শনিবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৮

শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর সম্পর্কে সামান্য

সব জানতে হবে
নিম্নের লেখাটি ভারতের স্বনামধন্য মতুয়া গবেষক Sudhir Ranjan Halder এর আইডি থেকে সরাসরি কপিকৃত।

দেশভাগের ফলে বর্তমানে ভারতের সমস্ত রাজ্যেই মতুয়া ভক্তরা ছড়িয়ে পড়েছেন। তাঁদের বর্তমান প্রজন্ম অনেকেই বাংলা লিখতে পড়তে জানেন না। তাঁদের অনেকেই জানেন হরিচাঁদ ঠাকুরের পূর্বপুরুষ মৈথিলি ব্রাহ্মণ ছিলেন। জনৈক ফেসবুক বন্ধু একটি পোস্টের পরিপ্রেক্ষিতে জানতে চেয়েছেন গুরুচাঁদ ঠাকুরের পদবি চক্রবর্তী ছিল কিনা। এমন বিকৃত ধারণা অনেক মতুয়া ভক্তদের মধ্যে রয়েছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে “মতুয়াধর্ম প্রসঙ্গে” বই থেকে কয়েকটি লাইন উল্লেখ করলাম।
 “ঠাকুর বংশজাত পূজ্যপাদ প্রমথরঞ্জন ঠাকুর তাঁর বইয়ে লিখেছেন, তাঁর পূর্বপুরুষেরা নমঃজাতির লোকদের মধ্যে শিষ্য করতে এসেছিলেন। নমঃদের কাছে ব্রাহ্মণ হল মর্ত্যে ঈশ্বরের প্রতিনিধি এবং গুরুদেব স্বয়ং ঈশ্বর। ব্রাহ্মণেরা নমঃদের কাছে ঠাকুর বলে বিবেচিত হওয়ায় তাঁদের পদবি হয় ঠাকুর। “শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত”-এর লেখক শ্রদ্ধেয় মহানন্দ হালদারও তাই লিখেছেন। তবে কবিরসরাজ তারকচন্দ্র সরকার প্রণীত “শ্রীশ্রীহরিলীলামৃত’’ গ্রন্হের প্রথম সংস্করণে তার সত্যতা পাওয়া যায় না।  পরবর্তীকালে কোনো কোনো সংস্করণে ওই তথ্য কে বা কারা প্রক্ষিপ্ত করলেও বর্তমান বাংলাদেশের ওড়াকান্দির সংস্করণগুলিতে আর তা দেখা যায় না। তবে মজার বিষয় হলো, গ্রন্হমধ্যে বর্জিত হলেও প্রথম দিকে একখানি পৃষ্ঠায় শ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরের পূর্ব ও বর্তমান পুরুষগণের তালিকায় রামদাসের নামের পার্শ্বে বন্ধনীর মধ্যে ‘মৈথিলী ব্রাহ্মণ’ ও তৎপুত্র চন্দ্রমোহনের নামের পার্শ্বে ‘স্ত্রীর নাম রাজলক্ষ্মীদেবী নমঃশূদ্রের মেয়ে’ লেখা এখনও অব্যাহত আছে।
 আগেই বলেছি “শ্রীশ্রীহরিলীলামৃত” গ্রন্হকে ভিত্তি করে পরবর্তী গ্রন্হসমূহ রচিত হয়েছে।  সেইসঙ্গে উপরোক্ত গ্রন্হ দু’খানির ওই তথ্যকে ভিত্তি করেই বর্তমানে অনেক লেখক মতুয়াধর্মের উপরে বই-পুস্তক লিখতে গিয়ে হরিচাঁদ ঠাকুরকে মৈথিলী ব্রাহ্মণের বংশধর বলে উল্লেখ করে চলেছেন। প্রশ্ন হল, যদি ওই তথ্য সত্য হবে, তাহলে শ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরের সান্নিধ্যে আসা অগ্রজ কবি তারকচন্দ্র সরকার তা লিখলেন না কেন? ‘ঠাকুর’ পদবি হওয়ারও তিনি ভিন্ন কারণ দেখিয়েছেন।
 “শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত” গ্রন্হে গুরুচাঁদ ঠাকুরের কোনো কথার ভিতরেও এমন আভাষ পাওয়া যায়নি যে, তাঁর পূর্বপুরুষেরা ব্রাহ্মণ ছিলেন কিংবা তাঁরা ব্রাহ্মণের বংশধর।  অস্পৃশ্য নমঃজাতিকে নীচ ভেবে হয়তো বা ব্রাহ্মণ্যধর্মের সর্বোচ্চ বর্ণে উত্তরণের এটা একটি হীনতম মরিয়া প্রয়াস এবং এক ধরণের আত্মপ্রসাদ লাভের চেষ্টা। আসলে হীনম্মন্যতায় ভুগে শ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী ধর্ম মতুয়াধর্ম সম্পর্কে প্রচারে এ-ও এক ধরণের দ্বিচারিতা।
 এই প্রসঙ্গে সম্প্রতি একখানি বইয়ে একটি ঘটনার উল্লেখ পাই। বইখানির নাম “আমার লেখা গল্প”, লেখক- বগুলা কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক শ্রদ্ধেয় সত্যরঞ্জন রায়।  তিনি তাঁর ‘একটি সত্যপ্রকাশের ইতিকথা’ (পৃঃ ৬৩-৭৭) শিরোনামে এই ঘটনাটি বিবৃত করেছেন। ঘটনাটি ১৯৭৩ সালের মার্চ মাসের। নদিয়ার বানপুরবাসী তারিণী সিংহরায় নামক জনৈক আনন্দবাজার পত্রিকার প্রাক্তন রিপোর্টার লেখক ও তাঁর সঙ্গীসাথিদের কাছে যা বলেছিলেন, গল্পচ্ছলে লেখক তা বর্ণনা করেছেন।  সেই বর্ণনা অনুযায়ী পি.আর. ঠাকুর (প্রমথরঞ্জন ঠাকুর) ১৯১৯ সালে “শ্রীশ্রীহরিলীলামৃত” গ্রন্হের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেন। ওই সংস্করণেই প্রথম ঠাকুরদের বংশপঞ্জি প্রকাশিত হয়। উক্ত তারিণীবাবুই পি.আর. ঠাকুরের অনুরোধে ওই বংশপঞ্জি তৈরি করে দেন। তারিণীবাবুর কথায়- “তিনি (প্রমথবাবু) বললেন- “হিন্দুসমাজের নীচুতলার মানুষ- বিশেষ করে নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের লোকেরাই তাঁকে (হরিচাঁদ ঠাকুরকে) অবতার বলে স্বীকার করে। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্যরা হরিচাঁদকে সে মান্যতা দেয় না। তারা তাঁকে অবহেলা করে। নমঃশূদ্রকুলে জন্ম বলে ঘৃণাও করে তাঁকে। এ সমস্যা সমাধানের জন্য ঠাকুরমশাই (পি.আর.) আমার দ্বারস্হ হয়েছিলেন।  তিনি তখন আমাকে বললেন, আমি যদি হরিচাঁদ ঠাকুরের বংশতালিকায় একটুখানি পরিবর্তন ঘটিয়ে লিখে দি-ই এবং সেখানে লিখি হরিচাঁদ ঠাকুরের রক্তে কোন অবাঙ্গালী ব্রাহ্মণের রক্ত বর্তমান আছে, তাহলে বাংলায় উচ্চবর্ণের মানুষদের কাছ থেকে তাঁর (হরিচাঁদ) অবতারের মান্যতা অনেকটা সহজ হবে। তারা বেশী বাধা দেবে না- যাইহোক, আমি বিষয়টাকে সম্যক অনুধাবন করলাম। সুতরাং সেদিন প্রমথবাবুর অনুরোধক্রমেই কোন এক মৈথিলী ব্রাহ্মণের রক্তের সঙ্গে হরিচাঁদ ঠাকুরের বংশের কোন এক পূর্বপুরুষের রক্তের (বৈবাহিক সূত্রে) যোগসাধক হয়েছিল ব’লে সে কথা লিখে দিয়েছি।  তারপর থেকেই.....।”
আশা করি এ উদ্ধৃতির পরে আর কারও বুঝতে বাকি থাকবে না যে, ‘হরিচাঁদ ঠাকুরের পূর্বপুরুষ মৈথিলী ব্রাহ্মণ ছিলেন’ কথাটি কতবড়ো মিথ্যা এবং কীভাবে তা ‘শ্রীশ্রীহরিলীলামৃত’ গ্রন্হে সন্নিবেশিত হয়েছে। গ্রন্হকার বর্ণিত ঘটনাটি সম্পর্কে যদি কারও সন্দেহ থাকে বা উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে মনে হয়, তবে তিনি লেখকের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন। প্রখ্যাত অধ্যাপক সত্যরঞ্জন রায় সুস্হ শরীরে এখনও বর্তমান।  কাজেই তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করতে কোনো অসুবিধাই নেই। এ পর্যন্ত কেউ মামলা করেছেন বলে জানা নেই।” (মতুয়াধর্ম প্রসঙ্গে, লেখক- সুধীর রঞ্জন হালদার, পৃঃ ৪৩-৪৪)

কোন মন্তব্য নেই: