শনিবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৩

ইতিহাস বড়ই নির্মম

 আমি জানি আপনারা সবাই পড়বেন না! তবুও লেখা প্রবন্ধ থেকে তুলে ধরলাম-  যদি কেউ সঠিক ঐতিহাসিক তথ্য জানতে চান !  সময় হলে ---


ইতিহাস বড় নির্মম। এই প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা জ্ঞাত করানো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করি। কারণ, শ্রীশ্রী হরিচাঁদ লীলাগীতি ছাপাতে গিয়ে কঠিন নিষেধাজ্ঞার দরুন নতুনরূপে বিয়োজন করে সংযোজন প্রাক্কালে যতটুকু বৈদিক ব্রাহ্মণ্য ধর্মের অবতার অলৌকিকবাদ যুক্ত হয়েছে তার সাথে তৎকালীন বাংলার ধর্মীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কূটনীতি জড়িত। এ কারণে, সেসব সত্য ইতিহাসের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রাংশ আপনাদের নিকট তুলে ধরতে সচেষ্ট হলাম।  সে সব জ্ঞাতব্য বিষয়গুলি সমাজের গবেষকদের গবেষণায় একান্তভাবে স্থান পাওয়া উচিৎ ছিল বলে মনে করি। অপ্রিয় হলেও সত্য যে,-  ব্রাহ্মণ্যধর্মের আধুনিক নামকরণের হিন্দুধর্ম'রূপ ভৌতিক প্রেতাত্মা বাংলার মূল ভারতীয় নম সমাজ তথা বহুজন সমাজের মস্তিস্কস্থানীয় স্মরণীয় শিক্ষিত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কে কতটা চেপে বসে ছিল এবং তার ভয়ানক পরিণতির ফলশ্রুতি কি দাঁড়িয়ে ছিল, তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরতে প্রয়াসী হলাম। অবশ্য, অন্ধ বৈদিকবাদে বিশ্বাসী মতুয়াগণ এবং কিয়দাংশ স্বশিক্ষিত ব্যক্তিগণ আমার আদ্যকৃত শ্রাদ্ধ কার্য সমাধান করতে ইতস্ততঃবোধ করবেন না! অন্য জনগোষ্ঠী তাদের অধ্যায়নজ্ঞাত ইতিহাসের বহির্ভূত হলেই তাদের তুলাদণ্ডের তুলনায় তুলোধোনা করতে ব্যস্ত থাকবেন!  তথাপিও সত্য তথ্য প্রকাশে ক্ষুদ্র কবি হিসাবে সামাজিক দায়বদ্ধতায় তুলে ধরছি ––

           উনবিংশ শতাব্দীর শেষ এবং বিংশ শতাব্দীর সূচনা লগ্ন হতে বাংলার মূল ভারতীয় সনাতন ধর্মের বিভিন্ন জাতি তথা নম'জাতির স্মরণীয় শিক্ষিত মানুষেরা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের আধুনিক নামকরণ'কৃত হিন্দুধর্মে উন্নীত হওয়ার নামে স্বর্ধম পরিত্যাগ করে হিন্দুধর্মরূপ আগুনে আত্মাহুতি দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছিলেন। 1905 সাল হতে ব্রাহ্মণ্যধর্মের বর্ণবাদীরা বাংলার ব্রিটিশ ভারতের আইন সভায় মনোনীত সদস্য (M L C) তালিকায় সংখ্যালঘু হওয়ার সংকেত অনুভব করেন। এতদিন তারা- ১৮৬১ সালের ভারত শাসন আইনের বলে আইন সভায় সমস্ত জাতির মনোনীত প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে আধিকারিক হয়ে ব্রিটিশ সরকারের সমস্ত সুবিধা ভোগ করে আসছিল। কিন্তু, ১৯০৫ সালে আগা খাঁন বুঝতে পারেন যে- ভারতীয় প্রত্যেক জনগোষ্ঠীদের অভাব অভিযোগ দাবিদাওয়া তুলে ধরার জায়গা একমাত্র রাজ্যের আইন সভা এবং সেখানে প্রতিনিধিত্ব করছে একমাত্র ব্রাহ্মণ্য ধর্মের হিন্দুরা। এই অপকৌশল বুঝতে পেরে আগা খাঁন ভ্রাতৃদ্বয়ের নেতৃত্বে মুসলিম সমাজ আইন সভায় মনোনীত সদস্যের সংখ্যা জনসংখ্যা অনুপাতে ব্রিটিশ সরকারের কাছে দাবি করে বসেন। এই সময় বাংলার মূল ভারতীয় বহুজন সমাজের মানুষদেরও চৈতন্যের বোধোদয় ঘটতে থাকে এবং ব্রিটিশ সরকারও বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করে মূল ভারতীয় বহুজনদের বিভিন্ন ধরণের অধিকার দিতে থাকেন।  ফলে, হিন্দুরা আইন সভায় একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিয়ে নীতি নির্ধারকের ভূমিকা গ্রহণ করে আসছিলেন, সহসা তারা সংখ্যালঘু হওয়ার সংকেত অনুভব করলেন। এজন্য, কি করে আইন সভায় মনোনীত প্রতিনিধি সদস্য এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায়- তার জন্য নতুন প্রণালীর ক্ষেপণাস্ত্র "আমরা সবাই হিন্দু" এই মৌখিক শ্লোগান প্রয়োগ করে বাংলার আকাশ বাতাস মুখরিত করে তুলে ছিলেন। যাতে, মুসলিম খ্রিস্টান বাদে সমস্ত মূল ভারতীয় বহুজন সমাজের সমস্ত জাতির প্রতিনিধি একমাত্র ব্রাহ্মণ্য ধর্মের হিন্দুগণ দখল করতে পারে- তারই নয়া ছলনার প্রণালী এই হিন্দুধর্মীয় হিন্দুত্বের শ্লোগান।  ফলতঃ, "আমরা সবাই হিন্দু" এই মৌখিক শ্লোগানে মোহিত হয়ে বাংলার মূল ভারতীয় সনাতন ধর্মের বিভিন্ন জাতের মানুষেরা অস্পৃশ্য শূদ্র পঁচাশূদ্র চণ্ডাল দাস অচ্ছুৎ দলিত ইত্যাদি হীনবাচক জাতির তকমা হতে নিষ্কৃতি লাভ করতে হিন্দুধর্মের ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় কায়েস্থ বৈশ্য হওয়ার দাবি করে ব্রিটিশ সরকারের সেনসাস্ আধিকারিকের নিকট আবেদনপত্র দাখিল করতে লাগলেন।  তারা, শিক্ষা ক্ষেত্রে, সামাজিক ক্ষেত্রে, চাকুরীক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্রে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের হিন্দুদের নিকট থেকে কথায় কথায় শূদ্র পঁচাশূদ্র অস্পৃশ্য চন্ডাল চাঁড়াল দাস মুচি মেথর ইত্যাদি হীনবাচক গালাগালি শুনতে শুনতে তিতিবিরক্ত, তার থেকে মুক্তি পেতে ব্রাহ্মণ্য ধর্মীদের নতুন ফরমূলার "আমরা সবাই হিন্দু" এই লোভনীয় প্রস্তাবে হিন্দুধর্মে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। এই সমস্ত জাতিগুলির আধুনিক হিন্দুধর্মে আত্মাহুতি দেওয়ার আবেদনপত্র সেন্সাস দপ্তরে এতই বেশি সংখ্যক জমা পড়েছিল যে,- আবেদনপত্রের সংখ্যা অঙ্কের হিসাব না কষে দাঁড়িপাল্লার মাপকাঠিতে ওজন করা হয়েছিল। পরিমাপে দেড়মণ ওজন হয়েছিল {-1911, সেনসাস রিপোর্ট} !  বহুবিভক্ত বাংলার আদি জাতিগুলী উন্নত জাতে উঠতে - নমঃগণ- নমঃব্রাহ্মণ, পৌঁন্ড্রগণ-  ক্ষত্রিয়, রাজবংশীগণ ক্ষত্রিয়,  চাষীকৈবর্তগণ- কায়স্থ ইত্যাদি দাবী করেছিলেন। ব্রাহ্মণ্য ধর্মিদের 'আমরা সবাই হিন্দু' এবং পাশাপাশি আরও লোভনীয় প্রস্তাব (অফার) সর্বজাতি সমন্বয়ে হিন্দুদের সহিত পংক্তি ভোজনের সুব্যবস্থার অপকৌশলও অবলম্বন করে ছিলেন! (1920 /21 সাল)।

       মূল ভারতীয় সনাতন ধর্মের বহুজন সমাজের মানুষদের আর্য ব্রাহ্মণ্যধর্মে উন্নীত হওয়ার নামে  হিন্দুধর্ম রূপ আকর্ষণীয় পুরস্কার তাঁরা সাতশত বৎসরের মধ্যে লাভ করতে পারেন নাই।  যাঁরা, আদিশুর ও বল্লাল সেনের ব্রাহ্মণ্য ধর্মের হাজার অত্যাচার সহ্য করেও বনজঙ্গল বিল বাদাড়ে লুকায়ে নিজস্ব কৃষ্টি সংস্কৃতি ভাষা ঐতিহ্য ইতিহাস এবং ধর্ম ফল্গু ধারার মত বহন করে চলে আসছে, তাঁদেরই স্মরণীয় শিক্ষিত ব্যক্তিগণ 1905 সাল হতে "আমরা সবাই হিন্দু" এই মৌখিক শ্লোগানে আকৃষ্ট হয়ে হিন্দুত্বের মোহে ব্রাহ্মণ্যধর্মে ডুবে নম'জাতির পরিবর্তে "নমঃব্রাহ্মণ" নামে উন্নত জাতে উঠতে একপ্রকার পাগল হয়ে উঠলেন। এমনকি, গুরুচাঁদ ঠাকুরের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও গুরুচাঁদ ঠাকুরের হাতে গড়া সেই সব শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ হিন্দু হওয়ার আবেদন পত্রে নম'দের আচার আচরণ ব্রাহ্মণের মত দাবি করে ১০টি বিধি সংযুক্ত করে ব্রিটিশ সেনসাস বিভাগে আবেদনপত্রে জমা দিয়েছিলেন। আমাদের সমাজের অধিকাংশ স্মরণীয় শিক্ষিত ব্যক্তিগণ হয়ে উঠলেন এই আধুনিক হিন্দুধর্মের কট্টর সমর্থক! মহাত্মা শশিবাবুও ব্যতিক্রমী ছিলেন না! তাঁকে সংযত করতে স্বয়ং গুরুচাঁদ ঠাকুরকেও আসরে নামতে বাধ্য করা হয়েছিল!  কিন্তু, জাতির জনক গুরুচাঁদ ঠাকুর কতজনকে নিরস্ত করবেন? যেখানে সমস্ত  শিক্ষিত সমাজ, গণ্যমান্য মাতুব্বর গোছের বাবুরা হিন্দুত্বের কট্টর সমর্থক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন ? বলে রাখা ভালো শ্রীধাম ওড়াকান্দি ঠাকুর বাড়িতে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের দেবদেবতা পূজা এবং বৈদিক সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ হিন্দুধর্মে আত্মাহুতি দেওয়ার পরিণাম।

      তদানীন্তন বেশকিছু আক্ষরিক শিক্ষায় শিক্ষিত, স্বশিক্ষিত গণ্যমান্য মাতুব্বর গোছের বাবু মানুষের ঐতিহাসিক ভুলে- সেই যে বাংলার মূল ভারতীয় সনাতন ধর্মের জাতিগুলী ব্রাহ্মণ্য তন্ত্রের ষড়যন্ত্রে আধুনিক হিন্দুধর্মের হিন্দুত্বে ডুবে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের খোয়াড়ে ঢুকে গেল- আর, সেই মহাশৃংখলের বন্ধন খুলে মুক্তির পথ চিরতরে এই মূল ভারতীয় সমাজ হারিয়ে ফেলে! ব্রাহ্মণ্য ধর্মের জাতিবিদ্বেষ বর্ণবাদের শাসন শোষণ নিপীড়ন নির্যাতন অত্যাচার সবাই জ্ঞাত, কিন্তু, হিন্দুধর্মের নামে লোভনীয় প্রস্তাবে জাতে ওঠার পরিণাম যে আরো মারাত্মক ভয়ানক তা, সেসব শিক্ষিত মস্তিষ্ক স্থানীয় ব্যক্তিদের ভাবনায় আসেনি। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের ঘাতকরা মূল ভারতীয়দের সরাসরি আঘাত হানতো, আর, হিন্দুত্বের ঘাতকরা পরমবান্ধব সেজে আদর করে কোলে তুলে হত্যা করার সুব্যবস্থা পাকাপাকিভাবে বন্দোবস্ত করে রেখেছে! এই প্রণালীতে সমস্ত মূল ভারতীয় বহুজন সমাজের বিভিন্ন জাতিগুলি সংরক্ষণের ব্যবস্থায় পাকাপাকি ভাবে গোলাম পরিণত হচ্ছে।  সেই থেকে মূল ভারতীয় সনাতন ধর্মের সর্বস্তরের মানুষেরা হিন্দুত্বের মারাত্মক অন্ধবিশ্বাসে ব্রাহ্মণ্যধর্মে এতই আত্মবিস্মৃত এবং আত্মনিমজ্জিত যে- কাউকে যদি প্রশ্ন করা হয়-  তুমি কি হিন্দু,  তিনি উল্টা প্রশ্ন করে বসেন- তা'হলে আমি কি মুসলমান-? বর্তমানে হিন্দু ধর্ম বলে যাকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করে চলেছি তা মূলতঃ হিন্দুধর্ম নয় ব্রাহ্মণ্যধর্ম ! হিন্দুধর্মের বস্তায় ব্রাহ্মণ্য ধর্মের চাউল! 


               কঠিন সত্য এই যে- সেই হিন্দুত্বের প্রভায় প্রভাবিত হয়ে শ্রীশ্রী হরি লীলামৃত গ্রন্থও নতুনরূপে পুরাণ সাহিত্যের আলোকে আলোকিত হয়ে উঠেছিল তা, আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। 1912 সালে হরিবর সরকার মহাশয় কতৃক শ্রীমৎ তারক চন্দ্রের লিখিত বৈদিকবাদ বিরোধী শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের জীবন চরিত "শ্রীশ্রী হরিচাঁদ লীলাগীতি'র" সংস্কার বিন্যাস বিয়োজনকৃত সংযোজন প্রাক্কালে বৈদিক ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের পুরাণ সাহিত্যের অবতারবাদ অবতারণায় শ্রীশ্রী হরি লীলামৃত গ্রন্থ ব্রাহ্মণ্য তন্ত্রের পুরাণ সাহিত্যের আদলে রূপান্তরিত হয়ে উঠল !  দীর্ঘ তিন বৎসর কঠোর পরিশ্রম করে হরিবর সরকার মহাশয় শ্রীমৎ দশরথ বিশ্বাস মহাশয়ের সহযোগিতায় 1915 সালের মাঝামাঝি নিষ্ঠার সাথে সংস্কার কার্য সমাধান করেছিলেন! লীলামৃত গ্রন্থ ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পুরাণ সাহিত্যের প্রায় সমকক্ষ হয়ে উঠল। এর পেছনের মৌলিক কারণ যে,- নম'জাতির স্মরণীয় শিক্ষিত সমাজ তাদের পূর্বের সনাতনধর্ম এবং শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের প্রদত্ত সনাতন ধারার সূক্ষ্ম তত্ত্বে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ব মানবতাবাদী মতুয়া ধর্ম চিরতরে বিসর্জন দিয়ে হিন্দুধর্মে আত্মাহুতি দেওয়ার ফলশ্রুতি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই হিন্দুত্বের খোলা দরজা দিয়ে মূল ভারতীয় বহুজন সমাজ ও নম'জাতির মস্তিস্কস্থানীয় স্মরণীয় শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ জাতির স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, ভাষা, ঐতিহ্য, ইতিহাস, ধর্মীয় পরিচয় এবং জাতির পরিচয় (আইডেন্টিটি) চিরতরে  হারিয়ে ফেলে ! সেই হিন্দুত্বের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে ও স্মরণীয় শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গের ঐকান্তিক ইচ্ছায় এবং শাস্ত্র প্রচার সমিতি নির্দেশ অনুসারে শ্রী হরিবর সরকার মহাশয় কতৃক শ্রীশ্রী হরি লীলামৃত মহা গ্রন্থখানি স্ববিরোধী তত্ত্ব তথ্যে হিন্দু মতুয়া মতবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়ে উঠল। কত গোঁজামিল উপসর্গ লক্ষনীয়- বৈশ্য দস্যুর উপাখ্যান শিরোনামের অধ্যায়টি ব্রাহ্মণ দস্যুর বৃত্তান্ত থাকলেও শিরোনামে বৈশ্য দস্যুর উপাখ্যান বলে নামাঙ্কিত হল! হিন্দুত্বে ডুবে যাওয়ার প্রবণতায় পরবর্তীকালের শ্রীশ্রী হরি-গুরুচাঁদ চরিত্র সুধাও অলৌকিক অবতারতত্ত্বে প্রবলভাবে প্রকট হয়ে উঠল!  শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ মাহাত্ম্য এবং শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ চরিত গ্রন্থও হিন্দুত্বের অবতারতত্ত্ব প্রতিষ্ঠায় একেবারে বঞ্চিত করে নাই ! লক্ষ্য করা যায়- এর কিছু পরে পরে শ্রীশ্রী হরি লীলামৃত গ্রন্থ পুনঃ মুদ্রণ প্রাক্কালে রাঢ়দেশীয় রামদাসও মৈথিলী ব্রাহ্মণে পরিণত হল!  রাঢ়দেশ আর মিথিলা যে এক নয়- এই কাণ্ডজ্ঞানটুকুও হারিয়ে ফেলে বসে আছে ! এসব অশুদ্ধ বিকৃত মস্তিষ্কপ্রসূত অনৈতিহাসিক তথ্য সংস্কারবাদী পণ্ডিত লোককবি শ্রীমৎ তারকচন্দ্র সরকার মহাশয়ের নামে চালানো হয়!

           জ্ঞাতব্য বিষয় হল-  নিরক্ষর সমাজ ভুল করলেও তার দ্বারা সমাজের বড় কোনো ক্ষতিসাধন সম্ভবতঃ হয় না।  কিন্তু, পরিতাপের বিষয় এই যে - আক্ষরিক জ্ঞানসমৃদ্ধে শিক্ষিত সমাজ ভুল করলে তার মাশুল যুগ যুগ ধরে সমগ্র জাতিকেই গুনতে হয়। নম'সমাজের মতুয়া আদর্শে সুশিক্ষিত স্মরণীয় ব্যক্তিবর্গ নিজস্ব সনাতন ধারার ঐতিহ্য, শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের মানবতাবাদী মতুয়া মতাদর্শ চিরতরে বিসর্জন দিয়া ব্রাহ্মণ্য ধর্মের উন্নত জাতে উন্নীত হওয়ার নামে নিজেদের জাতির পরিচয়, ধর্মীয় পরিচয় (আইডেন্টিটি) খোয়ায়ে আগত প্রজন্মকে মাঝিহীন তরীর ন্যায় উত্তাল সমুদ্রে ডুবায়ে মারিবার পথ প্রশস্ত করে রেখে গেছেন। হয়তোবা, একশ্রেণীর প্রিয় আমাত্ব-বর্গ এই অপ্রিয় সত্যকথা প্রকাশে সঠিক দুঃসাহসিক পদক্ষেপ না বলে আমার মুন্ডপাত করতে পিছপা হবেন না!  

       শিক্ষিত সমাজের কিয়দাংশ- যাদের নিরক্ষর অর্ধশিক্ষিত গামছা পরা সাধু গোসাই পাগল মনুবাদী বলিয়া স্বল্পবিস্তর তিরস্কার করে থাকেন- তাঁরা, নিজের জাতির পরিচয় ধর্মীয় পরিচয় বোঝার চেষ্টা করে ছিলেন, মতুয়াধর্ম ও নম'সমাজের উন্নতিতে নীরবে নিভৃতে কাজ করে ছিলেন এবং বর্তমানেও চলেছেন। তাঁরা সরল সহজ ভক্তি বিশ্বাসে শিক্ষিত মানুষদের কথা মেনে নেন। কিন্তু, শিক্ষিত সমাজ পূর্বে এবং বর্তমানেও অর্ধহিন্দু তালিকায় নাম নথিভুক্ত করে হিন্দুধর্মের দলিত দাস শূদ্র অস্পৃশ্য পতিত হয়েই অধিকার ফলাতে ব্যস্ত আছেন।  স্বতন্ত্র ধর্ম, স্বতন্ত্র পরিচয়, স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা, আত্মসম্মান, ন্যায্য অধিকারবোধ হারিয়ে ফেলছে। আর, তার মাশুল গুনতে গুনতে সমাজ আর শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়ানোর শক্তিসাহস কোনোদিন দেখাতে পারে নাই। সরল সহজ সাধারণ মতুয়া নম'সমাজের জাতির পরিচয়, ধর্মীয় পরিচয়, ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ইতিহাস বিস্মৃতির অতলে হারানোর দায়ভার গণ্যমান্য মাতুব্বর শিক্ষিত সমাজকেই বহন করতে হবে। এবং, বর্তমানে যেসব শিক্ষিত স্বশিক্ষিত মতুয়াচার্য সংঘাধিপতি বিভিন্ন নামধারী ব্যক্তিবর্গ শ্রীমৎ তারক চন্দ্রের যুগান্তকারী সৃষ্টির পদক্ষেপে বৈদিকবাদ ব্রাহ্মণ্যবাদ বৈষ্ণববাদ বিরোধী শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের বিশ্ব মানবতাবাদী সুক্ষ্ম সনাতনে আশ্রিত স্বাধীন স্বতন্ত্র মতুয়া ধর্মকে হিন্দুধর্মের শাখা, শুদ্ধবৈষ্ণব মতবাদ বলে কালিমালিপ্ত করে চলেছেন - আগত শিক্ষিত সমাজ তাদের ক্ষমা করলে মূল ভারতীয় মানুষদের সনাতন ধর্ম  এবং মতুয়া ধর্মের ইতিহাসের সলিল সমাধি ঘটবে।

কোন মন্তব্য নেই: