বুধবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২২

শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুরের আহবান


নমঃশূদ্রদের প্রতি শ্রীশ্রীহরিগুরুচাদের আহ্বান 

৪ ইংরেজী ১৯০৭ সাল থেকে ১৯১১ সাল পর্যন্ত , বাংলা ১৩১৪ সাল থেকে ১৩১৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ পাঁচ বছর অক্লান্ত কঠোর পরিশ্রম করে ইংরেজ পুরোহিত খৃষ্ট ধর্ম যাজক ড.সি.এস. মীডের সহযোগীতায় বৃটিশ

রাজ অনুকম্পায় গুরুচাঁদ সুদীর্ঘ ছয়শত বৎসরের অস্পৃশ্য চন্ডালত্বের কালিমা যুক্ত পতিত নমঃশূদ্র জাতিকে পাতিত্বের কবল থেকে মুক্ত করে উদাত্ত আহবানের মাধ্যমে জাতিকে বলেছিলেনঃ ( গুরুচাঁদ চরিতের ১৩১ | পৃষ্ঠার বিবৃতিতে )


 “ জাগো নমঃশূদ্র  নহ কেহ ক্ষুদ্র 

কুল ধর্মে গরীয়ান। 

দেখাও জগতে  নমঃশূদ্র হতে 

নাহি কেহ বরীয়ান

আত্ম পরিচয়  মনে নাহি হায়

তাই এত দূর্গাতি ভালে।

 পূর্ব বিবরণ  কররে স্মরণ 

শক্তিতে ওঠরে জ্বলে।

ধর্ম রক্ষা তরে গহণ কান্তারে 

যে জাতি সহিল দুঃখ। 

প্রতাপের সাথে অস্ত্র নিয়ে হাতে 

শতক্র নাশে লক্ষ লক্ষ

জননীর প্রায় যেই জাতি হায় 

ঘরে ঘরে দেয় অন্ন

শুচি শুভ্ৰ প্ৰাণ বালক সমান। 

বরণ করেছে দৈন্য।

দধিচীর মত পরহিতে রত

সুচরিত অতিশয় । 

আত্মভোলা ঋষি প্রান দেয় হাসি

পিছু পানে নাহি চায় ॥

ধর্ম _কর্ম জ্বল নাহি চায়।

 ঢল ঢল চোখে দৃষ্টি ।

 এই নমঃশূদ্ৰ কৃষ্টি ৷৷ 

আঁধার গুহায় সিংহ ঘুমে রয়

দুরন্ত ফেরুর দল ।

সিংহে মৃত ভাবি মিশিয়াছে সবি

 করিতেছে কোলাহল ॥ 

হওরে চেতন কেশর কেতন।

নাচাও সিংহরাজ 

করবে হংকার ধ্বনি ভয়ংকর

নামুক ইন্দ্রের বাজ ॥

ফেরুপাল দলে পদতলে দলে

সম্মুখে রুখিয়া চল ।

নমঃশূদ্র জয় হোক সর্বময়

 ঘরে ঘরে সবে বল ! 

নমঃশূদ্র প্রতি কর্নর মিনতী

আত্মপরিচয় জান । 

জগত সংসারে শ্রীগুরু চাঁদেরে

আপন বলিয়া মান ॥।

তাঁহার মতন কে আছে আপন

এই বিশ্ব ভূমন্ডলে । 

পঞ্চ বর্ষ ধরে বহুক্লেশ করে

নমঃশূদ্র উদ্ধারিলে ৷ 

ছাড়ি ভিন্ন মত অন্য যত পথ

হও সবে আগুয়ান । 

একই ছত্রতলে একই বৃক্ষমূলে

কর সবে অবস্থান | 

আঁধার নাশিবে সুদিন আসিবে

 জ্বলিবে প্রদীপ শিখা ।

 সারা বিশ্ববাসী হহষেতে আসি 

ললাটে পরাবে ' টিকা ' 

কশ্যপ তনয় মহা ত্বেজোময়

 ওহে নমঃশূদ্র গণ ! 

ব্রহ্ম ত্বেজে জ্বলি ওঠ সবে জ্বলি। 

হোক ব্রাহ্মণ দমন 


প্রাণপ্রিয় নমঃশূদ্র ভ্রাতা - ভগ্নিগণ ! আত্মপরিচিতি মানুষের ব্যক্তি | চরিত্রকে যেমন প্রভাবিত করে , জাতীয় চরিত্রকেও তেমনি সঞ্জীবিত রাখে । বল্লালীয় সমাজ ব্যবস্থায় আত্মপরিচয়হীন ব্যক্তি যেমন অপাংক্তেয় | হিসাবে বিবেচিত হয় , আত্মবিস্মৃত জাতিও তেমনি অবজ্ঞাসূচক হীন আখ্যায় আখ্যায়িত হ'য়ে অবহেলিত - ঘূর্ণিত অস্পৃশ্য জাতিতে পরিণত হয় । নমঃশূদ্র জাতি একটি আত্মবিস্মৃত জাতি । আর সেই আত্মবিস্মৃতির | সুযোগ নিয়ে বল্লালীয় চন্ডনীতির ধ্বজাধারীরা নমঃশূদ্র জাতিকে পাতিত্বের নাগ - পাশে আবদ্ধ করে মানবেতর পর্যায়ে রেখেছে । জাতির পিতা গুরুচাঁদ সেই নাগ - পাশ থেকে জাতিকে মুক্ত করেছেন । এখন প্রয়োজন | জাতিকে তার আত্মপরিচিতি সম্পর্কে অবহিত হয়ে ছয়শত বৎসরের | সমস্ত দুর্বলতাকে ঝেড়ে ফেলে অতীৎ ঐতিহ্যের সুপ্ত শক্তিকে জাগানো এবং সেই শক্তির স্ফূরণ ঘটানো । 


স্বয়ং গুরুচাঁদ প্রদত্ত তথ্যানুসারে ফরিদপুর জেলার অন্তর্গত মল্লিকপুর গ্রামের স্বনামধন্য সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিত শ্রীশ্যামাচরণ তর্কালঙ্কারের নিকট সংরক্ষিত অতি প্রাচীন “ শক্তি সঙ্গম তন্ত্র ” নামক সংস্কৃত গ্রন্থের | “ প্ৰাণতোষী ” নামক অধ্যায়ে হর - পার্বতরি কথোপকথনের সিদ্ধান্ত অনুসারে নমঃশূদ্রগণ স্বয়ং ব্রহ্মার বংশধর । ব্রহ্মার পুত্র মরীচি ; মরীচির 


পুত্র মহামুনি কশ্যপ । কশ্যপের ঔরসে ত্বদীয় স্ত্রী প্রধার গর্ভে ' নমস ' মুনির জন্ম । এই ' নমসা মুনির বংশাবলীই ' নমঃশূদ্র ' নামে বিখ্যাত । | এছাড়া দ্রাবিড় জাতির সঙ্গে শিবের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত নিবিড় । শিব ছিলেন দ্রাবিড় জাতির একমাত্র দেবতা । স্বনামধন্য ঐতিহাসিক অনিল চন্দ্র ব্যানার্জী তাঁর " হিষ্টরী অব ইন্ডিয়া " গ্রন্থে দ্রাবিড় সভ্যতা সম্পর্কে বিস্ত ারিত বর্ণনার মধ্যে প্রকাশ করেছেন যে , মহেঞ্জোদারো নগরীর ধ্বংসাবশেষে একমাত্র শিবের মূর্তি পাওয়া গেছে । এর দ্বারা তিনি প্রমাণ করেছেন যে , একমাত্র শিবই ছিলেন দ্রাবিড় জাতির উপাস্য দেবতা । ব্রহ্মপুরাণে স্বয়ং ব্রহ্মাও শিবের প্রাধান্য দিয়েছেন । ব্রহ্মা শিবকে দেবাদিদেব মহাদেব ' নামে আখ্যায়িত করেছেন । নমঃশূদ্র জাতির পূর্ব পুরুষ স্বয়ং ব্রহ্মা কর্তৃক বরিত ' শিব'ই শ্রীশ্রীগুরুচাদ ; আর পৃথিবীর আদি সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক সেই দ্রাবিড় জাতির উত্তর সূরী নমঃশূদ্র জাতি । গুরুচাদ চরিতের ১৭৪ পৃষ্ঠায় গুরুচাদ তাই বলেছেনঃ 


“ পতিত তারিতে এসেছিল মোর পিতা । 

অন্যথা নাহি হবে তার কোন কথা ॥ 

আজ যারা পদতলে পড়িছে কাঁদিয়া ।

 হরিচাঁদ পরশেতে উঠিবে জাগিয়া ॥ 

অব্যর্থ অমোঘ শক্তি দিয়েছেন তিনি ।

 নিশ্চয় জাগিবে যত পতিত পরানী ॥ 


হে আমার ভাগ্য বিড়ম্বিত নমঃশূদ্র ভ্রাতা - ভাগ্নিগণ ! এতক্ষণে নিশ্চয়ই অনুধাবন করতে পেরেছে যে , আমরা স্বয়ং ব্রহ্মার বংশধর এবং বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সুসভ্য দ্রাবিড় জাতির উত্তরসূরী । কিন্তু মানব জাতির মধ্যে | সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হয়েও আমরা অস্পৃশ্য অপাংক্তেয় ছিলাম । শিক্ষা , দীক্ষা , ধর্মে , কর্মে আমাদের কোন অধিকার ছিলনা । আমাদের কোন ভগবানও ছিলনা । কোন শাস্ত্র - গ্রন্থে আমাদের নাম গন্ধও নেই । অথচ আমরা স্বয়ং | ব্রহ্মার বংশধর , স্বয়ং শিবের উপাসক । ব্রহ্মত্বেজ আমাদের শিরায় শিরায় প্রবাহিত । শিব শক্তিতে আমরা শক্তিমান । তাইতো সর্বশক্তিমান শ্রীহরি আমাদের ঘরেই আবির্ভূত হয়েছেন । ব্রাহ্মণ্যবাদী দানবকে ধ্বংস করার স্বরহরি জগতে আসলেন কেন ? ২৫৩ জন্য প্রলয়ের অধিকর্তা মহাকাল শিবকে পুত্র রূপে আকর্ষণ করে । এনেছেন । জীবের কৈবল্য সিদ্ধি প্রদ সূক্ষ্ম সনাতন ধর্মের উদ্ভুতি আমাদের ঘরেই হয়েছে । আমাদের ঘরে ঘরে আজ শিক্ষার আলো জ্বলছে । কত গুণী , জ্ঞানী , কবি , সাহিত্যিক , গবেষক , দার্শনিক , ডাক্তার , ইঞ্জিনীয়ার , উকিল , ব্যারিষ্টার , সাধক , মহাসাধকের আবির্ভাব ঘটেছে । অতএব , আমরা এখন কি ভাবতে পারি না যে , আমরাই বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি । হে আমার প্রাণপ্রিয় ভ্রাতাভগ্নি গণ ! আখি মেলে চেয়ে দেখ , দ্রাবিড় জাতির সেই সভ্যতার সমাজ - কুঞ্জ মুষ্টিমেয় কয়েকজন | পান্ডা - পুরোহিতের করতলগত । ভন্ড তপস্বীর বেশে কোটি কোটি মানুষের উপর তারা নরক - রাজ্য স্থাপন করেছে । সামাজিক , রাজনৈতিক , অর্থনৈতিক , আধ্যাত্মিক সর্বক্ষেত্রে তারা প্রভৃত্বের আসন সৃষ্টি করে কোটি কোটি নর - নারীকে শোষন ও শাসন করছে । মিথ্যার এই পাপ - রাজ্যকে ধ্বংস করার জন্য নর - নারী মিলিত হয়ে বিপ্লবের আন্দোলন গড়ে তোল । ভন্ডামী , অন্যায় ও অত্যাচারের উদ্ধত মস্তক ধূলায় লুন্ঠিত করে দাও । | ব্রাহ্মণ্যবাদী শাস্ত্র - গ্রন্থ গঙ্গাজলে বিসর্জন দাও । মনে রেখো ভীরুতাই কাপুরুষের চিহ্ন । গুরুচাঁদ চরিতের ৫৯৭ পৃষ্ঠায় গুরুচাঁদ বলেছেনঃ 


“ ভীরু কাপুরুষের মত কেন কথা কও । 

সিংহ শিশু হয়ে কেন ভেড়া বনে যাও ॥ 

মোদের সহায় আছে আপনি শ্রীহরি । 

এ বিশ্ব জগতে মোরা কারে ভয় করি ॥ ”

কোন মন্তব্য নেই: