বুধবার, ১৬ নভেম্বর, ২০২২

বিরসা মুন্ডা

 VOICE of 85

 বিরসা মুণ্ডার জন্ম গ্রাম উলিহাতু জেলা রাঁচী ১৫ই নভেম্বর ১৮৭৫। পিতার নাম সুগণা মুণ্ডা মাতার নাম কর্মী হাতু। কাজের খোঁজে বীরসার পিতা কুরুম্বদা বীরবাকির কাছে যেতে হয়। সেখানে শ্রমিকের কাজ করে অন্যের জমিতে।


বীরসার ছোটবেলা সাধারণ আদিবাসী ছেলে মেয়েদের যেভাবে কাটে তারও সেই ভাবে আনন্দে কেটেছে ধূলাবালি গাছপালার সাথে। তবে বীরসা খুব সুন্দর বাঁশি বাজাতে পারত।


পরিবারের জন্য বীরসাকে তার মামাবাড়ী আয়ুভাতে থাকতে হয়েছিল। এখানে বীরসা দু বছর কাটিয়ে ছিল। এখানে সালগার এক স্কুলে সে পড়ত। যে স্কুল চালাত জয়পাল নাগ। তারপরে বীরসা একজন খ্রীষ্টান মিশনারির সান্নিধ্যে আসে এবং খ্রীষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে। তখন থেকে তার পড়াশুনার প্রতি অত্যধিক মনোসংযোগ এসে যায়। বীরসা যে ভেড়া ও ছাগলদের চরাত তাদের প্রতি নজর না দেওয়ার জন্য বীরসাকে প্রহার করে মালিকেরা। তখন সে তার দাদার কাছে কুন্দ্রী বড়ােলীতে চলে যায়। এখানেই সেই নিম্ন প্রাথমিকে পড়াশুনা করে জার্মান মিশনারীদের কাছে। তারপরে সে চাইবাসাতে ও একটি জার্মান মিশনারী স্কুলে পড়াশুনা করে। বীরসার জীবনের ছোট বেলাটাই কেটেছে বিহারের ছোটনাগপুরের গ্রাম ও জঙ্গলে।


চাইবাসাতে বীরসা ১৮৮৬ সাল পর্যন্ত কাটিয়েছিল। এই সময় সর্দারদের সঙ্গে মিশনারী এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হওয়ার কারণে তার পিতা তাকে মিশনারী স্কুল থেকে তুলে নেয়। এর একটা বড়ো কারণ ব্রিটিশ সরকার আদিবাসীদের কাছ থেকে জঙ্গলের অধিকার কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত করে। সিংভূম, পালামৌ, মানভূম সর্বর ব্রিটিশরা তাদের অধিকার কব্জা করতে উঠে পড়ে লাগে। ১৮৮২ সালে ভারতীয় জঙ্গল আইন চালু হয়, তারই ফলশ্রুতি এইসব।


ঠিকাদার এবং জাগিরদাররা বহুদিন ধরে এইসব অঞ্চল দখল করে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। ১৮৫৬ সালে এই জাগিরদারদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৬০০।

এর ফলে এখানকার মূলনিবাসী মানুষেরা প্রায় তাদের জমিজমা হারিয়ে ফেলেছিল। 


নিজেদের জমিতেই তারা মজদুর হিসাবে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছিল। তাদের জমি এই জমিদারের ঠিকাদার আর মহাজনদের কবজায় চলে গিয়েছিল। তাদের অশিক্ষার কারণে ব্রিটিশ কোর্টে তাদের লড়াই করার ক্ষমতা ছিল না। শত শত বছরের দখলে রাখা জমি ব্রিটিশদের দালাল জমিদার আর মহাজনদের কবজায় চলে গিয়েছিল। বীরসা ছোটনাগপুর অঞ্চলের সমস্ত আদিবাসীদের এক ছাতার তলায় নিয়ে আসল।


১৮৯৪ সালে খরা আর মহামারীতে আদিবাসীদের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে পড়ে। বিরসা সমস্ত আদিবাসীদের একজোট করে ব্রিটিশ সরকারের কাছে আবেদন জানায় জঙ্গলের উপরে যে ট্যাক্স চাপানো হয়েছে, তা যেন মকুব করা হয়।


১৮৯৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাদের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখা এবং সবাই একত্রীভূত করে ব্রিটিশের বিরোধিতার জন্য বীরসার দু'বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়। তার জন্য জমিদার এবং মহাজনদের ষড়যন্ত্র ছিল।


১৮৯৭ সালে বীরসা আগষ্ট মাসে চারশো আদিবাসীদের নিয়ে তীর ধনুক নিয়ে খুন্তী পুলিশ স্টেশন আক্রমন করে।


১৮৯৮ তালাগা নদীর পাশে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে বীরসা যুদ্ধে অবতীর্ণ


হয়। প্রথমিকভাবে ব্রিটিশদের পরাজিত করে।


পরবর্তীকালে ব্রিটিশ তাবেদারদের কৌশলে আদিবাসীদের অনেক লোককে গ্রেপ্তার হতে হয়। তাদের উপর চলে অকথ্য নিপীড়ন। ১৯০০ সালের ফেব্রুয়ারী তিন তারিখে চক্রধরপুরের জঙ্গলে বীরসাকে গ্রেপ্তার করে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী।


এই জেলে মাত্র ২৫ বছর বয়সে এক অসিম সাহসী আদিবাসী যুবক বীরসা মুণ্ডার মৃত্যু হয়। ব্রিটিশরা ঘোষণা করে কলেরায় বীরসা মুণ্ডার মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু কলেরা হয়েছে বীরসা মুণ্ডার এমন কোন খবর ছিল না।


২৫ বছর বয়সের এক যুবা যে এমন ঐতিহাসিক লড়াই দিতে পারে আবা পর্যন্ত ভারতবর্ষের ইতিহাসে এমন উদাহরণ পাওয়া মুস্কিল। হাজার হাজার আদিবাসীদের যেভাবে অনুপ্রাণিত করে দুর্ধর্ষ ব্রিটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে এবং জমিদার মহাজনদের বিরুদ্ধে এতো দুর্দমনীয় লড়াই এক স্বল্পশিক্ষিত আদিবাসী ২৫ বছরের যুবকের তা অবিস্মরণীয়। তার এই লড়াই চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে আগামীদিনের মানবতাবাদের লড়াইয়ের ইতিহাসে।

বর্তমান এই বীর পুরুষ বীরসা মুন্ডাকে আমরা মুলনিবাসি আদিবাসীরা ভগবান বানিয়ে ফেলেছি, বিশেষ করে উত্তর ভারতে দিল্লির প্রতিবেশী জেলার মুল নিবাসীরা এর পূজা করেন ।

বুধবার, ১২ অক্টোবর, ২০২২

কিভাবে মালাউন শব্দটি এলো।

কপি-পেস্ট উত্তর। মূল লেখা

‘মালাউন’ শব্দটি সম্পর্কে আলোচনার পূর্বে প্রাসঙ্গিক কিছু কথা জেনে নেওয়া প্রয়োজন। বাংলা ভাষার গোটা বিশেক অভিধান ঘেটে ‘মালাউন’ শব্দটি পাওয়া গেছে মাত্র ৩টি অভিধানে। বলাবাহুল্য, এর সবগুলো অভিধানই বাংলাদেশ থেকে, আরো সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে বলতে হয় বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত। আমার জানা মতে, বাংলা ভাষার প্রথম দিকের কোনো অভিধান থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত পশ্চিম বাংলা থেকে প্রকাশিত কোনো বাংলা ভাষার অভিধানেই ‘মালাউন’ শব্দটি নেই। তাদের ব্যবহারিক জীবনে শব্দটির তেমন প্রয়োগ নেই বলেই হয়তো তাদের অভিধানেও শব্দটি স্থান পায়নি। কিন্তু আমাদের দেশে ‘মালাউন’ শব্দটির বহুল প্রয়োগ এবং অপপ্রয়োগ শব্দটিকে করেছে তাৎপর্যপূর্ণ এবং গুরুত্বের সঙ্গে স্থান দিয়েছে অভিধানের পাতায়।

‘মালাউন’ শব্দটি এসেছে আরবি ভাষা থেকে। এদেশে ‘মালাউন’ শব্দটির ব্যবহার অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, ১৯৪৭-এ ভারত বিভাগের পর থেকে আমাদের দেশের কিছু মানুষের মুখে ‘মালাউন’ শব্দটির ব্যবহার দ্রুতহারে বাড়তে থাকে। এর আগেও শব্দটির ব্যবহার ছিল, তবে তা ছিল অনুল্লেখযোগ্য কিন্তু যথাযথ। বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের কবিতায় এবং আধুনিক যুগের কারো কারো সাহিত্যকর্মে ‘মালাউন’ শব্দটি লক্ষ করা যায়। পাকিস্তান সৃষ্টির পর বেশিরভাগ উর্দুভাষী পাকিস্তানী হিন্দু শব্দের পরিবর্তে ‘মালাউন’ শব্দটি ব্যবহার করতে থাকে। এই অপব্যবহারের ব্যাপকতা চোখে পড়ে ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়। সে সময় হানাদার পাকিস্তানী বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় সহযোগীরা ব্যাপকভাবে ‘মালাউন’ শব্দটি ব্যবহার করতে থাকে। হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর কোন সদস্য হিন্দুদেরকে কখনো ‘হিন্দু’ সম্বোধন করেছে এমন উদাহরণ বিরল। মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা মুক্তিবাহিনীর সদস্য এবং তাদের ভাষায় ‘মালাউন’দের খোঁজ করতো, হিন্দুদেরকে নয়। ‘মালাউন’ শব্দটি এরা বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টানদের প্রতি নয়; শুধু হিন্দুদের প্রতি ব্যাঙ্গার্থে বা তুচ্ছার্থে বা চরম ঘৃণা প্রকাশার্থে ব্যবহার করতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে মননে পাকিস্তানী কিছু সাম্প্রদায়িক মানুষ হিন্দুদেরকে শুধু ‘মালাউন’ই নয়; আরো ঘৃণার্থে ‘মালাউন’ শব্দটিকে তাদের মানসিকতার মতো বিকৃত করে ‘মালোয়ান’ এবং কোথাও তীব্রতম ঘৃণা ও ঈর্ষার প্রকাশ ঘটিয়ে ‘মালোয়ান’ শব্দকে সংক্ষিপ্ত করে ‘মালু’ শব্দটি চালু করেছে, যা একজন সামান্যতম হৃদয়বান ও ব্যক্তিত্ববান মানুষকে ব্যথিত না করে পারে না।

‘মালাউন’ শব্দটির অর্থ নিরূপণে অভিধানের শরণাপন্ন হওয়া যাক। প্রখ্যাত ভাষাতাত্ত্বিক, পণ্ডিত ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সম্পাদিত ‘বাংলা একাডেমী বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান’-এ ‘মালাউন’ শব্দটির প্রথম অর্থ দেওয়া হয়েছে ‘বিধর্মী’ এবং দ্বিতীয় অর্থ ‘অভিশপ্ত’। কাজী রফিকুল হক সম্পাদিত বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘বাংলা ভাষায় আরবী ফারসী তুর্কী হিন্দী উর্দু শব্দের অভিধান’ গ্রন্থে ‘মালাউন’ শব্দটিকে প্রথমত ‘মালউন’ বানানে দেওয়া হয়েছে, যার আরবি উচ্চারণ নির্ধারণ করা হয়েছে ‘মল্’ঊন’ এবং শব্দটির প্রথম অর্থ দেওয়া হয়েছে ‘অভিশপ্ত’; ‘বিতাড়িত’ এবং দ্বিতীয় অর্থ দেওয়া হয়েছে ‘শয়তান’। আর ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক এবং শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী সম্পাদিত ‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’ গ্রন্থে ‘মালাউন’ শব্দটির প্রথম অর্থ দেওয়া হয়েছে লানতপ্রাপ্ত; অভিশপ্ত; বিতাড়িত; কাফের (উদ্ধৃতি: অনাচারে কার সরদার মুসলিম অভিমানে ছাড়িয়ে গেল চিরতরে মালাউনকে- শাহাদাত হোসেন), দ্বিতীয় অর্থ দেওয়া হয়েছে ‘শয়তান’, আর তৃতীয় অর্থ দেওয়া হয়েছে মুসলমান কর্তৃক ভিন্ন সম্প্রদায়ের লোককে দেওয়া গালিবিশেষ। এই অভিধানের অন্যত্র ‘মালাউন’ শব্দের ‘লানতপ্রাপ্ত’ অর্থে ‘লানত’ বা ‘লানৎ’ আরবি শব্দটির দুটি অর্থ দেওয়া আছে। প্রথমটি ‘অভিশাপ’ (উদ্ধৃতি: হাজার লানত যে এমন কাজ করে- সৈয়দ হামজা)। দ্বিতীয় অর্থ ‘অপমান’; ‘লাঞ্ছনা’; ‘ভর্ৎসনা’। তৃতীয় অর্থ ‘শাস্তি’ (উদ্ধৃতি: সে সবেরে লাহানতি দিবেক আল্লায়- সৈয়দ সুলতান)। অর্থাৎ অভিধানের আলোকে ‘মালাউন’ শব্দটির অর্থ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহকৃত অর্থ ‘বিধর্মী’র মধ্যেই আজ আর সীমাবদ্ধ নেই। আজ অন্য কোনো ধর্মাবলম্বীকে না বুঝিয়ে ‘মালাউন’ শব্দটির অর্থ সংকুচিত করে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধিবিশিষ্ট কিছু মানুষ শুধু হিন্দুদেরকেই ‘মালাউন’ নামে অভিহিত করছে। শব্দটির অর্থ যদি ‘বিধর্মী’ অর্থাৎ অন্য ধর্মাবলম্বীকে বুঝাতো তাহলেও কথা ছিল। কিন্তু বর্তমানে ইসলাম ধর্মাবলম্বী ব্যতীত অন্য কোনো ধর্মাশ্রয়ীকে নয়; সুনির্দিষ্টভাবে তারা ‘মালাউন’ শব্দ দিয়ে শুধু হিন্দুদেরকেই বুঝাচ্ছে। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ‘মালাউন’ শব্দটির প্রথম অর্থ ‘বিধর্মী’ জানালেও দ্বিতীয় অর্থ দিয়েছেন ‘অভিশপ্ত’। উল্লেখ্য, শহীদুল্লাহ ব্যতীত আর কোনো অভিধানকার শব্দটির অর্থ ‘বিধর্মী’ বলেননি। অন্যদের অভিধানে যে অর্থটি গুরুত্ব পেয়েছে সেটি হচ্ছে ‘অভিশপ্ত’ এবং ‘বিতাড়িত’। তাহলে কি ওইসব সাম্প্রদায়িকমনস্ক ব্যক্তির কথায় ধরে নেবো এদেশের হিন্দুরা অভিশপ্ত এবং বিতাড়িত? অভিশপ্ত হলে কখন, কোথায়, কীভাবে, কার দ্বারা অভিশপ্ত হলো; আর বিতাড়িত হলে কোন জায়গা থেকে, কখন তাদেরকে তাড়িয়ে দেওয়া হলো। এদেশের হিন্দুরা কি নিচ মনোভাবাপন্ন ওইসব ব্যক্তি কর্তৃক অভিশাপগ্রস্ত হলো এবং এই হিন্দুরা কি নিজ বাসভূম থেকে বিতাড়িত হলো? না। বাংলাদেশের হিন্দুরা বাংলাদেশের মাটির আদিসন্তান। এদেশে ইসলাম প্রচারের কয়েক সহস্র বছর আগে থেকে তারা এখানে আছে এবং ইসলাম প্রচারের পর থেকে হিন্দু ও মুসলমান ধর্মের অনুসারী সাধারণ মানুষ একে অন্যের সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে হাত ধরাধরি করে ভাই-ভাইয়ের মতো অংশগ্রহণ করে সুখে-শান্তিতে বসবাস করছে। ধর্মপালনটা যার যার ব্যক্তিগত হলেও তখন থেকেই ধর্মীয় উৎসবটা হয়ে উঠেছে সবার। সুতরাং ‘অভিশপ্ত’ বা ‘বিতাড়িত’-র মতো নিকৃষ্ট অর্থে হিন্দুদেরকে নয়; বরং ওই সাম্প্রদায়িক মনোভাবদুষ্ট সংকীর্ণ মানুষদেরকেই উল্টো ‘মালাউন’ অভিধায় চিহ্নিত করা যেতে পারে। কাজী রফিকুল হকের অভিধানে ‘মালাউন’ শব্দের অর্থ দেওয়া হয়েছে আরবি শব্দ ‘শয়তান’, যার অর্থ আল্লাহদ্রোহী ফেরেশতা, পাপাত্মা, অতিশয় দুর্বৃত্ত, বদমায়েশ ইত্যাদি। তবে কি এদেশের হিন্দুরা আজ ওই মানুষদের কাছে এসব নেতিবাচক বিশেষণের উপযুক্ত? নিশ্চয়ই নয়। আর ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হকের অভিধানে ‘মালাউন’ শব্দের আর একটি উল্লেখযোগ্য অর্থ দেওয়া হয়েছে: ‘কাফের’ (আরবি শব্দ কাফির), যার অর্থ সত্য প্রত্যাখ্যানকারী, ইসলামধর্ম অস্বীকারকারী, ইসলাম-বিরোধী ইত্যাদি। এদেশের হিন্দুরা ইসলাম-বিরোধী বা অস্বীকারকারী তো নয়ই; সত্য প্রত্যাখ্যানকারীও নয়। কারণ হিন্দুর ধর্মই বহুমতে বিশ্বাসী ধর্ম, যেখানে প্রতিমা (মূর্তি) পূজার মধ্য দিয়ে যেমন প্রার্থনার পদ্ধতি আছে, তেমনি প্রতিমা ছাড়াই নিরাকারভাবে প্রার্থনার রীতিও আছে, যা বৈদিকযুগে ছিল এবং রাজা রামমোহন রায় কর্তৃক নবভাবে প্রবর্তিত ব্রাহ্মসমাজে এখনো প্রচলিত। আবার হিন্দুদের এক একজন এক এক দেবতাকে উপাস্য ভেবে প্রার্থনা করছে। কেউ এক দেবতাকে পুজো করলেও অন্য দেবতার প্রতি তার কোনোরূপ অবজ্ঞা বা অশ্রদ্ধা নেই। বরং ওই লোকদের সংখ্যাই হিন্দুদের মধ্যে বেশি, যারা বিভিন্ন দেবতাকেই সমান শ্রদ্ধায় পুজো করছে। অর্থাৎ হিন্দুধর্মের লোকদের রয়েছে অন্য ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধা। হিন্দুধর্মের আধুনিক ব্যাখ্যাকারী, রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণদেবের উদ্ধৃতি দিয়ে এ কথাটি আরো চমৎকারভাবে বলেছেন এভাবে: ‘যত মত, তত পথ। ... হিন্দু শুধু অন্যের ধর্মকে শুধু স্বীকারই করে না, বিশ্বাসও করে।’ তাই হিন্দুদেরকে কোনোভাবেই ‘মালাউন’ বলা যায় না।

এতক্ষণের আলোচনা থেকে যুক্তি ও উদাহরণসহকারে একথাটি স্পষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে যে, বাংলাদেশের হিন্দু ধর্মালম্বীদের কোনো ক্রমেই ‘মালাউন’ বলা উচিত নয়। যাঁরা মননে কোনোরূপ সাম্প্রদায়িক বা হিন্দুবিরোধী না হয়েও শুধু অর্থ না জানার কারণে, না বুঝে, না ভেবে, অন্ধ অনুকরণকারীর মতো এতদিন ‘মালাউন’ শব্দটির অপপ্রয়োগ করে আসছিলেন, তাঁরা আশা করি পরবর্তী সময়ে অনুতপ্ত হয়ে শব্দটির ব্যবহারে সংযত হবেন। আর যারা সাম্প্রদায়িক চেতনাদুষ্ট, কুরুচি, অসংস্কৃত চেতনা, অবিকশিত বুদ্ধি এবং অপরিপক্ব মেধার অধিকারী কিংবা জ্ঞানপাপী, তাদের কাছে যতোভাবেই অর্থ, যুক্তি ও উদাহরণ উপস্থাপন করে ‘মালাউন’ শব্দটির অপব্যবহার থেকে তাদেরকে বিরত রাখার চেষ্টা করা হোক না কেন, তা শুধু অরণ্যে রোদনে পর্যবসিত হবে। শুধু ‘মালাউন’ শব্দই নয়; অন্য ধর্মাবলম্বীর বা যেকোন মানুষের হৃদয়ে ব্যথার উদ্রেক করে এমন কোন শব্দ ব্যবহার করা আমাদের কারোরই উচিত নয়।

যুগে যুগে শব্দের অর্থ বদলায়; বদলায় শব্দের ইমেজ, চিত্রকল্প। তাই যে শব্দটির অর্থ এক যুগে নন্দিত ছিল, পরবর্তী যুগে তা নিন্দিত বা পরিবর্তিত হতে পারে। উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি স্পষ্ট করা যাক। ‘প্রবীণ’ শব্দের অর্থ আগে ছিল: প্রকৃষ্টরূপে অর্থাৎ চমৎকারভাবে বীণা বাজাতে পারেন যিনি। কিন্তু আজ শব্দটির অর্থ পরিবর্তিত হয়েছে ‘জ্ঞানী’ অর্থে। এমনিভাবে ‘পঙ্কজ’ শব্দের অর্থ ছিল পঙ্কে (কাদায়) জন্মে যা। ঝিনুক, শালুক, পদ্ম ইত্যাদি কাদায় জন্ম নিলেও আজ শুধু ‘পদ্ম’ অর্থেই পঙ্কজ শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে। ‘রাজাকার’, আরবি ভাষার এই শব্দটির অর্থ স্বেচ্ছাসেবক। কিন্তু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীকে সহায়তা এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা ও ক্ষতিসাধন করে রাজাকার বাহিনী ‘রাজাকার’ শব্দটিকে কলঙ্কিত করেছে। যে-কারণে সেই সময় থেকে ‘রাজাকার’ শব্দটির চমৎকার অর্থের বদলে আমাদের দেশে গালি অর্থেই শব্দটির প্রয়োগ হচ্ছে। ‘আলবদর’ এবং ‘আলশামস’ শব্দ দুটির ক্ষেত্রেও অনুরূপ মন্তব্য করা যায়। তেমনিভাবে ‘মালাউন’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ যা-ই হোক না কেন, সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিদের কিংবা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সদস্যদের মুখে ১৯৭১ সালে যে বীভৎসরূপে, তীব্রতম ঘৃণায়, রক্তলোলুপ জিঘাংসায় হিন্দুদের প্রতি ‘মালাউন’ শব্দটি উচ্চারিত হতো; সেই ‘মালাউন’ শব্দ শ্রবণে আমাদের সামনে এখনো এমন এক ঘৃণার্হ চিত্রকল্প ভেসে ওঠে, যা অনুভূতিসম্পন্ন, বিবেকবান যেকোনো মানুষের পক্ষে ভোলা সম্ভব নয়। আর এ কারণেই কোনো সংস্কৃতিবান, সুশিক্ষিত, অসাম্প্রদায়িক, মুক্ত চেতনার ধারক, আধুনিক মানুষের পক্ষে কোনোভাবেই ‘মালাউন’ শব্দের অপপ্রয়োগ শুধু অসম্ভবই নয়; অভাবনীয়ও বটে।

সোমবার, ১০ অক্টোবর, ২০২২

ইতিহাস পর্যালোচনায় নিম্নবর্গীয় জাতি বা উপজাতি

ইতিহাস পর্যালোচনায় নিম্নবর্গীয় জাতি এবং উপ জাতিগোষ্ঠী কে বা কাহারা? এদের উদ্ধার কর্তা হিসেবে কোন ভগবান এসেছে? কেন এসেছে।

ইতিহাস পর্যালোচনায় নিম্নবর্গীয় জাতি বা উপজাতি  গোষ্ঠীঃ-

বর্তমান বাংলাদেশ, ভারত সহ সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন তপশিলি জাতি এবং উপজাতি গোষ্ঠীরা বাস্তবিক অর্থে আজ-ও পর্যন্ত বিশ্বের কোনো ধর্মে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে নাই বা কাগজে কলমে মতুয়া মতাদর্শগত "সূক্ষ্ম সনাতন ধর্ম" বা "মতুয়া ধর্ম" ভিন্ন ধর্মীয় অধিকার পায় নাই। এদেরকে কতিত উচ্চবর্ণীয়রা বা ব্রাহ্মণ্যবাদীরা  নিম্নবর্গীয় তথা তপশিলি বা অন্ত্যজ (চন্ডাল সহ) জাতি এবং উপজাতি হিসেবে পরিগনিত করে আসছে। কিন্তু এই সকল ধর্মহীন তথাকথিত নিম্নবর্গীয় জাতিগোষ্ঠী মূল ইতিহাস না ঘেটে বা না বুঝে হুজুকেই বর্ণবৈষম্যভেদী, ছুৎমার্গ সহ উঁচু-নিচু জাত-পাত যুক্ত কুসংস্কারাচ্ছন্ন ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুধর্ম গ্রহণ করে চলছে বা হিন্দুধর্মে নাম লেখাতে চলেছে (মূল সনাতন ধর্মকে ছেড়ে) এবং ব্রাহ্মণ্যবাদীদের কুটচক্রে পরে ভয়ংকর  ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়াচ্ছে। আর সেখানে কথিত উচ্চবর্ণীয় লোকেরা অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে নবাগত ব্রাহ্মণ্যবাদ সৃষ্টি করে তথাকথিত নিম্নবর্গীয় অন্ত্যজ জাতিগোষ্ঠী বংশধরদের উপর শোষণ চালাবে যদি না এই সকল জাতি বা উপজাতি গোষ্ঠী সু-শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে মূল ইতিহাস জেনে এখনো সোচ্চার না হয়। নিম্নে ধর্মহীন সেই সকল নিম্নবর্গীয় জাতি এবং উপজাতি গোষ্ঠীর নাম তুলে ধরা হলো ---

১) নমঃশূদ্র ২) পৌণ্ড্রক্ষত্রিয় ৩) রাজপুত ৪) ঘাটোয়াল 

৫) তাঁতী ৬) শাখারী ৭) কর্মকার ৮) স্বর্ণকার ৯) কাঁশারী

১০) কুমোর  ১১) সদগোপ ১২) গোয়ালা ১৩) মালাকার

১৪) নাপিত ১৫) বারুই ১৬) বার্ণওয়ার  ১৭)তিলি ও তেলি ১৮) সদগোপ ১৯) গন্ধবনিক  ২০) সূত্রধর ২১) সুবর্ণবনিক  ২২) সাহা ২৩) কপালি ২৪)পাটিয়াল ২৫) পাটনি ২৬) চাষী কৈবর্ত ২৭) জালিয়া কৈবর্ত ২৮) ময়রা 

২৯) হালুই ৩০) কুণ্ডু ৩১) আগুরী ৩২) দলুই ৩৩) কুর্মি ৩৪) খেয়াতিলাম ৩৫) পরাশর দাস ৩৬) গরার  ৩৭) ধোপা ৩৮) স্যাকরা ৩৯) বৈষ্ণব ৪০) ডোম ৪১) যোগী ৪২) গাড়ওয়ারা ৪৩) চর্মকার ৪৪) কর্মকার ৪৫) সূত্রধর

৪৬) ভূইমালি ৪৭) কোচ ৪৮) রাজবংশী ৪৯) শূড়ী ৫০) খাটবা ৫১) বেলদার ৫২) কাচার ৫৩) কোইরি ৫৪) হানসি ৫৫) চুনরি ৫৬) মাটিয়াল ৫৭) তিয়র ৫৮) জালিয়া ৫৯) ঝাল ৬০) মল্ল ৬১) মাঝি ৬২) পাতুর ৬৩) বৈতি ৬৪) বাগদি ৬৫) দুলিয়া ৬৬) মুরিয়ারি ৬৭) লহেরি বা নুরি ৬৮) রাওয়ানী কাহার ৬৯) মাল-সাপুড়ে ৭০) রবি দাস ৭১) ঋষিদাস ৭২) বাঁশফোর ৭৩) বাল্মিকী ৭৪) হেলা ৭৫) হাড়ি ৭৬) মেথর ৭৭) লালবেগী ৭৮) বেদিয়া ৭৯) শিকারী ৮০) বাথুয়া ৮১) তেলেগু ৮২) তামিল ৮৩) নাগরচি ৮৪) বাহলিয়া ৮৫) বাউরি ৮৬) বিন্দ ৮৭) চাঁই ৮৮) দুসাদ ৮৯) পাসি ৯০) পান ৯১) পাহান ৯২) কাউরা ৯৩) মন্ডাই ৯৪) বুনো ৯৫) গারো ৯৬) শুড় ৯৭) ভুমিজ ৯৮) ভূইমালি ৯৯) নট ১০০) জেলে ১০১) শবর

এছাড়াও আরো কিছু জনজাতি আছে যার নাম আমার অজানা।


★ তপশিলি বা অন্ত্যজ জাতি (চন্ডাল সহ) এবং উপজাতি গোষ্ঠীর উদ্ধারকর্তা হিসেবে যে ভগবান এসেছে, যার জন্য এসেছেঃ--


উপরোল্লিখিত তপশিলি বা অন্ত্যজ জাতি এবং উপ জাতিগোষ্ঠীর জন্য এই বিশ্বে শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরের পূর্বে প্রকৃতপক্ষে কোনো ভগবান বা মুক্তিদাতা আসছে বলে ইতিহাসের পাতায় সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয় না। এই নিম্নবর্গীয় তপশিলি বা অন্ত্যজ জাতি এবং উপজাতির ধর্মীয় ও মৌলিক অধিকার সহ সকল প্রকার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য একমাত্র শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর এই ধরাধামে আবির্ভূত হয়েছিলেন।


এবার পূর্নব্রহ্ম পূর্ণানন্দ শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরের আসার কারন সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক----

                •তৎকালীন ভারতবর্ষ তথা বাংলার সমাজ ব্যবস্থায় ব্রাহ্মণ্যবাদীদের অত্যাচারে নিন্মবর্গের মানুষ যখন মানুষের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত, মন্দিরে গিয়ে ভগবানের আরাধনা থেকে বঞ্চিত, যেখানে নিন্মবর্গের মানুষের সংস্পর্শে মন্দির অপবিত্র হয়ে যেত ঠিক তখনই ঠাকুরের অবতীর্ণ হওয়ার প্রয়োজন দেখা দিল। তাইতো---দুনিয়ায় যারা উৎপীড়িত, যারা বঞ্চিত, যারা শোষিত, যারা লাঞ্ছিত, যারা উপেক্ষিত, যারা নির্যাতিত, যারা নিপীড়িত, যারা নিষ্পেষিত, যারা অবহেলিত, জীবনভর যারা শুধু দিলেই পেলেনা কিছুই, মানুষ যাদের চোঁখের জলের হিসেব নিলেনা; তাদের বেদনা তাদের করুন কান্নায় দ্যুলোক থেকে ভ্যূলোকে নেমে এনেছিল পতিতের পরিত্রাতা তথা তপশিলি বা অন্ত্যজ জাতি বা উপজাতি গোষ্ঠীর মুক্তিদাতা পূর্ণব্রহ্ম শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর।

     ঠাকুর এসেছিলেন ---

              "অন্ধজনে দিতে আলো, অমানীকে মান,

                ওড়াকান্দী আবির্ভূত হল ভগবান ।

                হরিচাঁদ যেই আলো প্রথম জ্বালিল,

                 গুরুচাঁদ শতগুনে বর্ধিত করিল।।"

পূর্ণব্রহ্ম শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর ও তৎপূত্র শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুরের আগমনে ব্রাহ্মণ্যবাদের ধ্বংসের দামামা বেজে উঠল। শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর এসে পতিতের মুক্তির জন্য প্রবর্তন করলেন মতুয়া মতবাদ, যেটা ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে এক মহা বিপ্লব। পতিত জাতির উদ্ধারের জন্য পূর্ণশক্তি ধারন করে পূর্ণব্রহ্ম শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর এই পৃথিবীতে এসে ব্রাহ্মণ বা ব্রাহ্মণ্যবাদীদের সৃষ্ট সকল জাতপাতের জাতাকল থেকে নিম্নবর্গের মানুষের মুক্তির জন্য এবং তিনি বিশ্বের সকল মানব জাতিকে একত্রে মিলিত করার উদ্দেশ্যে বললেন--

            "নরাকারে ধরাপরে যতজন আছে।

          একজাতি বলে মান্য পাবে মোর কাছে।।"

তাইতো সূক্ষ্ম সনাতন ধর্ম বা মানবতাবাদী মতুয়া ধর্মের মূলনীতি হিসেবে শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর বলেছেন --

           "জীবে দয়া নামে রুচি মানুষেতে নিষ্ঠা 

             ইহা ছাড়া আর যত সব ক্রিয়া ভ্রষ্টা।।"

এখানে শুধু গন্ডিবদ্ধ সম্প্রদায় ভূক্ত জাতিগোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করা হয়নি। এখানে বিশ্বের সকল জীবের প্রতি সমজ্ঞানে দয়া, যার যার ইষ্ট দেবতার নাম বা হরিনামের প্রতি রুচি রাখা এবং বিশ্বের সকল মানুষ একে অপরের প্রতি সহযোগিতা, সহমর্মিতা পোষণ পূর্বক ভালবাসা, মানুষের প্রতি নিষ্ঠা রাখা ও প্রেমের কথা বলা হয়েছে।

                     

বুধবার, ৫ অক্টোবর, ২০২২

প্রাচীন ভারতের ইতিহাস

 প্রাচীন কালে ভারতকে বলা হত জম্বুদ্বীপ। আর্য শাসন কালে এর নাম হয় আর্যাবর্ত।  এই আর্যাবর্তের বিস্তার ছিল উত্তরে গান্ধার থেকে দক্ষিণে সৌরাষ্ট্র পূর্বে কাশী পশ্চিমে পাকিস্তানের পশ্চিম সীমানা আবধি। তবে বর্তমান মধ্য ভারতের বিন্ধ্যপর্বত আর্যরা অতিক্রম করে নি।

 পূর্বে বঙ্গদেশ সমগ্র মধ্য ভারতের আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা এবং নেপাল ও পূর্বভারতের বর্তমানের অনেক রাজ্যই তৎকালীন বঙ্গদেশের মধ্যে ছিল। দক্ষিন ভারতের দ্রাবিড় মূল ভাষাভাষিদের বাসভুমি আলাদা ছিল। তখন এই তিনটি অঞ্চল কৃষ্টি জনগোষ্ঠী ভাষা ও শাসকের

সাথে আলাদা ভাবে পরিচিত ছিল। আর্যাবর্তের অনেক শাসক মূলভারতীয় ছিলেন এবং জনগোষ্ঠীও মূল ভারতীয় ছিল। আর্যাবর্তে বৈদিক প্রথা প্রচলিত ছিল। বাকি দুটি অংশে তা ছিল না।


    বঙ্গদেশ তখন মগধের সাথে অভিন্ন ছিল। এই দেশের অধিবাসীরা বোঙ্গার উপাসক হওয়াতে তারা নিজেদের বাসভূমির নাম বঙ্গ পরিচয় দেয়। আজও বোঙ্গার উপাষকরা ভারতে বিদ্যমান। মারাংবুরুও আদিবাসীদের নিকট বিশেষ সম্মানিত। আর্য সংস্কৃতির সাথে এইসব জনগোষ্ঠীর কোন সম্পর্ক নাই। অর্থাৎ এরা মূল নিবাসী ভারতীয়। গৌতমবুদ্ধ মূল ভারতীয়দের ধর্ম বা সংস্কৃতিতে কোন পরিবর্তন করার পক্ষপাতি ছিলেন না। তিনি মানুষের চরিত্র গঠনে তথা  সংশোধন করার শিক্ষা দেন। তাই সমগ্র মূলনিবাসী তার শিক্ষা গ্রহণ করে। বৈদিক সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী আর্যাবর্ত নিবাসীরা তাঁর যুক্তিবাদী মতবাদের কাছে নিজেদেরকে "ভ্রান্ত মতে"র বলে বুঝতে পারে এবং নিজেদের সংশোধনের জন্য তারা বুদ্ধের অনুগামী হন। কট্টর আর্যরা দেশ ছেড়ে দ্রাবিড় অঞ্চলের জঙ্গলে চলে যায়। বর্তমান কেরলে তাদের অস্তিত্ব প্রমাণ করে। ঐ গোষ্ঠীর ব্রাহ্মণেরা বর্তমানে ভারতের সমস্ত বড় বড় মন্দিরের পুরোহিত। তাদের সংস্কৃত ভাষা কেরলের একটি মাত্র গোষ্ঠীর কথ্যভাষা। শেষ 2011 সালের লোকগনণায় তাদের সংখ্যা 16 হাজারের একটু বেশী জানা গেছে, যা অনুমান করা যেতে পারে বুদ্ধের সময়কার একটি মাত্র পরিবার হলেও হতে পারে।


   বর্তমান ভারত 1947 সালে খন্ডিত হয়।  বৃটিশ ইন্ডিয়ার যে অংশে পাকিস্তান গঠন করা হয় তা প্রকৃতপক্ষে আর্যাবর্তের অংশ। এই আর্যাবর্তের নাম হস্তিনাপুরের রাজা  শান্তনু ও শকুন্তলার পুত্র ভরতের নামানুসারে ভারত রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ আজকের ভারত বা ইন্ডিয়া সে ভারত নয়। ইন্ডিয়ার অধীনস্থ দ্রাবিড় ভূমি এবং মগধ বা পরবর্তীতে বঙ্গালই বর্তমান ভারত। এর সমস্ত বসবাসকারী মূলনিবাসী ছিল ( ব্যতীত স্বল্পসংখ্যক বৈদিক যারা মন্দিরে পুরোহিত মাত্র)। 1192 খৃ. মুসলমান ধর্মের যোদ্ধারা ভারতের কান্দাহার হয়ে সিন্ধু নদের পশ্চিমপাড় দখল করে নেয় এবং হিন্দুস্থান নামক রাজ্য স্থাপনার সূচনা ঘটায়। ক্রমে তারা দিল্লীতে রাজধানী স্থাপন করে ও হিন্দুস্থানে মুসলমান রাজত্বের ইতিহাস তৈরী করে। চাতুরবর্ণ ব্যবস্থার শাসকরা তাদের কাছে হার স্বীকার করে। পরে তারা মুসলমানদের শাসনে সহায়তা করে এবং পাকাপোক্ত মুসলমান রাজত্বের প্রশাসনে অংশ গ্রহণ করে। 1757 সালে পলাশীর যুদ্ধে সিরাজদ্দৌলাকে হারিয়ে ভারতে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর রজত্ব শুরু হয়। পরে কোম্পানীর হাত থেকে বৃটিশ সরকার শাসন ক্ষমতা অধিগ্রহণ করে। 1947 সালে ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। শাসন ক্ষমতা হস্তান্তর হয় আর্যাবর্তের দুই নেতা জিন্নাহ ও জওহরলালের হাতে। ভারতকে খন্ডিত করা হয়। তবে তামিলনাড়ুর পেরিয়ার যিনি আলাদা স্বাধীন  দ্রাবিড়ভূমি চেয়েছিলেন তার দাবি মানা হয় নি। তেমনি অবিভক্ত স্বাধীন বাংলার দাবি জানান বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষদের প্রতিনিধিরা। তাদের মধ্যে হিন্দু মুসলমান দুইই ছিল। ছিলনা ব্রাহ্মণ দলের প্রতিনিধিরা। ফলে বাংলা শুধু যে শাস্তি পেল তাই নয়, বাংলা বলে আর কিছু থাকল না । দু'টুকরো করে বেশীটা দিল পাকিস্তানকে একটুকরো রাখা হল হিন্দুস্তানে। বাঙ্গালী কেউ থাকল না- হয় ভারতীয়, নয় পাকিস্তানি হল।

 তাহলে স্বাধীনতা কারা পেল? যারা আর্যাবর্তের লোক তারা লাভবান হল দুভাবে। এক, তাদের আলাদা দেশ তারা পেল। দুই , তারা পুরস্কৃত হল বাকি ইন্ডিয়ার শাসন ক্ষমতার দখল পেয়ে। এরাই একসময় বিদেশ থেকে ভারতে এসে ভারতকে শাসন ও শোষণ করত। আজও করছে। তাহলে বৃটিশ কাকে ক্ষমতা হস্তান্তর করল? যারা নিজদেশে পরাধীন তারা স্বাধীনতা চাইতেই পারে। আমার প্রশ্ন হল কবে তারা নিজেদের শাসন ক্ষমতা দখল করতে চাইবে?

শনিবার, ৪ জুন, ২০২২

শ্রমজীবী মানুষের মুক্তি

 প্রকৃত সত্য ও ঐতিহাসিক তথ্য : দেশবাসীর/শ্রমজীবি মানুষের কল‍্যানে .... 


 ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ২০ জুলাই ডঃ  বাবাসাহেব আম্বেদকর ব্রিটিশ সরকারের ভাইসরয়ের (Viceroy) অধীন মন্ত্রীসভায় শ্রমমন্ত্রী (Labour Member) নিযুক্ত হন। 

১৯৪৬ সাল পর্যন্ত তিনি ওই পদে বহাল ছিলেন। 

ব্রিটিশ সরকারের অধীন মন্ত্রীসভার শ্রমমন্ত্রী হিসাবে তিনি যেসব কাজ করেছিলেন তা সমস্ত দেশবাসীর জন্য।

সমস্ত জাতিবর্ণের সাধারণ খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের সামাজিক সুরক্ষার জন্য তিনি লড়াই করেছেন।


তার মধ্যে কয়েকটি নিচে উল্লেখ করা হলোঃ-


(1) Joint Labour Management Committee :-  


সরকার, মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে বিরোধের ক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ আলোচনার জন্য আগেই আম্বেদকরের পূর্বসূরি স্যার ফিরোজ খাঁ নুনের সময়ে Tripartite Labour Conference-এ একটি Standing Labour Committee গঠন করা হয়েছিল। 

বম্বে সেক্রেটারিয়েটে ১৯৪৩ সালের ৭ মে আম্বেদকরের সভাপতিত্বে ওই কমিটির তৃতীয় সভায় এই কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়। 

এই কমিটিতে কারখানা পরিচালনায় শ্রমিকদের প্রতিনিধি রাখার সংস্থান রাখা হয়।


(2) Employment Exchange :- 


ওই একই সভায় ভারতে প্রথম শ্রমিক-কর্মচারী নিয়োগ করার জন্য Emploment Exchange গঠন করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। 

এর ফলে ইচ্ছামতো মামা-কাকার জোরে শ্রমিক-কর্মচারী নিয়োগ প্রথা বন্ধ হয়; 

প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ এবং আধা-দক্ষ শ্রমিক-কর্মচারী যারা Employment Exchange-এ নাম লিখিয়েছেন তাঁদের ভেতর থেকেই নিয়োগ করা বাধ্যতামূলক করা হয়।


(3) Trade Union:-


ভারতের সর্বত্র বিভিন্ন অফিস, কলকারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে শ্রমিক ইউনিয়ন থাকলেও আইনগতভাবে সেগুলির কোনো সরকারি স্বীকৃতি ছিল না। 

ডঃ বাবাসাহেব আম্বেদকরের প্রচেষ্টায়ই সর্বপ্রথম সেগুলিকে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্দেশ্যে ‘ভারতীয় শ্রমিক সমিতি (সংশোধনী) বিল’ পাশ হয়। 

এর ফলে শ্রমিক-কর্মচারীদের Trade Union করার অধিকার আইনসঙ্গত হয়।


(4) কাজের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া:- 


আগে শ্রমিক-কর্মচারীদের কাজের সময়ের কোনো সময়সীমা ছিল না। 

১০ থেকে ১৪/১৬ ঘন্টা পর্যন্ত কাজ করতে হত। এজন্য তাঁদের কোনো বাড়তি মজুরি দেওয়া হত না। 

ডঃ বাবাসাহেব আম্বেদকরই এই সময়সীমা ৮ ঘন্টায় বেঁধে দেন। 

এর অতিরিক্ত কাজ করালে তার জন্য Over-time Salary দেবার আইন পাশ করেন।


(5) Labour Investigation Committee :- 


শ্রমিক শ্রেণির বেতন, খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা ইত্যাদি বিষয় পর্যালোচনা করা এবং তার সুষ্ঠু ব্যবস্থা করার জন্য এই কমিটি গঠন করেন এবং এ বিষয়ে বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করেন। 

সেগুলির মধ্যে শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সরকারি খরচে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য E.S.I Hospital সৃষ্টি করা। 

এ ছাড়া শ্রমিকদের  সরকারি খরচে প্রশিক্ষণ দেওয়ার আইনও তিনি করে যান।


(6) Coal Mine Labour Welfare Fund Ordinance :- 


শ্রমমন্ত্রী ডঃ বাবাসাহেব আম্বেদকর কয়লাখনির শ্রমিকদের আর্থিক উন্নয়ন করার উদ্দেশ্যে এই আইন পাশ করেন।


(7) The Factories Amendment Bill :-


আগে শিল্প-কলকারখানায় কর্মচারীদের সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছাড়া আর কোনো সবেতন ছুটির ব্যবস্থা ছিল না। 

কেউ অনুপস্থিত থাকলে তার বেতন কাটা যেত। শ্রমমন্ত্রী ডঃ বাবাসাহেব আম্বেদকর এই আইন পাশ করে কলকারখানার প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিক কর্মচারীদের বছরে ১০ দিন এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিক-কর্মচারীদের ১৪ দিন সবেতন ছুটির ব্যবস্থা করেন।


(8) নারী-পুরুষের সমহারে বেতন :- 


আগে পুরুষ শ্রমিকদের তুলনায় মহিলা শ্রমিকদের বেতন কম ছিল। 

ডঃ বাবাসাহেব আম্বেদকর আইন করে এই বৈষম্য দূর করেন। 

নারী-পুরুষ নির্বিশেষে একই কাজের জন্য একই বেতনের আইন তিনি পাশ করেন।


(9) মাতৃত্বকালীন ছুটি :- 


আগে সন্তান জন্ম দেওয়া ও তার প্রতিপালনের জন্য নারী শ্রমিকদের বেতন ছাড়া ছুটি নিতে হত। ডঃ বাবাসাহেব আম্বেদকর সন্তান প্রসবের আগে ১০ সপ্তাহ এবং প্রসবের পরে ৬ সপ্তাহের সবেতন ছুটির আইন পাশ করেন।


(10) Protection of Minimum Wage Bill :- 


ডঃ বাবাসাহেব আম্বেদকরের মন্ত্রীত্বের শেষের দিকে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিল এনেছিলেন। 


কিন্তু সেই বিলটি তিনি পাশ করিয়ে যেতে পারেননি।

বিলটি ছিল ‘সর্বনিম্ন বেতনের নিরাপত্তা বিল’। 

এতে বলা হয়েছিল শ্রমিকদের বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি অ্যাডভাইসরি বোর্ড ও একটি অ্যাডভাইসরি কমিটি থাকবে। 

এতে থাকবে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের সমসংখ্যক সদস্য। 

তাদের সুপারিশে শ্রমিকদের সর্বনিম্ন বেতন ধার্য হবে। 

এই বিলটি দু’বছর পরে স্বাধীনোত্তরকালে জগজীবন রাম শ্রমমন্ত্রী থাকার সময় পাশ হয়।


এখানে উল্লেখিত যে আইনগুলি শ্রমমন্ত্রী থাকাকালে ডঃ ভীমরাও রামজী  আম্বেদকর বিধিবদ্ধ করে গেছেন ।


সবগুলিই জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সমস্ত দেশবাসীর কল্যাণের জন্য তিনি করে গেছেন।

নারীদের স্বাধীনতা

 ================

নারীজাতির মুক্তিদাতা

Dr.B.R.AMBEDKAR


আজ যে মায়েরা ও বোনেরা দল বেঁধে পুজো করতে যাচ্ছেন তাঁরা একটু পড়ুন।


আজকের দিনে 1951 সালে 5 ই ফেব্রুয়ারি বাবাসাহেব আইন মন্ত্রী থাকাকালীন  #হিন্দুকোড বিলটি প্রথম পেশ করেন।যেখানে 9 টি পার্ট এবং 139 টি আর্টিকেল ছিল।


#তৎকালীন কংগ্রেস তথা নেহেরু সরকার

সমর্থন করেননি বলে, বাবাসাহেব আইনমন্ত্রি থেকে ক্ষোভে দুঃখে জর্জরিত হয়ে পদত্যাগ করেছিলেন।


যেগুলির অল্প কিছু আইন পরবর্তীতে পাশ হয়েছে

Babasaheb Ambedkar’s ideas influenced the enactment of many subsequent pro-women Acts viz. 


#Sati Prevention Act, 1987, 

Dowry Prohibition Act, 1961, 

The Family Courts Act, 1984, 

Protection of Human Right Act, 1993, 

The Maternity Benefit Act 1961, 

Immoral Traffic (Prevention) Act, 1956, 

The Child Marriage Restraint Act, 1929, 

The Equal Remuneration Act, 1976, 

The National Commission for 

Women Act, 1990, 

Protection of Women from 

Domestic Violence Act, 2005.


বর্তমান সমাজে সংরক্ষিত আসনে MP, MLA এর কজনের বুকের পাটা আছে যে তার সমাজের মানুষের জন্য কোন বিল পাস না হলে তিনি ইস্তফা দিয়ে চলে আসবেন।


আজকে হিন্দু সমাজে তথা ভারতবর্ষের সমস্ত সম্প্রদায়ের মানুষ যারা বাবাসাহেব ডঃ বি আর আম্বেদকর কে ঘৃণার চোখে দেখেন তারা কি সত্যি জানেন আপনার ঘরের মা বোনেদের জন্য তিনি কি কি কাজ করে গেছেন।

আর সংরক্ষণের জন্য যারা বাবাসাহেব কে গালাগাল করেন বিশেষ করে  উচ্চবর্ণের সমাজের মেয়েগুলো তারা কি জানে হিন্দু সমাজে তাদের কি অবস্থান ছিল নারী হিসেবে??


They succeeded in passing four Hindu code bills in 1955–56: the Hindu Marriage Act, Hindu Succession Act, Hindu Minority and Guardianship Act, and Hindu Adoptions and Maintenance Act.


মনুসংহিতা অনুযায়ী নারীকে নরকের দ্বার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

হিন্দুশাস্ত্র ''মনুসংহিতায়'' বলছে -অমন্ত্রীকা তু কার্যেয়ং স্ত্রীণামাবৃদ শেযতঃ(২/৬৬) অর্থাৎ নারীকে ও মন্ত্র ও অশিক্ষিত রাখতে হবে। পুজো বিবাহ-শ্রাদ্ধাদি সব ক্ষেত্রে শূদ্র ও নারী "ওঁ" মন্ত্র উচ্চারণ করবে না তারা শুধুমাত্র নমঃ উচ্চারণ করবে। 

প্রসঙ্গে বলতে হয়:-হিন্দু সমাজের মন্দির পূজা রচনা সামাজিক কার্যক্রম কোথাও নারীর উপস্থিতি পাপ বলে বিবেচিত হতো।


এক নজরে দেখে নেওয়া যাক বাবাসাহেব এই হিন্দু কোড বিল সমাজ সংস্কারের জন্য কি কি আইন সংশোধন করেছিলেন।


১) সমাজে নারীদের শিক্ষার কোন অধিকার ।

২) নারীর শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে চাকরি করার           

অধিকার।

৪) চাকরিতে সমান বেতনের অধিকার।

৫) চাকরির সময় মাতৃত্বকালীন ছুটি(১৯৪৬ ইংরেজ সরকারের কাছ থেকে আদায় করে আনেন)।


৬) বাবার সম্পত্তিতে সমান অধিকার।

প্রসঙ্গে বলতে হয়:-নারীর সঞ্চার কোন অধিকার নেই অর্থশূন্য করে পরাধীন রাখতে হবে (মনুসংহিতায় ৮/৪২৬এবং ৯/২)


নারীর উপনয়ন -পৈতে দেয়ার কোন অধিকার নেই

উপনয়ন,স্বামীর ঘরে বাস হলো গুরুগৃহে বাস এবং স্বামীর সেবাই হল বেদ পাঠ(২/৬৭,৫/১৫৫)


৭) স্বামীর সম্পত্তিতে সমান অধিকার

৮) প্রয়োজনে নিঃসন্তান দম্পতিদের দত্তক নেওয়ার অধিকার।


৯) ইন্টার কাস্ট ম্যারেজ এর অধিকার

আজকে যে সমস্ত ছেলে মেয়েরা ভালোবাসা করে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে বিবাহ সম্পর্ক স্থাপন করেছে এই আইন না থাকলে তারা করে শান্তিতে ঘুমাতে পারতো না।


১০) পুরুষের বহু বিবাহ বন্ধ করার অধিকার।

আর যারা বাবাসাহেব কে গালাগাল করেন সত্যি মনে হয় বহুবিবাহ যদি চালু থাকত তাহলে বোধহয় ঠিকই হত। একজন কুলীন ব্রাহ্মণ এর তৎকালীন বিয়ের সংখ্যা মৃত্যুর আগ পর্যন্তএই বিলের বিরোধিতা করেছিলেন তৎকালীন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী এবং কংগ্রেসের ব্রাহ্মণ্যবাদী নেতা-মন্ত্রী গন।

১১) পুরুষের যাঁতাকলে না থাকার জন্য ডিভোর্সের অধিকার।এই অধিকার দিয়ে বাবা সাহেব বোধায় ভুল ই করে গেছেন।

এই প্রসঙ্গে বলতে হয়:-নারীকে কেবলমাত্র ভোগের সামগ্রী, সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র, নারীকে পুড়িয়ে মারা পতিতালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া, একজন কুলীন ব্রাহ্মণ শতাধিক বিয়ে করতেন তার জন্য হিসাবের খাতা তৈরি করতেন। স্ত্রী স্বামীর দাসি নয় সে জীবন সঙ্গিনী উভয়ের সমান মর্যাদা থাকবে। এক বামন মারা যাওয়ার আগের দিন পর্যন্ত বিয়ে করতে পারতেন যাকে বলা হত #অন্তর্যলী যাত্রা।


১২) নাবালিকা মেয়েদের বিয়ে দেওয়া বন্ধের অধিকার, যেখানে হিন্দু ধর্ম মতে 12 বছরের মধ্যে নারীকে পাত্রস্থ করার কথা রয়েছে মনুসংহিতা অনুযায়ী।

প্রসঙ্গে বলতে হয়: নারী বাললে থাকবে পিতার অধীনে যৌবনে স্বামীর অধীনে ও বাধ্য থাকবে পুত্রের অধীনে (মনুসংহিতায় ৫/১৪৮ এবং ৯/৩)


স্বামীর সেবায় স্ত্রী তার রূপ গুণ বয়স বিচার করবে না, দেখতে সুন্দর হোক বা খারাপ হোক বা অল্প বয়সে বেশি বয়সে যে কোন পুরুষকে তার সঙ্গে যৌন ক্রিয়া করবে (মনুসংহিতায় 9/14)


প্রসঙ্গে বলতে হয় বাবাসাহেব একাধারে সংবিধান চালু করে সমাজের থেকে নারীর প্রতি কুসংস্কারগুলো যেভাবে ধ্বংস করেছেন সেগুলি হল

#মনুসংহিতা অনুযায়ী নারীদের ধর্মীয় আচরণ এ যোগদান দেওয়া অপরাধ।

#মনুসংহিতা অনুযায়ী মেয়েরা পৌরোহিত্য করতে পারবে না

#মনুসংহিতা অনুযায়ী  স্বামীর অত্যাচার এর বিরোধীতা করতে পারবে না।


####মনুসংহিতা অনুযায়ী নারীকে সতীত্বের প্রমাণ দেওয়া।

(যার জন্য 10 থেকে 12 মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হতো)

সেই মেয়েগুলোর কাছে প্রশ্ন যারা আজ বড় গলায় বাবাসাহেব এর সংবিধান এর বিরোধিতা করেন ফিরে আসুক তাহলে সতীত্ব প্রমাণ দেওয়ার রীতি নীতি কি বলেন আপনারা?


#মনুসংহিতা অনুযায়ী এক পুরুষ শতাধিক।


#মনুসংহিতা অনুযায়ী নারীর ঋতুকালীন অবস্থায় 

মন্দিরে ঢোকার পাপ বলে গণ্য হত।


#মনুসংহিতা অনুযায়ী নারী শুধুমাত্র ভোগের বস্তু, কন্যা হলো দানের বস্তুর মতো। যার জন্য বিয়েতে কন্যা দান করা হত।

#মনুসংহিতা অনুযায়ী স্ত্রীকে প্রথম 3 দিন গুরুদেবের কাছে থাকতে হতো যেটি গুরু দাসী প্রথা প্রচলিত ছিল।

#মনুসংহিতা অনুযায়ী দেবদাসী থাকবে।

যাদের ভোগদখল শারীরিক শোষণ তৎকালীন পূজারীরা করতেন।

#মনুসংহিতা অনুযায়ী নারীর  বেদ পাঠ নিষিদ্ধ ছিল।

#নারী পড়াশোনা শিখলে নাকি পতিতালয়ে চলে  এটি প্রচলিত ছিল হিন্দু ধর্ম  মধ্যে।


এছাড়াও হাজারো রকমের ব্রাহ্মণ্যবাদ হিন্দু ধর্ম রীতি অনুযায়ী যেগুলো ছিল সেগুলো বাবাসাহেব তার পবিত্র সংবিধান এর মাধ্যমে এক নিমিষেই ধ্বংস করে দিয়েছে আইনত কিন্তু সমাজে এখনও আনাচে-কানাচে আমরা এখনো তার জ্বলন্ত উদাহরণ দেখতে পাই।


আজ যে সমস্ত উচ্চবর্ণ তথা সকল সমাজের ছেলেমেয়েরা বাবা সাহেবের সংরক্ষণের জন্য শুধুমাত্র বিরোধিতা করেন।

তাদের কাছে একটি প্রশ্ন উপরোক্ত হিন্দু ধর্মীয় রীতি-নীতি যদি পুনরায় ফিরে আসে তাহলে খুশি হবেন তো???






★ AES KOLKATA ★

রবিবার, ১ মে, ২০২২

মাংস খেয়েই মানুষ হওয়া।

 হরপ্পীয় খাদ্যাখাদ্য 


আমাদের পূর্বজদের খাদ্য কী ছিল? আজ থেকে চার হাজার বছর আগে উত্তর-পশ্চিম ভারতবর্ষে মানুষ কোন খাবার পছন্দ করত? হরপ্পীয়রা কী শাকাহারি ছিল, নাকি সঙ্গে মাছ মাংস চলত?


কীভাবে সে কথা জানা যেতে পারা যায়?


নয়-দশ হাজার বছর আগে, নব্যপ্রস্তর যুগে দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ স্থানে মানুষ শিকার ও খাদ্যসংগ্রহ করে দিনাতিপাত করত। তবে তার মধ্যেই শুরু হয়েছে বর্তমান ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে খাদ্য উৎপাদনের হাতেখড়ি। দক্ষিণ এশিয়ায় বালুচিস্তানের মেহেরগড় ছিল খাদ্য উৎপাদনের সূচনাপর্বের প্রতিনিধি। মেহেরগড়ের অবস্থান ইরানের মালভূমি ও সিন্ধু নদের মধ্যবর্তী অঞ্চলে। এই অঞ্চলে নয় থেকে সাড়ে সাত হাজার বছর আগে গম ও বার্লি চাষ শুরু হয়েছে; ছাগল, ভেড়া ও গবাদি পশু গৃহপালিত করা হয়েছে।


আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে সিন্ধু উপত্যকা ছিল সুজলা ও সুফলা। উর্বর জমি। ওখানে চাষ হত বার্লি, গম। পালন করা হত ভেড়া, ছাগল, গবাদি পশু। তারা খাদ্য শস্য হিসেবে গম, বার্লি ইত্যাদি ব্যবহার করেছে। সঙ্গে খেয়েছে ফল, মসুর এবং মটর, ছোলা, সবুজ ছোলা এবং কালো ছোলা ডাল। আর খেত মাছ। মাছের কাঁটা বহু জায়গায় পাওয়া গেছে।


তৃতীয় সহস্রপূর্বাব্দে ওই অঞ্চলে মানুষের মূল পেশা ছিল কৃষি, পশুপালন ও মৎসশিকার। ধাপে ধাপে প্রাথমিক খাদ্য উৎপাদনের পরে শুরু হয় নিজস্ব প্রয়োজনে ছোট শিল্পদ্রব্য নির্মাণ। হরপ্পীয় সভ্যতা উপমহাদেশের প্রথম নগরকেন্দ্রিক ব্রোঞ্জ যুগের সভ্যতা। শেষে যখন উদ্বৃত্ত উৎপাদন সম্ভব হয় তখন তৈরি হয় নগর ও সড়ক, শুরু হয় সমুদ্রবাণিজ্য। তখনকার সভ্য পৃথিবীর মুখ্য অংশের সাথে যোগাযোগের ভিত্তিতে এই উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম, পশ্চিম, উত্তর, এমনকি দক্ষিণের পশ্চাদভূমি থেকে পণ্য সংগ্রহ করে হরপ্পীয়রা ভারতের প্রথম নৌবাণিজ্য দক্ষতার সাথেই চালিয়েছে।


আজ থেকে অন্তত ৫,২০০ বছর আগে থেকে ওই অঞ্চলে মনুষ্যবসতি গড়ে ওঠে। এই সময়ে বহু কারুশিল্পের উদ্ভব হয়েছে। প্রায় ৩,৯০০ – ৪,৬০০ বছর আগের সময়কালে বিরাট ভৌগোলিক এলাকায় নানা জায়গায় ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর মধ্যে সংশ্লেষ ও সমন্বয়ের কাজ আরম্ভ হয়, কিছুটা সাংস্কৃতিক অভিন্নতাও আসে। ওই সময়টাকে বলে হরপ্পীয় সভ্যতার ঐতিহ্যের যুগ। শেষে আসে আবার সমসত্ত্ব সংস্কৃতির স্থানীয়করণের যুগ। এই সময়ে শুরু হয় উল্টো পথে হাঁটা। বড় সংযুক্ত অংশগুলি যেন ছোট ছোট অঞ্চলে ভেঙে যায়।


ওদের সাথে যোগাযোগ ছিল তখনকার ব্রোঞ্জ যুগের বিভিন্ন সভ্যতাগুলির। মেসোপটেমিয়া, দিলমুন বা আজকের বাহরিন। প্রাচীন নগর ‘শহর-ই-শোকতা’ অথবা অক্ষু নদীর তীরে তুরান ও আফগানিস্তান অঞ্চলে সাড়ে চার হাজার বছরের পুরনো ব্রোঞ্জ যুগের ‘ব্যাকট্রিয়া মার্জিয়ানা আর্কিওলজিক্যাল কমপ্লেক্স’-এর সাথে।


হরপ্পীয় সভ্যতার দুই বৃহত্তম ও মহত্তম প্রত্নস্থল, মহেঞ্জোদাড়ো (সিন্ধ অঞ্চল) ও হরপ্পা (পশ্চিম পাঞ্জাব অঞ্চল) বর্তমানে পাকিস্তানে অবস্থিত। পরবর্তীকালে ভারতবর্ষে আরও কতগুলি বৃহৎ প্রত্নস্থল আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে কালিবঙ্গান (রাজস্থান), রাখিগর্হি (হরিয়ানা), ধোলাভিরা ও লোথাল (গুজরাট) বহুচর্চিত হরপ্পীয় প্রত্নস্থল। উত্তরে জম্মুর মান্ডা থেকে পশ্চিমে বালুচিস্তান, দক্ষিণে গুজরাট সীমান্ত থেকে পুবে দিল্লি ছুঁয়ে এক বিশাল অঞ্চল জুড়ে এই সভ্যতার ব্যাপ্তি ছিল। বর্তমানে ১৫০০ প্রত্নস্থলের মধ্যে ৯২৫টি প্রত্নস্থল খুঁজে পাওয়া গেছে ভারতবর্ষে।


বিগত ১০০ বছর ধরে হরপ্পীয় সভ্যতার বিভিন্ন সাইটগুলিতে পাওয়া গেছিল প্রভূত পরিমাণে গবাদি পশু, ভারতীয় মহিষ, ভেড়া, ছাগল, পাখি, শূকর ইত্যাদির কঙ্কাল। তার মধ্যে গবাদি পশু ও মহিষের কঙ্কালের পরিমাণ প্রচুর। কঙ্কালের অবশেষ এবং নৃতাত্ত্বিক তথ্যের বিশ্লেষণের ভিত্তিতে, বেশ কয়েকটি গবেষণা মনে করেছে যে, গবাদি পশু এবং মহিষের মাংস, দুধ ওরা খেত। তাছাড়া চামড়া দিয়ে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় বস্তু তৈরি করত। আর অন্যান্য শ্রম-ভিত্তিক কাজের জন্যও পশুদের ব্যবহার করা হত।


“গড়ে বিভিন্ন হরপ্পীয় প্রত্নস্থল থেকে প্রায় ৮০% প্রাণির অবশেষ গৃহপালিত প্রাণী প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত। গৃহপালিত প্রাণীগুলির মধ্যে আবার গবাদি পশু/মহিষ সবচেয়ে বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়, গড়ে ৫০ থেকে ৬০%। মেষ/ছাগল রয়েছে প্রায় ১০%।” গবেষণায় বলা হয়েছে, “গবাদি পশুর হাড়ের উচ্চ পরিমাণ সিন্ধু জনগোষ্ঠীর গো-মাংস খাওয়ার সাংস্কৃতিক অগ্রাধিকারের ইঙ্গিত দেয়, যা মাটন/মেষশাবকের মাংস দ্বারা পরিপূরণ করা হত।”

বিভিন্ন গবেষণা থেকে ওপরের সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া হয়েছিল। অনেকে অবশ্য এগুলিকে চূড়ান্ত প্রমাণ বলে মানতে  রাজি হন না।


তবে এই নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে এক অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়েছে। এই কাজে অংশ নিয়েছেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের গবেষক অক্ষয়েতা সূর্যনারায়ণ। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যামেরন পেট্রি গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। অংশ নিয়েছেন ভারতের বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ বসন্ত শিণ্ডে। ভারতের উত্তর-পশ্চিম দিকে হরিয়ানা ও উত্তরপ্রদেশের কয়েকটি প্রত্নস্থল হল রাখিগর্হি, ফরমানা, লোহারি রাগো, মাসুদপুরা, খানক ও আলমগীরপুর। আলমগীরপুর বাদে অন্য সব প্রত্নস্থলগুলি হরিয়ানাতে অবস্থিত। আলমগীরপুরের অবস্থান উত্তর প্রদেশে।

এর মধ্যে রাখিগর্হি ছিল বড় শহর, অনেকটা মহেঞ্জোদাড়োর মত। ফরমানা ছোট শহর, বাকিগুলি ছিল বড় বা ছোট গ্রাম।


এই সব প্রত্নস্থল থেকে ১৭০টি সিরামিক পাত্র ওরা সংগ্রহ করেছেন। এই পাত্রগুলি ব্যবহৃত হয়েছে হরপ্পীয় সভ্যতার ঐতিহ্যের যুগে (২৬০০ থেকে ১৯০০ সাধারণ পূর্বাব্দ)। ওরা ওই পাত্র সংগ্রহ করে তাতে শস্যদানা খোঁজেন নি। প্রাচীনকালের মাটির বাসনে অনেক সময়ে লেগে থাকে লিপিড নাম এক রাসায়নিক পদার্থ। লিপিডের অবশিষ্টাংশ তুলনামূলকভাবে কম নষ্ট হয়। তাই বিশ্বজুড়ে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলি থেকে এই লিপিড নিয়ে বিশ্লেষণ করে তার উৎস নির্ণয় করা হয়। লিপিড বিশ্লেষণ করে প্রাচীন খাদ্যের অনুসন্ধান করা প্রত্নতত্ত্বের গবেষণায় এক আদর্শ পদ্ধতি। তবে ভারতবর্ষে এখনও এর প্রচলন কম। 


ওরা এই পদ্ধতিতে মাটির বাসনে অনেক সময়ে লেগে থাকে লিপিড বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে:

“সিন্ধু মৃৎশিল্পে লিপিডের অবশিষ্টাংশের সমীক্ষায় পশুর লিপিডের প্রাধান্য দেখা যায়, যেমন শুয়োরের মত রোমন্থন না করা প্রাণীর মাংস বা গরু, মহিষের মত রোমন্থনকারী পশুর মাংস অথবা ভেড়া বা ছাগলের মাংস। এছাড়াও পাওয়া গেছে দুগ্ধজাতীয় খাদ্য," সূর্যনারায়ণ বলেছেন।

“Our study of lipid residues in Indus pottery shows a dominance of animal products in vessels, such as the meat of non-ruminant animals like pigs, ruminant animals like cattle or buffalo and sheep or goat, as well as dairy products,” Suryanarayan said.


যদিও প্রত্নস্থলগুলি থেকে শূকররের অবশেষ পাওয়া গেছে মোট প্রাণী অবশেষের মাত্র ২-৩% তবে লিপিডের জন্য বিশ্লেষণ করা প্রায় ৬০% পাত্রে শূকর জাতীয় প্রাণীর ফ্যাট পাওয়া গেছে। এটা বেশ চমকপ্রদ তথ্য। অবশ্য প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটগুলি থেকে শূকর বা পাখির ছোট অস্থির পুনরুদ্ধার করার কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে। তুলনায় গবাদি পশুর কঙ্কাল পাওয়া সহজ। তাই সিরামিকের হাঁড়িগুলিতে প্রাপ্ত উচ্চ-শতাংশযুক্ত শূকর মেদ এবং বিভিন্ন সাইট থেকে সংগৃহীত শূকর কঙ্কালের টুকরোর সংখ্যার ব্যবধানের কারণ হতে পারে কঙ্কাল সংগ্রহের অক্ষমতা।


এক হিসেবে এই সব তথ্য খুব একটা চমকপ্রদ হয়ত নয়। কারণ ব্রোঞ্জ যুগে দক্ষিণ, মধ্য ও সেন্ট্রাল এশিয়ার বিভিন্ন প্রত্নস্থল থেকে যা প্রাণী অবশেষে পাওয়া গেছে তাতে দেখা যায় মূলতঃ সবাই ছিল মাংসাশী। মেসোপটেমিয়ানরাও।


তবে কিছুদিন আগে এই সব নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। হরপ্পীয় সভ্যতার খাদ্য নিয়ে দিল্লিতে এই বছরে ফেব্রুয়ারি মাসে দিল্লির জাতীয় জাদুঘর, ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রক এবং একটি বেসরকারী সংস্থা যৌথভাবে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। তাতে যারা যোগ দিয়েছিলেন, তারা ওই সময়ের কিছু খাবার চাখতে পারবেন এমন আয়োজন করা হয়েছিল। বেশ সারা জাগানো ব্যাপার।

সেই খাদ্য তালিকা যথেষ্ট গবেষণা করে তৈরি করা হয়েছিল। তাতে ছিল নানাবিধ নিরামিষ ও আমিষ খাদ্যসম্ভার। অনুষ্ঠানের কয়েকদিন আগে রাতারাতি সমস্ত আমিষ খাদ্য অবশ্য তুলে নেওয়া হয়।

অর্থাৎ হরপ্পীয়রা মাংস খেত না, এমন প্রমাণ করার একটা তাগিদ যেন ওদের ছিল।


যাহোক, সেই তাগিদ জলাঞ্জলি গেল। এখন প্রমাণিত হরপ্পীয়রা শুধু যে মাংসাশী ছিল তাই নয়, ওরা সবচাইতে  ভালোবাসত গরু ও শুকরের মাংস খেতে।

ও হ্যাঁ। আজকে প্রমাণিত প্রায় সমগ্র ভারতবর্ষে যদি কোন তিনটি জিন সর্বব্যাপী হয় সে তিনটি হল আন্দামানের ওঙ্গে জনজাতির জিন (মাতৃক্রমে) আর হরপ্পীয় এবং স্তেপভূমির অর্ধ-যাযাবর পশুপালকদের জিন (পিতৃক্রমে )।


পালাবার পথ নেই। ঐতিহ্যকে মুছে দেওয়া যায় না।


তথ্যসূত্র:

1. Akshyeta Suryanarayana, “Lipid residues in pottery from the Indus Civilisation in northwest India,” Journal of Archaeological Science, Volume 125, 105291, January (2021)

2. P.P.Joglekar, C.V. Sharada, G.S. Abhayan “Faunal diversity during the Harappan period in Haryana,” Heritage: Journal of Multidisciplinary Studies in Archaeology, 1, 262-287, (2013)

3. L.J. MillerSecondary products and urbanism in South Asia: the evidence for traction at Harappa

S. Weber, W.R. Belcher (Eds.), Indus Ethnobiology, Lexington Books, Oxford, 251-326, (2003)

4) Sheeren Ratnagar, “Understanding Harappa: Civilization in the Greater Indus Valley,” Tulika Book, Chapter 3, October (2002)

5) Jane R McIntosh, “The Ancient Indus valley – New Perspective,” ABC-CLIO, Chapter III, (2008)

6) David G. Mahal et al., “The Geographic Origins of Ethnic Groups in the Indian Subcontinent: Exploring Ancient Footprints with Y-DNA ,” Front Genet, 9(4.), (2018)

Madhusree Bandyopadhyay

------------------‐---------------------


# বর্তমানের প্রেক্ষাপটে বহু সমস্যায় মানুষ জর্জরিত, তার অধিকাংশই মনুষ্য সৃষ্ট।


মনুষ্য সৃষ্ট সমস্যার মধ্যে অন্যতম প্রধান বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যেই 'অমিল' খুঁজে ছোট ছোট জনজাতিতে বিভক্ত করা।


এই কর্মে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছিল ধর্ম নামক বিশেষ নিয়মাবলী; বর্তমানে এর সাথে যুক্ত হয়েছে রাজনীতি নামক এক সর্বভুক জনগোষ্ঠীর মাতব্বরি।


ধর্ম আর রাজনীতির দ্বৈত নিষ্পিসনে প্রান ওষ্ঠাগত। এঁদের তৈরি নিয়মাবিধিকে মান্যতা দিয়ে মানুষকে বদলে ফেলতে হবে সুপ্রাচীন ঐতিহ্য, খাদ্যাভ্যাস, জীবন ধারণের সর্বপ্রকার রীতিনীতি।


এর সাথে ভেগান নামক এক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব হয়েছে যাঁরা প্রানীজাত খাদ্য গ্রহণ করেন না আর অন্যদেরও অনুউৎসাহীত করেন, আমিষাশী খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে; প্রয়োজনে তাঁদের যুক্তিগুলি বিজ্ঞানের চাদরে যত্নে মুড়ে পরিবেশন করেন।


উপরের লেখায় বর্তমান মানুষের পূর্বপুরুষের খাদ্যাভাস নিয়ে প্রামাণ্য আলোচনা হয়েছে কেবলমাত্র এটার প্রত্যাশায় যে মানুষ তাঁর অতীতকে চিনতে শিখুন আর ধর্ম-রাজনীতির যৌথ জাতাকলে আটকে না পড়ে একটু স্বাবলম্বী চিন্তা চেতনায় সমৃদ্ধ ও উদ্বুদ্ধ হয়ে নতুন করে পথ চলতে শিখা।

বৃহস্পতিবার, ২১ এপ্রিল, ২০২২

হিন্দু ধর্মে বর্ণভেদ প্রথার ইতিহাস


হিন্দু ধর্মে বর্ণভেদ প্রথার ইতিহাস

প্রকাশ: ০৭:১০ pm ২০-০৪-২০১৭ হালনাগাদ: ০৭:৪৬ pm ২০-০৪-২০১৭

 

ধর্ম ডেস্ক: মধ্য এশিয়া থেকে আগত আক্রমণকারীদের সামাজিক শোষণ এবং নৈতিক ভ্রষ্টাচার কায়েম রাখার উদ্দেশ্য হিন্দুদের বিভক্ত ও দুর্বল করবার জন্যে এই বর্ণভেদ প্রথার প্রবর্তন।

এই আক্রমণকারীদের আগমনের পূর্বে সাধারণত শ্রমকে চারটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করা হত অর্থনৈতিক সুবিধার জন্য।


যাঁরা শিক্ষালাভ এবং শিক্ষাদানের জীবিকা বেছে নিতেন তাঁদের বলা হত ব্রাহ্মণ, যুদ্ধবিদ্যায় যাঁরা পারদর্শিতা লাভ করতে চাইতেন তাঁদের বলা হত ক্ষত্রিয়, বুদ্ধিমান ব্যক্তি যাঁরা বৈষয়িক সম্পত্তি সৃষ্টিতে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতেন তাঁদের বলা হত বৈশ্য এবং কারিগর ও সাধারণভাবে শিল্পনৈপুণ্যের অধিকারীদের বলা হত শূদ্র।


প্রত্যেকে নিজের নিজের পছন্দ ও বিশেষ জ্ঞান ও কুশলতা অনুযায়ী কর্মে লিপ্ত হয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ঋগ্বেদের যুগে একই পরিবারের বিভিন্ন সদস্যরা বিভিন্ন বৃত্তি অবলম্বন করতেন।


আনুমানিক ৪৫০০ থেকে ৩৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে যাযাবর রক্তলোলুপ বিদেশী অশ্বারোহী সৈনিকেরা দলে দলে, বারে বারে স্বর্ণ লোভে ভারত আক্রমণ করে।


নতুন শাসকেরা অর্থনৈতিক শ্রেণী বিভাগকে চার প্রধান বর্ণে বিভাজিত করেন। হিন্দুদের এর মাধ্যমে দুর্বল ও বিভক্ত জাতিতে পরিণত করা হয়।


এই চার শ্রেণী বিভাগের নাম ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র। যারা শিক্ষিত ছিল না এবং দুর্ভাগ্যবশত : বিশেষ কোনও রকম কুশলতা অর্জন করেনি, তাদের সম্পর্কে নতুন শাসকদের কোনও আগ্রহ ছিল না।


তাদের বলা হল নিজেদের ব্যবস্থা নিজেরাই করতে। হাজার বছরের রাজনীতির দলনের শিকার হল এই দুর্ভাগা সৎ মানুষেরা, আজও তাদের বলা হয় দলিত।


বৃত্তিভেদপ্রথা হয়ে গেল বর্ণভেদপ্রথা। বৃত্তিভেদ ছিল এমন এক সমাজ ব্যবস্থা, যাতে সন্তান পিতার জ্ঞান ও কুশলতার উত্তরাধিকারী হত।


সে যুগে কারিগরি শিক্ষার কোনও বিদ্যালয় ছিল না, কাগজ ছিল না, বই ছিল না। পরিবারের বাইরে কুশলতা অথবা জ্ঞান অর্জন করবার কোনো রাস্তা ছিল না।


বংশপরম্পরায়, কারিগরি কুশলতা ও জ্ঞান সঞ্চারিত হত। এক বৃত্তি থেকে অন্য বৃত্তিতে অর্থাৎ এক বর্ণ থেকে অন্য বর্ণে প্রবেশ হিন্দুদের মধ্যে প্রচালিত ছিল।


হিংসাবৃত্তি দ্বারা আক্রমণকারীরা শান্তিপ্রিয় দেশ ভারতকে পদানত করল ঠিকই, কিন্তু ভারতীয়দের নৈতিক সাহস ও বিশ্বাসের দৃঢ়তা ছিল অটুট। আক্রমণকারীরা ভারতীয়দের মানসিকতার অবক্ষয় করতে পারল না।


তখন তারা বর্ণভেদ প্রথার অপব্যবহার করে, অর্থনৈতিক শ্রমবিভাগকে তথাকথিত ধর্মীয় অনুশাসনে পরিবর্তিত করল এবং তাকে এমনভাবে পরিচালিত করল যেন বিভিন্ন বর্ণের মধ্যে প্রাচীর অভেদ্য, যেন বর্ণভেদ একটি ধর্মীয় ব্যবস্থা।


অশিক্ষিত, অবুঝ মানুষ বহু শতাব্দী ধরে এই রাজনৈতিক অবস্থার মধ্যে বাস করতে করতে ভ্রান্ত বিশ্বাসের শিকার হয়ে গেল।


বোঝা দরকার, পৃথিবীর সর্বত্র কোনও সামাজিক অন্যায়, দীর্ঘকাল প্রচালিত থাকলে, তা প্রায় আইনের বাধ্যবাধকতা লাভ করে। বৃত্তিভেদ বা বর্ণভেদ প্রথাকে বিভিন্ন বর্ণের মধ্যে অভেদ্য অনতিক্রমণীয় প্রাচীরে রূপান্তরিত করা হিন্দু সমাজের সর্বাপেক্ষা গুরুতর পাপ।


চতুর রাজনীতিকেরা যুগে যুগে এই সামাজিক অন্যায়ের সুযোগে সমাজকে বিভক্ত করে অপশাসন ও সামাজিক শোষণ করেছেন। যাঁরা এর দ্বারা লাভবান হয়েছেন তাঁরা এঁকে সমর্থন করেছেন।


সনাতন ধর্মের দর্শন হিন্দুদের প্রচণ্ড নৈতিক বল দান করেছে যুগে যুগে। হিন্দু দর্শন মানবতার শ্রেষ্ঠ দর্শন। এই দর্শন ঈশ্বর প্রেরিত তাই হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করা আক্রমণকারীদের পক্ষে দুঃসাধ্য ছিল।


আক্রমণকারীরা ছিল অশ্বারোহী, দ্রুতগামী এবং নৃশংস ও হত্যায় সিদ্ধহস্ত। যতটুকু সাফল্য তারা পেয়েছে, তা মৃত্যুভয় প্রদর্শনের মাধ্যমে শ্রদ্ধার মাধ্যমে নয়।


নতুন প্রভুরা ভণ্ড, মিথ্যাচারীদের সহায়তায় হিন্দুদের বিভক্ত ও দুর্বল করে রাখল। ভণ্ড অর্থাৎ যারা পঞ্চমবাহিনী, তারা ধার্মিক হিন্দু ও মানবতাবাদীর ছন্দবেশে প্রকৃতপক্ষে সমাজকে ধ্বংস করে দিল, তাদের নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থ,  আত্মম্ভরিতা ও লোভকে চরিতার্থ করবার জন্যে, ক্ষমতাসীনদের সন্তুষ্ট করবার জন্যে বহুবার বহুপথে তারা মানুষকে পথভ্রান্ত করেছে, নানা অজুহাতে বিদেশীদের ভারতে এসে হিন্দুদের লুট করবার পথ প্রশস্ত করেছে।


বিপুল সংখ্যক দেশবাসী ছিল নিরক্ষর, অজ্ঞান, ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী, অপরিসীম দারিদ্র্যে পীড়িত। কালক্রমে নতুন শাসনকর্তাদের রাজসভায় কায়েমি স্বার্থ গজিয়ে উঠল। স্বল্প পরিমাণ সম্পদ যা ছিল, হস্তগত করবার জন্যে প্রত্যেক গোষ্ঠী প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়ল। প্রত্যেক গোষ্ঠীর মধ্যে 'নিজেদের লোক' এবং 'বাইরের লোক', এই মনস্তত্ত্ব গড়ে উঠল।


হাজার হাজার বৎসর ধরে এই অর্থনৈতিক ভেদ বর্ণভেদ প্রথাকে এক সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত করল। এই শোষণকে চিরস্থায়ী করবার জন্যে ভণ্ডেরা দুরভিসন্ধি পরায়ণ হয়ে একে ধর্মের বাহ্যিক রূপ দান করল।


গীতায় পরিষ্কার বলা হয়েছে বর্ণ পেশাগত যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মভেদ এবং মানুষের প্রবর্তিত কর্মবিভাগ। ঈশ্বর অর্থাৎ ধর্মের সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই।


ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বিংশা পূদ্রাং চ পরংতপ

কর্মাণি প্রবিভক্তানি স্বভাব প্রভবৈর্গুণেঃ।


অর্থ,  ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্যের এবং শূদ্ররও উপাধি ভেদ হবে তাহাদের বৃত্তিগত গুণাবলীর প্রকাশ অনুযায়ী।


চাতুর্বর্ন্‌ ময়া সৃষ্টম্‌ গুনকর্ম বিভাগশঃ ।

তস্য কর্তরম্‌ অপি মাম্‌ বিদ্ধি অকর্তারম্‌ অব্যয়ম্‌।।


অর্থ,  প্রকির্তির তিনটি গুন এবং কর্ম অনুসারে আমি মানুষ সমাজে চারিটি বর্নবিভাগ সৃষ্টি করিয়ছি । আমিই এই প্রথার স্রষ্টা হলেও আমাকে অকর্তা এবং অব্যয় বলে জানবে।


মহাভারতের বনপর্বে যুধিষ্ঠিরের চার ভাই এক যক্ষের পুকুরে বিনা অনুমতিতে জলপান করতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। যুধষ্ঠির যখন খুঁজতে এসে চার ভাইকে অজ্ঞান অবস্থায় দেখে যক্ষকে প্রার্থনা করেন যেন যক্ষ চার ভাইকে উজ্জীবিত করে তোলেন। যক্ষ বলেন যে যুধিষ্ঠির যদি তার বারটি ধর্ম সম্বন্ধীয় প্রশ্নের উত্তর ঠিকমত দিতে পারেন, তবেই যক্ষ চার ভাইকে বাঁচাবার ওষুধ দেবেন।


যুধিষ্ঠির উত্তর দিতে রাজি হলে যক্ষর নবম প্রশ্নটি ছিল-


"ব্রাহ্মণ হতে হলে কি একমাত্র জন্মসূত্রেই ব্রাহ্মণ হতে হবে? অথবা চরিত্রের সততা ও মাধুর্য্য দ্বারা ব্রাহ্মণ হওয়া যায় নাকি জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে অথবা প্রজ্ঞা লাভের মাধ্যমে ব্রাহ্মণ হওয়া যায়"।


ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির উত্তর দেন-


"ব্রাহ্মণ হওয়া যায় সৎ মধুর চরিত্র গঠনের মাধ্যমে। জন্মসূত্র, জ্ঞান অর্জন বা প্রজ্ঞা কাউকে ব্রাহ্মণ করে না"।


এটা একটা ধর্মমত প্রমাণ যে ইচ্ছা, পরিশ্রম ও কর্মকুশলতার মাধ্যমে মানুষ বর্ণভেদ প্রথার ওপরে উঠে স্ব-ইচ্ছায় নিজ বর্ণপরিচিতি নিতে পারে।


অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অসাধুতা দ্বারা উৎপন্ন জাতিভেদ প্রথা হিন্দুধর্মের মত একটি নির্মল ঈশ্বর প্রদত্ত ধর্মকেও প্রায় আবর্জনাস্তূপে পরিণত করেছে।


হিন্দুরা পৃথকান্ন পরিবার হয়ে দাঁড়ায়। সনাতন ধর্ম অর্থাৎ হিন্দুধর্ম কোনও দিনই বর্ণভেদবাদের নির্দেশ দেয়নি। কিন্তু হিন্দুধর্মের ধর্মাবলম্বীরা বাধ্য হয়ে এবং অজ্ঞতাবশে বহু শতাব্দী ধরে তা পালন করে এবং ঈশ্বর অসন্তুষ্ট হয়ে অভিশাপ দেন যে, বর্ণভেদ প্রথার অনুসারীরা দরিদ্র, দুর্বল এবং দাস হয়ে থাকবে।


কথিত আছে, ঈশ্বর বিধান দিয়েছেন, যে কেউ বর্ণভেদপ্রথা অস্বীকার করে হিন্দুদের ঐক্যের জন্যে চেষ্টা করবেন, তিনি অনন্ত স্বর্গ প্রাপ্ত হবেন, তাঁর পূর্বপুরুষেরাও স্বর্গবাসী হবেন।


বর্ণভেদপ্রথা যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণ, ধর্মীয় বিধান নয়, তার বহু প্রমাণ আছে। বঙ্গ দেশের দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক। ১২০০ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গদেশে এক শক্তিশালী নরপতি ছিলেন।


তাঁর নাম ছিল বল্লাল সেন। তাঁর রাজত্বকালে নাথ ব্রাহ্মণ (তাঁদের রুদ্র ব্রাহ্মণও বলা হত) ব্রাহ্মণদের মধ্যে উচ্চবর্ণ বলে পরিগণিত হতেন এবং রাজপুরোহিত হিসেবে কাজ করতেন।


পীতাম্বর নাথ ছিলেন রাজা বল্লাল সেনের রাজপুরোহিত, বল্লাল সেনের পিতার যখন মৃত্যু হয়, রাজা চাইলেন তাঁর গুরু পীতাম্বর নাথ মৃতের পিণ্ড গ্রহণ করুন রাজার দান হিসেবে।


পীতাম্বর নাথ কোন মৃত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো দান গ্রহণ করতে অাস্বীকার করেন। এই প্রত্যাখ্যান রাজা অপমান জ্ঞান করেন এবং আহত আত্মাভিমানে ও ক্রোধে শ্রীপীতাম্বর নাথের উপবীত কেড়ে নিয়ে বঙ্গরাজ্যে প্রচার করলেন রুদ্রজ ব্রাহ্মণ / নাথ ব্রাহ্মণ (অর্থাৎ উচ্চশ্রেণীর ব্রাহ্মণ) বলে গণ্য ব্যক্তিরা এরপর থেকে শূদ্র হিসেবে গণ্য হবেন।


তার ফলে তদবধি রুদ্রজ / নাথ সম্প্রদায়ভুক্ত ব্যক্তিরা বঙ্গ দেশে শূদ্র হিসেবে গণ্য হন এবং বঙ্গ -দেশের বাইরে সেই একই নাথেরা ব্রাহ্মণ পুরোহিত হিসেবে শ্রদ্ধার পাত্র। এই একটি দৃষ্টান্ত থেকে প্রমাণ হয়, বর্ণভেদ প্রথা হিন্দুধর্মের অঙ্গ নয়, চতুর রাজনীতিকদের দ্বারা কৃত রাজনৈতিক শোষণ। পুরাণে অর্থাৎ প্রাচীন শাস্ত্রে কথিত আছে যে, নাথ ব্রাহ্মণেরা (অর্থাৎ রুদ্র বাহ্মণ)  ভগবান শিব, যিনি রুদ্র নামেও অভিহিত তারই বংশধরগন ।


নেপালে(যেটি একমাত্র হিন্দু রাষ্ট্র) এখন পর্যন্ত রাজপুরোহিত একজন নাথ ব্রাহ্মণ। কলকাতায় বিখ্যাত কালী মন্দিরের প্রথম প্ররোহিত ছিলেন শ্রীচৌরঙ্গী নাথ। কলকাতায় একটি প্রধান রাজপথের নামকরণ হয়েছিল তাঁর স্মৃতিতে। সেটি চৌরঙ্গী রোড নামে পরিচিত ছিল। অন্য বিখ্যাত নাথেরা ছিলেন সোমনাথ, গোরখনাথ প্রভৃতি, যাঁদের স্মৃতিতে যথাক্রমে বিশাল সোমনাথ মন্দির (গুজরাট) এবং গোরখনাথ মন্দির (উত্তর প্রদেশ) নির্মিত হয়।


এই সব তথ্য আবার প্রমাণ করে যে, বর্ণভেদ প্রথার উৎপত্তি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, কর্মবিতরণ ও রাজনৈতিক শোষণ থেকে। প্রকৃত হিন্দুধর্ম বর্ণভেদ প্রথার বিরোধী।


ইতিহাস বলে ভারতে গুপ্তযুগে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়েরা বহু  ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই জীবিকা অর্জনের জন্য কারিগরের বৃত্তি অবলম্বন করতেন। ময়ূরশর্মা নামক এক ব্রাহ্মণ যোদ্ধার বৃত্তি গ্রহণ করে প্রসিদ্ধ হন এবং কদম্ব রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। আরেকজন ব্রাহ্মণ, মাতৃবিষ্ণু, ক্ষত্রিয়ের বৃত্তি অবলম্বন করে গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনে একটি প্রদেশের শাসক হন।


প্রদোষ বর্মণ জাতিতে শূদ্র ছিলেন, কিন্তু তাঁর বৃত্তি ছিল ক্ষত্রিয়ের এবং তিনিও একটি প্রদেশের শাসক হয়েছিলেন । গুপ্তযুগে অনেক ব্রাহ্মণ বনে জঙ্গলে শিকারীর কাজ করতেন কারণ তা ছিল অর্থকরী পেশা।


শূদ্র বংশজাতরা মান্ডাশোরের বিখ্যাত সূর্য মন্দির নির্মাণ করেন। এই সব দৃষ্টান্ত প্রমাণ করে যে হিন্দুধর্মে বর্ণভেদপ্রথা কেবলমাত্র শ্রমবিভাগ ছাড়া আর কিছুই নয়।


বৈদিগ যুগে শূদ্র অথবা অন্য কাউকে অস্পৃশ্য অথবা দলিত জ্ঞান করার ধারণা প্রচলিত ছিল না। কাউকে ঘৃণ্য মনে করা হত প্রধানত তার বৃত্তি এবং ব্যবহার সমাজে গ্রহণযোগ্য না হওয়ার কারণে। তবে, সমাজে নিন্দিত অবস্থা অনুশোচনা দ্বারা অথবা বৃত্তি পরিবর্তনের দ্বারা সংশোধিত করে নেওয়ার প্রথা প্রচলিত ছিল।


প্রাচীন যুগে ছাত্রাবস্থা দীর্ঘকাল ব্যাপী ছিল এবং আশ্রমে বনবাসের মত কঠোর জীবনযাপন করতে হত। গুরু - শিষ্যের মধ্যে জ্ঞানের আদান - প্রদান হত। সাধারণত শিক্ষা দান করা হতো মৌখিকভাবে কারণ লিখিত পুঁথি সহজলভ্য ছিল না


পক্ষান্তরে, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, শুদ্র ও বৈশ্য পরিবারের সন্তানদের (পারিবারিক বৃত্তি অথবা ব্যবসায়ের স্বাভাবিক সংস্পর্শের কারণে) একটা পারিবারিক কর্মের প্রবণতা প্রথম থেকেই তৈরি হত এবং পিতামাতারা সহজেই তাঁদের পরম্পরাগত বৃত্তিতে প্রবেশ করিয়ে নিতে পারতেন।


কালক্রমে বৃত্তি নির্বাচনের এই প্রথা অজ্ঞাতসারেই সম্পূর্ণ পরিবার ভিত্তিক বৃত্তির কারণ হল, যদিও সমাজ সে রকম পরিণতির আকাঙ্খা করেনি। এই বিষয়ে হিন্দুসমাজে কঠোরতা ছিল না।


কে কী বৃত্তি অবলম্বন করবে তাতে তার স্বাধীনতা ছিল। (যেমন,সত্যকাম জন্মসূত্রে শূদ্র ছিলেন, কিন্তু বেদাধ্যয়ন করে ব্রাহ্মণত্ব লাভ করে বিপুল শ্রদ্ধা অর্জন করেন।) বৈদিক যুগে যে কেউ পুরোহিত হতে পারতেন। ব্রাহ্মণের জন্য সে পদ সংরক্ষিত রাখার কোনও প্রশ্ন ছিল না।


পবিত্রাত্মা সংযতেন্দ্রিয় পোশালাং মধু জীয়বা চ

তং গুরু শ্রদ্ধয়া শৃনু উপহার চ প্রয়চ্ছতু।


অর্থ,  যারা অন্তর পবিত্র, প্রবৃত্তিসমূহ নিয়ন্ত্রণের অধীন এবং সুরসংযোগে যিনি শ্লোক আবৃত্তি করতে পারেন, তিনিই পুরোহিত হিসেবে মন্ত উচ্চারণের মাধ্যমে প্রার্থনা পরিচালনা করবার অধিকারী এবং তাকে ভক্তগণের প্রভূত পরিমাণ দান করতে হবে যেন তিনি সচ্ছন্দ ও উন্নত পারিবারিক জীবন যাপন করতে পারেন।


বৃত্তি বিবেচনায় বিবাহ একই বর্ণের মধ্যে হওয়া সুবিধাজনক বিবেচনা করা হত, একই ধরনের পারিবারিক পরিবেশ থেকে আসার কারণে পরিবারের ব্যবসায়ে প্রবেশ করতে দেরি হত না, অসুবিধা হত না এবং অতিরিক্ত কোনও শিক্ষানবিশির প্রয়োজন হত না। উপরন্তু এই ধরনের বিবাহের ব্যবস্থায় বর ও কন্যার বিবাহের পরে অপ্রত্যাশিত, অপরিচিত, অমিত্র-সুলভ ও অবাঞ্ছিত সামাজিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকত।


যাদের মধ্যে পারিবারিক পরিবেশের দিক থেকে বিপুল পার্থক্য ছিল এমন পাত্র-পাত্রীর মধ্যে বিবাহও হতে পারত এবং প্রায়ই ঘটত। মহাভারতের ইতিহাস বলে এক শূদ্র ধীবরের কন্যা সত্যবতীর সঙ্গে ক্ষত্রিয় রাজা শান্তনুর বিবাহে সমাজ কোনও প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেনি।


বর্ণভেদপ্রথা ছিল এক অর্থনৈতিক প্রথা। কাজের সুবিধার জন্য লোক তাদের পারিবারিক বৃত্তিই অবলম্বন করে থাকত এবং একই ধরনের পরিবারের মধ্যে অর্থাৎ একই ধরনের বৃত্তির লোকেরা মধ্যে সাধারণত বিবাহ হত। এই বিষয়ে সাম বেদের একটি শ্লোক প্রাসঙ্গিক : ঈশ্বর শোষণ পছন্দ করেন না। তিনি চান তাঁর ভক্তেরা সকলের সঙ্গে সমব্যবহার করুন, পীড়িতের সেবা করুন।


যো দদাতি বুভূক্ষিতেভ্য পিড়িতানাং সহায়ক :

দুঃখার্তাণাং সমাশিলষ্যতি তমেব ইশঃ প্রসীদতি।


অর্থ, ঈশ্বর খুশি হন, যখন তুমি সমব্যবহারের মাধ্যমে কোনও মানুষের চিত্ত আনন্দিত কর, ক্ষুধার্তকে অন্নদান কর, আর্তকে সাহায্য কর, দুঃখীর দুঃখ ভার লাঘব কর, অত্যাচারিতের প্রতি অন্যায় আচরণের অবসান কর।


হাজার বৎসর ব্যাপী বিদেশীয় দাসত্বের পর ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করে, সামাজিক ভেদনীতি অর্থাৎ জাতিভেদ প্রথা নির্মুল করার অধিকার লাভ করে। দীর্ঘকাল বর্ণের ভিত্তিতে যারা বঞ্চিত হয়ে এসেছে তাদের জন্যে ভারত সরকার চাকরিতে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।


জাতিভেদ প্রথা ভারতে আইনত দণ্ডনীয়, এখানে বাংলাদেশের হিন্দুরা পিছিয়ে থাকলেও, আধুনিক শিক্ষিত ভারতীয় জাতিভেদ প্রথাকে ঘৃণা করে এবং এই বিষয়ে আলোচনা হলে লজ্জিত হয় ও অপ্রতিভতা বোধ করে।

Collection Nitananda Biswas


সংগৃহীত - Nityananda Biswas

সোমবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২২

ইসলাম জিহাদ করেও ভারতে কেন এত হিন্দু?


অনেক সময় আমাদের অনেক মুসলিম বন্ধু প্রশ্ন করে যদি ভারতে ইসলামিক শাসনের সময় হিন্দুদের উপর অত্যাচার করা হয়ে থাকে তাহলে ভারতে এখনো কিভাবে 80 পার্সেন্ট হিন্দু রয়েছে ? আসলে প্রশ্নটি খুবই যৌক্তিক প্রশ্ন এবং এই প্রশ্নের সম্মুখীন আমিও ব্যক্তিগতভাবে নিজে হয়েছি অনেকবার। প্রকৃতপক্ষে এই প্রশ্নের উত্তরটা কি, আসলে কি মুসলিমরা উদার ছিল নাকি এর পিছনে রয়েছে অন্য কোন উত্তর। এটা নিয়েই আলোচনা করা হবে এই পোস্টে।

প্রথমেই আপনাকে একটি ভিডিও লিঙ্ক দিচ্ছি। এই ভিডিওটিতে গেলে আপনি খুব সুন্দরভাবেই ইসলামিক আমলে হিন্দুদের সাথে ঠিক কি কি করা হয়েছিল তার খুব সুন্দর বর্ণনা আপনি পেয়ে যাবেন রেফারেন্স সহ। ভিডিওটি আপনি অবশ্যই দেখুন ,আপনার মন মত হবে, তবে আগে পোস্টটি পড়ে নিন।

https://youtu.be/6_E6nUTiVUQ

এখন আসুন পোস্টটি শুরু করা যাক। একটু ইতিহাসের দিকে আমরা তাকাই ।আমরা দেখতে পারবো এই জগতে দুটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি রয়েছে যে শক্তি দুটি পূর্বে যেখানে গিয়েছে সেখানের সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে বিনষ্ট করে নিজের সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে চাপিয়ে দিয়েছে। সে দুটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হল ইসলাম এবং ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ। এদুটি সাম্রাজ্যবাদ যেখানেই গিয়েছি সেখানে নিজেদের সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে জোর করে চাপিয়ে দিয়েছে এবং সে জায়গার সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে বিনষ্ট করেছে ।যেমন আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে সিরিয়া খ্রিস্টান ছিল, মেসোপটেমিয়া এবং পারস্যে পার্সিরা ছিলো , কিন্তু এখন কি পারস্যে ও  মেসোপটেমিয়া পার্সিদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়? যায় না কারণ যখন মুসলিমরা পারস্যে এবং মেসোপটেমিয়া প্রবেশ করল তারা মাত্র 17 বছর আর 20 বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ পারস্য এবং মেসোপটেমিয়া কে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত বানালো, তাই মেসোপটেমিয়া হলো ইরাক এবং পারস্য হলো ইরান, আবার দেখুন যখন ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ আমেরিকায় গেলো তখন তারা  আমেরিকার স্থানীয় সংস্কৃতি বা native American culture কে বিনষ্ট করে খুবই অল্প সময়ের মধ্যে আমেরিকায় নিজেদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রচার করলো। একইভাবে তারা অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপিন, আফ্রিকায়ও নিজেদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রচার করলো। কিন্তু একটা জিনিস লক্ষ্য করুন তো, এই ইসলামি সাম্রাজ্যবাদ এবং ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদও ভারতে এসেছিল এবং ইসলামের সাম্রাজ্যবাদ প্রায় 600 বছর এবং ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ প্রায় 200 বছর ধরে এই ভারতে ছিল। প্রায় 800 বছর ধরে এ দুটি ধ্বংসাত্মক সাম্রাজ্যবাদ ভারতবর্ষে থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি কিভাবে এখনো জীবিত আছে????? ব্যাপারটা কি এরকম হয়েছিল যে এই দুটি ধংসাত্মক সাম্রাজ্যবাদ যখন ভারতের ভূমিতে পা দিলো তখন তারা অনেক উদার, অনেক প্রেমময়,অনেক প্রজাহিতৈষী হয়ে গেলো ??? কিন্তু এটা কি আদেও সম্ভব ,কখনোই নয়।

এই প্রশ্নের একটিই উত্তর তা হলো হিন্দুদের প্রবল প্রতিরোধ, হ্যাঁ প্রবল প্রতিরোধ করবার কারণেই ইসলামিক সাম্রাজ্য কখনো ভারতে একচ্ছত্র রাজত্ব করতে পারেনি এবং আজও ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি জীবিত আছে।যেমন ধরুন ইসলামিক আমলে আকবর প্রায় অধিকাংশ ভারত দখল করতে পারলেও মেওয়ারের মহারানা প্রতাপকে কখনো পরাজিত করতে পারেনি। তাই কখনো সমগ্র ভারতের একচ্ছত্র অধিকার সে নিতে পারেনি। আবার আরঙ্গজেব যখন দক্ষিণাত্যে নিজের সাম্রাজ্য বিস্তার করতে যায় তখন তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায় ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ ।আবার যখন পূর্বে সাম্রাজ্য বিস্তার করতে যায় তখন তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায় অহম সাম্রাজ্য এবং উত্তরেও বিদ্রোহ শুরু করে দেয় রাজপুত এবং শিখ যোদ্ধারা । এসব করণে আরঙ্গজেব ও সমগ্র ভারতে কখনো অধিকার করতে পারেনি। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় ইসলামিক সাম্রাজ্য দক্ষিণাত্যে প্রায় কখনোই নিজ সাম্রাজ্য স্থাপন করতে পারেনি। এরকম যুগে যুগে ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ, লাচিত বরফুকন, মহারানা প্রতাপ ,বাপ্পা রাওয়াল, হাম্বীর সিং সিসোদিয়া, হরিহর রায় বুক্কা রায়, এরকম হাজার হাজার প্রতাপী যোদ্ধার প্রবল প্রতিরোধের কারণে আজও ভারতে ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি জীবিত আছে। তারপরও আপনি যদি দেখেন তৎকালীন সময়ে হিন্দুদের নিজ সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি অধিক প্রেম ছিল।

এই প্রেম থাকবার কারণেই ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ এর পুত্র সাম্ভাজি মহারাজ কে 40 দিন ধরে অকথ্য নির্যাতন যেমন গরম শলাকা দিয়ে চোখ ফুরে অন্ধ করে দেওয়া, হাত ও পায়ের নখ টেনে টেনে তোলা, হাত-পা ছুড়ি দিয়ে কেটে তাতে লবন মরিচ দেওয়াসহ নানারকম নির্যাতন করা সত্ত্বেও সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেনি। আবার পৃথ্বীরাজ চৌহানকেও ঠিক একইভাবে চোখ অন্ধ করে দেওয়া সহ নানারকম নির্যাতন করা সত্ত্বেও সে  ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেনি। আবার গুরু তেগ বাহাদুরের উদাহরণই যদি নেন তাহলে দেখা যায় তারই চোখের সামনে তার এক শিষ্যকে ফুটন্ত গরম জলের মধ্যে ছেড়ে দেওয়া আরেকজন শিষ্যকে তুলার চাদরে মুড়ে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা ,আরেকজন শিষ্যকে বুক বরাবর তলোয়ার দিয়ে দুই ভাগে কেটে হত্যা করা এবং অবশেষে তাকে তলোয়ার দিয়ে গলা কেটে হত্যা করার পরেও সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেনি। হ্যাঁ এরকম প্রবল নির্যাতন করা সত্যেও তারা কেউই নিজ সভ্যতা ও  সংস্কৃতিকে পরিত্যাগ করেনি,কারন   তারা নিজ সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি অনেক বেশি পরিমাণে শ্রদ্ধাশীল ছিল।

মূলত এসব কারণেই আজও ভারতে 80% হিন্দু বিদ্যমান কারণ হিন্দুদের প্রবল প্রতিরোধ এবং নিজ সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি অধিক শ্রদ্ধা থাকাবার কারনেই এরকম সম্ভব হয়েছে। মূলত আমাদের পূর্বপুরুষগনের  প্রবল বীরত্বের কারনেই আজও আমরা সনাতনী হিসেবে টিকে রয়েছি যা একটি গর্ব করার মতোই বিষয়‌। তবে যেসব স্থানে হিন্দুদের সেরকম কোন ধরনের প্রবল প্রতিরোধ ঘটে নি এবং মুসলিমদের একচ্ছত্র আধিপত্য বহুদিন ধরে ছিল সেসকল অঞ্চল পূর্বে ভারতের অংশ হওয়া সত্ত্বেও আজ কিন্তু ভারতের অংশ নয়। আজ  মুসলিম দেশে রূপান্তরিত হয়েছে। যেমন পাকিস্তান , আফগানিস্তান। তাই এটা মনে করা যে মুসলিমরা অনেক বেশী উদার ছিল তাই আজও ভারতে 80% হিন্দু রয়েছে এটা সম্পূর্ণ একটি ভুল ধারণা, মূলত আমাদের পূর্বপুরুষগনের প্রবল প্রতিরোধ ও বীরত্বের কারনে আজও আমরা সনাতনী হিসেবে টিকে আছি এবং সনাতন সভ্যতা ও সংস্কৃতি দুটি ধ্বংসাত্মক সাম্রাজ্যবাদের মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও, আজও এই পৃথিবীতে নিজের স্থান সমুন্নত রেখে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে ।তাই আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের প্রতি কৃতজ্ঞ এবং গর্বিত যাদের প্রবল আত্মত্যাগ এবং বলিদান এর কারনে আজও ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিশ্বে বিদ্যমান।

আশা করি পোস্টটি পড়ে যারা এতদিন সংশয়ে ছিলেন তারা উত্তরটি পেয়ে গিয়েছেন।

"সত্যমেব জয়তে "

সত্যের বিজয় হবেই।

ধন্যবাদ

রবিবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২২

গোত্র কি? স্বগোত্রে বিবাহ করা কেন উচিত নয়

 গোত্র কি? স্বগোত্রে বিবাহ করা কেন উচিত নয়?


 


গোত্র শব্দের অর্থ কুল বা বংশ।সনাতন ধর্মে গোত্র মানে একই পিতার ঔরসজাত সন্তান-সন্ততি  দ্বারা সৃষ্ট বংশ পরম্পরা।গো-শব্দের উৎপত্তি হয়েছে গম্-ধাতু থেকে যার অর্থ- গতি। আর ‘ত্র’ উতপত্তি হয়েছে ত্রৈ-ধাতু থেকে,  মানে হলো ত্রাণ করা। তাই গোত্র মানে দাঁড়ায় বংশের ধারা বা গতি যাঁর মাধ্যমে রক্ষিত হয় সেই স্মরনীয় পিতৃপুরুষ।  তিনিই গোত্র পিতা।সনাতন ধর্মের বৈশিষ্ট্য হলো,এ ধর্মের বংশ রক্ষার ধারায় ঋষিগণ সম্পৃক্ত ছিলেন।এই একেকজন ঋষির বংশ পরম্পরা তাদের নামে এক একটি গোত্র হিসেবে পরিচিত লাভ করে।


পূজা, যজ্ঞ কিংবা বিবাহ যেকোনো মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানেই গোত্রের নাম জিজ্ঞেস করা হলে  নামটা অবলীলায় মুখ থেকে নির্গত হলেও তা কেবল নামসর্বস্বই। এর বাইরে গোত্র সম্বন্ধে  খুব কম লোকরই জানা। পারিবারিক পরম্পরায় শুধু নামটিই প্রবাহিত হয়ে আসছে, কিন্তু এর উৎস সম্বন্ধে অধিকাংশই অজ্ঞ। 


 


কীভাবে আমাদের নামের সাথে এই গোত্রটি যুক্ত হয়ে গেল? এর নেপথ্যে কী? 

গোত্র সম্পর্কে জানতে হলে এই ব্রহ্মান্ড সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে এর ইতিহাস জানতে হবে।  ভগবানের নির্দেশে ব্রহ্মা সৃষ্টি কার্য শুরু করলেন। ব্রহ্মা সনক, সনন্দ, সনাতন ও সনৎকুমার নামে চারজন মহর্ষিকে সৃষ্টি করেছিলেন সৃষ্টি বিস্তারের লক্ষ্যে ।তাদের সৃষ্টি করা হলেও ভগবান বাসুদেবের প্রতি ভক্তিপরায়ণ হয়ে মোক্ষ লাভ করে।মোক্ষনিষ্ঠ কুমারেরা সৃষ্টি বিস্তারে কাজ করার অনিচ্ছা প্রকাশ করলেন।


ব্রহ্মা যখন দেখলেন যে, মহাবীর্যবান ঋষিদের উপস্থিতি সত্ত্বেও সৃষ্টির বিস্তার তথা মনুষ্যকুল পর্যাপ্ত পরিমাণে বৃদ্ধি পাচ্ছে না, তখন তিনি গভীরভাবে চিন্তা করতে লাগলেন কীভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি করা যায়। তিনি চিন্তা করলেন, নিজের দেহ থেকে এভাবে সৃষ্টি না করে, নারী-পুরুষের মাধ্যমে সংসার সৃষ্টি হোক। তখন তাঁরা দেহ থেকে প্রান পেয়েছিল আদি মানব পিতা মাতার, তাঁরা হলেন মনু ও শতরূপা।


মনু তাঁর জেষ্ঠ্য কন্যা আকুতিকে রুচি নামক ঋষিকে দান করেন এবং কনিষ্ঠা কন্যা প্রসূতিকে দক্ষের নিকট দান করেন। তাঁদের দ্বারাই সমগ্র জগৎ জনসংখ্যায় পূর্ণ হয়েছে। ব্রহ্মা থেকে সৃষ্ট  ঋষিদের থেকেই বিভিন্ন গোত্রের প্রবর্তন হয়েছে।


 


গোত্র প্রসঙ্গে ভারতীয় গণিতবিদ বৌধায়ন (খ্রীষ্টপূর্ব ৮০০ শতক) এর মত নিম্নরূপ-


 


বিশ্বামিত্রো জমদগ্নিভরদ্বাজোত্থ গৌতমঃ। 


অত্রিবশিষ্ঠঃ কশ্যপ ইত্যেতে সপ্তঋষয়। 


সপ্তানাং ঋষিনামগস্ত্যাষ্টমানাং যদপত্যং তদগোত্রম্।। 


 


অর্থাৎ, বিশ্বামিত্র, জমদগ্নি, ভরদ্বাজ, গৌতম, অত্রি, বশিষ্ঠ,ও কশ্যপ  এই সাতজন মুনির পুত্র ও পৌত্র প্রভৃতি অপত্যগণের মধ্যে যিনি ঋষি হওয়ার যোগ্যতা রয়েছে,  তাঁর নামেই পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের গোত্র ।


বৌধায়নসূত্রে বিশ্বামিত্র, জমদগ্নি, ভরদ্বাজ, গৌতম, অত্রি, বশিষ্ঠ ও কশ্যপ এই সাতজন ঋষিই আদি গোত্রকার বলে নির্দিষ্ট আছেন। সাতজন ঋষি থেকে প্রবাহিত গোত্র ব্যতিত আরও কিছু গোত্রের নামও শোনা যায়। তবে এর কারণ হচ্ছে একই গোত্রদ্ভুত কোনো প্রসিদ্ধ ব্যক্তির নাম অনুসারে পরবর্তী কোনো সময়ে ঐ প্রসিদ্ধ ব্যক্তির নামে গোত্র পরিচয় দেওয়া। যেমন কাশ্যপ গোত্রের বংশক্রমে যদি কোনো ব্যক্তি প্রসিদ্ধ হয় এবং পরবর্তীতে যদি সেই  প্রসিদ্ধ ব্যক্তির নামে গোত্র পরিচয় হয়ে থাকে । এইরূপ আরও কিছু গোত্র আছে যেমন শাণ্ডিল্য,অগ্যস্ত,কাত্যায়ন, বাৎস্য, সার্বন, কৌশিক, মৌদগল্য, আলম্যান, পরাশর, অত্রি, রোহিত, বৃহস্পতি, গর্গ ইত্যাদি।


 


প্রায়ই শোনা যায়, একই গোত্রে কেন বিবাহ করা যায়্না?জেনে নেয়া যাক  এক্ষেত্রে শাস্ত্রে কী বলা হয়েছে?

একটি বংশের রক্ত ধারাবাহিকভাবে প্রভাবিত হয় পুরুষ পরম্পরায়। বৈদিক যুগ থেকেই একই গোত্রে বিবাহের নিষেধ আছে।কেননা সমগোত্র মানে বর ও কনের কোনো না কোনো পিতৃপুরুষ একই পিতার থেকে এসেছে। রক্তধারা যেহেতু পুরুষ পরম্পরায় প্রবাহিত হয় সুতরাং বংশের রক্তের ধারক বাহক হচ্ছে পুরুষ।এজন্য একই বংশের ছেলে মেয়ের মধ্যে বিবাহ বন্ধন হতো না।কারণ  হিসেবে বৈদিক শাস্ত্রসমূহ বিশেষ করে মনুসংহিতায় বলা হচ্ছে, একই রক্তের সম্পর্কের কারো সাথে বিবাহ হলে সন্তান বিকলাঙ্গ, শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধী, মেধা ও বুদ্ধিহীন হয়। শিশু নানা রোগে জরাজীর্ণ হয়ে থাকে। তবে একান্তই প্রয়োজন হলে যেমন পাত্র-পাত্রী না পাওয়া গেলে ১৪ পুরুষ পেরিয়ে গেলে তখন বিবাহ করা যেতে পারে। তবে তা যথাসম্ভব এড়িয়ে চললেই ভালো।


 


মনুসংহিতায় (মনুসংহিতা ৩/৫-৬) এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে– 


 


অসপিন্ডা চ যা মাতুরসগোত্রা চ যা পিতুঃ। 


সা প্রশস্তা দ্বিজাতীনাং দারকর্মণি মৈথুনে।। 


 


অর্থাৎ, যে নারী মাতার সপিন্ডা না হয়, অর্থাৎ সপ্তপুরুষ পর্যন্ত মাতামহাদি বংশজাত না হয় ও মাতামহের চতুর্দশ পুরুষ পর্যন্ত সগোত্রা না হয় এবং পিতার সগোত্রা বা সপিন্ডা না হয়, অর্থাৎ পিতৃস্বসাদিব সন্তান সম্ভব সম্বন্ধ না হয় এমন স্ত্রী-ই দ্বিজাতিদের বিবাহের যোগ্য বলে জানবে।


 


 বৈদিক শাস্ত্রের এই সিদ্ধান্ত আধুনিক বৈজ্ঞানিকগণও স্বীকার করছেন-


তারা বলছেন, নিকটাত্মীয়দের মধ্যে বিয়ের পরিণামে যে সন্তান হয়, তার মধ্যে জন্মগত ত্রুটি দেখা দেয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। ‍”দ্য ল্যানসেট” সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা নিবন্ধে বিজ্ঞানীরা এ তথ্য জানিয়েছেন।

বাঙালি পরিচয় হননকারি

 বাঙালির আত্মপরিচয় ছিনতাইয়ের ষড়যন্ত্র


 ©


[লেখাটি দু’বছর আগের। সফটওয়্যারের কিছু সমস্যার কারণে অনেক ক্ষেত্রে পড়তে অসুবিধা হচ্ছিল। পাঠোদ্ধার করে পুনর্লিখনে শব্দচয়ন ও বাক্যবিন্যাসে কিছু ব্যত্যয় ঘটে থাকবে। শিরোনামটি পরিবর্তন এবং হয়েছে যৎসামান্য সম্পাদনাও]


 গত বছরের কথা। বঙ্গাব্দ নিয়ে আকবর তত্ত্বে ছেয়ে গেছিল পশ্চিমবঙ্গের বাংলা কাগজ গুলো। তারই মধ্যে একটা বিখ্যাত পোর্টাল একটু অন্যরকম ভাবে এই বিষয়ে একটি লেখা বের করে। শিরোনামটা বেশ বিস্ফোরক। “বাঙালিদের কোনও কৃতিত্ব নেই। পয়লা বৈশাখের সূচনা করেছিলেন মহামতি আকবর” শুধুমাত্র এই শিরোনামের জন্যই লেখাটা আমার সব থেকে বেশি ভাল লেগেছিল। কোন লুকোলুকির ব্যাপার নাই একদম সোজাসাপটা স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে যে এঁরা ঠিক কি চায়। ‘বঙ্গাব্দে বাঙালিদের কোনো কৃতিত্ব নাই’ এটা যে কোন ভাবে প্রমাণ করাটাই এদের ঘোষিত লক্ষ্য।


     আকবরের বঙ্গাব্দ চালু করার কোন ইতিহাস না থাকলেও, বঙ্গাব্দের আকবর তত্ত্বের কয়েক দশকের ইতিহাস আছে। ঘটনার সূত্রপাত পাকিস্তানি আমলে। পাকিস্তান পন্থী বুদ্ধিজীবীরা চেয়েছিলেন বাঙালির থেকে তার ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য কেড়ে নিয়ে বাঙালিকে অন্যদের মানসিক দাসে পরিণত করতে। সেজন্যই দরকার ছিল বাংলার বাইরের কোন ব্যক্তিকে বঙ্গাব্দের কৃতিত্ব দেবার। (সংযোজনঃ প্রকৃতপক্ষে আরব উপদ্বীপের বাইরে তরবারির মুখে ইসলাম কবুল করা সকল জনগোষ্ঠীই আত্মপরিচয়ের সঙ্কটে ভোগেন এর থেকে নিস্কৃতি পেতে তাদের বর্তমান প্রজন্ম নানাপ্রকার গোঁজামিল ও ছল চাতুরির আশ্রয় নেন। আত্মপ্রবঞ্চনার মাধ্যমে তারা নিজেদেরকে প্রবোধ দেওয়ার চেষ্টা করেন যে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি সবই আরব ভূমি ও ইসলামের অবদান।) তাই ১৯৬৬ সালে পূর্ব পাকিস্তানে এমন একটি কমিটি গঠিত হয় যার লক্ষ্য ছিল আকবরকে বঙ্গাব্দের প্রবর্তক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। সরকারি ভাবে এই কমিটির নাম ছিল ‘পঞ্জিকা সংস্কার কমিটি’।


দায়িত্ব পেয়েই এই বিষয়ে একটি সুদীর্ঘ রচনা লিখে ফেলেন কাজী দীন মোহাম্মদ। এই রচনার মূল বক্তব্য ছিল আকবর প্রবর্তিত বর্ষপঞ্জি তারিখ-ই-ইলাহীই হল বাঙালির বঙ্গাব্দ। এবং এই বঙ্গাব্দের গণনা পদ্ধতি নাকি আরবি বছর হিজরির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ !?? এরকম উদ্ভট এবং হাস্যকর দাবি কাজী দীন মোহাম্মদই প্রথম তোলেন। এরপরে ওই অসঙ্গতি পূর্ণ লেখাটিকে প্রামাণ্য তত্ত্বের রূপ দিতে ডাক পড়ল জনাব গোলাম সামদানীর। লেখাটি ছেপে বেরোল জনাব গোলাম সামদানীর বাংলা একাডেমি পত্রিকায়। ধীরে ধীরে পূর্ণতা পেতে লাগল বঙ্গাব্দকে বাঙালির থেকে কেড়ে নেবার চক্রান্ত।


এরপরেই আসরে নামেন মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। এই শহীদুল্লাহ ছিলেন মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের অন্যতম সমর্থক। বাংলায় কথা বলা মুসলমান যে কোনোভাবেই বাঙালি নয়, এটা শহীদুল্লাহ মনে মনে ঠিকই জানতেন। তাই ইনি মনে করতেন মুসলিম দেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা বা উর্দু না হয়ে আরবী হওয়াই উচিত। ফলে কাজী দ্বীন মহম্মদের ‘আরবিই মূষলমানদের জাতীয় ভাষা’ লেখাটি শহিদুল্লাহ্ সাহেবের বিশেষ ভাবে পছন্দ হয়। কারণ ঐ লেখাতে আরবি বর্ষপঞ্জী হিজরীর সাথে বঙ্গাব্দের গণনা পদ্ধতির মিল দেখানোর চেষ্টা করা হয়। তাই পঞ্জিকা সংস্কার কমিটির প্রধান হিসাবে ৪ নং সুপারিশের মাধ্যমে মোহম্মদ শহীদুল্লাহ্ আকবরকেই বঙ্গাব্দের জনক হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে দেন।


মজার ব্যাপার হল, আকবরের রাজসভায় লিখিত আকবর নামা বা আইন-ই-আকবরি’র কোন অংশেই বাঙলার জন্য আলাদা বছর চালুর কথা নেই। এমনকি খুব পরিস্কার ভাষায় আইন-ই-আকবরিতে লেখা রয়েছে যে আকবর একটিই বর্ষ গণনা চালু করেন যার নাম তারিখ-ই-ইলাহি। এই তারিখ-ই-ইলাহীও কিন্তু আরবের হিজরী সালের গণনা অনুযায়ী তৈরি হয়নি। কারণ আকবর হিজরী সাল পছন্দ করতেন না। আকবর প্রবর্তিত এই ‘তারিখ-ই-ইলাহী’কে ‘মালিকি সাল’ও বলা হয়।


অথচ বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবিরা আকবর, হিজরি এবং বঙ্গাব্দকে মিলিয়ে একটা কাল্পনিক খিচুরি বানিয়ে ফেলেছেন। তাঁদের বানানো গল্পটা হল এরকমঃ আকবর সিংহাসনে বসেন ইংরেজি ১৫৫৬ খৃস্টাব্দে। ঐ বছর ছিল ৯৬৩ হিজরি সাল। সিংহাসনে বসার সনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে বাংলায় বঙ্গাব্দ চালু করেন আকবর। এবং যেহেতু সেই বছরটি ছিল ৯৬৩ হিজরি তাই প্রথম বঙ্গাব্দটিও হয় ৯৬৩ বঙ্গাব্দ। এটাই এই আকবর তত্ত্বের সবথেকে বড় মুশকিল !


আইন-ই-আকবরিতে গোদা গোদা অক্ষরে লেখা রয়েছে যে আকবর হিজরি সন পছন্দ করতেন না বলেই তারিখ-ই-ইলাহি চালু করেন। যিনি হিজরি সন পছন্দ করতেন না সেই তিনি হিজরি সন অনুযায়ী বঙ্গাব্দ বানাতে যাবেন কেন ? আইন-ই-আকবরিতে আরও লেখা রয়েছে যে তারিখ-ই-ইলাহির প্রথম বছর সেটাই যে বছর আকবর সিংহাসনে বসেন। অর্থাৎ ইংরেজি ১৫৫৬ খৃস্টাব্দই হল তারিখ-ই-ইলাহির প্রথম সাল। অর্থাৎ ২০২০ খৃস্টাব্দে হবে তারিখ-ই-ইলাহির (২০২০-১৫৫৬) ৪৬৪ সাল। কিন্তু এখন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ। তারিখ-ই-ইলাহী এবং বঙ্গাব্দ দুটোই যদি আকবর চালু করতেন তাহলে বর্ষের সংখ্যাতে মিল থাকা অবশ্যই উচিৎ ছিল। আরও আশ্চর্যের বিষয় তারিখ-ই-ইলাহীর মাসের সাথেও বাংলা মাসের কোন মিল নাই। বাংলায় প্রথম মাস বৈশাখ; সমস্ত ভারতীয় তথা হিন্দু পঞ্জিকাতেই মাসের নামে মিল রয়েছে। যেখানে তারিখ-ই-ইলাহীর প্রথম মাস হল, ‘ফরোয়ার-মাহ্-ই-ইলাহী’। এমনি মাহ্-ই-ইলাহী প্রতিটি মাসের নামেই রয়েছে। একজন বাদশা তার সম্রাজ্যে ইলাহীর নামে মালিকি সাল চালু করবেন আর শুধু বাঙলার জন্য বঙ্গাব্দ চালু করবেন, সে কি হয় ? আকবর তত্ত্বে আরও সমস্যা রয়েছে। আকবর তাঁর সম্রাজকে ১২টি সুবা’তে ভাগ করেন। তার মধ্যে যদি ধরেও নেই একটি সুবার জন্য আলাদ সাল গণনা পদ্ধতির প্রয়োগ করেছিলেন। তাহলেও এই তত্ত্ব মুখ থুবড়ে পড়বে। সুবা-ই-বাঙ্গাল বাস্তবে বাংলা বিহার ও উড়িষ্যা নিয়ে গঠিত ছিল। বিহার বা উড়িষ্যাতে বঙ্গাব্দের প্রচলন ছিল বা আছে এমন কথা কেউ কখনও শুনেছেন ? অতএব তারিখ-ই-ইলাহী এবং বঙ্গাব্দে মাসের নাম, গণনা পদ্ধতি এবং বর্ষ ক্রমাঙ্ক এ সবে কোন মিলই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বরং বিপক্ষেই প্রমাণ মিলছে ভুরি ভুরি।


তবে সংস্কৃতির দখলদাররা এ সবে দমে যাবার পাত্রই নন। পূর্ব পাকিস্তানের নাম বদলে বাংলাদেশ হওয়ার এক দশক পর ক্ষমতায় বসেন হুসেন মোহম্মদ এরশাদ। ক্ষমতায় বসেই তিনি বাঙালির আত্মপরিচয় মুছে দেওয়ার কাজে লেগে পড়েন। ‘বাঙালি’ শব্দে আপত্তি জাহির করে পরিবর্তে ‘বাংলাদেশী’ শব্দের উপর জোর দেন। উদ্যোগ নেন বাংলা বর্ষগণনা বদলানোর। সরকারীভাবে একে ‘পঞ্জিকা সংস্কার’ নাম দেওয়া হলেও মূল লক্ষ্য ছিল বঙ্গাব্দ থেকে আদি ও প্রকৃত বাঙালির শেষ চিণ্হটুকু মুছে ফেলা। তারই অংশ হিসাবে শহীদুল্লাহ্ কমিটির ৪ নং সুপারিশকে মান্যতা দেন রাষ্ট্রপতি এরশাদ। অর্থাৎ ‘বঙ্গাব্দের প্রতিষ্ঠাতা আকবর’ ! কলমের এক খোঁচায় প্রতিষ্ঠা হয়ে গেল এতো বড় ভিত্তিহীন মিথ্যা।


এই নতুন তত্ত্বকে জনপ্রিয় করার বিপুল চেষ্টা হয় বাংলাদেশে। ঐ দেশের সংখ্যাগুরু জনগণ আকবরের ধর্মালম্বী হওয়ায় বিপুলভাবে সমাদৃত হয় এই ভুয়া তত্ত্ব। এরপর ধীরে ধীরে ক্রমাগত চেষ্টা চলে বাঙ্গালীর শেষ আশ্রয় এই পশ্চিমবঙ্গে এই বিষাক্ত ভাইরাস অনুপ্রবিষ্ট করার। পশ্চিমবঙ্গে এই কুতত্ত্ব আমদানির প্রধান নায়ক হলেন অমর্ত্য সেন। যিনি পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু মূষলমানের হাত থেকে বাঁচতে এই পশ্চিমবঙ্গে এসে আশ্রয় নেন। সেখানে থেকে যাওয়া ২২% আদি বাঙালির গণহত্যাকে বলেছিলেন ‘স্বতঃস্ফুর্ত ভূমিসংস্কার’। আনন্দবাজার, Scroll, News 18 বাংলা প্রভৃতি বাম মানসিকতার মিডিয়া গ্রুপ অমর্ত্য সেনের এই আকবর ভক্তির সমর্থনে যোগ দেয়। লক্ষ্য একটাই, বাঙালিকে বোঝানো যে বাঙালির আসলে কোনো কৃতিত্ব নাই ! তার নববর্ষ, সংস্কৃতি, গণনা পদ্ধতি কোন কিছুই তার নিজের নয়।


কোন মানুষের কাছ থেকে তার সম্পদ চুরি করা একটা অপরাধ কিন্তু কোন জাতির কাছ থেকে তাদের সম্পদ কেড়ে নেওয়া আরও বড় অপরাধ। কিন্তু ক্ষমাহীন অপরাধ হল নিজেদের জাতীয় সম্পদ বিনা বাধায় অন্যকে কেড়ে নিতে দেওয়া। সেই ক্ষমাহীন অপরাধ আমরা এতদিন ধরে করে এসেছি। বঙ্গাব্দের ঐতিহ্য অপহরণের এই চক্রান্ত এক দিনে হয়নি, বহু বছর ধরে হয়েছে। একটু একটু করে ওরা এগিয়েছে আর আমরা চোখ দুটোকে বন্ধ করে রেখেছি। অনেক দেরি হয়ে গেছে, আর প্রতিবাদ না করলেই নয়। মহারাজ শশাঙ্ক প্রবর্তিত বঙ্গাব্দের ঐতিহ্য আমাদের; সেই অধিকার সুরক্ষিত রাখার দায়িত্বও আমাদের।


জয় বঙ্গ

বুধবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২২

শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুরের আহবান


নমঃশূদ্রদের প্রতি শ্রীশ্রীহরিগুরুচাদের আহ্বান 

৪ ইংরেজী ১৯০৭ সাল থেকে ১৯১১ সাল পর্যন্ত , বাংলা ১৩১৪ সাল থেকে ১৩১৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ পাঁচ বছর অক্লান্ত কঠোর পরিশ্রম করে ইংরেজ পুরোহিত খৃষ্ট ধর্ম যাজক ড.সি.এস. মীডের সহযোগীতায় বৃটিশ

রাজ অনুকম্পায় গুরুচাঁদ সুদীর্ঘ ছয়শত বৎসরের অস্পৃশ্য চন্ডালত্বের কালিমা যুক্ত পতিত নমঃশূদ্র জাতিকে পাতিত্বের কবল থেকে মুক্ত করে উদাত্ত আহবানের মাধ্যমে জাতিকে বলেছিলেনঃ ( গুরুচাঁদ চরিতের ১৩১ | পৃষ্ঠার বিবৃতিতে )


 “ জাগো নমঃশূদ্র  নহ কেহ ক্ষুদ্র 

কুল ধর্মে গরীয়ান। 

দেখাও জগতে  নমঃশূদ্র হতে 

নাহি কেহ বরীয়ান

আত্ম পরিচয়  মনে নাহি হায়

তাই এত দূর্গাতি ভালে।

 পূর্ব বিবরণ  কররে স্মরণ 

শক্তিতে ওঠরে জ্বলে।

ধর্ম রক্ষা তরে গহণ কান্তারে 

যে জাতি সহিল দুঃখ। 

প্রতাপের সাথে অস্ত্র নিয়ে হাতে 

শতক্র নাশে লক্ষ লক্ষ

জননীর প্রায় যেই জাতি হায় 

ঘরে ঘরে দেয় অন্ন

শুচি শুভ্ৰ প্ৰাণ বালক সমান। 

বরণ করেছে দৈন্য।

দধিচীর মত পরহিতে রত

সুচরিত অতিশয় । 

আত্মভোলা ঋষি প্রান দেয় হাসি

পিছু পানে নাহি চায় ॥

ধর্ম _কর্ম জ্বল নাহি চায়।

 ঢল ঢল চোখে দৃষ্টি ।

 এই নমঃশূদ্ৰ কৃষ্টি ৷৷ 

আঁধার গুহায় সিংহ ঘুমে রয়

দুরন্ত ফেরুর দল ।

সিংহে মৃত ভাবি মিশিয়াছে সবি

 করিতেছে কোলাহল ॥ 

হওরে চেতন কেশর কেতন।

নাচাও সিংহরাজ 

করবে হংকার ধ্বনি ভয়ংকর

নামুক ইন্দ্রের বাজ ॥

ফেরুপাল দলে পদতলে দলে

সম্মুখে রুখিয়া চল ।

নমঃশূদ্র জয় হোক সর্বময়

 ঘরে ঘরে সবে বল ! 

নমঃশূদ্র প্রতি কর্নর মিনতী

আত্মপরিচয় জান । 

জগত সংসারে শ্রীগুরু চাঁদেরে

আপন বলিয়া মান ॥।

তাঁহার মতন কে আছে আপন

এই বিশ্ব ভূমন্ডলে । 

পঞ্চ বর্ষ ধরে বহুক্লেশ করে

নমঃশূদ্র উদ্ধারিলে ৷ 

ছাড়ি ভিন্ন মত অন্য যত পথ

হও সবে আগুয়ান । 

একই ছত্রতলে একই বৃক্ষমূলে

কর সবে অবস্থান | 

আঁধার নাশিবে সুদিন আসিবে

 জ্বলিবে প্রদীপ শিখা ।

 সারা বিশ্ববাসী হহষেতে আসি 

ললাটে পরাবে ' টিকা ' 

কশ্যপ তনয় মহা ত্বেজোময়

 ওহে নমঃশূদ্র গণ ! 

ব্রহ্ম ত্বেজে জ্বলি ওঠ সবে জ্বলি। 

হোক ব্রাহ্মণ দমন 


প্রাণপ্রিয় নমঃশূদ্র ভ্রাতা - ভগ্নিগণ ! আত্মপরিচিতি মানুষের ব্যক্তি | চরিত্রকে যেমন প্রভাবিত করে , জাতীয় চরিত্রকেও তেমনি সঞ্জীবিত রাখে । বল্লালীয় সমাজ ব্যবস্থায় আত্মপরিচয়হীন ব্যক্তি যেমন অপাংক্তেয় | হিসাবে বিবেচিত হয় , আত্মবিস্মৃত জাতিও তেমনি অবজ্ঞাসূচক হীন আখ্যায় আখ্যায়িত হ'য়ে অবহেলিত - ঘূর্ণিত অস্পৃশ্য জাতিতে পরিণত হয় । নমঃশূদ্র জাতি একটি আত্মবিস্মৃত জাতি । আর সেই আত্মবিস্মৃতির | সুযোগ নিয়ে বল্লালীয় চন্ডনীতির ধ্বজাধারীরা নমঃশূদ্র জাতিকে পাতিত্বের নাগ - পাশে আবদ্ধ করে মানবেতর পর্যায়ে রেখেছে । জাতির পিতা গুরুচাঁদ সেই নাগ - পাশ থেকে জাতিকে মুক্ত করেছেন । এখন প্রয়োজন | জাতিকে তার আত্মপরিচিতি সম্পর্কে অবহিত হয়ে ছয়শত বৎসরের | সমস্ত দুর্বলতাকে ঝেড়ে ফেলে অতীৎ ঐতিহ্যের সুপ্ত শক্তিকে জাগানো এবং সেই শক্তির স্ফূরণ ঘটানো । 


স্বয়ং গুরুচাঁদ প্রদত্ত তথ্যানুসারে ফরিদপুর জেলার অন্তর্গত মল্লিকপুর গ্রামের স্বনামধন্য সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিত শ্রীশ্যামাচরণ তর্কালঙ্কারের নিকট সংরক্ষিত অতি প্রাচীন “ শক্তি সঙ্গম তন্ত্র ” নামক সংস্কৃত গ্রন্থের | “ প্ৰাণতোষী ” নামক অধ্যায়ে হর - পার্বতরি কথোপকথনের সিদ্ধান্ত অনুসারে নমঃশূদ্রগণ স্বয়ং ব্রহ্মার বংশধর । ব্রহ্মার পুত্র মরীচি ; মরীচির 


পুত্র মহামুনি কশ্যপ । কশ্যপের ঔরসে ত্বদীয় স্ত্রী প্রধার গর্ভে ' নমস ' মুনির জন্ম । এই ' নমসা মুনির বংশাবলীই ' নমঃশূদ্র ' নামে বিখ্যাত । | এছাড়া দ্রাবিড় জাতির সঙ্গে শিবের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত নিবিড় । শিব ছিলেন দ্রাবিড় জাতির একমাত্র দেবতা । স্বনামধন্য ঐতিহাসিক অনিল চন্দ্র ব্যানার্জী তাঁর " হিষ্টরী অব ইন্ডিয়া " গ্রন্থে দ্রাবিড় সভ্যতা সম্পর্কে বিস্ত ারিত বর্ণনার মধ্যে প্রকাশ করেছেন যে , মহেঞ্জোদারো নগরীর ধ্বংসাবশেষে একমাত্র শিবের মূর্তি পাওয়া গেছে । এর দ্বারা তিনি প্রমাণ করেছেন যে , একমাত্র শিবই ছিলেন দ্রাবিড় জাতির উপাস্য দেবতা । ব্রহ্মপুরাণে স্বয়ং ব্রহ্মাও শিবের প্রাধান্য দিয়েছেন । ব্রহ্মা শিবকে দেবাদিদেব মহাদেব ' নামে আখ্যায়িত করেছেন । নমঃশূদ্র জাতির পূর্ব পুরুষ স্বয়ং ব্রহ্মা কর্তৃক বরিত ' শিব'ই শ্রীশ্রীগুরুচাদ ; আর পৃথিবীর আদি সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক সেই দ্রাবিড় জাতির উত্তর সূরী নমঃশূদ্র জাতি । গুরুচাদ চরিতের ১৭৪ পৃষ্ঠায় গুরুচাদ তাই বলেছেনঃ 


“ পতিত তারিতে এসেছিল মোর পিতা । 

অন্যথা নাহি হবে তার কোন কথা ॥ 

আজ যারা পদতলে পড়িছে কাঁদিয়া ।

 হরিচাঁদ পরশেতে উঠিবে জাগিয়া ॥ 

অব্যর্থ অমোঘ শক্তি দিয়েছেন তিনি ।

 নিশ্চয় জাগিবে যত পতিত পরানী ॥ 


হে আমার ভাগ্য বিড়ম্বিত নমঃশূদ্র ভ্রাতা - ভাগ্নিগণ ! এতক্ষণে নিশ্চয়ই অনুধাবন করতে পেরেছে যে , আমরা স্বয়ং ব্রহ্মার বংশধর এবং বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সুসভ্য দ্রাবিড় জাতির উত্তরসূরী । কিন্তু মানব জাতির মধ্যে | সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হয়েও আমরা অস্পৃশ্য অপাংক্তেয় ছিলাম । শিক্ষা , দীক্ষা , ধর্মে , কর্মে আমাদের কোন অধিকার ছিলনা । আমাদের কোন ভগবানও ছিলনা । কোন শাস্ত্র - গ্রন্থে আমাদের নাম গন্ধও নেই । অথচ আমরা স্বয়ং | ব্রহ্মার বংশধর , স্বয়ং শিবের উপাসক । ব্রহ্মত্বেজ আমাদের শিরায় শিরায় প্রবাহিত । শিব শক্তিতে আমরা শক্তিমান । তাইতো সর্বশক্তিমান শ্রীহরি আমাদের ঘরেই আবির্ভূত হয়েছেন । ব্রাহ্মণ্যবাদী দানবকে ধ্বংস করার স্বরহরি জগতে আসলেন কেন ? ২৫৩ জন্য প্রলয়ের অধিকর্তা মহাকাল শিবকে পুত্র রূপে আকর্ষণ করে । এনেছেন । জীবের কৈবল্য সিদ্ধি প্রদ সূক্ষ্ম সনাতন ধর্মের উদ্ভুতি আমাদের ঘরেই হয়েছে । আমাদের ঘরে ঘরে আজ শিক্ষার আলো জ্বলছে । কত গুণী , জ্ঞানী , কবি , সাহিত্যিক , গবেষক , দার্শনিক , ডাক্তার , ইঞ্জিনীয়ার , উকিল , ব্যারিষ্টার , সাধক , মহাসাধকের আবির্ভাব ঘটেছে । অতএব , আমরা এখন কি ভাবতে পারি না যে , আমরাই বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি । হে আমার প্রাণপ্রিয় ভ্রাতাভগ্নি গণ ! আখি মেলে চেয়ে দেখ , দ্রাবিড় জাতির সেই সভ্যতার সমাজ - কুঞ্জ মুষ্টিমেয় কয়েকজন | পান্ডা - পুরোহিতের করতলগত । ভন্ড তপস্বীর বেশে কোটি কোটি মানুষের উপর তারা নরক - রাজ্য স্থাপন করেছে । সামাজিক , রাজনৈতিক , অর্থনৈতিক , আধ্যাত্মিক সর্বক্ষেত্রে তারা প্রভৃত্বের আসন সৃষ্টি করে কোটি কোটি নর - নারীকে শোষন ও শাসন করছে । মিথ্যার এই পাপ - রাজ্যকে ধ্বংস করার জন্য নর - নারী মিলিত হয়ে বিপ্লবের আন্দোলন গড়ে তোল । ভন্ডামী , অন্যায় ও অত্যাচারের উদ্ধত মস্তক ধূলায় লুন্ঠিত করে দাও । | ব্রাহ্মণ্যবাদী শাস্ত্র - গ্রন্থ গঙ্গাজলে বিসর্জন দাও । মনে রেখো ভীরুতাই কাপুরুষের চিহ্ন । গুরুচাঁদ চরিতের ৫৯৭ পৃষ্ঠায় গুরুচাঁদ বলেছেনঃ 


“ ভীরু কাপুরুষের মত কেন কথা কও । 

সিংহ শিশু হয়ে কেন ভেড়া বনে যাও ॥ 

মোদের সহায় আছে আপনি শ্রীহরি । 

এ বিশ্ব জগতে মোরা কারে ভয় করি ॥ ”

শুক্রবার, ১ এপ্রিল, ২০২২

বাংলা ভাগের নেপথ্যে কে?

 বাংলা ভাগের  নেপথ্য ইতিহাস 

তথ্য সূত্রঃ শ্রদ্ধেয় জগদীশ চন্দ্র মণ্ডল, কোলকাতা-৭০০১৫২

"১৯৩৭ সালের সাধারণ নির্বাচনের পরে যখন কংগ্রেস দল বাংলা সহ সকল প্রদেশেই মন্ত্রী সভা গঠনে অস্বীকৃত হইলেন তখন বাংলার দ্বিতীয় সংখ্যা গরিষ্ঠ " কৃষক প্রজা " দলের নেতা মৌলবী এ কে ফজলুল হক তৃতীয় সংখ্যা গরিষ্ঠ লীগ দলের নেতা খাজা স্যার নাজিমুদ্দিনের সহিত কোয়ালিশন মন্ত্রীসভা গঠন করেন। ইহার এক বছর পরেই মৌলবী এ কে ফজলুল হক লীগ দলে যোগদান করেন এবং বাংলার মন্ত্রীসভা কার্যত লীগ মন্ত্রীসভায় পরিণত হয়। ১৯৪০ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া লীগের সাধারণ কনফারেন্সে বাংলার লীগের প্রতিনিধিগণ  ফজলুল হক সাহেবের নেতৃত্বে পত্রপুষ্পে শোভিত একখানি স্পেসাল ট্রেনে লাহোর গমন করেন। লাহোরের লীগ কাউন্সিল অধিবেশনে পাকিস্তান প্রস্তাব রূপে যে প্রস্তাব গৃহীত হয় সেই প্রস্তাবটি বাংলার ফজলুল হক সাহেবই উত্থাপন করেন। সম্মেলন অন্তে অনুরূপ সজ্জিত স্পেশাল ট্রেনে "শেরে বাঙ্গাল জিন্দাবাদ" ধ্বনি দ্বারা অভি নন্দিত হইয়া হক সাহেব বাংলায় প্রত্যাবর্তন করেন। তখন তিনি বাংলার প্রধান মন্ত্রী। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় এই যে, পাকিস্তান প্রস্তাবের প্রস্তাবক হওয়া সত্বেও বাংলাদেশে হক সাহেবের বিরুদ্ধে কোন প্রতিক্রিয়া দেখা দিল না। তাঁহার মন্ত্রীসভায় যে সব হিন্দু মন্ত্রীগণ ছিলেন - যথা নলিনী রঞ্জন সরকার, স্যার বিজয় প্রাসাদ সিংহ রায়, কাসিম বাজারের মহারাজা শ্রীশচন্দ্র নন্দী, প্রসন্ন দেব রায়কত এবং মুকুন্দ বিহারী মল্লিক,তাহেদের কেহই পদত্যাগ করিলেন না। কোথা হইতেও কোনরূপ প্রতিবাদ ধ্বনিত হইল না।“ ( আমার দু-চারটি কথা, শ্রী যো গেন্দ্রনাথ মণ্ডল)  

যে ফজলুল হক বাংলা ভাগের প্রবক্তা, তাকেই সমর্থন করে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিরা দ্বিতীয়বার মন্ত্রীসভা গঠন করেন। যদিও বিরোধীদের অনাস্থা প্রস্তাবে সেই মন্ত্রীসভাও ভেঙে যায়। তপশীল জাতির অধিকংশ এমএলএ দের নিয়ে মহাপ্রান যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল এই অনাস্থা প্রস্তাব সমর্থন করেন। এই অনাস্থা প্রস্তাবের পর যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল দাবী করেন যে যারা তাদের দাবী মেনে নেবেন তাদেরকেই তাঁরা সমর্থন জানাবেন।

এই দাবীগুলি হল ঃ

১) তপশীল এম এল এ দের মধ্যে ৩ জন মন্ত্রী ও ৩ জন পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি নিযুক্ত করতে হবে।

২) তপশীল জাতির শিক্ষার জন্য প্রতিবছর ৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করতে হবে।

৩) সরকারী চাকরীতে জাতির ভাগিদারী পুরোপুরি মেনে নিতে হবে এবং

৪) উচ্চ পদের সরকারি চাকরিতে তপশীল জাতির প্রার্থী গ্রহণ করতে হবে।

হক সাহেব এই দাবী গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন । নাজিমুদ্দিন দাবীগুলি মেনে নেয়। তপশীল জাতির ২২ জন এম এল এ নাজিমুদ্দিনকে সমর্থন করায় তিনি ১৯৪৩ সালে মন্ত্রীসভা গঠন করেন। এই মন্ত্রীসভাকে আরো ৫ জন হিন্দু নেতা সমর্থন করেন এবং মন্ত্রিত্ব অর্জন করেন।

তারা হলেনঃ

১)তুলসী চরণ গোস্বামী,

২)হাওড়ার কংগ্রেস নেতা বরদা প্রসন্ন পাইন,

৩)উত্তর পাড়ার বিক্ষাত জমিদার তারক নাথ মুখার্জি,

৪)প্রেম হরি বর্মা ও

৫)পুলীন বিহারী মল্লিক।

এছাড়াও এই মন্ত্রীসভার আরো ৬ জন হিন্দু পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি ছিলেন।

তারা হলেনঃ

১) পাবনার নরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তী

২) জে এন গুপ্ত (নেতাজী সুভাষের জীবনী রচয়িতা)

৩) রংপুরের যতীন্দ্র চক্রবর্তী

৪) রায় বাহাদুর অনুকুল চন্দ্র দাস

৫) আসানসোলের বঙ্কু বিহারী মণ্ডল ও

৬) যশোরের রসিকলাল বিশ্বাস

যোগেন্দ্রনাথে যুক্তি ছিল যে, তপশীল জাতির অধিকাংশ মানুষ গরীব। তারা কৃষক ও শ্রমিক। শিক্ষা দীক্ষায় অনগ্রসর। মুসলমানদের অধিকাংশ তাই। এই মন্ত্রীসভা দ্বারা অনগ্রসর মানুষের কল্যাণ সাধিত হবে। উল্লেখ করা দরকার যে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল এই মন্ত্রী সভার সদস্য ছিলেন না। কিন্তু তার এই ভাগীদারী মডেল যে পরবর্তীকালে সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়ণের এক বৃহত্তম নিদর্শন হয়ে উঠবে তা সবর্ণ সমাজের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। তারা বুঝতে পারেন যে এই মডেল কার্যকরী থাকলে সবর্ণ সমাজ তাদের কৌলীন্য হারাবে এবং কোনদিনই ক্ষমতার শীর্ষ পদটি দখল করতে পারবে না।

শ্যামাপ্রসাদ ফজলুল হককে এবং মুসলিম লীগকে সমর্থনের পেছনে ছিল বাংলার জমিদারদের সমর্থন।

তারা ফজলুল হককে সামনে রেখে তাদের হাতে নিয়ন্ত্রণ রাখতে চেয়েছিলেন। এই সময় সবর্ণ সমাজের জমিদারেরা ছিলেন কংগ্রেস পার্টির প্রত্যক্ষ সমর্থক।

কিন্তু নাজিমুদ্দিন ও পরবর্তী কালে সোহরাবর্দী বাংলার প্রধানমন্ত্রী হলে তাদের সেই প্রচেষ্টা মার খেয়ে যায়। সক্রিয় হয়ে ওঠে হিন্দু মহাসভা ও কট্টর পন্থী মুসলিম লীগ। লীগ ১৯ জুলাই ১৯৪৬ সালে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম প্রস্তাব গ্রহণ করে। ১৬ আগস্ট ১৯৪৬ বিক্ষোভ প্রদর্শনের দিন ধার্য করা হয়। ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টিও মুসলিম লীগকে সমর্থন করে।

এই সময় ভারতীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও আইনসভায় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে "সম্মানের সাথে" ক্ষমতার হস্তান্তর বিষয়টি আলোচনা করার জন্য ক্যাবিনেট মিশন ভারতে আসে। দুইটি যুযুধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে শুরু হয় ভাগ বাটোয়ারার হিসেব নিকেশ। ইংরেজরা কংগ্রেসের হাতে ক্ষমতার ভার দিয়ে যাবার প্রস্তাব দিলে জিন্না বেঁকে বসে। ১৯৪৬ সালে দিল্লীতে মুসলিম লীগের সম্মেলনে জিন্না ফজলুল হকের দেখানো পথে পাকিস্তান রাষ্ট্রের দাবী তোলেন। এই সুযোগে কংগ্রেস ভারতের কয়েকটি বিশেষ প্রদেশের বিভাগের জন্য দাবী তুলতে শুরু করে। এই বিভাগের প্রশ্নে কংগ্রেস বাংলা ও পাঞ্জাবের উপর বেশি গুরুত্ব দেয়। করাণ আইন সভার নির্বাচনে এই দুটি প্রদেশ থেকে তারা প্রায় নির্মূল হয়ে গিয়েছিল।

১৯৪৭ সালের ২০শে জুন বাংলা ভাগের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। এই সভায় কংগ্রেসের হিন্দু সদস্যগণ বাংলা ভাগের পক্ষে কিন্তু মুসলমান সদস্যরা বাংলা ভাগের বিপক্ষে ভোট দেয়। যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের নেতৃত্বে তপশীল জাতি ফেডারেশন বাংলা বিভাগের পূর্নত বিরোধিতা করে। তখন তিনি অন্তর্রর্তী কালীন ভারতবর্ষের আইন মন্ত্রী। ১৯৪৭ সালের ২৩শে এপ্রিল হিন্দুস্থান টাইমসে একটি পূর্ণ বয়ান দিয়ে তিনি জানান যে, তপশীল জাতি বাংলা বিভাগের সম্পূর্ণ বিরোধী।

জিন্না কিন্তু বাংলা ভাগের বিরোধী ছিলেন। বড়লাটকে একটি চিঠি দিয়ে তিনি বাংলা ও পাঞ্জাব ঐক্য না ভাঙার কথাই বলেন। তিনি জানান যে, বাংলা ও পাঞ্জাবের একটি সাধারণ চরিত্র আছে, যা এদের কংগ্রেসের সদস্য হওয়ার থেকেও অনেক বেশি। তিনি আরো জানান যে, এরা নিজেরাই ঠিক করুক তারা কোন গ্রুপে থাকবে। ২৬শে এপ্রিল জিন্না মাউন্ট ব্যাটেন কে বলেছিলেন যে, তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হবেন যদি বাংলা ঐক্যবদ্ধ ভাবে স্বাধীন রাষ্ট্র হয়।

এই সময় অবিভক্ত বাংলার নেতৃত্ব দেন শরৎচন্দ্র বসু। তিনি তখন বাংলা কংগ্রেসের সভাপতি হলেও কার্যত তার হাতে কোন ক্ষমতা ছিলনা। তার চেষ্টায় ফজলুল হকের নেতৃত্বে একটি কোয়ালিশন সরকার গঠন হয়। জহরলাল নেহেরু, সরদার প্যাটেল সহ কংগ্রেসের নেতৃবর্গ বুঝতে পারেন যে শরৎচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে বাঙালী অবিভক্ত বাংলার পক্ষেই রায় দেবে। শুরু হয় চক্রান্ত।  কংগ্রেসি চক্রান্তেই তাকে জেলে যেতে হয় শরৎচন্দ্র বসুকে। জেল থেকে বেরিয়ে তিনি কংগ্রেস থেকে ইস্তফা দেন এবং সার্বভৌম বাংলা গড়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। শরৎচন্দ্র বসু মহাপ্রাণকে তপশীল জাতির নেতা হিসেবে গ্রহণ করেন। 

বাংলা বিভাগের পক্ষে সক্রিয় হয়ে ওঠে সংবাদ মাধ্যগুলি।  অমৃতবাজার পত্রিকা বাংলা ভাগের পক্ষে জনমত গঠন করতে সক্রিয় হয়। তারা জানায় যে, বাংলার ৯৮.৬ শতাংশ মানুষ দেশভাগ চাইছে, এটা নাকি তারা একটি ওপিনিয়ন পোল করে সংগ্রহ করেছে। পার্টিশান লীগের পক্ষ থেকে পশ্চিম বাংলাকে আলাদা করে তাকে  ভারত রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করার উপরে ব্যপক প্রচার শুরু হয়। এই বিভাগে এগিয়ে আসে মাড়োয়ারি ব্যবসাদার, বিড়লা,গোয়েঙ্কা, ঈশ্বর দাস জালান। তারা প্রচুর পরিমাণে অর্থ ঢালতে শুরু করে দেশ বিভাগের পক্ষে কারণ এই বিভাগে তারাই সবথকে বেশি লাভবান হবেন। তাদের পয়সা দিয়েই তখন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি, বিধান রায়, এন সি চ্যাটার্জিদের আন্দোলন চলে। ৪ এপ্রিল ১৯৪৭ সালে, তারকেশ্বরে হিন্দু মহাসভার একটি সম্মেলনে এন সি চ্যাটার্জি বলেন,"বিষয়টা আর দেশভাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বাংলার হিন্দুরা আলাদা প্রদেশ গড়ে শক্তিশালী দিল্লী কেন্দ্রিক জাতীয় সরকারের অধীনে থকাবে। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি একই সুরে বলেন যে, দেশ ভাগই সাম্প্রদায়িক সমস্যার একমাত্র সমাধান।

অবিভক্ত বাংলার আমৃত্যু উপাসক ছিলে যোগেন্দ্র নাথ মণ্ডল। শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত চেয়েছিলেন অবিভক্ত বাংলা এবং জাতির মঙ্গল। আজকের ইতিহাসে তিনি উপেক্ষিত।নানা কদর্য ভাষায় তার উপর আক্রমণ শানিত হচ্ছে। যে ব্রাহ্মণবাদী এবং কট্টর ইসলামপন্থীরা বাংলা ভাগের জন্য দায়ী তারাই আজ মহাপ্রান যোগেন্দ্র নাথের উপরে দেশ ভাগের দায় চাপাতে তৎপর। 

সংগ্রামী অভিনন্দন সহ 

শরদিন্দু উদ্দীপন