ম্যাচো ম্যানস সিগারেট, স্যার হিল ও স্যার ডল
ওয়েন ম্যাকলারেন, ৫২ বছর। মৃত্যুর কারণ ফুসফুসের ক্যানসার।
এরিক লসন, ৭২ বছর। মৃত্যুর কারণ ফুসফুসের ক্রনিক রোগ।
ডেভিড ম্যাকলীন, ৭৩ বছর। মৃত্যুর কারণ ফুসফুসের ক্রনিক রোগ ও ফুসফুসের ক্যানসার।
একটি আমেরিকান সিগারেট কোম্পানি ১৯২৪ সালে মহিলাদের জন্য একটি সিগারেট ব্র্যান্ড বাজারে ছাড়ে। সেটি বিশেষ চলছিল না। ত্রিশ বছর পরে বিজ্ঞাপনের আমূল পরিবর্তনের ধাক্কায় ঐ সিগারেটটিই হল পরম পুরুষালী, মাচো ম্যানের হাতে উঠল সেই পৌরুষপূর্ণ ভোগ্য। ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৭—দুবছরের মধ্যে ঐ ব্র্যান্ডের সিগারেটের বিক্রি বেড়ে হল চারগুণ—৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার।
সিগারেটের নতুন বিজ্ঞাপনে স্মোকারদের ম্যাচো ম্যান ইমেজ তৈরি হল। এল নতুন নতুন মুখ। যথা ডেভিড ম্যাকলীন, এরিক লসন, ওয়েন ম্যাকলারেন। দ্য কাউবয় হিরো’জ। এই তিনটে নাম লেখার প্রথমেই দিয়েছি, আর এদের মধ্যে দুজনের ছবি দিয়েছি নীচে।
সিগারেটের হিরো। সিগারেটের শিকারও। আজ আমরা জানি যে রোগে এরা মারা যান সেই রোগগুলো সবই সিগারেট খেয়ে হয়। কিন্তু বৈজ্ঞানিক সত্য আদালত-মান্য হতে গেলে অনেকগুলো ধাপ পেরিয়ে আসতে হয়। তাই ডেভিড ম্যাকলীন ফুসফুসের ক্যান্সারে মারা যাবার পরে তাঁর বিধবা স্ত্রী সিগারেট কোম্পানির বিরুদ্ধে ক্যালিফোর্নিয়ার আদালতে মামলা করেন, কিন্তু হেরে যান। সিগারেট থেকে ঐ রোগ হয়েছে, বা বিজ্ঞাপনে সিগারেট ফুঁকতে বাধ্য হবার জন্য রোগ—এসব মানেনি ক্যালিফোর্নিয়া কোর্ট।
১৯৯০ তে ফুসফুসে ক্যানসার ধরা পড়ার পরে ওয়েন ম্যাকলারেন ধূমপান বিরোধী প্রচারে নামলেন—নীচের ছবিতে দেখবেন একই ফ্রেমে পাশাপাশি রয়েছেন সিগারেটের বিজ্ঞাপনে উজ্জ্বল ম্যাকলারেন আর বিছানায় মৃত্যুর কাছাকাছি ম্যাকলারে্ন—অ্যান্টি-স্মোকিং প্রচারের জন্য তোলা ছবি। আর প্রথম ছবিটি এরিক লসনের।
শেষ পর্যন্ত সিগারেট কোম্পানিকে কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছিল। কেন দিতে হল তাই নিয়েই আজকের গল্প।
------------------------------------
স্যার অস্টিন ব্র্যাডফোর্ড হিল এবং স্যার রিচার্ড ডল। রিচার্ড ডল গণিতবিদ হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু কেম্ব্রিজের এন্ট্রান্স পরীক্ষায় আটকে যান, ভর্তি হন ডাক্তারি পড়তে। মেধাবী চিকিৎসাবিজ্ঞান গবেষক। আর ব্র্যাডফোর্ড হিল হতে চেয়েছিলেন ডাক্তার, কিন্তু ছোটবেলায় টিবিরোগের কারণে ভগ্নস্বাস্থ্য, ডাক্তারির চাপ সইবে না, তাই হয়েছিলেন গণিতবিদ। ১৯৪০ সাল নাগাদ গণিতবিদ হয়েও হিল ডাক্তারি নিয়ে অনেক গবেষণা করেন। টিবি-তে ওষুধের ভূমিকা, আর্সেনিক নিয়ে কাজ করলে ক্যানসার হয় কিনা—এইসব গবেষণা। এরকম সময়ে হিল সাহেবের নজর পড়ল ফুসফুসের ক্যান্সার রোগটার ওপরে। রোগটা তার আগের দুই দশকে ছয়গুণ বেড়ে গেছে! কিন্তু কেন বেড়েছে কেউ জানে না।
হিল বললেন ডল সাহেবকে, আরে, দেশের হল কী? ফুসফুসের ক্যান্সার হঠাৎ এত বাড়ল কেন? দুজনে মিলে মাথা ঘামিয়ে বের করলেন মোটরগাড়ির দূষণের সঙ্গে বা ধূমপানের সঙ্গে এর একটা সম্পর্ক থাকতে পারে। কিন্তু সম্পর্ক থাকতে পারে বললেই তো হবে না, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ কোথায়? এর জন্য তো ওষুধের কার্যকারিতা প্রমাণের মতো কোনো রান্ডমাইজড কন্ট্রোলড ট্রায়াল বা আরসিটি করা যাবে না। (পাদটিকা ১)
হিল সাহেবের প্রথমে মনে হয়েছিল, মোটরগাড়ির দূষণের সঙ্গে ফুসফুসের ক্যান্সারের সম্পর্ক বেশি ঘনিষ্ঠ। কিন্তু মোটরগাড়ির দূষণ দ্বারা কে কতটা আক্রান্ত হচ্ছেন সেটা কীভাবে মাপা যাবে? কে ধূমপায়ী আর কে ধূমপায়ী নন, সেটা চিনতে কিন্তু কোনো অসুবিধা নেই। তাই ধূমপানের সঙ্গে ফুসফুসে ক্যান্সারের সম্পর্ক আছে কিনা সেটা দেখাটাই তাঁরা প্রথম কর্তব্য স্থির করলেন।
ধূমপানের সঙ্গে ফুসফুসে ক্যান্সারের সম্পর্ক ধরার কাজে যে সমীক্ষা করতে হবে তার জন্য চাই বড় দুটো গ্রুপ—যাদের একদল ধূমপান করে, আরেকদল ধূমপান করে না। দুই দলে অনেক মানুষ চাই, যাদের জীবনযাত্রা অন্য সব বিষয়ে একই রকম, তফাৎ কেবল এই ধূমপানের ব্যাপারটায়। তাদের কয়েক বছর ধরে নিয়মিত নজরদারিতে রাখতে হবে, সমস্ত শারীরিক সমস্যার খবর লিপিবদ্ধ করে বিশ্লেষণ করতে হবে। যদি দেখা যায় ধূমপান করা মানুষদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যান্সারের হার সত্যিই বেশি, তাহলে বুঝতে হবে ধূমপান সম্ভবত দায়ী। এইধরনের সমীক্ষা হল কয়েক বছর ধরে চলা এক রাজসূয় যজ্ঞবিশেষ—এর টেকনিকাল নাম প্রস্পেকটিভ কোহর্ট স্টাডি। আমাদের দেশ হলে এমন সমীক্ষা আদৌ করা সম্ভব হত কিনা সন্দেহ, কারণ আমাদের দেশে এখনও মেডিকেল নথী কেন্দ্রীয়ভাবে ঠিকমতো রাখার ব্যবস্থা তেমন নেই।
এমন নথী ওদেশে, মানে বৃটেনেও বিরল। কিন্তু হিল অনেক ভেবচিন্তে দেখলেন, বৃটেনের ডাক্তাররাই তো রয়েছেন। ১৯৫১ সালে বৃটেনে ত্রিশ হাজার ডাক্তারকে নিয়ে পঞ্চাশ বছর ধরে সমীক্ষা চালানোর ছক কষে ফেললেন তাঁরা। ডাক্তারদের দুটো দলে ভাগ করলেন—একদল ধূমপান করেন, আরেকদল করেন না। ডাক্তার ধূমপায়ীরা ঝুঁকি থাকতেও পারে সেটা জেনে স্মোক করেন, চট করে তা ছাড়বেন না। আর যাঁরা ধূমপায়ী নন তাঁদের মাঝবয়সে ধূমপান শুরু করার সম্ভাবনা কম। ডাক্তারদের একবার এই সমীক্ষাতে রাজি করাতে পারলে তাঁরা নিজেদের ইচ্ছাতেই শেষ পর্যন্ত থাকবেন, কারণ ফুসফুস ক্যান্সার বাড়ার কারণ জানা তাঁদের পেশার জন্য দরকার। এছাড়াও বৃটিশ ডাক্তারদের মধ্যে রোজগার, জীবনযাত্রা ইত্যাদির খানিকটা সাম্য আছে—এরকম হতে পারে না যে যাঁরা ধূমপান করেন তাঁরা বেশি কৃমি বা অপুষ্টিতে ভোগেন। অর্থাৎ এঁদের মধ্যে ধূমপান ও ক্যান্সারের যোগসূত্র থাকলে তা অন্য কোনো অজ্ঞাত তৃতীয় বিষয়ের জন্য হবার কথা নয়। (তথ্যসূত্র ১)
পঞ্চাশ বছর ধরে সমীক্ষা চলবে এমন কথা ছিল। তার মানে সমীক্ষার ফল প্রকাশ হবার কথা ছিল ২০০০ সাল নাগাদ। কিন্তু প্রথম বছরেই ফলাফল এতোই উল্লেখযোগ্য যে বৃটিশ মেডিক্যাল জার্নালে প্রাথমিক রিপোর্ট ছাপা হল। তিন বছরের মধ্যেই সমীক্ষায় খুব নির্দিষ্ট ফলাফল আসতে শুরু করল। ত্রিশ হাজার ডাক্তারের মধ্যে ৩৭ জন তিন বছরে ফুসফুসের ক্যান্সারে মারা যান, আর তাঁদের প্রত্যেকেই ধূমপায়ী। শুধু তাই নয়, ধূমপান হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা অনেক বাড়িয়ে দেয় এটাও প্রমাণিত হয়ে গেল। (প্রাথমিক রিপোর্ট -- তথ্যসূত্র ২)
সিগারেট ইন্ডাস্ট্রি নানা রকম পদ্ধতির ফাঁকফোকর খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। হাজার হোক, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যবসা। বৃটিশ ডাক্তাররা নিজেরা এই সমীক্ষার গিনিপিগ ছিলেন। তাঁরা একেবারে প্রথম থেকেই সমীক্ষার পদ্ধতি সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন। তাই সিগারেট ইন্ডাস্ট্রি যখন আইনি কচাকচি করছে তখন বৃটিশ চিকিৎসকেরা সিগারেটের বিরুদ্ধে বলতে শুরু করলেন।
এর মধ্যে ১৯৫৪ সালে একলক্ষ নব্বই হাজার আমেরিকান নাগরিকদের নিয়ে আরেকটি সমীক্ষার ফল প্রকাশিত হল, তাঁর ফলাফল বৃটিশ ডক্টরস’ সার্ভে-র অনুরূপ (পাদটীকা ২)। কীভাবে ধূমপান থেকে ক্যান্সার হতে পারে তার সম্ভাব্য উত্তরও দ্রুত মিলতে শুরু করল। পরীক্ষাগারে তামাকের ধোঁয়া থেকে পাওয়া আলকাতরার মতো জিনিসটি ইঁদুরের চামড়ায় লাগালে সেখানে ক্যান্সার হতে দেখা গেল। আবার হার্ট অ্যাটাক, ক্যান্সার, ফুসফুসের অন্যান্য রোগ মিলিয়ে মোট মৃত্যুর হার হিসেব করে দেখা গেল, আমেরিকা-ইউরোপের ৩৯ বছর থেকে ৬৯ বছর বয়সী মানুষদের মধ্যে অধুমপায়ীদের মৃত্যুহার বেশ কম। মোটামুটি শতকরা ১৫ জন অধূমপায়ী মানুষ এই বয়সে মারা যান, অথচ শতকরা ৪৩ জন ধূমপায়ী এই বয়সে মারা যান। অর্থাৎ শতকরা ২৮ জনের মৃত্যুর পেছনে ধূমপানের অবদান থাকার যথেষ্ট সম্ভাবনা।
ব্র্যাডফোর্ড হিল এবং রিচার্ড ডল চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রথম প্রস্পেকটিভ কোহর্ট স্টাডি করলেন, এমন নয়। এর আগেও এরকম সমীক্ষা হয়েছিল। কিন্তু এ ধরনের সমীক্ষার মধ্যে এটি সবথেকে নাড়া দেবার মতো ঘটনা। খুব দ্রুত পাশ্চাত্যের নানা দেশে ধূমপান ও তামাক বিরোধী আইনগুলো এল।
দুঃখের বিষয় এর ফলে সিগারেট কোম্পানিগুলো আরও বেশি করে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমাদের মতো দেশগুলোর ওপর, যেখানে আইন প্রণয়ন হল দেরীতে, আর আইনের প্রয়োগ হল আরও আলগাভাবে—আমাদের দেশ এখন তামাক-জনিত ক্যান্সারে বিশ্বে শীর্ষের দিকে।
সেটা নিয়ে কথা হবে পরের কোনো সময়।
পাদটিকা
(১) ওষুধ কাজ করে কিনা সেটা জানার জন্য রোগীদের দুটো দলে ভাগ করে, তাদের একদলের ওপর ওষুধ প্রয়োগ করে আর অন্যদলের ওপর ওষুধের মতো কিন্তু আসলে অকেজো জিনিস দিয়ে, কিছুদিন পরে তুলনা করা যায়। যদি ওষুধ পাওয়া রোগীরা অকেজো জিনিস পাওয়া রোগীদের চাইতে গড়ে বেশি উপকৃত হয় তাহলে বুঝতে হবে ওষুধটা ঐ রোগে কাজের। নইলে বুঝতে হবে ঐ রোগের জন্য ওটা ওষুধ নামের যোগ্য নয়। একে বলে রান্ডমাইজড কন্ট্রোলড ট্রায়াল—সংক্ষেপে আরসিটি।
(২) স্যার হিল ও স্যার ডল-এর সমীক্ষাটি ‘বৃটিশ ডক্টরস’ সার্ভে’ বলে আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রে বিখ্যাত। জার্নাল অফ আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন-র ইতিহাসে এই সমীক্ষাটি একটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলে স্বীকৃত।
চিত্র পরিচিতি (কেবলমাত্র অব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য)
১। এরিক লসন— কাউবয় হিরো।
২। ওয়েন ম্যাকলারেন—সিগারেটের বিজ্ঞাপনে আর বিছানায় মৃত্যুর কাছাকাছি। ধূমপান বিরোধী প্রচারে তোলা ছবি।
৩। স্যার ব্র্যাডফোর্ড হিল এবং স্যার রিচার্ড ডল।
তথ্যসূত্র
1. Trick or Treatment: Alternative Medicine on Trial. Simon Singh & Edzard Ernst. Corgi Books, 2009.
2. Smoking and Carcinoma of the Lung. Richard Doll and A. Bradford Hill. Bristish Medical Journal. 1950 Sep 30; 2(4682): 739–748. https://www.bmj.com/content/2/4682/739 accessed on 28 June 2020
3. India Against Cancer পোর্টাল http://cancerindia.org.in/tobacco-related-cancer/ accessed on 28 June 2020.
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন