগাঁও এর অন্তর্ভুক্ত মিরপুরেও আমার যাওয়া হয়েছে। আমি সবচেয়ে মর্মাহত হয়েছি ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে ট্রেনে শত শত নিরপরাধ হিন্দু হত্যার খবরে। ঢাকার দাঙ্গার দ্বিতীয় দিনে আমি পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর সাথে দেখা করে তাকে অনুরোধ করি দাঙ্গা যেন জেলা শহর ও গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে না পারে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ যেন তিনি অবিলম্বে জেলা কর্তৃপক্ষ গুলোর নিকট পৌঁছে দেন। ২০ ফেব্রুয়ারী, ১৯৫০ তারিখে আমি বরিশাল শহরে পৌঁছে সেখানকার ঘটনা শুনে বিস্মিত হয়ে যাই। জেলা শহরে বেশকিছু হিন্দু ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়, প্রচুর হিন্দু নিহত হয়। আমি জেলাটির প্রায় সব দাঙ্গা আক্রান্ত অঞ্চল পরিদর্শন করেছি। জেলা শহরের ৬ মাইলের মধ্যে অবস্থিত এবং গাড়ি চলাচলের রাস্তা দিয়ে সংযুক্ত কাশিপুর, মাধবপাশা, লাকুটিয়ার মত জায়গাগুলোয় ধ্বংসযজ্ঞের পরিমাণ দেখে আমি বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম। মাধবপাশা জমিদার বাড়িতে প্রায় ২০০ মানুষ নিহত হন, আহত হন আরো অন্তত ৪০ জন। মুলাদী নামক স্থানে যেন নরক নেমে আসে। স্থানীয় মুসলিমদের ও কিছু কর্মকর্তার ভাষ্য অনুসারে শুধু মুলাদী বন্দরেই ৩০০এর বেশি লোক নিহত হয়। আমি মুলাদী গ্রামও পরিদর্শন করি এবং সেখানে মৃতদেহের কঙ্কাল পড়ে থাকতে দেখি। কুকুর এবং শকুন নদীর ধারে মৃতদেহ কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল। আমাকে অবগত করা হয় যে সকল পূর্ণবয়স্ক পুরুষকে হত্যার পর সমস্ত যুবতীদের দুর্বৃত্ত দলের হোতাদের মাঝে ভাগ করে দেয়া হয়। রাজাপুরের অন্তর্গত কৈবর্তখালী নামক স্থানে ৬৩ জন নিহত হয়। থানা থেকে ঠিল ছোঁড়া দূরত্বে অবস্থিত হিন্দু বাড়িগুলোতেও লুটপাট করে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়, সেগুলোতে বসবাসকারীদের হত্যা করা হয়। বাবুগঞ্জ বাজারের সকল হিন্দু দোকানে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে, বহু হিন্দু নিহত হয়। বিস্তারিত বর্ণনা পাবার পর কম করে ধরলেও দেখা যায় শুধুমাত্র বরিশাল জেলাতেই ২,৫০০ প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সব মিলিয়ে পূর্ব বঙ্গে মৃতের সংখ্যা ছিল প্রায় ১০ হাজার! সব খোয়ানো নারী-শিশুদের স্বজন হারাবার হাহাকারে আমার হৃদয় দ্রবীভূত হয়ে গিয়েছিল। আমি নিজের কাছেই জানতে চাইলাম “ইসলামের নামে পাকিস্তানে কি ঘটতে চলেছে”।
দিল্লী চুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিকতার অভাবঃ
২৩। মার্চের শেষভাগে বিশাল সংখ্যায় হিন্দুরা বাংলা ছাড়তে শুরু করে। মনে হচ্ছিল কিছুদিনের মধ্যেই সকল হিন্দু ভারতে চলে যাবে। ভারতে রণধ্বনি বেজে উঠলো। পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়ল। জাতীয় দুর্যোগ অবশ্যম্ভাবী হয়ে দেখা দিল। ৮ এপ্রিলের দিল্লী চুক্তি অবশ্য এই অনুমিত দুর্যোগকে থামিয়ে দিতে পারল। ভয়ার্ত হিন্দুদের মনোবল পুনরুদ্ধারের আশায় আমি সারা পূর্ব বাংলা চষে বেড়ালাম। আমি ঢাকা, বরিশাল, ফরিদপুর, খুলনা ও যশোরের অনেক স্থান পরিদর্শন করলাম। আমি বহু বড় বড় জনসমাবেশে হিন্দুদের নিকট আহ্বান জানাই তারা যেন তাদের সাহস ধরে রাখে এবং নিজেদের পূর্বপুরুষের ভিটা-মাটি ছেড়ে না যায়। আমি আশা করেছিলাম যে পূর্ব বাংলার সরকার এবং মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ দিল্লী চুক্তির শর্তসমূহ যথাযথভাবে পালন করবে। কিন্তু যতই সময় গড়াতে লাগল আমি উপলব্ধি করলাম এই দুই পক্ষের কেউই দিল্লী চুক্তির শর্তাদি পালনের ব্যাপারে প্রকৃতরূপে উৎসাহী নয়। দিল্লী চুক্তির শর্ত মোতাবেক একটি সিস্টেম দাঁড় করাতে পূর্ব বাংলার সরকার যে শুধুমাত্র অক্ষম ছিল তাই নয়, সেই বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপও তারা নিতে চায়নি। দিল্লী চুক্তির পরপর বেশ কিছু হিন্দু তাদের নিজ বাসভূমে ফিরে আসলেও ইতোমধ্যে মুসলিমদের দখলে চলে যাওয়া তাদের জায়গা-জমি ও ঘরবাড়ি আর ফিরে পায়নি।

মাওলানা আকরাম খানের প্রেরণায়ঃ
২৪। ‘মোহাম্মাদী’ নামক একটি মাসিক পত্রিকার ‘বৈশাখ’ সংখ্যায় ছাপা হওয়া প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি মাওলানা আকরাম খানের সম্পাদকীয় পড়ে লীগের নেতৃবৃন্দের মনোভাব সম্বন্ধে আমার অনুমান যে অভ্রান্ত তা আমি বুঝতে পারি। ঢাকা রেডিও স্টেশন থেকে পাকিস্তানের সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী ড. এ. এম. মালিকের প্রচারিত প্রথম রেডিও বক্তব্যের প্রেক্ষিতে তিনি এই সম্পাদকীয় লিখেন। ড. মালিক বলেন, “এমনকি নবী হযরত মুহম্মদ(সাঃ)ও আরবের ইহুদীদের নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দিয়েছিলেন”। মাওলানা আকরাম খান এর প্রেক্ষিতে বলেন, “ড. মালিক তার বক্তব্যে আরবের ইহুদীদের প্রসঙ্গ না টানলেই ভাল করতেন। এটা সত্য যে নবী হযরত মুহম্মদ(সাঃ) আরবের ইহুদীদের নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দিয়েছিলেন; কিন্তু সেটা ছিল ইতিহাসের প্রথম অংশ মাত্র। শেষদিকে তাঁর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ছিল এরকম – আরব থেকে সকল ইহুদীদের বিতাড়িত কর”। মুসলিম সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং আধ্যাত্মিক জীবনে অতি উচ্চ পদে আসীন একজন ব্যক্তির এহেন মন্তব্যের পরেও আমি আশা করে ছিলাম যে নুরুল আমিন মন্ত্রীসভা এতটা আন্তরিকতাশূন্য হবেনা। কিন্তু দিল্লী চুক্তির শর্ত মেনে নিতে যখন নুরুল আমিন ড. এন. বারারীকে মন্ত্রী মনোনিত করলেন তখন আমার সমস্ত আশা চূর্ণ হয়ে গেল। শর্তে ছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মনে হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে তাদের একজন করে প্রতিনিধি পূর্ব বাংলা এবং পশ্চিম বাংলার মন্ত্রীসভায় নিয়োগ পাবে।
নুরুল আমিন সরকারের আন্তরিকতাশূন্য কার্যকলাপঃ
২৫। আমার এক সাধারণ বিবৃতিতে আমি ড. এন. বারারীকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেবার ব্যাপারে আমার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে বলি যে এর ফলে কোনো বিশ্বাস তো ফেরত আসবেই না বরং নুরুল আমিন সরকারের আন্তরিকতে বিষয়ে যদি সংখ্যালঘুদের মনে কিছু আশার মরীচিকা তখনো জেগে থাকে তবে তাও পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।আমার নিজস্ব মত হল নুরুল আমিনের সরকার যে শুধু আন্তরিকতাহীন কাজ করেছে তাই নয়, তাদের ইচ্ছা ছিল দিল্লী চুক্তির প্রধান প্রধান লক্ষ্যসমূহ অর্জনে বাধা প্রদান করা। আমি আবারো বলতে চাই যে ড. এন. বারারী নিজেকে ছাড়া আর কারো প্রতিনিধিত্ব করেন না। তিনি কংগ্রেসের টিকেটে সংগঠনটির টাকা এবং সাংগঠনিক শক্তির সুবাদে বাংলার আইনসভায় ফিরে আসতে সক্ষম হন। তিনি নমঃশূদ্রদের ফেডারেশনটির প্রার্থীদের বিরোধিতা করেছিলেন। নির্বাচিত হবার কিছুদিন পর তিনি কংগ্রেসের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে ফেডারেশনে যোগ দেন। মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হবার কালে তিনি ফেডারেশনেরও সদস্য ছিলেন না। বাঙ্গালী হিন্দুরা আমার সাথে একমত হবেন যে পূর্ববর্তী কার্যকলাপ, চরিত্র এবং বুদ্ধিবৃত্তির দিক থেকে দিল্লী চুক্তি অনুসারে মন্ত্রী নিযুক্ত হবার পক্ষে বারারী বিবেচনার উপযুক্ত নন।
২৬। আমি জনাব নুরুল আমিনকে এই পদের জন্য ৩ জনের নাম সুপারিশ করেছিলাম। এদের মধ্যে একজন ছিলেন এমএ, এলএলবি, অ্যাডভোকেট, ঢাকা হাইকোর্ট। তিনি প্রথম ফজলুল হক মন্ত্রীসভার সময়কালে ৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলার মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি প্রায় ৬ বছর ধরে কোলকাতার কয়লা খনি গুদামজাত বোর্ডের সভাপতি ছিলেন। তিনি নমঃশূদ্রদের ফেডারেশনটির সহ-সভাপতি ছিলেন। আমার দ্বিতীয় সুপারিশ ছিলেন একজন বিএ, এলএলবি। সংস্কার ঘটার আগে তিনি ৭ বছর যাবৎ আইনসভার সদস্য ছিলেন। আমি জানতে ইচ্ছুক ঠিক কোন কারণে জনাব নুরুল আমিন এই দুজন ভদ্রলোককে বাদ দিয়ে এমন একজনকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিলেন সঙ্গত কারণেই যার নিয়োগের বিরোধিতা আমি করেছিলাম। কোনো প্রতিবাদের মুখোমুখি হবার ভয় ছাড়াই আমি বলতে পারি জনাব নুরুল আমিনের বারারীকে দিল্লী চুক্তি অনুসারে মন্ত্রী হিসেবে বেছে নেয়াই এর চরম প্রমাণ যে পূর্ব বাংলার সরকার এখানকার হিন্দুদের জান-মাল, সম্মান ও ধর্ম ঠিক রেখে জীবনধারণের উপযোগী পরিবেশ তৈরির জন্য সম্পাদিত দিল্লী চুক্তিকে কখনোই গুরুত্ব ও আন্তরিকতার সাথে বিবেচনা করেনি।
সরকারী মদদে হিন্দুদের নির্মূল করার চেষ্টা
২৭। আমি এই প্রসঙ্গে আমি আমার পূর্ণ বিশ্বাস এবং সন্দেহ ব্যক্ত করতে চাই যে পূর্ব বাংলা সরকার এই প্রদেশ থেকে হিন্দুদের সম্পূর্ণরূপে উৎখাত করতে চায়। এই বিষয়ে আমি আপনাকে একাধিকবার সাক্ষাতে অনেক কথা বলেছি। আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি পশ্চিম পাকিস্তান হিন্দু নিধনে সম্পূর্ণরূপে সক্ষম হয়েছে এবং পূর্ব পাকিস্তানে এই প্রক্রিয়া সফলতার সাথে অগ্রসর হচ্ছে। ডি এন বারারি এর নিয়োগ এবং আমার এই বিষয়ে অসম্মতির পরও পাকিস্তান সরকারের প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে তারা কি অর্থে নিজেদের ইসলামিক প্রজাতন্ত্র দাবি করে। পাকিস্তান না হিন্দুদের বেঁচে থাকার অধিকার দিয়েছে না পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়েছে। এখন তারা হিন্দু বুদ্ধিজীবীদের মারতে চায় যাতে পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক জীবন তাদের দ্বারা আর প্রভাবিত না হতে পারে।
যৌথ নির্বাচকমণ্ডলীর বিষয়টিকে এড়িয়ে চলাঃ২৮। আমি বুঝতে পারি না নির্বাচকমণ্ডলীর ব্যাপারটিতে কেন এখনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। সংখ্যালঘু সাব-কমিটি তৈরির পর ৩ বছর পার হয়ে গেছে। ৩বার মিটিংও হয়ে গিয়েছে। গত ডিসেম্বরে কমিটির সভায় যৌথ বা পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর ব্যাপারে কথা উঠলে পাকিস্তানের সকল স্বীকৃত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিগণ পশ্চাৎপদ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর জন্য সংরক্ষিত আসন রেখে যৌথ নির্বাচকমণ্ডলীর স্বপক্ষে মত দেন। আমরা নমঃশূদ্রদের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা রেখে যৌথ নির্বাচকমণ্ডলীর দাবি জানাই। গত আগস্টের আরেক সভাতেও এই ব্যাপারে কথা উঠে। কিন্তু এর উপ কোনোরূপ আলোচনা ছাড়াই সভা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে পাকিস্তানী শাসকদের সময়ক্ষেপণের নীতির পেছনে কোন মতলব কাজ করছে তা বুঝতে কারোরই অসুবিধা হবার কথা নয়।
হিন্দুদের দুঃসহ ভবিষ্যৎ
২৯। এখন আসি দিল্লী চুক্তির ফলে পূর্ব বাংলার হিন্দুদের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে। আমি বলতে পারি এখন হিন্দুদের অবস্থা শুধু হতাশাজনক নয় বরং সম্পূর্ণ আশাহীন এবং ভবিষ্যৎ অন্ধাকার অমনিশায় আচ্ছন্ন। পূর্ব বাংলার হিন্দুদের ভিতর আস্থা ফিরিয়ে আনতে কিছুই করা হচ্ছে না। চুক্তিটি মুসলিম লীগ কাগজের ভিতরই সীমাবদ্ধ রেখেছে। বিপুল সংখ্যক হিন্দু শরণার্থী বিশেষ করে নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে এলেও এটা প্রমাণ করে না যে হিন্দুদের আস্থা ফিরে এসেছে। বরং এটা প্রমাণিত হয় পশ্চিম বাংলা বা ভারতীয় ইউনিয়নের ভিতর তাদের পুনর্বাসনের কোন সুযোগ নেই। উদ্বাস্তু জীবনের বেদনাই তাদের মাতৃভূমিতে ফিরতে বাধ্য করেছে।
পাশাপাশি অনেকেই ফিরে আসছে তাদের অস্থাবর সম্পত্তি সাথে নিয়ে যেতে এবং স্থাবর সম্পত্তির একটা গতি করতে। পূর্ব বাংলায় অতি সাম্প্রতিককালে কোনো বড় রকমের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটে নি, কিন্তু এর কৃতিত্ব দিল্লী চুক্তিকে দিলে তা ভুল হবে। কোনো চুক্তি বা আপস ছাড়াই এটা একসময় বন্ধ হত, সহজভাবে বলতে গেলে এটা এভাবে চলতে থাকা ছিল অসম্ভব।
৩০। স্বীকার করতেই হবে দিল্লী চুক্তি সমস্যায় সমাধানের জন্য যথেষ্ট নয়। এই চুক্তির ভিতর ছিল কিছু শর্ত যাতে ভারত এবং পাকিস্তানের ভিতর বিবদমান সমস্যাগুলো সমাধান করা যায়। কিন্তু চুক্তির ছয় মাস পরেও কিছুই হয় নাই। অন্যদিকে পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে দেশে এবং বিদেশে অপ্প্রচার চালিয়েই যাচ্ছে পুরোদমে। মুসলিম লীগ দ্বারা সারা পাকিস্তান জুড়ে কাশ্মীর দিবস পালন করা এর একটি উদাহরণ। পাকিস্তান শাসিত পাঞ্জাবের গভর্নরের সাম্প্রতিক বক্তব্য যাতে তিনি উল্লেখ করেছেন পাকিস্তানের শক্তিশালী সেনাবাহিনী দরকার ভারতের মুসলিমদের রক্ষায়, পাকিস্তানের আসলে চেহারা দেখিয়ে দিয়েছে। এই ধরণের বক্তব্য দুইদেশের ভিতর শুধু উত্তেজনাই বাড়াবে।
পূর্ব বঙ্গের বর্তমান চিত্রঃ
৩১। এখন পূর্ব বাংলার অবস্থা কেমন? দেশভাগের পর থেকে প্রায় ৫০ লক্ষ হিন্দু দেশ ছেড়ে গেছে। গত ফেব্রুয়ারীর দাঙ্গা বাদেও এর পেছনে বহু কারণ কাজ করেছে। মুসলিমদের বয়কটের কারণে আইনজ্ঞ, মেডিকেল প্র্যাকটিশনার, দোকানদার, বিক্রেতা ও বণিক সহ প্রায় সব পেশার হিন্দুদেরই জীবিকার খোঁজে পশ্চিম বঙ্গে চলে যেতে হয়েছে। আইনগত পদ্ধতি অনুসরণ না করেই হিন্দু বসতবাড়ির সম্পূর্ণ মালিকানা কিনে নেয়া এবং বাড়ির মালিকদের কোনোরূপ ভাড়া পরিশোধ না করার ফলে তারা ভারতে আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। হিন্দু জমিদারদের খাজনা দেয়া বহু আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। তদুপরি, হিন্দুদের নিরাপত্তার প্রতি সবসময়ের হুমকি হিসেবে আছে আনসার যাদের ব্যাপারে আমি সব জায়গা থেকে অভিযোগ পেয়েছি। শিক্ষা এবং তা প্রদানের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাজে ইসলামীকরণের নামে হস্তক্ষেপ হাইস্কুল এবং কলেজের শিক্ষকদের তাদের পরিচিত পরিবেশের বাইরে ছুঁড়ে ফেলেছে। তারা এই বাংলা ছেড়ে যাচ্ছে। ফলে বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই বন্ধ হয়ে গেছে। আমি জানতে পেরেছি যে কিছুদিন আগে শিক্ষা কর্তৃপক্ষ একটি সার্কুলার প্রকাশ করেন যাতে সব সম্প্রদায়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য পবিত্র কোরআন হতে আবৃত্তি বাধ্যতামূলক করা হয়। আরেকটি সার্কুলারের মাধ্যমে প্রধান শিক্ষকদের বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের বিভিন্ন ব্লক জিন্নাহ, ইকবাল, লিয়াকত আলী, নাজিমুদ্দীন প্রমুখ ১২ জন পরিচিত মুসলিমদের নামে নামকরণ করতে বলা হয়। অতি সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক শিক্ষা সম্মেলনে রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেন যে পূর্ব বাংলার ১৫০০ ইংরেজি স্কুলের মধ্যে মাত্র ৫০০টি চালু আছে। মেডিকেল প্র্যাকটিশনারেরা দেশ ছেড়ে যাওয়ায় রোগীদের সঠিক চিকিৎসা প্রাপ্তির আশা দুরাশায় পরিণত হয়েছে। হিন্দু বসতবাড়িতে পূজা-অর্চনা করতেন এমন প্রায় সকল পুরোহিত দেশ ত্যাগ করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ মন্দিরগুলো পরিত্যক্ত পড়ে রয়েছে। ফলে পূর্ব বাংলার হিন্দুদের জন্য বিয়ের মত সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো যেখানে একজন পুরোহিতের উপস্থিতি অত্যাবশ্যক সেসব পালন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। দেব-দেবীর মূর্তি প্রস্তুতকারী শিল্পীরাও দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। পুলিশ এবং সার্কেল অফিসারদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্মতিতে দমনমূলক নীতির মাধ্যমে ইউনিয়ন বোর্ডগুলোর সভাপতির পদ থেকে হিন্দুদের মুসলিমদের দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। হিন্দু প্রধান শিক্ষক ও বিদ্যালয়ের সচিবদেরও মুসলিমদের দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। হাতে গোনা যে অল্প কজন হিন্দু সরকারী চাকরিজীবি আছেন তাদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলা হয়েছে। হয় তাদের জুনিয়র মুসলিম সহকর্মীরা তাদের পেছনে ফেলে উপরে উঠে যাচ্ছে অথবা যথেষ্ট বা কোনো কারণ ছাড়াই তাদের অব্যাহতি দেয়া হচ্ছে। অতি সাম্প্রতিককালেই একজন হিন্দু পাবলিক প্রসিকিউটরকে কোনো কারণ ছাড়াই চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। শ্রীযুক্তা নেলি সেনগুপ্ত এর এক বিবৃতিতে ঘটনাটি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা আছে। অন্তত তাঁকে কেউ মুসলিম বিদ্বেষী বলে চিহ্নিত করতে পারবে না।
হিন্দুরা রীতিমত নিরাপত্তাহীন

৩২। হিন্দুদের সম্পত্তি চুরি-ডাকাতি এবং হত্যাকাণ্ডও আগের মত চলছে। থানা পুলিশ হিন্দুদের অভিযোগ নিচ্ছে না। অবশ্য হিন্দু মেয়েদের জোরপূর্বক অপহরণ এবং ধর্ষণের সংখ্যা আগের থেকে কমে গেছে। এর কারণ হল পূর্ব পাকিস্তানে ১২ থেকে ৩০ বছর বয়সে কোন হিন্দু মেয়ে আর নেই। আর যারা পালাতে পারে নাই তারা মুসলিম গুণ্ডাদের হাত থেকে বাঁচে নাই। আমি অনেক খবর পেয়েছি নিম্নবর্ণের হিন্দু মেয়েদের ধর্ষণের খবর। হিন্দুরা বাজারে পাট এবং কৃষিপণ্য বিক্রি করতে যায়। মুসলিম ক্রেতারা খুব কম সময়ই পুরো দাম দেয়। প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানে আইনের শাসন নেই, বিশেষ করে হিন্দুদের জন্য।
পশ্চিম পাকিস্তানে জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণঃ
৩৩। পূর্ব পাকিস্তানের কে পাশে সরিয়ে এখন পশ্চিম পাকিস্তান, বিশেষ করে সিন্ধ এর দিকে মনোনিবেশ করা যাক। দেশভাগের পর পশ্চিম পাঞ্জাবে প্রায় লাখ খানেক অস্পৃশ্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষ ছিল। এদের মধ্যে একটা বড় অংশকে ইসলামে ধর্মান্তর করা হয়। কর্তৃপক্ষের কাছে বারংবার আবেদনের পরেও অপহৃত ১২ জন নমঃশূদ্র মেয়ের মাঝে কেবল মাত্র ৪ জনকেই এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা হয়েছে। অপহৃত মেয়েদের নাম ও তাদের অপহরণকারীদের নাম সরকারের নিকট পৌঁছে দেয়া হয়েছিল। এই অপহরণের ঘটনার অফিসার-ইন-চার্জের সাম্প্রতিকতম উত্তরে ছিল “তার কাজ হল হিন্দু মেয়েদের উদ্ধার করা এবং ‘অচ্ছুতেরা’ (অস্পৃশ্য/নমঃশূদ্র) হিন্দু নয়”। যে ক্ষুদ্র হিন্দু জনগোষ্ঠী এখনো সিন্ধ এবং পাকিস্তানের রাজধানী করাচিতে বসবাস করছে তাদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। আমার কাছে করাচি ও সিন্ধ এর ৩৬৩টি হিন্দু মন্দির ও গুরুদুয়ারার একটি তালিকা আছে(যা কোনো উপায়েই সম্পূর্ণ নয়) যারা এখনো মুসলিমদের দখলে রয়েছে। কিছু কিছু মন্দিরকে মুচির দোকান, কসাইখানা এবং হোটেলে পরিণত করা হয়েছে। কোনো নোটিশ ব্যাতিরেকেই হিন্দুদের কাছ থেকে জমিজমা কেড়ে নিয়ে শরণার্থী ও স্থানীয় মুসলিমদের ভাগ করে দেয়া হয়েছিল, তাদের কেউই আর তা ফেরত পায় নি। ব্যক্তিগতভাবে আমি ২০০ থেকে ৩০০ হিন্দুকে চিনি যারা বহুকাল পূর্বেই তত্ত্বাবধায়ক কর্তৃক এই অঞ্চলের অধিবাসী হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত তাদের সম্পত্তি তাদের ফিরিয়ে দেয়া হয়নি। শত্রু সম্পত্তি নয় হিসেবে ঘোষিত হবার পরেও করাচি পিঞ্জিরাপোল এখনো ট্রাস্টিদের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয় নি। করাচিতে আমি বহু হতভাগ্য বাবা ও স্বামীর কাছ থেকে আবেদন পেয়েছি অপহৃত হিন্দু মেয়েদের সম্পর্কে, যাদের বেশিরভাগই ছিল নমঃশূদ্র। এ ব্যাপারে আমি দ্বিতীয় প্রাদেশিক সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। কিন্তু এ ব্যাপারে অগ্রগতি ছিল শূন্যের কোঠায়। আমি অত্যন্ত দুঃখ পাই একথা জেনে যে সিন্ধ এ এখনো অব্দি বসবাস করা নমঃশূদ্রদের এক বিরাট অংশকে জোরপূর্বক ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে।
পাকিস্তান, হিন্দুদের জন্য অভিশাপঃ
৩৪। উপরের সংক্ষিপ্ত চিত্র থেকে এটা বলাই চলে যে সবদিক দিয়েই পাকিস্তানের হিন্দুরা আজ নিজভূমে পরবাসী। তাদের একমাত্র দোষ হল তারা হিন্দু ধর্মের অনুসারী। মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ বারবার বলছেন পাকিস্তান ইসলামিক রাষ্ট্র আছে এবং থাকবে। ইসলামকে সকল বৈশ্বিক পঙ্কিলতা দূরীকরণের পথ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। পুঁজিবাদ ও সমাজবাদের পারস্পরিক সাংঘর্ষিক মতবাদের মধ্যে আপনি ইসলামিক গণতন্ত্রের আনন্দজনক সমতা ও ভ্রাতৃত্ববোধকে তুলে ধরছেন। শরীয়ত অনুসারে মুসলিমরা একচ্ছত্র শাসক এবং হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তাদের নিরাপত্তায় বেঁচে থাকা জিমির মত। এর জন্য তাদের আবার দামও দিতে হয়। এবং অন্য সকলের চেয়ে আপনি ভাল করে জানেন প্রধান মন্ত্রী সাহেব এর পরিমাণ কতটুকু। দীর্ঘ বিবেচনার পর আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে পাকিস্তান হিন্দুদের বসবাসের পক্ষে উপযুক্ত স্থান নয়। এখানে তাদের ভবিষ্যত হল ধর্মান্তরিত হওয়া অথবা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া। উচ্চ বংশীয় এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন অস্পৃশ্য জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই এর মধ্যে পূর্ব বাংলা ছেড়ে গেছে। যেসকল অভিশপ্ত হিন্দু পাকিস্তানে থেকে যাবে আমার আশঙ্কা ধীরে ধীরে পরিকল্পনামাফিক তাদের ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হবে নয়ত ধ্বংস করে দেয়া হবে। এটা আসলেই অবাক করার মত ব্যাপার যে আপনার মত একজন শিক্ষিত, সংস্কৃতিমনা, অভিজ্ঞ ব্যক্তি মানবতার প্রতি হুমকিস্বরূপ এবং সকল সমতা ও শুভবোধের ধ্বংসকারী এরূপ মতবাদে পরিপূর্ণ হবার নজির রেখে যাচ্ছেন। আমি আপনাকে এবং আপনার সাথীদের বলতে চাই যে যেরূপ খুশি ব্যবহার করা হোক বা লোভ দেখানো হোক না কেন, হিন্দুরা নিজেদের জন্মভূমিতে নিজেরা জিমি হিসেবে গণ্য হতেও পিছপা হবে না। আজকে হয়ত অনেকে দুঃখে নয় ভয়ে নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু আগামীকাল তারা জীবনের অর্থনীতিতে নিজেদের স্থান আদায় করে নেবার জন্য সংঘর্ষে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কে বলতে পারে ভবিষ্যত কি লুকিয়ে রেখেছে? যখন আমি নিশ্চিত যে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারে আমার অবস্থান হিন্দুদের কোনো উপকারেই আসছে না তখন নিজের বিবেকের কাছে নিজেকে পরিষ্কার রাখার জন্যই আমি পাকিস্তান এবং বিদেশের হিন্দুদের মনে এমন কোনো মিথ্যে আশার জন্ম দিতে চাই না যে তারা এখানে সম্মান এবং জান-মাল ও সম্পত্তির নিরাপত্তার নিশ্চয়তা সহকারে বসবাস করতে পারবে। হিন্দুদের নিয়ে বলার ছিল এটুকুই।
মুসলমানদেরও সামাজিক স্বাধীনতা নেই

৩৫। সেই মুসলিমদের কি খবর যারা মুসলিম লীগ এবং তার দুর্নীতিবাজ আমলাতন্ত্রকে সমর্থন করেন না? পাকিস্তানে সামাজিক স্বাধীনতা বলতে কিছু নাই। উদাহরণস্বরূপ খান আবদুল গাফফার খান নামক সেই ধর্মপ্রাণ মুসলিমের কথা চিন্তা করুন। কিংবা তার দেশপ্রেমিক ভাই ডা খান সাহিবের পরিণতি চিন্তা করুন। উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এবং পূর্ব বাংলার নেতাদের আপনারা বিনা বিচারে আটকে রেখেছেন। বাংলাতে মুসলিম লীগের বিজয় পতাকা বহনকারী জনাব  সোহরাওয়ার্দিকে এখন সরকারের ইচ্ছায় চলতে হয় এবং মুখ খুলতেও অনুমতি লাগে।  বাংলার প্রবীণ বৃদ্ধ নেতা, লাহোর প্রস্তাবের উত্থাপনকারী জনাব ফজলুল হক বর্তমানে ঢাকা হাই কোর্টের চারদেয়ালের মাঝে তার একাকী জমিতে লাঙ্গল চড়াচ্ছেন এবং তথাকথিত ইসলামিক চিন্তাতে লিপ্ত যেটা সম্পূর্ণ অমানবিক। আর পূর্ব বাংলার সাধারণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর কথা চিন্তা করুনঃ তারা ভালো আছে বলতে পারবে না। তারা আশ্বাস পেয়েছিল স্বায়ত্তশাসন এবং আঞ্চলিক স্বাধিকারের। কিন্তু তারা আসলেই কি পেয়েছে? যদিও পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশের মিলিত জনসংখ্যার চেয়ে বেশি মানুষ এখানে থাকে, তবুও পূর্ব বাংলা পশ্চিম পাকিস্তানের উপনিবেশে পরিণত হয়েছে। এই অবিচারের পরও করাচীর কোন অধিকার নেই সেখান থেকে অয়াদেশ জারি করার। পূর্ব বাংলার মুসলিম জনগোষ্ঠীর আগ্রহ এই বিচিত্র ইসলামিক প্রজাতন্ত্র পাথর ছুঁড়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে মরু সিন্ধু এবং পাঞ্জাব থেকে সাহায্য পাওয়ার বদলে।

আমার নিজের দুঃখভারাক্রান্ত তিক্ত অভিজ্ঞতা
৩৬। পাকিস্তানের সমগ্র চিত্র আর অন্যের প্রতি অবিচার আর শোষণের কথা বাদ দিলেও আমার নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। আপনি প্রধানমন্ত্রী এবং শাসকদলের প্রধান হিসেবে আপনার নিজের অবস্থান ব্যবহার করে আমাকে একটি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে বলেছিলেন এবং আমি গত ৮ সেপ্টেম্বর তা করেছিও। আপনি জানতেন আমি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং অর্ধসত্যের সংমিশ্রণে কোন বক্তব্য দিতে রাজি না। কিন্তু আমি একজন মন্ত্রী এবং আপনার অধীনে কাজ করছি। তাই আমার পক্ষে এই অনুরোধ রক্ষা করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। কিন্তু এই মিথ্যার ভার আর বহন করা আমার পক্ষে বহন করা সম্ভব নয় এবং আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি আপনার মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করবো। এই পদত্যাগপত্র আমি এখনই আপনার হাতে জমা দিচ্ছি এবং আমি আশা করছি আপনি বিন্দুমাত্র দেরি না করে তা গ্রহণ করবেন। অবশ্যই আপনার পূর্ণ অধিকার রয়েছে এই পদত্যাগপত্র নিয়ে কি করবেন সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। অথবা আপনার ইসলামী প্রজাতন্ত্রের রীতিনীতি এবং উদ্দেশ্যের সাথে মিলে এমন কোন উপায়ে লুকিয়ে ফেলা।
আপনার বাধ্যগত
এসডি./-জে এন মণ্ডল
৮ অক্টোবর ১৯৫০
(ইংরেজি থেকে অনূদিত) 
পরিশিষ্টঃ
১। যোগেন মণ্ডল বরিশালের মৈস্তারকান্দি গ্রামে নমঃশূদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএ ও বিএল ডিগ্রি নিয়ে আইন পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৩৬ সালে তিনি বরিশাল সদর লোকাল বোর্ডেও সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৩৭ সালে সাধারণ নির্বাচনে নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে বাখরগঞ্জ উত্তর-পূর্ব আসন থেকে অশ্বিনী দত্তের ভাইপো সরল দত্তকে হারিয়ে এমএলএ নির্বাচিত হন। সরল দত্ত জমিদার এবং উচ্চবর্ণেও মানুষ ছিলেন। তিনি কংগ্রেসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জিতেছেন। নির্দলীয় প্রার্থী হওয়ায় নমঃশূদ্র এবং মুসলমানদের ভোটও পেয়েছেন। কিন্তু নমঃশূদ্রের প্রার্থী ছিলেন না। তিনি যতখানি এই নির্বাচনে শূদ্রনেতার চেয়ে জননেতার ইমেজটাই মুখ্য হতে পারে। কিন্তু তাঁর এই অভূতপূর্ব সাফল্যকে ম্লান করা হয় শূদ্রনেতা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ায়। ১৯৪০ সালে তিনি সুভাষচন্দ্র বসু ও শরৎ বসুর সহযোগিতায় কলকাতা সিটি করপোরেশনের ৩নং বটতলা ওয়ার্ড থেকে কমিশনার নির্বাচিত হন। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে তিনি তফশিলি ফেডারেশনের প্রার্থী হিসেবে পিরোজপুর-পটুয়াখালী কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হয়ে সোহরাওয়ার্দির মন্ত্রিসভায় বিচার, পূর্ত ও গৃহনির্মাণ মন্ত্রী হন। ৪৭-এর দেশভাগে তাঁর সায় ছিল না। তিনি দেশভাগের বিপক্ষে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। তবে দেশভাগের পাশাপাশি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা গঠনের যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন সোহরাওয়ার্দি, আবুল হাশিম, শরৎ বসু প্রমুখ নেতা, সে উদ্যোগের সঙ্গেও ছিলেন যোগেন মণ্ডল। অন্যরা জাতীয় নেতার স্বীকৃতি পেলেও যোগেন মণ্ডল হয়ে পড়লেন সমালোচিত ও বিতর্কিত। তিনি তখন করাচি চলে যান। ১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট তিনি পাকিস্তান গণপরিষদের অস্থায়ী স্পিকার নির্বাচিত হন। ১৫ আগস্ট দেশভাগ গলে তিনি পাকিস্তানের প্রথম আইন ও শ্রমমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ১৯৫০ সালে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের ঢাকা-বরিশাল-খুলনা অঞ্চলে ভয়াবহ দাঙ্গায় সংখ্যালঘুদের পক্ষে সরকারের নীরবতার প্রতিবাদে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। এর পরের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। এর পরে তিনি কলকাতা চলে যেতে বাধ্য হন। সেখানে তিনি রাজনীতিতে যুক্ত থাকলেও কোনো নির্বাচনেই বিজয়ী হতে পারেননি। এমনকি ১৯৬৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে বামফ্রন্টের সমর্থন নিয়ে আরপিআই-এর প্রার্থী হিসেবেও বারাসাত লোকসভা কেন্দ্র থেকে পরাজিত হন। এভাবেই ১৯৩৭ সালের বিজয়ী নায়ক ৩০ বছরের রাজনৈতিক জীবন শেষে করুণ পরাজয়ের মধ্য থেকে মঞ্চ থেকে বিদায় নেন। আস্তে আস্তে তিনি হারিয়ে যান বাংলার ইতিহাস থেকেও।
২। ভারতে ব্রিটিশ শাসনবিরোধী অহিংস আন্দোলনের অন্যতম নেতা খান আবদুল গাফফার খান (সীমান্ত গান্ধী) ১৯৮৮ সালের ২০ জানুয়ারি পাকিস্তানের পেশোয়ারে ইন্তেকাল করেন। আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবেও তার পরিচিতি ছিল। ফখরে আফগান বা বাদশাহ খান নামেও তিনি পরিচিত। মহাত্মা গান্ধীর অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন তিনি।
১৮৯০ সালে তত্কলীন ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে (বর্তমানে পাকিস্তান) তার জন্ম। তার বাবা বৈরম খান ছিলেন একজন ভূস্বামী। ব্রিটিশ মিশনারি স্কুল এডওয়ার্ড মিশন স্কুলে তার পড়াশোনা।
পারিবারিক উত্সাহেই তিনি ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনীতে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু এক সতীর্থের প্রতি ব্রিটিশ কর্মকর্তার আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। মায়ের হস্তক্ষেপে এ সময় ইংল্যান্ডে পড়াশোনায়ও ইস্তফা দেন।
তিনি দেখলেন, ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং সংস্কারই হবে বেশি উপযোগী, যার অংশ হিসেবে পরবর্তীকালে গড়ে ওঠে খোদাই খিদমতগার আন্দোলন। এই আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলেন তিনি। ’৪৭-এর দেশভাগের বিরোধী ছিলেন তিনি। দেশভাগের পর পাকিস্তান সরকার তাকে বেশ ক’বার গ্রেফতার করে।
১৯৮৫ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন তিনি। ১৯৮৭ সালে প্রথম অভারতীয় হিসেবে তিনি ভারতের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার ভারতরত্নে ভূষিত হন।
অত্যন্ত ধর্মভীরু মুসলিম ছিলেন তিনি। আফগানিস্তানের জালালাবাদে তিনি সমাহিত।
৩। ২০ ডিসেম্বর ১৯৪৯। খুলনা জেলার বাগেরহাট মহাকুমার মোল্লার হাট থানার কালশিরা গ্রামের জয়দেব বর্মার বাড়িতে শেষ রাতে কয়েকজন কম্যুনিস্ট সন্দেহভাজনকে গ্রেফতারের জন্য ৪ পুলিশ কনেস্টবল অভিযান চালায়।কোন আসামীকে না পেয়ে,একজন পুলিশ কনেস্টবল জয়দেবের স্ত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা চালায়।গৃহবাসীদের তাৎক্ষণিক প্রতিরোধে হানাদারদের একজন নিহত হয়। হৈচৈ শুনে আশপাশের মানুষ এসে বাকি তিনজনকে উদ্ধার করে।পরের দিন পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে পুলিশ ও আনসার বাহিনী এসে কালশিরা ও পার্শবর্তী হিন্দু গ্রামে বিভীষিকা সৃষ্টি করে।হত্যা, ধর্ষণ, লুট, অগ্নিসংযোগ ও ধর্মান্তরিতকরনের ঘটনা হয়। এক মাসের মধ্যে ৩০ হাজার হিন্দু নরনারী ভারতে চলে যায়।

৪। ১৯৫০ সালের ৫ জানুয়ারি পুলিশ বাহিনীর একজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে একদল কনস্টেবল নাচোলের চণ্ডীপুর গ্রামে চাঁদা তুলতে আসে। গ্রামবাসী সংগঠিত হয়ে পুলিশ বাহিনীকে পাল্টা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করতে থাকে। বিক্ষোভের এক পর্যায়ে উম্মত্ত গ্রামবাসী ওই পুলিশ কর্মকর্তা ও পাঁচ জন পুলিশ কনস্টেবলকে হত্যা করে। এই ঘটনার পর নাচোলের চারিদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার দু’দিন পর ৭ জানুয়ারি শুরু হলো পুলিশের প্রতিশোধ। দুই হাজার সেনা কাছাকাছি রেলওয়ে স্টেশনের কাছে উপস্থিত হয়ে অভিযান শুরু করে। বারোটি গ্রাম ঘেরাও করে তছনছ করে, ঘরবাড়ি ধ্বংস করে, চারিদিকে গুলি চালিয়ে হত্যা করে অনেক গ্রামবাসীকে। নারীদের ওপর যৌন অত্যাচার এমনকি শিশুদের ওপরও নির্যাতন করে। এই আন্দোলনের নেত্রী ছিলেন ইলা মিত্র।

সোমবার, ৭ অক্টোবর, ২০১৯

যে মতুয়ারা, ‘জন্মগত জাতিকথা কয় না’ সেই মতুয়া- জনক হরি-গুরুচাঁদের গলায়, ‘ব্রাহ্মণ’ – জাতের জুতোর মালা কেন পরাই?



 

 









যে মতুয়ারা, ‘জন্মগত জাতিকথা কয় না’ সেই মতুয়া- জনক হরি-গুরুচাঁদের গলায়, ‘ব্রাহ্মণ’ – জাতের জুতোর মালা কেন পরাই?
       লেখক – স্বপন কুমার বিশ্বাস
(বই- হরি-গুরুচাঁদ  বাঙলার চণ্ডাল ও ভারতবর্ষের অভ্যুত্থান পৃষ্ঠা ক্রমাঙ্ক ৬০ থেকে ৬৫)

---- একদল নমঃশূদ্র নিজেদের ব্রাহ্মণ বলে পরিচিত করানোর চেষ্টা করে। তাতেই তারা আনন্দ পায়। কেন? একি কেবল হীনমন্যতা প্রসূত পলায়ন মনবৃত্তি না ঐতিহাসিক তত্ত্ব ভিত্তিক সত্য? হরিচাঁদ বেদ, ব্রাহ্মণ মানেননি। সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলন ও বৈপ্লবিক আধ্যাত্মিক আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি জাতিভেদ ব্যবস্থার বিলোপ করার সাধনা করেছেন। সেক্ষেত্রে তাঁকে কিংবা তাঁর পরিবার বা বংশকে এবং সর্বশেষে, সমগ্র চণ্ডাল তথা নমঃশূদ্র জাতিকে ব্রাহ্মণ হিসাবে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা যে কত বড় অপপ্রচেষ্টা তা নির্ণয় করাও কঠিন।

   চণ্ডাল জাতির কিছু সম্পন্ন মানুষ সামাজিক মর্যাদা অর্জনের জন্য চেষ্টা চালান। এর জন্য তৎকালে তাদের সামনে দুটি মাত্র পথ খোলা ছিল, প্রথমতঃ ধর্মান্তরিত মুসলমান হওয়া দ্বিতীয়তঃ হিন্দুদের মাঝে হিন্দু ব্রাহ্মণ সমাজপতিদের দ্বারা গ্রহণযোগ্য স্তরে স্থান লাভ করা। তৎকালে প্রায়  এক কোটি চণ্ডাল জাতির সদস্য মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করে মানুষ হিসাবে সামাজিক স্বীকৃতি আদায় করে নেয়। একদল যারা চৈতন্য মহাপ্রভুর অত্যাচারে এবং অন্যবিধ প্রচারের প্রভাবে মুসলমান খ্রীষ্টান হতে পারেনি, তারা হিন্দুদের  পঙ্‌তিতে আশ্রয় গ্রহণের চেষ্টা চালায়। এক দল ব্রাহ্মণ সমাজপতিও এমনি  শূদ্র-স্বেচ্ছাদাস বানাবার এক সুযোগ খুঁজছিলো।
    সামান্য শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠান প্রাপ্ত সদস্যরাই দলিত বহুজন সমাজকে স্ব-স্বার্থে ধোঁকা দিয়েছে,  বিপন্ন করেছে চিরকাল। তারা নানান ভাবে প্রমাণ করতে চেষ্টা করেছে চণ্ডালেরা ব্রাহ্মণ, কিম্বা চণ্ডালেরা চণ্ডাল নয় তারা নমঃশূদ্র এবং নমঃশূদ্ররা ব্রাহ্মণ। এই পথে তারা ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুদের কাছে ঘেঁসার চেষ্টা করেছে।
    হরিচাঁদ জন্মের প্রায় শত বৎসর পরে তারক গোঁসাই লেখা হরিলীলামৃত প্রকাশিত হয়। গ্রন্থমধ্যে বর্ণিত হয়েছে যে, জীবনীর পাণ্ডুলিপি দেখে ঠাকুর হরিচাঁদ নিষেধ করেছিলেন জীবনী লিখতে। যাইহোক ইতিমধ্যে আমরা লক্ষ্য করেছি চণ্ডালদের মধ্যে হিন্দু হবার একটা আগ্রহ দেখা দিয়েছিল। যদিও হরিচাঁদের ধর্ম ও দর্শনতত্ত্ব, ধর্মাচার ও পদ্ধতি সবই হিন্দুধর্ম তথা ব্রাহ্মণ্যধর্ম থেকে বিভিন্ন তথাপি পরবর্তী কালের শিষ্যরা তাঁকে এবং তাঁর ধর্মকে হিন্দুভুত করার ত্রুটি   রাখেন নি। এবং আত্মমর্যাদা রক্ষা করার জন্য অন্যায় ও হীন মনোভাব গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ হরিচাঁদকে ব্রাহ্মণ বংশোদ্ভুত বলে পরিচয় দেবার ব্যবস্থা করে। বলা হয়, তার পূর্বজ পুরুষ, উত্তর বিহারের মিথিলা অঞ্চলের একজন ব্রাহ্মণ সাধু পুরুষ ছিলেন। তিনি পূর্ববঙ্গে এসে নমঃশূদ্র কন্যার পাণী গ্রহণ করেছিলেন। তারপর থেকে বংশটি নমঃশূদ্র বলে পরিচিত হয়।
     এমনকি মহাকবি মহানন্দ হালদার মীড সাহেবের মুখে উচ্চারণ করিয়েছেনঃ-  
“আমি বলি এই জাতি নিশ্চয় ব্রাহ্মণ।
হীন হয়ে আছে শুধু হিংসার কারণ।।
আদি কালে এরা সবে ছিল যে ব্রাহ্মণ
ক্ষুদ্র কিম্বা শূদ্র এরা হবে না কখন।।”
    এমন মতবাদ জাতিতত্ত্বের হিসাব নিকাশে মেলে না। কারণ, প্রথমতঃ জাতকের জাত পিতার জাত হিসাবেই নির্ধারিত হয়। কন্যার জাত থেকে হয় না। দ্বিতীয়তঃ যে অতীত কালে হরিচাঁদের পূর্বপুরুষ নমঃশূদ্র কন্যা বিবাহ করেন বলে বলা হয়েছে, সেইকালে চণ্ডালী মাতার গর্ভের সন্তান নমঃশূদ্র বলে পরিচিত হয়েছিল, এমন কথা শাস্ত্র সম্মত নয়। নমঃশূদ্র তখন ছিলই না।
    এই সব দাবী-দাওয়ার কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। কোন শাস্ত্র বা লিখিত প্রমাণ নেই। দাবীগুলি যে অলীক ও কৃত্রিম সে কথা নানান ভাবে বোঝা যায়। বঙ্গ দেশে তৎকালেই এক কোটি  সংখ্যার বেশি চণ্ডাল ছিল। প্রায় নব্বই লক্ষ চণ্ডাল মুসলমান হয়ে যায়। সংখ্যা তত্ত্বের দিক থেকে অনায়াসেই বলা যায়, এত সংখ্যক ব্রাহ্মণ পূর্বভারত তথা বঙ্গদেশে তৎকালে থাকতেই পারেনা। ভারতবর্ষে ব্রাহ্মণের সংখ্যা কখনও ৩% - ৩.৫% শতাংশের বেশি হয়নি। কিন্তু বঙ্গদেশে চণ্ডালের  সংখ্যা মোট জন সংখ্যার প্রায় ৯% শতাংশে ছিল। এর সঙ্গে আসল ব্রাহ্মণের সংখ্যা যুক্ত হলে দাঁড়ায় প্রায় ১৪% শতাংশ। সপ্তশতী (শূদ্রব্রাহ্মণ) কিম্বা আদি সুরের আনিত পঞ্চ ব্রাহ্মণ যাই হোক না কেন; ব্রাহ্মণ হীন, বেদবাহ্য বঙ্গদেশে মাত্র কয়েকশ বছরে ব্রাহ্মণের সংখ্যাবৃদ্ধির হার যদি আর্যাবর্তের আর ব্রহ্মবর্তের মাত্র ৩% - ৪% শতাংশ ব্রাহ্মণের সঙ্গে তুলনা করা যায় তবে নিশ্চিতই, অবিশ্বাস্য মনে হবে। উত্তর প্রদেশের তথা আর্যাবর্তের ব্রাহ্মণ সংখ্যা ৪% শতাংশের বেশি নয় আজও। বঙ্গে কি করে সেকালেই দেড় দুই কোটি ব্রাহ্মণ হবে?
    এই ধরণের ভাবনা হিসাবে মেলেনা। নমঃশূদ্ররা যদি চণ্ডাল না হত, তারা সকলে যদি ব্রাহ্মণ হত তবে সর্বমোট ব্রাহ্মণের সংখ্যা কত হত? এই কালে, যুগী ও বৈদ্যজাতের লোকেরাও নিজেদের ব্রাহ্মণ বলে দাবী করে আন্দোলন চালিয়েছিল। ভারতবর্ষের সব কটি প্রদেশে ব্রাহ্মণের শতকরা সংখ্যার সঙ্গে বঙ্গের ব্রাহ্মণের শতকরা সংখ্যার কি মিল থাকে? যে দেশে অষ্টম-সপ্তম শতাব্দীর পূর্বে ব্রাহ্মণ ছিল না সেই পাণ্ডব বর্জিত দেশে এত বিপুল সংখ্যক (চন্ডাল + ব্রাহ্মণ + যুগী + বৈদ্য + ধর্মান্তরিত চণ্ডাল + মুসলমান) ব্রাহ্মণ উৎপন্নের হিসাব কোন ম্যালথাস সাহেব দিতে পারবেনা। চণ্ডালের ব্রাহ্মণত্ব ঐতিহাসিক ও গাণিতিক দিক থেকে অবাস্তব।
   এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, জাতভুক্তি করণের মাধ্য দিয়ে হিন্দুকরণের বা ব্রাহ্মণের দাস হিসাবে পরিণত করার কাজের স্রোত এত প্রবল হয়েছিল যে এই একই সময়ে বঙ্গের কায়স্ত, মাহিষ্য, রাজবংশী, পোঁদ-পৌন্ড্র, হাড়ি ইত্যাদি জাতের লোকেরা নিজেদের ক্ষত্রিয় হিসাবে দাবী করতে থাকে। সরকারী নথিতে ক্ষত্রিয় পরিচয় লিপিবদ্ধ করানোর জন্য শাস্ত্রের অকাট্য যুক্তি প্রমান দেখায়। এভাবে দেখা যায় বেদবাহ্য বঙ্গের প্রায় ৩০% ব্রাহ্মণ এবং ৬০% ক্ষত্রিয় জাতের বা বর্ণের মানুষ।
    আর্যসংস্কার তথা মনোবৃত্তি বলে, যা কিছু প্রবল এবং ভাল গুণ সম্পন্ন তাই ব্রাহ্মণজাত, আর্য  বিষয়। আর যা কিছু মন্দ, দুর্বল, কদাকার কিম্বা ভারতীয় তা অন-আর্য। পক্ষান্তরে বলা যায়, যা  কিছু ভারতীয় অন্‌আর্য এবং অব্রাহ্মণ্য তাই মন্দ, নিন্দনীয় ও অস্থায়ী। তার মধ্যে উজ্জ্বল ও প্রশংশনীয় কিছ থাকতে নেই। বঙ্গের প্রবল, সংখ্যাবহুল বিকাশশীল চণ্ডালদের মুক্তিসূর্যের মহিমময় জ্যোতির্লোক হরি-গুরুচাঁদকে তাই আত্মস্মাৎ করে নিতে হবে ব্রাহ্মণ বলে? চণ্ডাল জাতির শৌর্য এবং মানবিক সাধন-সিদ্ধির প্রতি এ এক অন্যায় ব্যঙ্গ এবং বিদ্রুপ মাত্র। ব্রাহ্মণ হওয়া কোন গৌরবের নয়। ব্রাহ্মণজাত ভারতবর্ষের প্রগতি- বিকাশ এবং উত্থানের জন্য কোন অবদানই –ত রাখেনি। ভারতীয় সভ্যতা সংস্কৃতিতে ব্রাহ্মণদের কোন অবদান যদি থাকে তবে তা দাসপ্রথার স্থায়ীত্ব দান, দাসদের সংখ্যা বৃদ্ধি। “ছোট ছোট এই সব (ভারতীয়) গোষ্ঠী ছিল, জাতিভেদ ও কৃতদাসত্ব দ্বারা কলুষিত। অবস্থার প্রভুরূপে মানুষকে উন্নত না করে তাকে (ব্রাহ্মণেরা) করেছে বাহিরের অবস্থার পদানত। স্বয়ং-বিকশিত একটি সমাজ ব্যবস্থাকে তারা পরিণত করেছে অপরিবর্তমান প্রাকৃতিক নিয়তি রূপে। এবং এইভাবে আমদানি করেছে প্রকৃতির এমন পূজা, যা  পশু করে তোলে লোককে। প্রকৃতির প্রভু যে মানুষ তাকে হনুমানদেব রূপী বানর এবং শবলাদেবী রূপী গরুর অর্চনায় ভুলুন্ঠিত করে অধঃপতনের প্রমাণ দিয়েছে” Indian Castes, those decisive impediments to Indian progress and Indian power’ জাত ভেদ ব্যবস্থা ভারতীয় শক্তি ও প্রগতির চূড়ান্ত প্রতিবন্ধকতা। সুতরাং ব্রাহ্মণ হবার পিছনে কোন গৌরব থাকতে পারে না। শোষক-দলক-ঘৃণক যারা, তাদের বিরুদ্ধে সদা দণ্ডায়মান ছিলেন গুরুচাঁদ।
     বাংলায় তথা পূর্ব ভারতে ব্রাহ্মণ ছিল না একেবারেই। ‘শপ্তশতি ব্রাহ্মণের কাহিনি যারা জানে তারা এটাও জানেন, যে গল্পটি অনঐতিহাসিক কাহিনি। যদি ঐতিহাসিকও হয়, কৃত্রিমভাবে,   উদ্দেশ্য মূলকভাবে বানান গল্প নাও হয়, তাহলেও ঐ সাতশত ব্রাহ্মণ কিন্তু কাহিনি অনুসারেই সাজানো ব্রাহ্মণ। গলায় উপবিতের মতন সুতো পরিয়ে গরুর পিঠে চড়িয়ে তাদের পাঠিয়ে ছিলেন রাজা আদিশূর। আদিশূরের ঐতিহাসিক স্থানকাল নির্ণয় করা যায় না। তাহলে বলতে হয় এই  সাতশত শূদ্রব্রাহ্মণ আর স্ত্রীহীন কনৌজ থেকে আগত ব্রাহ্মণই যৌগিক শব্দের ‘নম’ এবং ‘শূদ্র’ বঙ্গ দেশে ব্রাহ্মণের সংখ্যা বৃদ্ধি করে ছিল। সুতরাং সাধু সাবধান। আমাদের স্মরণে রাখা দরকার যে বেদবাহ্য দেশের বামুন, রাজা রামমোহন রায় বেদের বঙ্গানুবাদ করেছিলেন বলে কাশীর বামুনেরা তাঁকে অধিকার ভঙ্গের জন্য গালি দিয়েছিল। এ হেন অবস্থায়, বৈদ্য, যুগী আর বিপুল সংখ্যক নমঃশূদ্ররা যদি, পূর্বোক্ত নকল জারজ ব্রাহ্মণদের সঙ্গে সঙ্গে ব্রাহ্মণের খাতায় নাম লেখায় তবে ইতিহাস ভূগোলের সাথে গণিতেরও গণ্ডগোল শুরু হবে।
     তারা প্রশ্ন তোলেনি, নমঃশূদ্ররা যদি ব্রাহ্মণ তবে ‘ব্রাহ্মণ’ এই বিশেষ্য লিখবে না কেন? নমঃশূদ্র লিখবে কেন? নমঃশূদ্ররা যদি ব্রাহ্মণ, তবে বিহারের মৈথিলী ব্রাহ্মণ পুত্র পুর্ববঙ্গের নমঃশূদ্র মেয়ে বিয়ে করে, হরিচাঁদের সপ্তম ঊর্দ্ধপুরুষ ব্রাহ্মণত্ব হারায় কেন?
     চণ্ডালেরা তথা নমঃশূদ্ররা যদি ব্রাহ্মণই হবে তবে ব্রাহ্মণের (দশ দিনে শ্রাদ্ধ ছাড়া) অপরাপর বিদ্যাশিক্ষায় অধিকারাদি নেই কেন? শ্রাদ্ধ ব্যবস্থাও তো অবৈদিক। চণ্ডাল তথা নমঃশূদ্রদের জাতিগত চারিত্রিক লক্ষণ মোটেই ব্রাহ্মণাক্রান্ত নয়। ব্রাহ্মণের ন্যায় এরা পরান্ন ভোগী, পরশ্রমশোষক, তঞ্চক, শঠ এবং বিবেকহীন নিষ্ঠুর নয়। এরা কঠোর শ্রমশীল উৎপাদক, স্বনির্ভর, সৎ এবং অত্যন্ত সাহসী জাতি। এরা হৃদয়বাণ ও ধর্মপরায়ণ। রিজলের মত----- এরা সর্বকর্ম পরঙ্গম। নৌচালনা, মৎস শিকার, যুদ্ধবিদ্যা, কৃষিবাণিজ্য, বাস্তুবিদ্যা এবং চিকিৎসা (চাঁদসী) বিদ্যায় দক্ষ। ব্রাহ্মণেরা এসবের কিছুই পারে না। জলে এবং ডাঙ্গায় এরা সমান পারদর্শী। এস্ফিভিয়াস অর্থাৎ উভয়চর বলে উচ্চপ্রশংশীত হয়েছে চণ্ডাল জাতি, ইংরেজ বিদ্বান ও গবেষকগণ কতৃক।   
     এই সব অতিমহৎ ও সুদূর্লভ গুণ সম্পন্ন চণ্ডাল তথা নমঃশূদ্রদের অপগুণের তথা সর্বপ্রকার  অমানবিক এবং পৈশাচিক কাজকর্মের গুণধর যে ব্রাহ্মণ তাদের দলভুক্ত করাটা চণ্ডালের কপালে অস্পৃশ্যতার কলঙ্ক লেপনের থেকেও বড় গ্লানিদায়ক। চণ্ডালকে ব্রাহ্মণ আখ্যা দিলে প্রকৃতপক্ষে  চণ্ডালকে চুড়ান্ত অপমান করা হয়। ব্রাহ্মণ জাত তো অপরাধ জগতের অবতার। সেন্সাস কমিশনার মিঃ এল. এস. এস. ও ‘মেলী, ভারতবর্ষ, অপরাধ প্রবণ, সম্প্রদায় ও জাতিগুলির তুলনা মূলক বিচার করে লিখেছিলেনঃ “The number of Muslim and Hindu convicts in Bengal is almost exactly proportionate to their strength in the population…… The largest number of Hindu criminals are Kayasthas and Brahmins.” ব্রাহ্মণদের বহুবিবাহ, কুলীন প্রথা, বাল্যবিবাহ, বিধবা অত্যাচার, মন্দির বেশ্যা ব্যবসা, সতীদাহের নারী হত্যা, ছোটজাত বলে মানুষের প্রতি অমানবিক ঘৃণা ইত্যাদি হাজারো ক্রাইমদোষে কলঙ্কিত। কলঙ্কের ঐতিহ্যময় ব্রাহ্মণ হতে যাবেন কেন হরি-গুরুচাঁদ!!  
    হরিচাঁদ ঠাকুর যাদের পারিবারিক, উপাধী ‘দাস’ কিম্বা ‘বিশ্বাস’ ছিল, ভক্তদের দ্বারা ব্রাহ্মণ বলে কীর্তিত। বলা হয়েছে তার পূর্বতন পিতৃপুরুষ শ্রীরামদাস বিশুদ্ধ এবং পূণ্যবাদ মৈথিলী ব্রাহ্মণ   সন্তান ছিলেন। তার পুত্র এবং গুরুচাঁদ ঠাকুরের সপ্তম ঊর্দ্ধপুরুষ চন্দ্রমোহন নমঃশূদ্র কন্যা বিবাহ করেন, একারণেই এবং সেই থেকে বংশটি নমঃশূদ্র জাত হিসাবে পরিগণিত হয়।  

     প্রকৃত পক্ষে এই সব কথা অতীত ইতিহাস ভিত্তি হীন। কোন প্রাচীন লিখিত প্রমাণ তথ্যের ভিত্তিতে  এ সব কথা তারক গোঁসাই লেখেন নি। যে কালে হরিচাঁদের পিতৃপুরুষের দ্বারা নমঃশূদ্রের কন্যার পাণিগ্রহণের কথা বলা হয়েছে সে কালে নমঃশূদ্র কোথায়? জাতিমালার কোন গ্রন্থেই নমঃশূদ্র নেই। এদের নাম ছিল চন্ডাল। নমঃশূদ্র শব্দের আবির্ভাব মোটামুটি ১৮৮০ দশক থেকে। স্বং গুরুচাঁদ কিছু চেষ্টা করেছিলেন চণ্ডাল নামের পরিবর্তে নমঃশূদ্র নাম দিতে। সুতরাং অতপ্রাচীন কালে নমঃশূদ্র কন্যা বিবাহের কাহিনি কাল্পনিক বলেই বলতে হয়।  
    আরো দেখা যায়, বর্ণান্তরে বিবাহের ফলে, নিয়মানুসারে পিতার বর্ণ বা জাতের নামে পরিচিত হয় সন্তান। যেমন, ব্রাহ্মন যদি নমঃশূদ্র কন্যা বিবাহ করে, বর্তমান সমাজে আমরা দেখি সন্তানের পরিচয় ব্রাহ্মণই হয়। নমঃশূদ্র যদি কায়স্ত কন্যা বিয়ে করে তাদের সন্তান নমঃশূদ্র এবং তপশীল ভুক্তই হয়। কায়স্ত হিসাবে পরিচিত হয় না। হরিচাঁদের ব্রাহ্মণ প্রপিতামহ নমঃশূদ্র কন্যা বিবাহ করার পরেও বংশধরেরা তো ব্রাহ্মণ হিসাবেই অন্ততঃ পতিত ব্রাহ্মণ হিসাবে গৃহীত হবে। অস্পৃশ্য  নমঃশূদ্র কেন হয়ে গেল? জাত তো জনকের সূত্রে আগত। মাতৃসূত্রে নয়।
     আবার শাস্ত্রে দেখা যায় ভিন্ন রকম। মনু বলেছেন শূদ্র পিতা এবং ব্রাহ্মণ মাতার উত্তর পুরুষ চণ্ডাল নামে খ্যাত হয়। অর্থাৎ ব্রাহ্মণ হয় না কখনই। দুজনের কারো জাতের নাম পায় না। নতুন এক সঙ্কর বর্ণের সৃষ্টি হয়। তাহলে হরিচাঁদ ঠাকুরের প্রপিতামহের বেলায় এই অদ্ভূৎ, কৃত্রিম এবং পতনপদ অবস্থা ঘটল কেন? পিতা ব্রাহ্মণ,  মাতা নমঃশূদ্র। সঙ্কর বর্ণ কিছু নতুন নাম পাবেতো? পিতৃ সূত্রে পাবে তো? শূদ্রের থেকেও নিম্নতম স্থান তথা অস্পৃশ্যত্ব কি করে পায়? হিসাব, কোনভাবে না মেলায় একমাত্র এবং পরিষ্কার কারণ এই যে এই পরিচয় পত্রটি একেবারেই বানানো এবং কৃত্রিম। চণ্ডালরা মাতৃসূত্রে আর্য; আর নমঃশূদ্রতো প্রিতৃসূত্রে আর্য!     
     হরিচাঁদ ঠাকুরের ব্রাহ্মণ উৎস কোনভাবেই তাদের কিম্বা তাঁর স্বজাতির মর্যাদা বাড়ায় না।  বরং ভাবিকালের আদালতে ব্রাহ্মণজাতের দ্বারা কৃত সব মানবতা বিরুদ্ধ অপকর্ম এবং অপসংস্কৃতি অনুষ্ঠানের সব দায় তাদের ঘাড়েও বর্তাবে। অন্য পরে কা কথা স্বয়ং হরি-গুরুচাঁদ বলেছেন,
“দলিত গলিত যত পতিত মানব।
ব্রাহ্মণের কুটচক্রে মৃতপ্রায় সব।।”
মানব জাতিকে দলিত- গলিত পশ্বাধাম করে রেখেছে যে জাত গোষ্ঠী, সেই কুচক্রি ব্রাহ্মণ  নরগোষ্ঠী-সদস্য হতে যাবে কোন দুঃখে, ধন উৎপাদক, সৎ ও উদার প্রাণের কৃষক সম্প্রদায়।  হরি-গুরুচাঁদ দলিত বহুজন, আর্ত সমাজের উদ্ধার কর্তা, তাদের জীবন ও সমাজের কালোত্তীর্ণ ধ্রুবতারা, তিনি কি করে ব্রাহ্মণ হবেন? ব্রাহ্মণ তো দলিত বহুজন মানুষের নৈস্বর্গিক দুষমন। ঘৃণক তারা মানবের। উপনিবিষ্ট, বিদেশী। শূদ্র শম্বুকের উত্থানে ব্রাহ্মণ শিশুর অকাল মরণ ঘটে আর শূদ্র  শম্বুকের শিরচ্ছেদ হলে, তাঁর মরণ কাঠির যাদুস্পর্শে দূরবর্তী মৃত ব্রাহ্মণ কুমার পুনঃপ্রাণ লাভ করে। দলিত বহুজন মানুষের প্রাণের ঠাকুর হরি-গুরুচাঁদ কি করে ব্রাহ্মণ হবে। মিথ্যা কথা! সব ঝুট হ্যায়! হতেই পারে না।
     যে মতুয়ারা, ‘জন্মগত জাতিকথা কয় না’ সেই মতুয়া- জনক হরি-গুরুচাঁদের গলায়, ‘ব্রাহ্মণ’ – জাতের জুতোর মালা কেন পরাই?