শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরের দেখানো ‘প্রশস্ত গার্হস্থ্য ধর্ম’ই দেখাবে জাতিকে সঠিক উন্নতির পথ--------
শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর উনবিংশ শতাব্দীর সমাজ বিপ্লবে এক মহাপ্লাবনের নাম । গার্হস্থ্য জীবন’কে কেন্দ্র করে এবং ‘এক ও অভিন্ন’ ধর্মীও সত্ত্বার মাধ্যমে যেখানে ধর্মের ভিন্ন ভিন্ন মতের বেড়াজাল ও ভেদাভেদ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় । সংক্ষিপ্ত আলোচনার প্রারম্ভে ধর্ম ও ধর্মমত বিষয়ে আমাদের পরিস্কার ধারণার জন্য উদাহরণ স্বরূপ কিছু কথা দিয়ে শুরু করা হল ।
পৃথিবীর কোটি-কোটি প্রজাতির জীবের মধ্যে আমরা মনুষ্য প্রজাতি একটা । বুদ্ধিমত্তা ও বিবেকের প্রয়োগে আমরা শ্রেষ্ঠ ও অন্যান্য জীবের উপর প্রভুত্ব বজায় রেখে চলেছি । ১) খেয়ে-পরে সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকাই আমাদের ধর্ম । ২) স্থান-কাল ভেদে যার প্রণালীগত পার্থক্য তৈরী হয় । এখন, ১) খেয়ে-পরে সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকা যা আমাদের Basic needs----‘ধর্ম’-এর সাথে তুলনীয় । ২) স্থান-কাল ভেদে প্রণালীগত পার্থক্য-----অর্থাৎ কি খেয়ে বাঁচবে বা কি প্রকারে খাবে------যা ‘ধর্মমত’ এর সাথে তুলনীয় এবং পরিবেশ-জলবায়ু-স্থান-কাল বা শর্ত সাপেক্ষ ।
সুতরাং, ‘ধর্ম’ এক ও অভিন্ন যেখানে বাহ্যিক উপাচারকে প্রাধান্য দেওয়া হয় না । কিন্তু ধর্মমতে বাহ্যিক উপাচার থাকবেই । আমরা বেশিরভাগ মানুষ কিছু বিশেষ নিয়ম-কানুনের মধ্যে দিয়ে ধর্মের পালন করা বুঝে থাকি । যেমন মন্দির, মসজিদ, গির্জা বা মঠে যেতে হবে । সেখানকার বিধি অনুযায়ী পূজা, প্রার্থনা বা ধ্যান করতে হবে বা বিশেষ পোষাক পরিহিত হতে হবে ইত্যাদি । বাকী সময় কিভাবে জীবন অতিবাহিত করলাম সেদিকে ফিরে তাকাবার সময় আমাদের থাকে না ! বলা যায়, ভিন্ন ভিন্ন বাহ্যিক উপাচার বা সাধন ভজনের নিয়ম-কানুন ‘এক ও অভিন্ন’ ধর্মীয় সত্ত্বার ভিন্ন ভিন্ন ‘মত’ সৃষ্টির কারণ । ধর্মের পথ ধরে থাকতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন নিজেকে সৎ ও শুদ্ধ মানুষ হিসাবে গড়ে তোলা । অখন্ড ভারতবর্ষে যা সর্বপ্রথম দেখিয়েছেন শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর । তিনি বলেছেন----
গৃহধর্ম রক্ষা করি বাক্য সত্য কয় ।
বানপ্রস্থী পরমহংস তার তুল্য নয় ।।
বর্তমান যুগে যার প্রাথমিক কিছু শর্ত হ’ল শিক্ষা, সু-স্বাস্থ্য, সত্য কথা বলা, চরিত্র গঠন করা ইত্যাদি । যার মূল কেন্দ্র কোনো মন্দির, মসজিদ, গির্জা বা মঠ নয় । যে শিক্ষা কোনো বিশেষ ধর্মগুরু দেয় না । এ-শিক্ষার সূত্রপাত পবিত্র গৃহ হ’তে । যেখানে প্রাথমিক শিক্ষাগুরু হলেন আমাদের মাতা-পিতা । তাই পিতা-মাতা বা স্বামী-স্ত্রী’র সম্পর্কের উপর বিশেষ যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন । কারণ স্বামী-স্ত্রী’র মানসিকতা ও সম্পর্কের উপর সন্তানের মানসিক গঠন অনেকাংশে নির্ভর করে । তাহলে একথা বলা যায়, সর্বধর্মের মূল কেন্দ্র হ’ল আমাদের গৃহ । প্রশস্থ গার্হস্থ্য ধর্ম পালনের মধ্য দিয়ে শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর যা হাতে ধরে শিক্ষা দিয়েছেন । ‘একনারী ব্রহ্মচারী’ কথাটি সর্বপ্রথম তাঁরই কন্ঠে ধ্বনিত হয় । তিনি আরও বলেছেন-----
পরনারী মাতৃতুল্য মিথ্যা নাহি কবে ।
পরদুঃখে দুঃখী সদা সদ্চরিত্র রবে ।।
লক্ষ লক্ষ বিপথগামী মানুষ তাঁর দেখানো পথে খুঁজে পেয়েছেন ধর্মের সঠিক পথ । যা কোনো বন-জঙ্গল, পাহাড়, মন্দির, মসজিদ বা তীর্থস্থানে গিয়ে দেখাতে হয় না । কারণ, ধর্ম দেখাবার বস্তু নয়, ধর্মের পালন করতে হয় প্রতি ক্ষণে নিজের আচার-আচরণে, নিজের কৃত-কর্মের মধ্যে দিয়ে । সত্যের পথযাত্রী ঠাকুর হরিচাঁদ তাইতো বলেছেন-----
যত যত তীর্থ আছে অবনী মাঝারে ।
সত্য বাক্য সমকক্ষ না হয়তে পারে ।।
ধর্ম এক এবং অদ্বীতিয়----যার সৃষ্টি বা ধ্বংস নাই । যা যুক্তি ও মানবতাবাদের মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করতে হয় । ‘ধর্মমত’-এর কাজ হ’ল ব্যক্তি’কে ‘ধর্ম’ চিনতে সাহায্য করা, যাতে সে সঠিক উন্নতির পথে চলতে পারে । যে ‘ধর্মমত’ তা করার ক্ষমতা রাখে না তেমন ধর্মমত’কে বর্জন করাই শ্রেয় ও মঙ্গলদায়ক । ‘ধর্মে’র চেয়ে ‘ধর্মমত’ কখনোই মহান হ’তে পারে না । যে ‘ধর্মমতে’র নিয়ম-রীতির বেড়াজালে হারিয়ে যায় মানুষের মনুষ্যত্ব, যার বেড়াজালের চক্রবূহ্য ভেদ করতে সারাজীবন পার হয়ে যায় ! সেখানে তো ধর্ম মৃত ! তাহলে ধর্মের পালন হবে কিভাবে ? এককথায় হবে না । কারণ ধর্ম’কে না চিনলে ধর্মের পালন করা যায় না । মানুষ যাতে সহজেই ধর্মের পালন করতে পারে শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর তাই শিখিয়েছেন সহজ সরল গৃহধর্ম । দেখিয়েছেন কিভাবে গৃহে থেকে ব্রহ্মচর্য, বানপ্রস্থ্য, সন্ন্যাস নীতি পালন করতে হয় । কিভাবে সুন্দর গৃহ তথা সমাজ গঠনের মধ্য দিয়ে ধর্মের প্রকাশ করা যায় । সর্বোপরি মানব জাতির জৈবিক জীবনের উন্নতির বিকাশ ঘটতে থাকে । তাই দয়াল হরিচাঁদের দেখানো মতাদর্শে তথাকথিত দীক্ষাপ্রথা, তীর্থ পর্যটন বা কাল্পনিক মুক্তিলাভের জন্য সাধন-ভজনের কোন স্থান নাই । তাই তিনি বলেছেন-----
অদীক্ষিত না করিবে তীর্থ পর্যটন ।
মুক্তিস্পৃহা শূন্য নাই সাধন ভজন ।।
গৃহ বা পরিবারের সমস্ত দায়-দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে আমাদের সুখ-শান্তির সকল উৎস । কারণ সন্তানের জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চরিত্র, নীতি-আদর্শ, সচেতনতা সব কিছুরই সূত্রপাত গৃহ হতেই । শিশুরা গৃহের প্রতিটি সদস্য বিশেষতঃ পিতা-মাতার প্রতি মুহূর্তের চালচলন, কথাবার্তা, ব্যবহার খুব সহজেই অনুকরণ করে যা তাঁর মস্তিষ্কে ছাপ ফেলে প্রকট বা প্রচ্ছন্নভাবে । তাঁর চরিত্র বা ব্যক্তিত্বের উপর যা অদূর ভবিষ্যতে প্রবলভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারে । শ্রীশ্রীহরিচাঁদের নীতি-আদর্শের উপর অটুট বিশ্বাস ও ভক্তি বজায় রেখে সৎ কর্মের মধ্য দিয়ে গৃহের সুস্থ পরিবেশ গড়ে তোলাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য হওয়া উচিৎ ।
গৃহ ধর্ম গৃহ কর্ম করিবে সকল ।
হাতে কাম মুখে নাম ভক্তিই প্রবল ।।
এক্ষেত্রে পিতা-মাতা বা স্বামী-স্ত্রী তাঁদের সম্পর্কের বন্ধন বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করে । ভূমিকা গ্রহণ করে আমরা পরিবারের প্রতিটি সদস্যের উপর কতখানি যত্নশীল তার উপর । ‘পতিত পাবন’ শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর বলতেন----‘পাপ দূরে কোথাও নাই, পাপ আছে আমাদের মনে, আমাদের গৃহে । এই পাপকে সর্বপ্রথম দূর করতে হবে; পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে গৃহের----- কারণ গৃহ কোনো পাপাচারের জায়গা নয় । গৃহ হবে আশ্রম সমতূল্য; ঈশ্বর লাভের আশায় গৃহত্যাগ করে বন-জঙ্গল, পাহাড়-পর্বত, শ্মশান বা তীর্থস্থান কোনোস্থানেই যাবার প্রয়োজন নাই ! ঈশ্বর বিরাজ করুক প্রতি মানুষের হৃদয় ও গৃহে । তিনি আরও বলেছেন-----
“গৃহেতে থাকিয়া যার ভাবোদয় হয় ।
সেই সে পরম সাধু জানিবে নিশ্চয় ।।”
অর্থাৎ সৎচরিত্রের মানুষ, সত্যবাক্য ও সামর্থ অনুযায়ী যেকোনো সৎকর্মের দ্বারা গৃহ বা তাঁর পরিবারের প্রতি দায়-দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে ‘পরম সাধু’ হতে পারেন । এখানে চালাকীর কোনো স্থান নাই, নাই কোনো ‘বাহ্য অঙ্গ সাধুসাজ’ । ঠাকুর হরিচাঁদ চাইতেন, আত্মবলে বলীয়ান হয়ে প্রতিটি মানুষ গড়ে উঠুক গভীর আত্মপ্রত্যয়ে, সাবলম্বী হয়ে । কাজ না করে কাল্পনিক কিছু পাবার আশায় নিজের অমূল্য সময়ের অপব্যয় তিনি পাপ বলে বিবেচিত করতেন । কারণ সঠিক চেতনতাবোধ তৈরী হলে মানুষ আপনা হতেই জানবে ‘ধর্ম-মত’ এর বেড়াজালে আবদ্ধ না হয়েও ধর্মের পালন করা যায় ! তখন তাঁর কাছে ধর্মপালনের না থাকবে বিশেষ ক্ষণ, না থাকবে বিশেষ স্থান । না থাকবে উঁচু-নীচু, জাত-পাতের ভেদাভেদ । তৈরী হবে নিজের প্রতি স্বচ্ছ ধারণা । হিসাব কষতে পারবে ঠিক-ভুলের । তাই ঠাকুর হরিচাঁদ বলেছেন-----
কিবা শূদ্র কিবা ন্যাসী কিবা যোগী হয় ।
যেই জানে আত্মতত্ত্ব সেই শ্রেষ্ঠ হয় ।।
‘গার্হস্থ্য ধর্মে’র হাত ধরে বিশ্বের সমস্ত মানুষ সব ধর্ম-মতের খোলশ ছেড়ে একই সুরে সাম্য ও মানবতাবাদের জয়গান গাইতে পারে । তাই যদি আমরা প্রকৃত ও সার্বিক উন্নতি চাই, যদি মনে হয় ‘এ-বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য’ করে গড়ে তোলার প্রয়োজন তবে এখনই যত্নশীল হতে হবে পবিত্র চরিত্রে ‘গার্হস্থ্য ধর্ম’ পালনের । আজকের দিনে সুস্থ, সবল ও সংস্কৃতিবান সমাজ গঠনে শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের মতাদর্শের প্রয়োজন কোনো প্রশ্ন চিহ্নের অবকাশ রাখে না । অর্থাৎ একথা বলা যায়, ঠাকুর হরিচাঁদ গার্হস্থ্য ধর্মের মধ্য দিয়ে সর্ব-ধর্ম-মতের মিলন ঘটিয়েছেন । যা ঊনবিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে যুগান্তকারী এক মহাবিপ্লব । শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরের মতাদর্শে জীবন ধারণ করলে কোনো কিছুই অপূর্ণ থাকে না । যেখানে ধর্মমতের পরিবর্তন নয়----প্রয়োজন সংস্কারের মাধ্যমে নিজেকে মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা ! কারণ শ্রীশ্রীহরিচাঁদের পথ---- বিজ্ঞানের পথ, মানবতাবাদের পথ, সাম্যতার পথ । তিনি বলেছেন-----
পূর্ণ আমি সর্বময় অপূর্ণের পিতা ।
সাধনা আমার কন্যা আমি জন্মদাতা ।।
শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর ‘লীলা’ সম্পূর্ণ করেছেন তাঁর প্রিয় পুত্র শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুরের মধ্য দিয়ে । তাই মতুয়া’রা শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর ও শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুরকে আলাদা সত্ত্বা হিসাবে দেখেন না । তাই মতুয়া ভক্ত’রা পিতা-পুত্র’কে একত্রে শ্রীশ্রীহরি-গুরুচাঁদ ঠাকুর নামে অভিহিত করে থাকেন । শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর চাইতেন, প্রতিটি মানুষ শিক্ষা পেয়ে হয়ে উঠুক সংস্কৃতিবান ও বিশেষজ্ঞ । আত্মোন্নতির সাথে সমাজের, দেশের ও জাতির উন্নতিসাধনই হোক শিক্ষার মূল কথা । কারণ মানুষের চরিত্র গঠন না হলে ব্যক্তির ‘মানুষ’ হয়ে ওঠা সম্পূর্ণ হয় না । ব্যক্তি মানুষ না হলে পরিবার তথা সমাজের কল্যাণ সম্ভব নয় । তাই তিনি পুত্র গুরুচাঁদ’কে বলেছেন-----
শোন বলি গুরুচাঁদ ধর্ম শিক্ষা পরে ।
ছেলে মেয়ে বিদ্যা শিক্ষা দিবে ঘরে ঘরে ।।
সকলের উর্ধে মানবিকতা ও মনুষ্যত্ত্ববোধ । এটা ঠিক যে জাতির উন্নতির জন্য শিক্ষা এবং অর্থের কোন বিকল্প হয় না । আবার ‘মনুষ্যত্ত্ববোধ’ না থাকলে সব’ই অর্থহীন হয়ে পড়ে । সুস্থ শরীর, সুস্থ মন ও সুকর্ম ছাড়া যেমন কেউ বড় হতে পারে না আবার সু-আদর্শ ছাড়া সমাজ জীবনের রূপরেখা তৈরী করা যায় না । কু-কর্মে হয়তো সাময়িকভাবে আনন্দ মেলে (বিকৃত), কিন্তু শান্তি আসে না । শুরু হয় বিবেকের সাথে মনের সংঘর্ষ । এর ফল হয় মারাত্মক । তৈরী হয় বিষ (আত্মত্পীড়ন) । আর এই বিষ ধীরে ধীরে শেষ করে দেয় আমাদের সুন্দর মন ও শরীর। শুরু হয় বিপথে চলা । আমরা হয়ে পড়ি দিক্-ভ্রান্ত । তারই দৃষ্টান্ত আমরা দিকে দিকে দেখছি । চোখ খুললেই দেখা যায় হাজারও বিকৃত ঘটনা । তাই ধর্মপথে নিজেকে ধরে রাখতে ইন্দ্রিয় সমূহ নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে গার্হস্থ্য জীবন যাপন করা একান্ত কর্তব্য বলে মনে করতেন শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর । সুস্থ সমাজ গঠনে যা একান্ত অপরিহার্য । তিনি বলেছেন-----
দেহের ইন্দ্রিয় বশ করেছে যে জন ।
তাঁর দরশনে সর্ব তীর্থ দরশন ।।
আমরা শিক্ষিত সাবলম্বী হয়ে যদি নিজেদের রুচীবোধ হারিয়ে ফেলি, বড়’কে সম্মান করতে না শিখি, যদি ভাষাজ্ঞান না থাকে , ইন্দ্রিয় সুখে বুঁদ হয়ে যদি নিজ কর্তব্য ভুলে যাই তাহলে কি মূল্য আছে আমাদের শিক্ষার, আমাদের অর্থের ? নৈতিকতা হারিয়ে যদি সমাজ ছুটে যায় ভয়ংকর দাবানলের দিকে, কিসের জন্য আমরা শিক্ষিত হচ্ছি, অর্থ উপার্জন করছি আর কাদের জন্যই বা আমরা অর্থ সঞ্চয় করছি ? আমরা যদি নিজেকে ভালোবেসে থাকি, নিজের সন্তান’কে ভালোবেসে থাকি, যদি মনে হয় একটা সুস্থ-সংস্কৃতি সম্পন্ন সমাজে আমার সন্তান মানুষ হয়ে গড়ে উঠুক, তাহলে এখনিই সচেতন হতে হবে আমাদের । তাই সকলের কাছে আমার অনুরোধ আসুন দেখি, মহান ‘সমাজ সংস্কারক’ হরি-গুরুচাঁদ ঠাকুর কি দিয়ে গেলেন আমাদের । তাঁরা হাতে-কলমে শিক্ষা দিয়েছেন কি করে চরিত্র গড়তে হয়, কিভাবে সন্তানকে লেখা-পড়া শেখাতে হয়, কেমন করে অর্থের উপার্জন করতে হয়, কিভাবে গৃহের সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখতে হয় । শিখিয়েছেন কিভাবে একজন সচেতন নাগরিক হিসাবে সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগবদ্ধ হতে হয় । নিজ অধিকার ও দাবী কিভাবে বুঝে নিতে হয় । অর্থাৎ মানুষের জৈবিক জীবনের প্রতিটি স্তরের উন্নতির বিধান তাঁরা হাতে-কলমে মানুষ’কে শিক্ষা দিয়ে গেছেন । যেখানে কর্ম ও কর্মফলের বাইরে আর কিছু নাই------নাই কোনো কাল্পনিকতার স্থান । কারণ পৃথিবীতে এযাবৎ যা কিছু হয়েছে তা মানুষের জ্ঞান ও কর্ম দ্বারাই হয়েছে । তাই ঠাকুর হরিচাঁদ বলেছেন-----
পুরাকালে মুনিগণ করিতেন ধ্যান ।
এবে সেই ধ্যান হয় জ্ঞানেতে বিজ্ঞান ।।
অর্থাৎ ধর্মের পালনে কল্পলোকের স্থান নাই । মানুষের উন্নতিই এখানে শেষ কথা । মানুষের উন্নতি হলেই দেশের উন্নতি হয় । দেশ কথা বলে মানুষের মুখে । মতুয়া দর্শনে মানুষই একমাত্র ইষ্ট-নিষ্ট । তাই দেখা যায় শ্রীশ্রীহরিচাঁদের আদর্শতলে তৎকালীন সময়ে নমঃশূদ্র, সাহা, ব্রাহ্মণ, মুসলীম, তেলী, মালী, কুম্ভকার, পন্ড্রক্ষত্রীয়, কুন্ডু সহ মোট ৩৬-টি বর্ণের মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন । ভক্তি ও যুক্তির পূর্ণ সমন্বয়ের এই মানবতাবাদী দর্শন যে সময়োপযোগি ও কালজয়ী তা বলার অপেক্ষা রাখে না । যেখানে নেই কোন জাত-পাত, ছোট-বড় বা তথাকথিত কোনো ধর্মমতের বেড়াজাল । সারা জীবনই এখানে এক মহা ধর্মক্ষেত্র । যা সমগ্র মানব জাতিকে পথ দেখাতে সক্ষম । মানব জাতিকে এক ও অভিন্ন সত্ত্বায় ঐক্যবদ্ধ করতে ধর্মমতের উপাচার নয়, শুদ্ধ মানুষ গড়াই হোক আমাদের লক্ষ্য । তাই মহর্ষি তারক চন্দ্র সরকার ‘শ্রীশ্রীহরিলীলামৃত’ মহাগ্রন্থে লিখেছেন -----
সর্ব ধর্ম লঙ্ঘি এবে করিলেন স্থূল ।
শুদ্ধ মানুষেতে আর্তি এই হয় মূল ।।
জয় হরিচাঁদ ।
লেখক - বরুন ভক্ত
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন