বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২০

রাখিগড়ির জীন কি বলেছে। বিজ্ঞান বনাম আর্য আক্রমণ তত্ব

বিজ্ঞান বনাম আর্য আক্রমণ তত্ত্ব: রাখিগড়ির জিন কি বলছে?

ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব-এর পরিধির অন্তর্গত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মানুষ বহুবছর ধরে নানা রকম অধ্যয়ন করে আসছে। তাত্ত্বিক আলোচনার বাইরেও এ’সব বিষয়ে আমাদের কৌতূহল চিরকালীন। তা’ নিয়ে যথেচ্ছ প্রবন্ধ ও বইও লেখা হয়েছে। তবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না এসব বিষয় আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে নিজ নিজ যথার্থতার পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে উত্তীর্ণ হচ্ছে, ততক্ষন তাকে ‘সত্য’ হিসেবে মেনে নেয়া কষ্টকর, ক্ষেত্রবিশেষে বিপদজনকও বটে। সবক্ষেত্রে যে সেই সত্য উদঘাটন সম্ভব, তাও নয়, তবে তার প্রচেষ্টা করা যুক্তিবাদী প্রাণী হিসেবে আমাদের কর্তব্য। তেমনি একটি বহুল আলোচিত এবং বিতর্কিত ঐতিহাসিক (?) বিষয় ভারতভূমিতে  ‘আর্য আক্রমণ তত্ত্ব’ (Aryan Invasion Theory)।
জিনগত বিশ্লেষণ (Genetical analysis) আধুনিক বিজ্ঞানের একটি অতি শক্তিশালী অস্ত্র। সঠিক ঐতিহাসিক সময়কালের প্রেক্ষাপটে প্রাপ্ত নির্দিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক নমুনার উপর এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে এমন অনেক অজানা তথ্য নিখুঁতভাবে জানা সম্ভব, যা চর্চিত  ইতিহাসের অভিমুখ ঘুরিয়ে দিতে পারে।

আর্য আগমন তত্ত্ব প্রশ্নের মুখে

অতি সম্প্রতি দুই বিশ্ববিখ্যাত জার্নাল এ প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক নিবন্ধে এমন কিছু তথ্য প্রকাশ পেয়েছে, যার মাধ্যমে এখন সহজেই ভারতবর্ষে ‘আর্য আক্রমণ তত্ত্ব’, এমনকি ‘আর্য মাইগ্রেসন তত্ত্ব’, উভয়েরই বাস্তবিকতা নিয়ে গভীর প্রশ্নচিহ্ন উঠে এসেছে। তবে কি আমাদের ইতিহাস বইয়ে ভারতীয় সভ্যতার উৎপত্তি ও উন্মেষ নিয়ে যা পড়ানো হয়ে আসছে তা’ ভুল ?  তথ্য ও প্রমাণ সে দিকেই ইঙ্গিত করছে। তবে এই বিষয়ের গভীরে যাওয়ার আগে, আধুনিক মানুষের এই যাত্রা বা মাইগ্রেসন-এর  একদম শুরুর দিকের কিছু সাধারণ ব্যাপার ঝালিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
আজ থেকে প্রায় ৭০,০০০ বছর আগে আধুনিক মানব প্রজাতি, অর্থাৎ হোমো সেপিয়েন্স-এর কিছু দল প্রথমবার বিশাল সংখ্যায় আফ্রিকা ত্যাগ করে। আফ্রিকার ‘শিং’ বা উত্তরপূর্বদিক দিয়ে বেরিয়ে তারা চলতে থাকে এবং পশ্চিম এশিয়া হয়ে এসে পৌঁছায় ভারতে এবং সমুদ্রতট বরাবর তারপর পৌঁছায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে এবং অস্ট্রেলিয়ায়। আরো প্রায় বিশ হাজার বছর পরে মানুষ পৌঁছায় মধ্যেপ্রাচ্য, ইউরেশিয়া ও ইউরোপে, এবং তারও বহু পরে আমেরিকায়। অর্থ্যাৎ, আফ্রিকার পর ভারতবর্ষই ছিল মানুষের দ্বিতীয় বসতভূমি। যাইহোক, মানবসভ্যতার প্রথমদিকে, প্রস্তর যুগে মানুষ পশুপাখি শিকার করেই জীবন নির্বাহ করত। যারফলে যাযাবর বৃত্তি ছিল তার সহজাত। তারপরে শুরু হয় পশুপালন এবং আনুমানিক ৮,০০০ থেকে ৯,০০০ বছর আগে তারা কৃষিকাজের কলাকৌশল আয়ত্ত করা শুরু করে। কৃষিকাজ দেয় খাদ্য-সংস্হানের নিশ্চয়তা, ফলে এবার শুরু হয় স্থায়ী জনবসতি স্থাপনের।

ভারতের ভূমিপুত্ররাই এদেশে কৃষি আবিষ্কার করে

‘সেল (Cell)’ পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১২,০০০ বছর বা তার আগেই পশুশিকারী মানুষের একটা দল ভাগ হয়ে চলে যায় মধ্য এশিয়ার ইরানের দিকে, দ্বিতীয়টি চলে আসে প্রাচীন ভারতের সিন্ধু নদের অববাহিকায়। আজ থেকে প্রায় ৪,৫০০ থেকে ৭,৫০০ বছর (খ্রিস্টপূর্ব ২,৫০০-৫,৫০০) সময়কালের মধ্যে, আজকের উত্তর-পূর্ব আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রাপ্ত সিন্ধু তথা হরপ্পা সভ্যতা গড়ে তোলে এরাই। আজকের শুকিয়ে যাওয়া সরস্বতী নদীর তটে (ঘগ্গর-হাকরা বেসিন) অবস্থিত ‘ভিরানা’ শহর রেডিও কার্বন ডেটিং অনুযায়ী প্রায় ৮,০০০ থেকে ৯,৫০০ বছরের পুরনো এবং হরপ্পা সভ্যতার প্রাচীনতম নিদর্শন। সেল (Cell) পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, হরপ্পা সভ্যতার বৃহত্তম শহর, রাখিগড়িতে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে প্রাপ্ত ৪,০০০ বছর পুরনো এক কঙ্কালের ডিএনএ (আই৬১১৩)-এর অ্যানালিসিস করে জানা যাচ্ছে যে এর সাথে সেই বহুহাজার বছর আগে আফ্রিকা থেকে ভারতে আসা মানুষের জীনগত সাদৃশ্য রয়েছে। মিল রয়েছে ইরানের দিকে যাওয়া দলটির ডিএনএ-এর সাথেও; কিন্তু, ইরানে চলে গিয়ে যে দলটি পশুশিকার ও প্রতিপালন ছেড়ে পরবর্তীকালে কৃষি কাজ শুরু করেছিল, তাদের সাথে এই সিন্ধু সভ্যতার মানুষের বংশানুক্রমিক কোন যোগ নেই। অর্থাৎ, হরপ্পা সভ্যতার বিকাশের সময়ে এখানকার ভূমিপুত্রেরাই কৃষিকাজ এর পদ্ধতি আবিষ্কার ও তার রূপায়ণ করে।
অথচ, এতদিন ভাবা হত যে ইরান থেকে আসা মানুষেরাই ভারতবর্ষে প্রথম কৃষিকাজ শুরু করে। অবশ্য ইরানের সাথে সেসময়ে ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান ছিল কিনা বা তা’ এই হরপ্পা সভ্যতাকে প্রভাবিত করেছিল কিনা, এই গবেষণা থেকে তা জানা যায় না। সাথে সাথেই, এটাও মনে রাখা প্রয়োজন যে সেই যুগে দাহ করার রীতিও চালু ছিল, সবাইকে গোর দেওয়া হত না। কাজেই গবেষণায় ব্যবহৃত নমুনাটি হরপ্পা সভ্যতার অংশীদার শতশত গোষ্ঠীর মানুষের কারোর একটি। ভবিষ্যতে আরও এমন প্রত্নতাত্ত্বিক নমুনার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ হওয়া প্রয়োজন।

ঋগ্বেদে বর্ণিত সরস্বতী নদীর অববাহিকায় গড়ে উঠেছিল হরপ্পা সভ্যতা

আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যৌথভাবে করা এই গবেষণার প্রধান বিজ্ঞানী ড: বসন্ত শিন্ডে জানিয়েছেন যে সাতটি বিভিন্ন স্তরে ক্রমবিকাশের মাধ্যমে একশোরও বেশি শহরে এই সিন্ধু সভ্যতা গড়ে উঠেছিল তার শিল্প কার্য, যেমন বালুচিস্তানের মেহেরগড়ের মৃৎশিল্প কার্য তথা টেরাকোটার কাজ, অথবা রাখিগড়ির সিরামিকের কাজ আজ এত হাজার পরেও অবিকৃতভাবে ওখানকার মানুষ অনুসরণ করে চলেছে। সেইসময়ের শিল্পরীতি, কৃষি পদ্ধতি,  বাড়ী ও রাস্তা তৈরির প্রণালী, এমনকি খাদ্যাভ্যাসের সাথেও এখনকার সময়ের  কোনো পরিবর্তন হয়নি, এবং এর মধ্যে কোনোরকম বৈদেশিক প্রভাব পুরোপুরি অনুপস্থিত। অর্থাৎ, এই নিরবিচ্ছিন্নতাই প্রমাণ করে যে আমাদের সভ্যতা সম্পূর্ণরূপেই স্বদেশজাত। এখানকার এই মৃৎশিল্পের রীতির সাথে মধ্যপ্রাচ্যের মৃৎশিল্পের রীতির কোন মিল নেই। “ঋকবেদ-এ সরস্বতী নদীর উল্লেখ রয়েছে। হরপ্পার জনজীবন এর সাথে ঋকবেদ-এ উল্লিখিত জনজীবন পদ্ধতির মিল রয়েছে”- জানিয়েছেন ড: শিন্ডে।  অর্থাৎ, ঋকবেদ-এর রচনাকাল সিন্ধু সভ্যতার সমসাময়িক, খ্রিস্টপূর্ব ১,৫০০ এর পর তা’ লেখা হয়নি। যা, ‘আর্য আক্রমণ বা মাইগ্রেসন তত্ত্ব’- এ দাবি করা হয়। প্রাকৃতিক কারণে সরস্বতী নদী শুকিয়ে গেলে এবং মহেঞ্জোদারোর মত সিন্ধু সভ্যতার কোনো কোনো শহরে বন্যা আসার কারণে বহু প্রাণহানি ঘটে, এবং এই জনবসতি গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চলে সরে আসে। সিন্ধু-সরস্বতীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা ওই সভ্যতা খ্রিস্টপূর্ব ২,০০০-১,৭০০ সালের মধ্যে শেষ হয়ে আসে। এই ঘটনা পরম্পরার মধ্যে আর্য আগমনের কোনো স্থান নেই।
মহেঞ্জোদারোয় ছড়িয়ে থাকা যেসমস্ত কঙ্কালসমূহকে বিনা বিজ্ঞানসম্মত পরীক্ষায় একসময়ে আর্য আক্রমণের নিদর্শন বলা হয়েছিল, এবং ম্যাক্সমূলারের মত তথাকথিত দার্শনিক যাকে কেন্দ্র করে নিজের  ‘আর্য আক্রমণ তত্ত্ব’ খাড়া করেছিলেন, মার্কিন প্রত্নতাত্ত্বিক কেনেথ কেনেডি পরে পরীক্ষা করে জানান যে ওইসব মানুষেরা বন্যায় ডুবে মারা গিয়েছিল, তাদের কঙ্কালে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

ব্রাহ্মণ এবং আদিবাসিদের পূর্বপুরুষ পৃথক নন

‘সায়েন্স’ পত্রিকায় প্রকাশিত ডঃ নরসিমন-এর ল্যাবরেটরি হরপ্পা সভ্যতার একদম উত্তর প্রান্ত, স্বাট উপত্যকা, ইরান তথা মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরেশিয়া অঞ্চলে বসবাসকারী ৫২৩ জন মানুষের গত ৮,০০০ বছরের সময়কালের কঙ্কালের ডিএনএ বিশ্লেষণ করে। তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রায় ৪,০০০ বছর আগে মধ্য এশিয়া থেকে আগত মানুষের সঙ্গে হরপ্পা সভ্যতার উত্তর প্রান্ত, স্বাট উপত্যকার মানুষদের মধ্যে মিলন তথা জেনেটিক আদান-প্রদান শুরু হয় এবং এই জীন পরবর্তীকালের উত্তর ভারতীয়দের মধ্যে কম-বেশি বর্তমান। এক্ষেত্রে, পুরুষের থেকে আসা ওয়াই ক্রোমোজোমের আর১এ হ্যাপ্লোটাইপ বিশ্লেষণ করে পাওয়া গেছে যে ব্রাহ্মণ ও ভূমিঘর জাতির মানুষের মধ্যে এর আধিক্য বেশি। তবে, এখানে একটা মজার ব্যাপার হলো যে, আরকদল বিজ্ঞানী, ডঃ স্বরকার শর্মা ও ডঃ বামেজাই তাদের জার্নাল অফ হিউম্যান জেনেটিক্স এর প্রতিবেদনে দীর্ঘদিনের গবেষণার যে ফলাফল প্রকাশ করেছিলেন তা উপরে উল্লিখিত পর্যবেক্ষণকে সমর্থন করে, তবে তার সাথে এও প্রমাণ করে যে, ভারতের তথাকথিত আদিবাসী ও উপজাতিদের মধ্যেও এই আর১এ১* হ্যাপ্লোগ্রুপ যথেষ্ট পরিমাণে উপস্থিত। এটা পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করে যে, আর১এ১* হ্যাপ্লোগ্রুপের সৃষ্টি ভারতবর্ষে এবং ভারতীয় ব্রাহ্মণরাও আমাদের আদিবাসী ও উপজাতিদের পূর্বপুরুষদের থেকেই উদ্ভূত। বস্তুত, ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইন্সটিটিউটের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ডঃ পার্থ প্রতিম মজুমদার বিশ্ববিখ্যাত জার্নাল, প্রসিডিংস অফ দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকা (PNAS)-এ তার গবেষণাপত্রে দেখিয়েছেন যে, বিভিন্ন ভারতীয় জাতির মধ্যে এই জেনেটিক আদান-প্রদান হাজার হাজার বছর ধরে চলেছে। ভারতবর্ষে বৌদ্ধধর্মের প্রসারের সমসাময়িক একটা পর্যায়ে, আজ থেকে প্রায় ৭০ প্রজন্ম আগে ইন্দো-ইউরোপিয়ান ভাষী (সংস্কৃত ও তদ্ভব) তথাকথিত উচ্চজাতির মানুষের মধ্যে এক সামাজিক রক্ষণশীলতার জন্ম হয়। শুরু হয়,  কঠোরভাবে স্বজাতির মধ্যেই বিবাহের রীতি। এর সময়কাল  দক্ষিণে চালুক্য (৫৪৩-৭৫৩ খ্রিস্টাব্দ) ও রাষ্ট্রকূট (৭৫৩-৯৮২ খ্রিস্টাব্দ) এর সময়ে, পূর্ব ভারতে কিছুটা পরে অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতকে, বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী পালরাজাদের সময়ে।
ডঃ নরসিমন-এর গবেষণা আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য তুলে ধরেছে যা ঐতিহাসিকদের বহুদিনের এক ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে। আমুদরিয়ার উত্তরের ব্যকট্রিয়া অঞ্চলের মানুষদের ডিএনএ-এর  সাথে আন্দামানের মানুষের ডিএনএ-এর যে মিল পাওয়া গেছে, তার থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে দক্ষিণ এশিয়ার থেকে উত্তরে মানুষের মাইগ্রেসন আজ থেকে আট হাজার বছর বা তারও আগে কোন সময়ে হয়েছিল এবং এরা একই পূর্বপুরুষদের বংশধর। উপরন্তু, ৩৬টি ডিএনএ নমুনার পরীক্ষা করে তারা জানাচ্ছেন যে, ওই ব্যকট্রিয়া বা কাজাকাস্তানের লোকেদের হাত ধরে ঘোড়ার ব্যবহার দক্ষিণ এশিয়া তথা ভারতে আসেনি, কারণ তাদের সাথে প্রাচীন  ব্রোঞ্জ যুগের (হরপ্পা সভ্যতার) ভারতীয়দের কোনোরকম বংশানুক্রমিক যোগাযোগ ডিএনএ পরীক্ষায় পাওয়া যাচ্ছে না।

প্রত্নতত্ত্বের বিচারে ‘আর্য সভ্যতা’-এর কোনো অস্তিত্ব নেই

৪,০০০ বছর আগের মানুষের ডিএনএ কিভাবে তৎপরবর্তী সময়ে ঘটা (?) তথাকথিত আর্য আগমনের সম্ভবনা নাকচ করছে ? ঠিক এই প্রশ্নটিই করা হয়েছিল এখানে আলোচিত দুটি রিসার্চ পেপারেরই সহ-লেখক (গবেষক) হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ও স্বনামধন্য বিজ্ঞানী ডঃ ডেভিড রেইখ্ কে। তাঁর মতে এই প্রথমবার বিশ্বের গবেষকদের কাছে এমন একটা জেনেটিক মডেল তুলে ধরা হয়েছে যা’ আজকের ভারতীয়দের জন্য সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে গ্রহণযোগ্য: “সিন্ধু সভ্যতার মানুষের সাথে অন্যান্য কয়েকটি জাতির যে (অল্পমাত্রার) সংমিশ্রণে আজকের দক্ষিণ এশীয় মানুষরা তৈরি হয়েছে, তার প্রকৃত আনুপাতিক হার এই গবেষণায় পাওয়া গেছে।” তাঁর আরও পর্যবেক্ষণ: “প্রত্নতত্ত্বের বিচারে বৈদিক যুগের শুরু থেকেই ভারতের সভ্যতা ও উপাদান-সংস্কৃতির যে বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়, তার সাথে পশ্চিম এশিয়া বা ইউরেশিয়ার সংস্কৃতির কোনো মিল নেই, পরবর্তীকালে জেনেটিক সংমিশ্রণ কিছুটা হওয়া সত্ত্বেও। আর প্রত্নতত্ত্বের বিচারে ‘আর্য সভ্যতা’-এর কোনো অস্তিত্বই নেই। ব্রোঞ্জ যুগের সিন্ধু সভ্যতার জটিল ও সুক্ষ্ম কারীগরির সাথে তুলনা করা যায়, এমন সভ্যতা সমসাময়িক মধ্য এশিয়া অথবা ইউরেশিয়ায় ছিল না। দক্ষিণ এশিয়া তথা ভারতে সিন্ধু সভ্যতার ভূমিপুত্ররাই ভবিষ্যতের সমগ্র ভারতের মূল পূর্বপুরুষ।”
পরিশেষে, এটা মনে রাখা প্রয়োজন যে, জেনেটিক্স একটি বৈজ্ঞানিক সাধনী মাত্র। অন্তিম সিদ্ধান্তে আসতে আরো বেশি সংখ্যক এবং প্রকৃত অর্থে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নমুনার বিশ্লেষণ প্রয়োজন। জেনেটিক্সের যথোপযুক্ত ও সতর্ক ব্যবহার ইতিহাসে বর্ণিত ঘটনার সত্যাসত্য বিচারে কেবলমাত্র এভাবেই আমাদের প্রাচীন অসত্য ও অর্ধসত্য ধ্যানধারণা থেকে মুক্তি দিতে পারে।

References:

1. An Ancient Harappan Genome Lacks Ancestry from Steppe Pastoralists or Iranian Farmers. Shinde, V.*, Narasimhan, V. M.*, Rohland, N., et.al; (2019); An Ancient Harappan Genome Lacks Ancestry from Steppe Pastoralists or Iranian Farmers; Cell; 179:1–7; (Paper, Genotype data, Online Data Visualizer, doi: 10.1016/j.cell.2019.08.048).
2. The Formation of Human Populations in South and Central Asia. Narasimhan, V. M.*, Patterson, N. J.*, et al; (2019); The Formation of Human Populations in South and Central Asia; Science; 365:eaat7487; (Paper, Supplementary Materials, Genotype data, Online Data Visualizer, doi: 10.1126/science.aat7487, )
3. Genomic reconstruction of the history of extant populations of India reveals five distinct ancestral components and a complex structure.  Analabha Basu, Neeta Sarkar-Roy, and Partha P. Majumder. PNAS February 9, 2016 113 (6) 1594-1599; first published January 25, 2016 https://doi.org/10.1073/pnas.1513197113.
4. The Indian origin of paternal haplogroup R1a1* substantiates the autochthonous origin of Brahmins and the caste system. Swarkar Sharma, Ekta Rai, Prithviraj Sharma, Mamata Jena, Shweta Singh, Katayoon Darvishi, Audesh K Bhat, A J S Bhanwer, Pramod Kumar Tiwari & Rameshwar N K Bamezai.
5.Indus Valley Civilisation is largest source of ancestry for South Asians: David Reich, The Economic Times, 9 September 2019

কোন মন্তব্য নেই: