শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১

সতীদাহ পালন ও প্রথা

 🔴প্রসঙ্গঃ যেভাবে সতীদাহ পালিত হতঃ


সতীদাহ মূলত উচ্চ বর্ণের হিন্দু পরিবারগুলোতেই করা হত। হাজার হাজার বছর ধরে অগণিত ভারতীয় হিন্দু নারী জীবিত অবস্থায় চিতার লেলিহান আগুনে প্রবেশ করেছেন- কখনও স্বেচ্ছায়, কখনও বা জোর করে। স্বেচ্ছায় হলেও মানবতার বিচারে এই প্রথার পৃষ্ঠপোষকতা ভারতীয় সভ্যতার একটি অন্যতম কলঙ্ক-বিন্দু। কিন্তু কীভাবে পালিত হত এই বর্বর প্রথা? এই ব্যাপারে গোরাচাঁদ মিত্রের লেখা 'সতীদাহ' বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তারই কিছু অংশ নীচে তুলে ধরলাম-


🔸স্বামীর মৃতদেহ চিতায় শায়িত । নাপিত এসে বিধবা নারীর নখ কেটে দিয়ে গেলেন । শােক স্তব্ধা স্ত্রী হাতের শাখা ভেঙে চললেন স্নানে - শুচিশুদ্ধ হবার জন্য । স্নানের পর চিতারোহণের সাজ । আত্মীয়রা এগিয়ে এসে পরিয়ে দিলেন লাল চেলী , হাতে বেঁধে দিলেন রাঙা সুতাে দিয়ে আলতা , গােটা কপাল জুড়ে লেপে দিলেন টকটকে লাল সিঁদুর – নিপুণ করে আঁচড়ানাে চুলে থরে থরে চিরুনির বাহার । গােটা দেহে মূল্যবান অলংকারের সমারােহ । স্বামীহারা স্ত্রী দু-ফোঁটা চোখের জল ফেলতেও বিস্তৃত হয়েছেন তিনি যেন সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের হাতের পুতুল । কুশ হাতে নিয়ে পুবমুখী বসে অাচমন করলেন নারী । হাতে নিলেন তিল , জল ও কুশনির্মিত ত্ৰিপত্র । উপস্থিত ব্রাহ্মণগণ উচ্চারণ করলে – 'ওঁ তৎসৎ' । ধ্বনিত হল বিধবার নিম্ন কন্ঠে -"নমঃ , আজ অমুক মাসে , অমুক পক্ষে , অমুক তিথিতে , অমুক গােত্র ঐ অমুক দেবী বশিষ্ঠেব পত্নী অরুন্ধতীর সমমর্যাদায় স্বর্গে যাওয়ার জন্য , মানুষের শরীরে যত লোম আছে তত বছর অর্থাৎ তিনকোটি বছর স্বামীর সঙ্গে স্বর্গসুখ উপভােগের আশায় , মাতৃকুল , পিতৃকুল ও পতিকুল — তিন কুলকেই পবিত্র করার অভিপ্রায়ে , চতুর্দশ ইন্দ্রের রাজত্বকাল পর্যন্ত স্বর্গসুখ ভোগের কামনায় এবং যদি স্বামী ব্রহ্মহত্যাকারী , কৃতঘ্ন ও মিত্রদ্রোহী হন , তাহলে তাকে পবিত্র করার জন্য , আমি স্বামীর জলন্ত চিতায় অধিরোহণ করছি ' । ‘ হে অষ্টলােকপালগণ , হে সূর্য , চন্দ্র , বায়ু , হে অগ্নি , আকাশ , ভূমি , জল , হে অন্তর্যামিন আত্মাপুরুষ , হে যম , দিন , রাত্রি , সন্ধ্যা , হে ধর্ম , আপনারা সকলে সাক্ষী থাকুন , আমি প্রজ্বলিত চিতায় আরােহণ করে স্বামীর অনুগামিনী হচ্ছি ।" 


এরপর খই , খণ্ড ও কড়ি আঁচলে বেঁধে সতীনারীর চিতাপ্রদক্ষিণের পালা - বার বার সাতবার । ব্রাহ্মণ পুরােহিত কণ্ঠে প্রয়ােজনীয় মন্ত্রাদি বিবৃত হবার পর বিধবা স্ত্রী স্বামীর পাশে চিতাশয্যা গ্রহণ করলেন । আত্মীয়স্বজনেরা মহোল্লাসে গাছের ছালের দড়ি দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে চিতার সঙ্গে বাঁধলেন তাকে । পুত্র বা নিকট কোন আত্মীয় এগিয়ে এলেন চিতায় অগ্নিসংযােগের জন্য । উপস্থিত দর্শকবৃন্দের পৈশাচিক উল্লাস ও ঢাক - ঢােল , কাসরের প্রচণ্ড আর্তনাদে চতুর্দিক স্তম্ভিত । দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলাে চিতা । তাও যেন অাশ মেটে না পুণ্যার্থীদের ! ঝুপঝাপ করে শর ও পাকাটির আঁটি ফেলতে লাগলেন সবাই চিতার আগুনে । অগ্নিসংযোগের পর পাছে সতীনারীর আরও কিছুদিন পৃথিবীর আলাে - বাতাস ভােগের শখ হয় তাই চিতার পাশেই মােটা মােটা বাশ নিয়ে 'ধর্মসংস্থাপনাকারীরা' অপেক্ষমান । বিধবা স্ত্রী বাঁচবার সামান্যতম চেষ্টা করলেই বাঁশের উপর্যুপরি আঘাতে তার ভবলীলা সাঙ্গ করা হত। কোন নারী দৈবক্রমে চিতা থেকে পালিয়ে গেলে ক্ষুধার্ত নেকড়ের মত তার পিছু নিতেন অনুষ্ঠান কর্তা ও তার সাঙ্গোপাঙ্গোরা , পলায়মানা নারীকে লজ্জাকরভাবে বাহুবলে পরাস্ত করে আবার চিতায় চাপানাে হত — না হলে যে বংশের মুখে চুনকালি পড়বে ! সম্মিলিত প্রতিরােধের কাছে ফুৎকারে নিভে যেত সতীনারীর বাঁচার আশা । ধীরে ধীরে এক সময় নিভে যেত চিতার আগুন । কিন্তু তা বলে পুরােহিতের বিশ্রাম নেই । তিনি তখন শকুনির মত ঘেটে চলেছেন চিতার ছাই - ভস্ম - সতীর গায়ের বল মূল্য অলংকারগুলি বর্তমান মালিক তো তিনিই । অন্যদিকে বংশগৌরবের উজ্জ্বলতা বিচার করতে করতে ঘরে ফিরে চলেছেন মৃতের আত্মীয়স্বজন - চাদরের তলায় কর গুণে-গুণে হিসেব করছেন স্ত্রীর মৃত্যু হবার দরুণ মৃতের কতখানি স্থাবর - অস্থাবর সম্পত্তির মালিক হলেন তারা । অনেক ক্ষেত্রে দাহকার্যের পূর্বে মদ , ভাঙ , ইত্যাদি উত্তেজক দ্রব্য খাইয়ে সতীনারীর মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে ফেলা হত । কি অপরিসীম মানসিক স্থৈর্যের অধিকারিণী ছিলেন এই সতীনারীরা , ভাবলে বিস্ময় লাগে। এক অদ্ভুত অপার্থিব সুখভােগের আশায় , স্বর্গ নামক এক অজ্ঞাত মনােহারী স্থানে মিষ্টি সুখে স্বামী-সঙ্গ লাভের কামনায় তারা দলে দলে অবিচলভাবে হেঁটে গেছেন আগুনের কোলে — শিকার হয়েছেন পৃথিবীর নৃশংসতম প্রথার । কিন্তু এই প্রথার বিরুদ্ধে তর্জনী উত্তোলনের মত সাহসও কারুর ছিল না ।


তথ্যসূত্রঃ

সতীদাহ | লেখকঃ গোরাচাঁদ মিত্র | শঙ্খ প্রকাশনী

(পৃষ্ঠা ২-৩)


#sati

সংগৃহীত : Sukanta Saha Suhrid

শাস্ত্রপৃষ্ঠা

কোন মন্তব্য নেই: