শুক্রবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০২৫

শাহজাহান এর শেষ মুহূর্ত

 ১৬৫৯ সালের ঘটনা। স্থান প্রতাপগড়‚ মহারাষ্ট্র। 


মুঘল বংশের সবথেকে ছ্যাঁচড়া নমুনাটি অর্থাৎ ঔরঙ্গজেব তখন দাক্ষিনাত্য ছেড়ে দিল্লির দিকে দৌড় দিয়েছে। কারণ উড়ো খবর এসেছে বাবা শাহজাহানের দুনিয়ার ভিসা ক্যান্সেল হয়ে গেছে। ফলে‚ দিল্লির সিংহাসন এখন ফাঁকা পড়ে আছে। তাই মুঘল ট্রাডিশান মতো এখন শাহাজাহানের ছেলেদের মধ্যে সাঙ্ঘাতিক যুদ্ধ হওয়ার কথা। এক ভাই অন্য ভাইয়ের গলা কাটবে। কাকা ভাইপোকে বিষ খাইয়ে মারবে‚ হেরে যাওয়া ভাইদের আত্মীয় আর অনুগামীদের কচুকাটা করা হবে‚ তাদের মেয়েদের দখল করবে বিজয়ী ভাই। সারা ভারত রক্তের সাগরে ভাসবে। আর তার মধ্যে দিয়েই জিতে যাওয়া ভাই বসবে ভারত শাসন করার মসনদে। হয়ে উঠবে সে মহান সম্রাট। আরব থেকে নিয়ে আসা এক ভয়ঙ্কর জান্তব নিয়ম তখন চলছে ভারতবর্ষ জুড়ে। 


প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে ভারতের ইতিহাসে সিংহাসনের দখল নিয়ে কয়েকটা ভ্রাতৃঘাতী লড়াই হলেও সেগুলো ছিলো নেহাতই ব্যতিক্রম। সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার নিয়ে হিন্দু নিয়ম কিন্তু সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই নির্দিষ্ট ছিল। যে কারণে আমরা দেখতে পাই যুধিষ্ঠিরের জন্ম হয়ে যাওয়ার খবর শুনে গান্ধারীর নার্ভাস ব্রেকডাউন হয়ে যায় আর সে গর্ভ নষ্ট করার উপক্রম করে। ( এবং সম্ভবত করেও ফেলেছিলো। অন্ততপক্ষে মহাভারত সেটাই বলছে। আর তারপরই হঠাৎ অলৌকিকতার দিকে টার্ণ নেয় পরবর্তী কার্যক্রম। খুব সম্ভবত এর পরই ভীষ্মকে কন্ট্রোলে রাখার উদ্দেশ্য এদিক ওদিক থেকে ১০০ খানা বাচ্চা তুলে এনে গান্ধারীর হাতে তুলে দেয় ব্যসদেব। ভীষ্মও সম্ভবত যে কারণে কুরু সিংহাসনের রক্ষক হয়েও কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে বংশের বিদ্রোহী ফ্যাকশন অর্থাৎ পান্ডবদের প্রতি অনুগত ছিলো। কুরুক্ষেত্রে ভীষ্মের হাতে বেশিরভাগই পাঞ্চাল সৈন্য মারা গেছিলো‚ পান্ডবদের ন্যূনতম ক্ষতি হয়নি। পয়েন্ট টু বি নোটেড।)  যাইহোক আসল কথায় আসি‚ এই  সিংহাসন দখলের জন্য নির্দিষ্ট আইনের অভাব ও সেই কারণে বাধ্যতামূলক যুদ্ধ মূলত মধ্যযুগেই ভারতের ট্রাডিশান হয়ে ওঠে।


তো যেখানে ছিলাম সেখানে ফিরি। ভাইদের সাথে যুদ্ধ করতে আওরঙ্গজেব তো দক্ষিন ছেড়ে উত্তরে দিল্লির দিকে দৌড় দিল। ফলে সাউথের পাওয়ার স্ট্রাকচার গেলো পালটে। সাউথের শিয়া রাজ্যগুলোর উপর আওরঙ্গজেবের ভয়ানক রাগ ছিল। আওরঙ্গজেব বলত ওরা নাকি মুসলমানই না। মুশরিক। তাই দাক্ষিণাত্যে গিয়ে আওরঙ্গজেবের প্রথম ও প্রধান কাজ হয়েছিল শিয়া রাজ্যগুলো দখল করা। সুন্নী মুঘলদের তান্ডবে দক্ষিনী শিয়াদের তখন আক্ষরিক অর্থেই সিপিএম কন্ডিশন হয়ে গেছিল। 


কিন্তু আওরঙ্গজেব দক্ষিণ ছাড়তেই ওরা আবার মাথা চাড়া দিল। ওদের জেহাদী যোশ আবার ফিরে আসল। আর বিজাপুরের সুলতান মন দিল কাফের শিবাজীকে সাইজ করার কাজে। ফলে সৈন্য সামন্ত সহ বিজাপুরের কমান্ডার আফজল খাঁকে পাঠানো হল শিবাজীকে মার্ডার করার জন্য।


শিবাজির সাথে লড়াইয়ের জন্য আফজল খান যা নিয়ে এসেছিল তা মোটামুটি এইরকম -

২০,০০০ আদিলশাহী অশ্বারোহী সৈন্য

১৫,০০০ আদিলশাহী পদাতিক সৈন্য

আফজল খানের ১০,০০০ ব্যক্তিগত অশ্বারোহী সৈন্য

আফজল খানের ৫,০০০ ব্যক্তিগত পদাতিক সৈন্য

১,৫০০ মাস্কেটধারী

৮৫টি যুদ্ধের হাতি।

১,২০০টি উট

৮০-৯০টি কামান

১২,০০০ অতিরিক্ত পদাতিক সৈন্য


এখন এই আফজল খাঁ লোকটি মানুষ হিসাবে বিশেষ সুবিধার ছিল না। যুদ্ধবিদ্যাও তেমন ছিলো না। থাকার মধ্যে ছিলো তার একটা জাম্বো সাইজ কালাপাহাড়ি শরীর। নিজে সেনাপতি হলেও যুদ্ধমুদ্ধ করতে তার ছিলো ভয়ানক আপত্তি। তার সবথেকে প্রিয় শখ ছিলো হিন্দু রাজাদের মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে নিজের কাছে ডেকে আনা‚ তাদের বন্ধুভাবে কোলাকুলি করা আর কোলাকুলি করার ছলে নিজের বিশাল শরীর দিয়ে চেপে দম আটকে কিংবা ছুরি দিয়ে কুপিয়ে তাকে মেরে ফেলা। শিবাজীকে ডাকার আগে আফজল খান ১৬৩৯ সালে আরেক হিন্দু রাজা কস্তুরি রাঙ্গাকেও একইভাবে মিটিং করার নামে ডেকে খতম করে দিয়েছিল বলে তথ্য পাওয়া যায়।  


তা আফজল খান আসছে শুনে শিবাজিও এগোল যুদ্ধ করার জন্য। কিন্তু আফজল খান জানত যে শিবাজি লড়াই করেন গেরিলা পদ্ধতিতে।  অর্থাৎ ছোটো ছোটো দলে ভাগ হয়ে শত্রুকে আক্রমণ করে আর যতটা সম্ভব বেশী ক্ষয়ক্ষতি করে ফিরে যায়। জমি ও নারী দখলের লড়াইতে পারদর্শী আফগানদের মাথায় ঢুকত না শিবাজির এই গেরিলা পদ্ধতি। ওরা হয়তো কোনো গ্রাম অরক্ষিত দেখে সেখানে আক্রমণ করার পায়তারা করছে‚ লাস্ট মিনিট সাজেশনের মতো গ্রামের কোন সম্পদ কে নেবে‚ কোন নারীকে কে ধর্ষন করবে এসব জটিল ও প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা সেরে নিচ্ছে‚ এমন সময় কথা নেই বার্তা নেই‚ চারিদিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে মারাঠা সৈন্য এসে আফগানদের বেধড়ক পিটিয়ে চলে গেল। সেনাপতি যুদ্ধ শুরু করার অর্ডার দেওয়ার আগেই হয়তো দেখা গেল অর্ধেক আফগান মরে পড়ে আছে আর অর্ধেক আফগান কি করবে বুঝতে না পেরে প্রাণের মায়ায় ভাগলবা হয়েছে‚ দে ছুট। নিতান্তই হেলায় যুদ্ধ জিতে যেত মারাঠারা।  


তাই শিবাজিকে ট্যাকল করার জন্য আফজল খান নিজস্ব টেকনিক ইউজ করতে চাইল। তার সেই বন্ধুত্বের নামে কোলাকুলি করে কিষেনজী বানিয়ে দেওয়ার পদ্ধতি। এর আগেও বহুজন তার কাছে এসে ফেঁসেছে এই টেকনিকের জন্য।


যাইহোক‚ পরিকল্পনা মতো আফজল খান শিবাজির কাছে দূত পাঠাল। যে‚ কি আর হবে যুদ্ধুমুদ্ধু করে? আমিও মানুষ‚ তুমিও মানুষ। আমাদের দুজনের রক্তই লাল -  তাই এসো আমরা আজ থেকে শত্রুতা ভুলে যাই। তুমি আমার তাবুতে এসো‚ আমি তোমার সাথে কোলাকুলি করে বন্ধুত্ব পাতাই আর আমরা দুজনে মিলে অষ্টম বামফ্রন্ট সরকার গড়ি। টেক লাভ অ্যান্ড হ্যাভ ফান। ইনকিলাব জিন্দাবাদ।  


আফজলের দূতকে দেখে শিবাজি সবই বুঝলেন। আফজলের স্বভাব সে ভালোমতোই জানত। আফজলের এইসব মিষ্টি মিষ্টি কথা শুনে কস্তুরি রাঙা সহ অন্যান্য হতভাগ্য রাজাদের কি হাল হয়েছিল তাও সে শুনেছিল। কিন্তু কথা হল যে শিবাজি হলেন শিবাজি। ইংরেজিতে যাকে বলে ম্যান উইথ আয়রণ বলস। লোহার অন্ডকোষ যুক্ত পুরুষ। বিন্দুমাত্র না ঘাবড়িয়ে শিবাজিও দূতের হাত দিয়ে ফিরতি চিঠি পাঠিয়ে দিলো যে‚ আফজলের মতো ফার্স্ট ক্লাস জেনারেল তার বিরুদ্ধে লড়তে আসছে‚ এটা জেনে সে বড়ই লজ্জিত ও মর্মাহত হয়েছে। নেহাতই এটা কলিকাল‚ এখন কেউ লজ্জা পেলেও পৃথিবী দুভাগ হয় না তাই তিনি কোনোমতে বেঁচে আছেন। যদি আফজল আগে দূত না পাঠাত তাহলে শিবাজিই নাকি আফজলের কাছে আনুগত্যের  বার্তা পাঠাত। আফজল নিজে তার মতো একজন ছোট্ট রাজার কাছে দূত পাঠিয়েছে এটা ভেবে সে আরেকবার লজ্জিত হয়েছে…………ইত্যাদি ইত্যাদি নানা ভ্যানতারা পাকানো চিঠি গেল আফজলের কাছে। যার মোদ্দা কথা এই যে নির্দিষ্ট দিনে শিবাজি আসছে আফজলের শিবিরে তার সাথে দেখা করতে। 


নির্দিস্ট দিনে শিবাজি গায়ে চড়ালেন লোহার বর্ম ও মাথায় লোহার হেলমেট । তার ওপর পড়লেন আলখাল্লা ও মাথায় উষ্ণীষ। বাম হাতে পরলেন বাঘনখ লাগানো গ্লাভস এবং ডান হাতের জামার হাতার ভাঁজে লুকিয়ে রাখলেন একটি ছোরা। তাঁর লুটিয়ে-পড়া পুরো-হাতা সাদা আলখাল্লার নীচে সব চাপা পড়ে গেল। হ্যাঁ, এ বার তিনি ধর্মযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত! রাঙা কস্তুরি সহ অসংখ্য হিন্দুর উপর হওয়া অন্যায়ের প্রতিশোধ আজ তিনি তুলবেন। 


বেরোনোর সময় হিন্দু রীতি মেনে প্রণাম করলেন জিজামাতাকে। মা পুত্রকে আশীর্বাদ করলেন। জন্মদাত্রী মায়ের ও আরাধ্যা দেবী ভবানীর আশীর্বাদ নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন শিবাজি। ইতিহাসে তারিখ তখন ১০ নভেম্বর, ১৬৫৯ সাল।


প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে তাদের মধ্যে ঠিক হয়েছিল যে শিবাজি এবং আফজল খান দু’জনের সাথে মাত্র দু’জন করে বডিগার্ড  উপস্থিত থাকবে। এছাড়া আর কেউ ধারেকাছে থাকতে পারবে না। কারণ সেফটি ফার্স্ট! 


শিবাজি নির্দিষ্ট সময় ঢুকলেন আফজল খানের তাবুতে। শান্ত - নিরীহ - নিরস্ত্র। ঠিক যেন মারাঠি পোষাক পড়া আমাদের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীটি! 


এদিকে আফজলের পাশে রাখা আছে তলোয়ার এবং ভোজালি। আহ্লাদে আটখানা হয়ে আফজল অপেক্ষা করছে কখন শিবাজি তার সামনে আসবে‚ দুজন কোলাকুলি করবে আর তারপরেই………! জান্নাতে ভালো জায়গা পাওয়ার পথে আরেক ধাপ এগিয়ে যাবে আফজল। কিন্তু হিন্দু কূল ধুরন্ধর শিবাজিকে চিনতে তার তখনো বাকি ছিলো! 


শিবাজি মঞ্চে উঠলেন। হাসি মুখে এগিয়ে গিয়ে যেখানে আফজল খানের সামনে দাঁড়ালেন আর তাকে অভিবাদন জানালেন। শুভ কাজে দেরী করতে নেই ভেবে আফজলও উঠে দাঁড়াল আর দুহাত বাড়িয়ে শিবাজিকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। 


বিরাট দেহ আফগান আফজলের কাঁধের কাছে ঠেকলেন আকৃতিতে ছোটখাটো মরাঠা শিবাজি। এই অসম আকৃতির সুযোগে বাঁ হাতে শিবাজির গলা টিপে ধরল আফজল। ডান হাতে ছুরি নিয়ে কোপ বসালে শিবাজির বাম দিকে। কিন্তু বর্ম থাকায় সেই কোপ চামড়া পর্যন্ত পৌঁছাল না। পরিস্থিতির জন্য তৈরী ছিলেন শিবাজিও। সম্ভবত হিন্দু নিয়ম মেনে বন্ধুত্বকামী শত্রুকে আগে আক্রমণ করেন নি। অপেক্ষা করছিলেন শত্রুর আক্রমনের! আর সেই আক্রমণ আসতেই

স্বভাবসুলভ ক্ষিপ্রতায় শিবাজি তাঁর বা হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলেন আফজলের কোমর এবং সঙ্গে সঙ্গে পরপর বাঘনখের আঘাতে চিরে ফেললেন আফজলের পেট।


শিবাজী আফজলের নাড়িভুড়ি বের করে দেবার পর আবার একটা ছোরা দিয়ে কোপ মারেন। কিন্তু পাশে থাকা আফজলের বডিগার্ড তলোয়ার দিয়ে কোপ মেরে শিবাজীর পাগড়ি দুটুকরো করে ফেলে। ভেতরে হেলমেট থাকায় মাথা বেঁচে যায় শিবাজির।  শিবাজীর বডিগার্ড আবার এক কোপে সেই আফজলের বডিগার্ডের হাত কেটে ফেলেন। আর শিবাজী বেচারাকে এক হাত নিয়ে বেঁচে থাকার কষ্ট থেকে মুক্তি দেবার জন্য এক্কেবারে স্কন্ধকাটা বানিয়ে  দেন। ওদিকে বডিগার্ডের মারামারির সুযোগে নাড়িভুড়ি বের হওয়া আফজল পালানোর ধান্দা করছিল। বডিগার্ডের পর আফজলকেও এবার স্বেচ্ছায় মুন্ডুদান শিবিরে বসিয়ে দেওয়া হয়। সেনাপতির মুন্ডু নেই দেখে বাকি বিজাপুরীরা বন বাঁদার ভেঙ্গে উল্টোদিকে দৌড় দেয়। য পলায়তি স জীবতি। পন্ডিত লোকে বলে গেছেন।


অল্পস্বল্প কিছু যুদ্ধ হয় বটে। তবে তা না হওয়ার মতোই। তবে যেকটা বিজাপুরীকে সামনে পায় মারাঠারা‚ সবকটাকে পত্রপাঠ আল্লার পেয়ারে করে দেওয়া হয়। আর বিজাপুরীদের ফেলে যাওয়া বহু কামান, ৬৫টা হাতি, ৪,০০০ টা ঘোড়া, ১,২০০ উট, ১০ লক্ষ নগদ টাকা, ৩ লক্ষ টাকার সমমূল্যের অলঙ্কার এবং প্রচুর মূল্যবান পোশাক হস্তগত করে আবার নিজের কেল্লায় ফিরে যায় শিবাজি।i


হ্যাঁ ঠিক আজকের দিনেই ঘটেছিল সেই মহান ঘটনাটি। ১০ই নভেম্বর, ১৬৫৯!

কোন মন্তব্য নেই: