আসুন আজ ডক্টর বিধান চন্দ্র রায়ের জন্ম দিবসে তাঁর প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করি এবং আপামর বাঙালি ও বাংলার সকল স্তরের মানুষের পক্ষে জানাই শতকোটি প্রনাম ।
বাংলার নবরূপকার বলতেই যে মানুষটির নাম ঠোঁটের ডগায় চলে আসে তিনি আর কেউ নয় , তিনি মহান চিকিৎসক, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও বাংলার মানুষের কাছের মানুষ, প্রানের মানুষ ও মনের মানুষ ডক্টর বিধান চন্দ্র রায় মহাশয় ।
বিধান চন্দ্র রায় বাংলার সনামধন্য রাজা প্রতাপাদিত্যের বংশধর । যিনি সম্রাট আকবরের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন । বাংলার গৌরবময় ইতিহাসে তাঁর নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য । সেই বংশের একজন অংশীদার হলেও বিধান চন্দ্রের পিতা প্রকাশ চন্দ্র এর ভাগ্য কোন বিষয় সম্মতি জোটে নি । পারিবারিক কলহ বিবাদ মামলা মোকদ্দমায় লিপ্ত হয়ে পড়ে রায় পরিবার এর উত্তরসূরিগন । প্রকাশ চন্দ্র কে নিজের ভিটে ছেড়ে বহরমপুরে চলে আসতে হয়।
তিনি সারা জীবন ধরে লড়াই করে জীবন সংগ্রামে নিজেকে সর্বদা ব্যস্ত রাখেন পরিবারের জন্য । তাঁর এই জীবন সংগ্রামের সাথী হিসাবে তিনি পাশে পেয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী অঘোরকামিনী দেবী কে । বিধান চন্দ্র রায় তাঁদের কনিষ্ঠ পুত্র । তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১লা জুলাই ১৮৮২ সালে। দুই কন্যা ও তিন পুত্রের জননী অঘোরকামিনী দেবী কে খুব কষ্টের মধ্যে দিন কাটাতে হয়েছিল । বিধান চন্দ্রের জীবনে তাঁর পিতা মাতার চিন্তাধারার বিশেষ প্রভাব পড়েছিল । বিধান চন্দ্র খুব ছোট বেলা থেকেই যে শিক্ষা পেয়েছিলেন তাঁর পিতা মাতার কাছ থেকে তা ভবিষ্যতে তাঁর জীবনে আশীর্বাদ এ পরিনত হয় ।
একদিকে মানব দরদী চিকিৎসক অন্য দিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী (১৯৪৮-১৯৬২)। তাঁর কর্মজীবন খুবই বর্ণময় । স্বাধীন ভারতের একজন প্রথম সারির নেতা । শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয় তাঁর প্রভাব প্রসারিত ছিল দিল্লি পর্যন্ত । ভারতবর্ষের রাজ্য ও কেন্দ্র দুই স্থানেই ছিল তাঁর সমান কদর । তিনি পন্ডিত নেহেরুজীর ঘনিষ্ট বন্ধু হিসাবেও রাজনৈতিক মহলে পরিচিত ছিলেন । ১৯৪৮ সালে রাজ্যভার গ্রহণ করার পর থেকে তাঁকে সম্মুখীন হতে হয়েছিল সমস্যা বহুল জটিল রাজনীতির । প্রথম সমস্যা - ইস্ট পাকিস্থানের বাঙালিদের পুনর্বাসন নিয়ে । এই সমস্যা খুবই ভয়াবহ রূপ ধারণ করে । তিনি কোনমতে সেই সমস্যা থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন । উদ্বাস্তু পুনর্বাসন সমস্যার কিন্তু পুরোপুরি সমাধান হয়নি । কেন্দ্র ও রাজ্যের বোঝাপড়ার মধ্যে দিয়ে সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া হয় । বিধান চন্দ্রের চেষ্টায় কোন ত্রুটি ছিল না । অনেকটা অসহায় অবস্থায় তাকে অনেক সমালোচনা মেনে নিতে হয় দলের স্বার্থে । সেই সময় তাঁর পাশে ছিলেন প্রফুল চন্দ্র সেন । তিনি মুখ্যমন্ত্রীর পদে বসে সারাটা জীবন বাংলার উন্নতির কথা ভেবেছিলেন । খাদ্য সমস্যা, পরিবহন সমস্যা, শিল্পায়ন, চিকিৎসা ব্যবস্থা, শিক্ষা, খেলাধুলার জগৎ সব কিছু নিয়ে ভেবেছিলেন । তিনি যে বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন তার স্বার্থক রূপদানে সর্বদা সচেষ্ঠ ছিলেন । দুর্গাপুর শিল্প নগরী, কল্যাণী টাউন শীপ, সল্টলেক , হরিনঘাটা ফার্ম, ওরিয়েন্টাল গ্যাস কোম্পানি, ভূতল রেলওয়ে, দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে, আকাওয়া গঞ্জেস (গঙ্গা জল পরিশোধন প্রকল্প) প্রভৃতি নানা দিকে ছিল তাঁর নজর । ১৯৫০ সালে ভূতল রেলওয়ে এর জন্য ফ্রান্স থেকে একদল ইঞ্জিনিয়ার কলকাতা আসেন । কিন্তু সেই সময় পরিবহন সমস্যা এতটাই খারাপ অবস্থায় ছিল যে তিনি সেই পরিমান অর্থ ভূতল রেলওয়ের জন্য বরাদ্দ করতে সক্ষম হন নি । নতুন শিল্প গঠনের ক্ষেত্রে বাঙালি যুবকদের তিনি সব সময় উৎসাহিত করতেন । চিকিৎসা জগতে তিনি গরিব মানুষের ভগবান ছিলেন । তিনি ব্যস্ততার মধ্যেও সময় বের করে ছুটে যেতেন তাঁর রোগীদের চিকিৎসার জন্য । অনেক উদাহরণ আছে তাঁর উদারতার । তিনি সিনেমা জগৎ কেও সমান ভাবে উৎসাহিত করেছেন এবং তার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন । সত্যজিৎ রায় যখন 'পথের পাঁচালি' করতে গিয়ে অর্থের অভাবে কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলেন তখন সরকারি ভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন । এই পথের পাঁচালি এনে দেয় বাংলার ঘরে অনেক খ্যাতি ও যশ ।
প্রথম বিধানসভা নিবার্চন হয় ১৯৫৭ সালে । বিধান চন্দ্র রায় পুনরায় নিবাচিত হন এবং দ্বিতীয়বার মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসেন । এর পূর্বে ১৯৫৬ সালে তাঁর উদ্যোগ্যে বিধান সভায় খসড়া পঞ্চায়েত আইন পেশ করা হয় । ১৯৫৭ সালের নিবাচনের পর এই আইন নানা বাধা অসুবিধার কারনে স্বার্থক রূপ পায় নি । তাঁর মন্ত্রিসভায় সিদ্ধার্থ শংকর রায় আইন মন্ত্রী হিসেবে কিছু দিন ছিলেন । অন্যান্য দের সাথে মতানৈক্যের কারনে তিনি অল্প দিন পরেও ইস্তফা দেন ।
১৯৬১ সালে রাষ্ট্রপতি ডক্টর সার্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনান তাঁকে ভারত রত্ন সম্মানে সন্মানিত করেন । ১৯৬২ সালের নির্বাচনে তিনি পুনরায় নির্বাচিত হন। তৃতীয়বার মুখ্যমন্ত্রীর আসন গ্রহণ করেন । সেই সময় তিনি শারীরিক ভাবে দুর্বল ছিলেন । ৩০ জুন ১৯৬২ তে তিনি ভীষণ ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন । পরের দিন তার জন্মদিন । বহু মানুষ আগের দিন থেকেই কলকাতায় আসতে শুরু করেন তাঁকে জন্ম দিনের শুভেচ্ছা জানাতে । এত অসুস্থতার মধ্যেও তিনি তাঁর কাছে আগত মানুষের ভালবাসার কথা চিন্তা করে তাঁর বাড়ির দরজায় একটি বার্তা লিখে নিজে সই করেন । সেটি তাঁর বাড়ির দরজায় আটকে দিতে বলেন । তাঁর সেই বার্তা :-
" According to the advice of the doctors it is not possible for me to receive personally your congratulations and good wishes on my birth day. I reciprocrate the same, and requests my friends to accept my heartful thanks and I pray for their well being..."
Bidhan Chandra Roy
এই মানুষটিকে জানতে হলে অবশ্যই পড়তে হবে Dr. B.C.Roy by K.P. Thomas . এই বই টির ফরওয়ার্ডিং এ জহরলাল নেহেরু লেখেন --
".....I am glad that Shri K.P.Thomas has written a biography of Dr. B.C.Roy, and I hope that many will profit by it..."
K.P.Thomas এর অনেকটাই বাংলা অনুবাদ বলা যেতে পারে আরও একটি বই " কর্মযোগী বিধানচন্দ্র" লেখক নন্দলাল ভট্টাচার্য ।
এ ছাড়াও অনেক বই আছে যেমন DR. BIDHAN CHANDRA ROY by Dr. Nitish Sengupta
আমার হাতে আরও একটি বই আসে যেটি খুবই মূল্যবান । বিধান চন্দ্র রায়ের সাথে তাঁর সহকারী হিসাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন Shri S.M. Bose তাঁর 'Two Decades With Dr. Roy And His Successors' বইটিতে ।
সকল পাঠক বন্ধুদের কাছে নিবেদন যদি ডক্টর বিধান চন্দ্র রায় কে জানতে চান ওপরের উল্লিখিত বই গুলো অবশই পড়বেন ।
তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে যদি আমার লেখার মধ্যে কোন ভুলত্রুটি থাকে আমাকে মার্জনা করবেন ।
বিনীত
তারক মিত্র।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন