রবিবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২২

বাঙালি পরিচয় হননকারি

 বাঙালির আত্মপরিচয় ছিনতাইয়ের ষড়যন্ত্র


 ©


[লেখাটি দু’বছর আগের। সফটওয়্যারের কিছু সমস্যার কারণে অনেক ক্ষেত্রে পড়তে অসুবিধা হচ্ছিল। পাঠোদ্ধার করে পুনর্লিখনে শব্দচয়ন ও বাক্যবিন্যাসে কিছু ব্যত্যয় ঘটে থাকবে। শিরোনামটি পরিবর্তন এবং হয়েছে যৎসামান্য সম্পাদনাও]


 গত বছরের কথা। বঙ্গাব্দ নিয়ে আকবর তত্ত্বে ছেয়ে গেছিল পশ্চিমবঙ্গের বাংলা কাগজ গুলো। তারই মধ্যে একটা বিখ্যাত পোর্টাল একটু অন্যরকম ভাবে এই বিষয়ে একটি লেখা বের করে। শিরোনামটা বেশ বিস্ফোরক। “বাঙালিদের কোনও কৃতিত্ব নেই। পয়লা বৈশাখের সূচনা করেছিলেন মহামতি আকবর” শুধুমাত্র এই শিরোনামের জন্যই লেখাটা আমার সব থেকে বেশি ভাল লেগেছিল। কোন লুকোলুকির ব্যাপার নাই একদম সোজাসাপটা স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে যে এঁরা ঠিক কি চায়। ‘বঙ্গাব্দে বাঙালিদের কোনো কৃতিত্ব নাই’ এটা যে কোন ভাবে প্রমাণ করাটাই এদের ঘোষিত লক্ষ্য।


     আকবরের বঙ্গাব্দ চালু করার কোন ইতিহাস না থাকলেও, বঙ্গাব্দের আকবর তত্ত্বের কয়েক দশকের ইতিহাস আছে। ঘটনার সূত্রপাত পাকিস্তানি আমলে। পাকিস্তান পন্থী বুদ্ধিজীবীরা চেয়েছিলেন বাঙালির থেকে তার ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য কেড়ে নিয়ে বাঙালিকে অন্যদের মানসিক দাসে পরিণত করতে। সেজন্যই দরকার ছিল বাংলার বাইরের কোন ব্যক্তিকে বঙ্গাব্দের কৃতিত্ব দেবার। (সংযোজনঃ প্রকৃতপক্ষে আরব উপদ্বীপের বাইরে তরবারির মুখে ইসলাম কবুল করা সকল জনগোষ্ঠীই আত্মপরিচয়ের সঙ্কটে ভোগেন এর থেকে নিস্কৃতি পেতে তাদের বর্তমান প্রজন্ম নানাপ্রকার গোঁজামিল ও ছল চাতুরির আশ্রয় নেন। আত্মপ্রবঞ্চনার মাধ্যমে তারা নিজেদেরকে প্রবোধ দেওয়ার চেষ্টা করেন যে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি সবই আরব ভূমি ও ইসলামের অবদান।) তাই ১৯৬৬ সালে পূর্ব পাকিস্তানে এমন একটি কমিটি গঠিত হয় যার লক্ষ্য ছিল আকবরকে বঙ্গাব্দের প্রবর্তক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। সরকারি ভাবে এই কমিটির নাম ছিল ‘পঞ্জিকা সংস্কার কমিটি’।


দায়িত্ব পেয়েই এই বিষয়ে একটি সুদীর্ঘ রচনা লিখে ফেলেন কাজী দীন মোহাম্মদ। এই রচনার মূল বক্তব্য ছিল আকবর প্রবর্তিত বর্ষপঞ্জি তারিখ-ই-ইলাহীই হল বাঙালির বঙ্গাব্দ। এবং এই বঙ্গাব্দের গণনা পদ্ধতি নাকি আরবি বছর হিজরির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ !?? এরকম উদ্ভট এবং হাস্যকর দাবি কাজী দীন মোহাম্মদই প্রথম তোলেন। এরপরে ওই অসঙ্গতি পূর্ণ লেখাটিকে প্রামাণ্য তত্ত্বের রূপ দিতে ডাক পড়ল জনাব গোলাম সামদানীর। লেখাটি ছেপে বেরোল জনাব গোলাম সামদানীর বাংলা একাডেমি পত্রিকায়। ধীরে ধীরে পূর্ণতা পেতে লাগল বঙ্গাব্দকে বাঙালির থেকে কেড়ে নেবার চক্রান্ত।


এরপরেই আসরে নামেন মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। এই শহীদুল্লাহ ছিলেন মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের অন্যতম সমর্থক। বাংলায় কথা বলা মুসলমান যে কোনোভাবেই বাঙালি নয়, এটা শহীদুল্লাহ মনে মনে ঠিকই জানতেন। তাই ইনি মনে করতেন মুসলিম দেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা বা উর্দু না হয়ে আরবী হওয়াই উচিত। ফলে কাজী দ্বীন মহম্মদের ‘আরবিই মূষলমানদের জাতীয় ভাষা’ লেখাটি শহিদুল্লাহ্ সাহেবের বিশেষ ভাবে পছন্দ হয়। কারণ ঐ লেখাতে আরবি বর্ষপঞ্জী হিজরীর সাথে বঙ্গাব্দের গণনা পদ্ধতির মিল দেখানোর চেষ্টা করা হয়। তাই পঞ্জিকা সংস্কার কমিটির প্রধান হিসাবে ৪ নং সুপারিশের মাধ্যমে মোহম্মদ শহীদুল্লাহ্ আকবরকেই বঙ্গাব্দের জনক হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে দেন।


মজার ব্যাপার হল, আকবরের রাজসভায় লিখিত আকবর নামা বা আইন-ই-আকবরি’র কোন অংশেই বাঙলার জন্য আলাদা বছর চালুর কথা নেই। এমনকি খুব পরিস্কার ভাষায় আইন-ই-আকবরিতে লেখা রয়েছে যে আকবর একটিই বর্ষ গণনা চালু করেন যার নাম তারিখ-ই-ইলাহি। এই তারিখ-ই-ইলাহীও কিন্তু আরবের হিজরী সালের গণনা অনুযায়ী তৈরি হয়নি। কারণ আকবর হিজরী সাল পছন্দ করতেন না। আকবর প্রবর্তিত এই ‘তারিখ-ই-ইলাহী’কে ‘মালিকি সাল’ও বলা হয়।


অথচ বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবিরা আকবর, হিজরি এবং বঙ্গাব্দকে মিলিয়ে একটা কাল্পনিক খিচুরি বানিয়ে ফেলেছেন। তাঁদের বানানো গল্পটা হল এরকমঃ আকবর সিংহাসনে বসেন ইংরেজি ১৫৫৬ খৃস্টাব্দে। ঐ বছর ছিল ৯৬৩ হিজরি সাল। সিংহাসনে বসার সনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে বাংলায় বঙ্গাব্দ চালু করেন আকবর। এবং যেহেতু সেই বছরটি ছিল ৯৬৩ হিজরি তাই প্রথম বঙ্গাব্দটিও হয় ৯৬৩ বঙ্গাব্দ। এটাই এই আকবর তত্ত্বের সবথেকে বড় মুশকিল !


আইন-ই-আকবরিতে গোদা গোদা অক্ষরে লেখা রয়েছে যে আকবর হিজরি সন পছন্দ করতেন না বলেই তারিখ-ই-ইলাহি চালু করেন। যিনি হিজরি সন পছন্দ করতেন না সেই তিনি হিজরি সন অনুযায়ী বঙ্গাব্দ বানাতে যাবেন কেন ? আইন-ই-আকবরিতে আরও লেখা রয়েছে যে তারিখ-ই-ইলাহির প্রথম বছর সেটাই যে বছর আকবর সিংহাসনে বসেন। অর্থাৎ ইংরেজি ১৫৫৬ খৃস্টাব্দই হল তারিখ-ই-ইলাহির প্রথম সাল। অর্থাৎ ২০২০ খৃস্টাব্দে হবে তারিখ-ই-ইলাহির (২০২০-১৫৫৬) ৪৬৪ সাল। কিন্তু এখন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ। তারিখ-ই-ইলাহী এবং বঙ্গাব্দ দুটোই যদি আকবর চালু করতেন তাহলে বর্ষের সংখ্যাতে মিল থাকা অবশ্যই উচিৎ ছিল। আরও আশ্চর্যের বিষয় তারিখ-ই-ইলাহীর মাসের সাথেও বাংলা মাসের কোন মিল নাই। বাংলায় প্রথম মাস বৈশাখ; সমস্ত ভারতীয় তথা হিন্দু পঞ্জিকাতেই মাসের নামে মিল রয়েছে। যেখানে তারিখ-ই-ইলাহীর প্রথম মাস হল, ‘ফরোয়ার-মাহ্-ই-ইলাহী’। এমনি মাহ্-ই-ইলাহী প্রতিটি মাসের নামেই রয়েছে। একজন বাদশা তার সম্রাজ্যে ইলাহীর নামে মালিকি সাল চালু করবেন আর শুধু বাঙলার জন্য বঙ্গাব্দ চালু করবেন, সে কি হয় ? আকবর তত্ত্বে আরও সমস্যা রয়েছে। আকবর তাঁর সম্রাজকে ১২টি সুবা’তে ভাগ করেন। তার মধ্যে যদি ধরেও নেই একটি সুবার জন্য আলাদ সাল গণনা পদ্ধতির প্রয়োগ করেছিলেন। তাহলেও এই তত্ত্ব মুখ থুবড়ে পড়বে। সুবা-ই-বাঙ্গাল বাস্তবে বাংলা বিহার ও উড়িষ্যা নিয়ে গঠিত ছিল। বিহার বা উড়িষ্যাতে বঙ্গাব্দের প্রচলন ছিল বা আছে এমন কথা কেউ কখনও শুনেছেন ? অতএব তারিখ-ই-ইলাহী এবং বঙ্গাব্দে মাসের নাম, গণনা পদ্ধতি এবং বর্ষ ক্রমাঙ্ক এ সবে কোন মিলই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বরং বিপক্ষেই প্রমাণ মিলছে ভুরি ভুরি।


তবে সংস্কৃতির দখলদাররা এ সবে দমে যাবার পাত্রই নন। পূর্ব পাকিস্তানের নাম বদলে বাংলাদেশ হওয়ার এক দশক পর ক্ষমতায় বসেন হুসেন মোহম্মদ এরশাদ। ক্ষমতায় বসেই তিনি বাঙালির আত্মপরিচয় মুছে দেওয়ার কাজে লেগে পড়েন। ‘বাঙালি’ শব্দে আপত্তি জাহির করে পরিবর্তে ‘বাংলাদেশী’ শব্দের উপর জোর দেন। উদ্যোগ নেন বাংলা বর্ষগণনা বদলানোর। সরকারীভাবে একে ‘পঞ্জিকা সংস্কার’ নাম দেওয়া হলেও মূল লক্ষ্য ছিল বঙ্গাব্দ থেকে আদি ও প্রকৃত বাঙালির শেষ চিণ্হটুকু মুছে ফেলা। তারই অংশ হিসাবে শহীদুল্লাহ্ কমিটির ৪ নং সুপারিশকে মান্যতা দেন রাষ্ট্রপতি এরশাদ। অর্থাৎ ‘বঙ্গাব্দের প্রতিষ্ঠাতা আকবর’ ! কলমের এক খোঁচায় প্রতিষ্ঠা হয়ে গেল এতো বড় ভিত্তিহীন মিথ্যা।


এই নতুন তত্ত্বকে জনপ্রিয় করার বিপুল চেষ্টা হয় বাংলাদেশে। ঐ দেশের সংখ্যাগুরু জনগণ আকবরের ধর্মালম্বী হওয়ায় বিপুলভাবে সমাদৃত হয় এই ভুয়া তত্ত্ব। এরপর ধীরে ধীরে ক্রমাগত চেষ্টা চলে বাঙ্গালীর শেষ আশ্রয় এই পশ্চিমবঙ্গে এই বিষাক্ত ভাইরাস অনুপ্রবিষ্ট করার। পশ্চিমবঙ্গে এই কুতত্ত্ব আমদানির প্রধান নায়ক হলেন অমর্ত্য সেন। যিনি পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু মূষলমানের হাত থেকে বাঁচতে এই পশ্চিমবঙ্গে এসে আশ্রয় নেন। সেখানে থেকে যাওয়া ২২% আদি বাঙালির গণহত্যাকে বলেছিলেন ‘স্বতঃস্ফুর্ত ভূমিসংস্কার’। আনন্দবাজার, Scroll, News 18 বাংলা প্রভৃতি বাম মানসিকতার মিডিয়া গ্রুপ অমর্ত্য সেনের এই আকবর ভক্তির সমর্থনে যোগ দেয়। লক্ষ্য একটাই, বাঙালিকে বোঝানো যে বাঙালির আসলে কোনো কৃতিত্ব নাই ! তার নববর্ষ, সংস্কৃতি, গণনা পদ্ধতি কোন কিছুই তার নিজের নয়।


কোন মানুষের কাছ থেকে তার সম্পদ চুরি করা একটা অপরাধ কিন্তু কোন জাতির কাছ থেকে তাদের সম্পদ কেড়ে নেওয়া আরও বড় অপরাধ। কিন্তু ক্ষমাহীন অপরাধ হল নিজেদের জাতীয় সম্পদ বিনা বাধায় অন্যকে কেড়ে নিতে দেওয়া। সেই ক্ষমাহীন অপরাধ আমরা এতদিন ধরে করে এসেছি। বঙ্গাব্দের ঐতিহ্য অপহরণের এই চক্রান্ত এক দিনে হয়নি, বহু বছর ধরে হয়েছে। একটু একটু করে ওরা এগিয়েছে আর আমরা চোখ দুটোকে বন্ধ করে রেখেছি। অনেক দেরি হয়ে গেছে, আর প্রতিবাদ না করলেই নয়। মহারাজ শশাঙ্ক প্রবর্তিত বঙ্গাব্দের ঐতিহ্য আমাদের; সেই অধিকার সুরক্ষিত রাখার দায়িত্বও আমাদের।


জয় বঙ্গ

কোন মন্তব্য নেই: