বৃহস্পতিবার, ৩১ মার্চ, ২০২২

অজানা তথ্য অশ্বিনী গোসাই

 জয় হরি চাঁদ,

 ভাবুক কবি শ্রী অশ্বিনী গোসাইয়ের নাতির মেয়ে মধ্য আন্দামানের টোগাপুর গ্রামে আছেন। গত দু-দিন আগে বারুনির আগে সেই মায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে। তার মুখে শ্রী আশ্বিনী গোসাইযের অনেক অজান তথ্য শুনলাম এবং তা কাগজে কিছু লিপিবদ্ধ করে নিলাম। 

শ্রী আশ্বিনী গোসাইয়ের তিন সন্তান ছিল।

প্রথম কন্যা তার নাম ছিল বিমলা, দুটি পুত্র সন্তান ছিল মেজ শ্রী কালিদাস এবং শ্রী অমুল্য। কালিদাস মহাশয় খুব কম বয়সে মারা গিয়েছিলেন।

শ্রীমতি বিমলা দেবীর বিবাহ হয় শ্রী হরিবর বিশ্বাস মহাশয়ের সঙ্গে। বিমলার দুটি সন্তান  প্রথম শ্রী নরেন বিশ্বাস ( আশ্বিনীর নাতি), মেয়ে সুচিত্রা দেবি ছিলেন। 

শ্রী নরেন গোসাই( বিশ্বাস) মধ্য আন্দামানের    বিল্লিগ্রাউন্ড এ পুনর্বাসন পেয়েছিলেন। শ্রী নরেন গোসাইযের পাঁচ মেয়ে ছিল। তারা সুনীতি, সুরিতি, বিজয়া, বিনা, লক্ষী এবং এক ছেলে শ্রী মহানন্দ বিশ্বাস। শ্রী নরেন গোসাইয়ের তৃতীয় কন্যা শ্রীমতি  বিজয়ার সঙ্গে আমার সাক্ষাত হয়েছে এ বছর মহা বারুনীর দু-দিন পূর্বে । বর্তমানে আন্দামাণ নিকোবর দ্বীপের মতুয়া ধর্ম প্রচারক শ্রী হরি দাস বিশ্বাস(শ্রীমৎ গোপাল মহারাজ/ গোঁসাই অন্তরঙ্গ শিষ্য পুত্র) সঙ্গে শ্রী বিমলা দেবীর বিবাহ হয়, যার টোগাপুর বাড়িতে প্রতি বছর মহা-বারুনীর অনুস্ঠাণ হয়ে থাকে। সেখানে প্রত্যেক বছর হাজার হাজার ভক্তের সমাগম ঘটে। এ বছর ও বহু ভক্ত সমাবেশ ঘটে ছিল। ভক্তি মতি শ্রীমতি বিজয়ার সঙ্গে অনেক কথপোকথনে শ্রী আশ্বিনী গোসাইয়ের অনেক অজানা তথ্য জেনে তা ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য লিপিবদ্ধ করলাম। অনেক আনন্দ এবং মনে ভক্তির সঞ্চয় হলো। 

জয় হরিবল।

শুক্রবার, ৪ মার্চ, ২০২২

নমশুদ্র সম্মেলনে বিশ্বকবি।

 নম:শুদ্র সম্মেলনে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর:


1913 সালে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হন। এশিয়ার মধ্যে তিনিই প্রথম কবি যিনি এই সম্মানে ভূষিত হন। এই স্বীকৃতি পাওয়ার 13 বছর পর 1926 সালে তিনি তৎকালীন পূর্ববঙ্গ বর্তমানে বাংলাদেশ সফরে যান তখন ওনার বয়স ছিল 65 বছর। সম্ভবত এটাই ছিল তাঁর শেষ পূর্ববঙ্গ সফর। ঢাকা-ময়মনসিংহ হয়ে তিনি কুমিল্লায় পৌঁছান সেখানে তিনি 22 শে ফেব্রুয়ারি 1926 নমঃশূদ্র সম্মেলনে যোগ দেন।সম্মেলনটি ডা: সুরেশ চন্দ্র ব্যানার্জীর  "অভয় আশ্রমে" অনুষ্ঠিত  হয়েছিল। 96 বছর আগের এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি কেউ স্মরণ করেনি কারণ পাছে কেউ স্মরণ করে এবং এই তথ্য সাধারণ ও অভাজনদের চমকৃত এবং অভিভূত করে ফেলে তাই বাঙালির স্মৃতি থেকে একেবারে মুছে ফেলার পাকাপাকি ব্যবস্থা করা হয়েছে।  এই কুকর্মটি যারা করেছেন তারা হলেন সমাজের উচুতলার অভিজাত শ্রেণীর মানুষ এবং যারা দেশের সর্বাঙ্গীণ প্রগতির কাটা। 


বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত বাংলার ব্রাহ্মণ,বৈদ্য, কায়স্থগণ ধুমধাম করে স্বজাতি সম্মেলন  করতেন। উঁচু জাতের গণ্যমান্য ব্যক্তি এই স্বজাতি সম্মেলনে যোগদান করতেন কিন্তু কবি অন্য কোন জাতের সম্মেলনে যোগদান করেছেন কিনা তা জানা যায়নি। প্রথম বাঙালি নোবেল জয়ী অস্পৃশ্যদের সম্মেলনে গিয়ে  সম্মেলন এবং আয়োজকদের এক আলাদা মর্যাদা প্রদান করেছিলেন তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই । নমঃশূদ্র দের প্রতি কবির এই উদার ও অকপট মানবিক ব্যবহার সমাজের স্বার্থান্বেষী, ছিদ্রান্বেষী বাঙালি বুদ্ধিজীবীগণ সরল ও প্রসন্ন  মনে গ্রহণ করেননি। 

তিনি নম:শুদ্র সম্পর্কে বক্তৃতায় বলেছিলেন : 

"নমঃশূদ্রের প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করিয়া হিন্দুরা দুর্বল হইতেছে"। নমঃশূদ্র সমাজ হিন্দু জাতির একটি প্রয়োজনীয় অংশ। এই কথা মনে করিয়া তাহাদের প্রতি সহানুভূতিপরায়ণ হওয়া হিন্দু সমাজের কর্তব্য। উপসংহারে কবি বলেন -দেশের প্রতি আপনাদের যে কর্তব্য  রহিয়াছে সাধুতা ও আন্তরিকতার সহিত সেই কর্তব্য উদযাপন করিতে চেষ্টিত হউন, তাহা হইলে দেশের মুক্তির পথ প্রশস্ত হইবে।


" নমঃশূদ্রদের প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করিয়া হিন্দুরা দুর্বল হইতেছে" কবির এই কথাটি শুধু সত্য নয় অতি গুরুত্বপূর্ণ। 1921 সালের আদমশুমারিতে বাংলায় হিন্দুর সংখ্যা ছিল 20809148 জন। তারমধ্যে নমঃশূদ্র 2006259জন,  রাজবংশী 1727111 জন, ব্রাহ্মণ 1307539 জন, কায়স্থ 1297736 জন এবং  বৈদ্য 102931 জন ছিল। অর্থাৎ নমঃশূদ্র পূর্ববাংলার হিন্দুদের মধ্যে 9.6%। আর ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য মিলে 13%। নমঃশূদ্র দের এই বিরাট সংখ্যককে শুধু উপেক্ষা করা হয়নি জাতবর্ণ ব্যবস্থার কারণে তারা নিরন্তর অত্যাচার, অপমান, বৈষম্য ও নিগ্রহের শিকার হয়েছে। সবর্ণদের ভাষায় ও দৃষ্টিতে তারা "ছোটজাতের" মানুষ "বাজেলোক" বলে গণ্য হয়েছে। তাদের প্রতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহমর্মিতা ও উদ্বেগ অভিজাত সমাজ সুনজরে দেখেনি। তাইতো তাকে পুরীর জগন্নাথ মন্দির প্রবেশে বাধা দিয়েছিলেন। সংবেদনশীল মনের যে জালানা কবি বাংলার অস্পৃশ্যদের সামনে উন্মোচিত করেছিলেন সেকথা বিশ্ববাসী জানতেই পারলেন  না। সংবাদপত্র মাধ্যম মৌনতা পালন করেছিলেন। তা সত্ত্বেও একটি সংবাদ মাধ্যম সেদিন নিচের তথ্য টুকু মাত্র পরিবেশন করেছিলেন :

"গত 19 শে ফেব্রুয়ারি শুক্রবার রাত্রে রবীন্দ্রনাথ সদলবলে কুমিল্লা পৌঁছান। তাহার শরীর অসুস্থ থাকায় স্টেশনে তাহাকে কোন বিপুল অভ্যর্থনা  দেওয়া হয়নি।....... কবিকে মোটরে করিয়া "অভয় আশ্রমে"  আনা হয়। কবির সঙ্গে ছিলেন শ্রীযুক্ত রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তাহার পত্নী ও কন্যা, শ্রীযুক্ত দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, শ্রীযুক্ত কালীমোহন ঘোষ, শ্রীযুক্ত মরিস।


অভয় আশ্রমে অনুষ্ঠিত বার্ষিক নম:শুদ্র সম্মেলনের যে খবর পরিবেশন করেছিলেন  তা হল - 22 শে ফেব্রুয়ারি সোমবার বৈকালে শ্রীযুক্ত সুরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের  "অভয় আশ্রমে" নমঃশূদ্র সম্মেলনের অধিবেশন বসিয়াছিল। ঢাকা, ফরিদপুর, খুলনা, যশোর, নোয়াখালী প্রভৃতি স্থান হইতে প্রতিনিধিগণ আসিয়াছিলেন। সভায় নমঃশূদ্র সমাজের হিতকর অনেক কথা আলোচনা হয়। কয়েকজন নম:শুদ্র মহিলা ইহাতে যোগদান করিয়াছিল। 


কবির তিরোধানের পর 1941সালের 3 সেপ্টেম্বর কলিকাতা কর্পোরেশন কর্তৃক প্রকাশিত গেজেটের বিশেষ স্মারক সংখ্যায় Rabindranath Tagore  attended  the Namasudra (Depressed classes) conference. এইটুকু উল্লেখ আছে।


কেন তিনি  বাংলার এক বিশাল অভাজন, অনাদৃত শ্রেণীর ডাকে তাদের পাশের ছুটে গিয়েছিলেন?  অনাবিল সরলতায় সবকিছু তিনি হয়তো ওই সভায় তাদের বলেছিলেন। সেই কথার কোন সংকলিত  ভাষ্য  আমাদের পর্যন্ত পৌঁছায়নি। শিক্ষিত শ্রেণীর মানবিক দীনতার কারণেই এই অপুরণীয় ক্ষতি।এটি  ইতিহাসের একটি লজ্জা, বাঙালি সমাজের কলঙ্ক। জানিনা এটা কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে হেয় করতে, না নমঃশূদ্রের প্রতি উঁচু জাতের হিন্দুদের চির লালিত ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ?  এর উত্তর দেবে কে?


সূত্র : ১) শ্রী অতুল কৃষ্ণ বিশ্বাস  প্রাক্তন IAS

প্রাক্তন উপাচার্য - বাবাসাহেব ভীম রাও আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয়।

২) A.K.Biswas

3) Census 1921

4) Calcutta Municipal gazette 

5) Mainstream Patika.